সাম্প্রতিক পোস্ট

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস এবং বর্তমান বাস্তবতা

মানিকগঞ্জ থেকে মো. নজরুল ইসলাম

হাজার বছরের লোকায়ত সংস্কৃতি ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সুরক্ষায় বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে নারী-পুরুষের সম্মিলিত সম্প্রীতিতে নিজস্ব ও সাংগঠনিক কায়দায় আবির্ভূত হয়েছে অসংখ্য গায়ক, কবি, সাহিত্যক, লেখক শিল্পী ও বিষয়ভিত্তিক বুদ্ধিজীবিদের। তারা সমসাময়িক বাস্তবতার নিরিখে বাংলা সংস্কৃতিক লোকায়ত চিত্র তুলে ধরেছেন তাদের সৃষ্টিকর্মে। আমরা সেগুলোকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে না পারলেও প্রকৃতির দিকে ফিরে তাকিয়ে লোকায়ত সংস্কৃতিকে স্মরণ করে ইতিবাচক যে চর্চাগুলো অব্যাহত আছে সেগুলো সুরক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর।
বৈশাখী উৎসব পালনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস সৌর পঞ্জিকানুসারে বাংলা বারোমাস মুঘল আমলেরও অনেককাল আগে থেকেই পালিত হত। এই পঞ্জিকা শুরু হত গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরালা, মণিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা,পাঞ্জাব,তামিলনাডু ও ত্রিপুরায় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হত। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের শুরুতেই একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, একসময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য্য ছিল কৃষি কাজ কারণ প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর উপরেই নির্ভর করতে হতো।

এক সময় বাংলা সনের মূল নাম ছিল তারিখে এলাহি। মোঘল স¤্রাট আকবর ১৫৮৫ সালে তার রাজত্বকালে ২৯ তম বর্ষের ১০ কিংবা ১১ মার্চ তারিখে এক ডিগ্রী জারির মাধ্যমে তারিখ এ এলাহী প্রবর্তন করেন। সিংহাসনে আরোহণের পরপরই তিনি একটি বৈজ্ঞানিক, কর্মপোযোগী ও গ্রহণযোগ্য বর্ষপুঞ্জি প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন, যেখানে দিন ও মাসের হিসবাটা যথাযথ থাকবে। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তিনি তৎতকালিন প্রখ্যাত বিজ্ঞানি ও জোর্ত্যিিবদ আমীর ফতুল্লাহ সিরাজীকে নতুন বর্ষপঞ্জি তৈরির দায়িত্ব প্রদান করেন। বিখ্যাত পন্ডিত ও সম্্রাট আকবর এর মন্ত্রি আবুল ফজল এ সমন্ধে ব্যাখ্যা প্রদান করেন যে, হিজরী বর্ষপঞ্জি কৃষিকাজের জন্য মোটেও উপযোগী ছিল না কারণ চন্দ্র বছরের ৩১ বছর হয় সৌর বছরের ৩০ বছরের সমান। চন্দ্র বছরের হিসাবেই তখন কৃষকদের নিকট থেকে রাজস্ব আদায় করা হতো অথচ চাষবাস নির্ভর করত সৌর বছরের হিসাব মত। চন্দ্র বছর হয় ৩৫৪ দিনে সেখানে সৌর বছর হয় ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিনে। ফলে দুটি বর্ষপঞ্জির মধ্যে ব্যবধান দেখা যায় ১১ বা ১২ দিন। বাংলা সনের জন্ম ঘটে স¤্রাট আকবরের এই রাজস্ব আদায়ের অভিনব কায়দার পেক্ষাপটে।

তারিখে এলাহি বারোমাসের নাম ছিল কারবাদিন, আর্দি, বিসুয়া, কোদার্দ, তীর আমাদার্দ, শাহরিয়ার, আবান, আজুর, বাহাম ও ইস্কান্দার মীজ, কারো পক্ষে আসলে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় কখন এবং কিভাবে এসব নাম পরিবর্তিত হয়ে বৈশাখ, জৈষ্ঠ্য, আষাঢ, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র্য হলো। অনুমান করা হয়, বারোটি নক্ষত্রের নাম নিয়ে পরবর্তীকালে নামকরণ করা হয় বাংলা মাসের। বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, জায়িস্তা থেকে জৈষ্ঠ্য, শার থেকে আষাঢ়, শ্রাবণী থেকে শ্রাবণ, ভদ্রপদ থেকে ভাদ্র, আশ্বায়িনী থেকে আশ্বিন, কার্তিকা থেকে কার্তিক, আগ্রহায়ণ থেকে অগ্রহায়ণ, পৌউসা থেকে পৌষ, ফাল্গুনি থেকে ফাল্গুন, এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র।

IMG_20190414_091047
আনুষ্ঠানিকভাবে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি সম্রাট আকবরই প্রদান করেন। তার আমলে রাজ্যে ১৪টি উৎসব পালন হত মহাসমারহে ও ধুমধামে। তারমধ্যে অন্যতম ছিল নওরোজ বা নববর্ষ উৎসব। আরো জানার বিষয় হলো, এই নওরাজ বা নববর্ষ অনুষ্ঠানেই রাজপুত্র সেলিম পরে যিনি সম্্রাট জাহাঙ্গীর নামে খ্যাত হন, এবং মেহেরুন্নেসার প্রেমে পড়েন। এই মেহেরুন্নেসাই ইতিহাসের সেই বিখ্যাত নূরজাহান। এ রকম আরেকটি নববর্ষের উৎসবে রাজপুত্র খুররম পরবর্তীকালের স¤্রাট শাজাহান, খুঁজে পান তার জীবনসঙ্গীনি মমতাজ মহল থেকে। যার জন্য তিনি নির্মাণ করেন জগতখ্যাত তাজমহল। যদি এই নববর্ষ উতসব না থাকত তাহলে আমরা হয়তো নুরজাহানকে আবিস্কার করতে পারতাম না এবং বিশ্বের বিস্ময়কর তাজমহলও পেতাম না।

অনেক আগে থেকেই পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব যেটি বর্তমানে বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। আমাদের দেশেও পাহাড়-হাওর লবণাঞ্চল সমতলসহ নদী কেন্দ্রিক অঞ্চল ভেদে ভিন্ন ভিন্ন রূপে পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। যেমন ব্যবসায়ী বণিকেরা নতুন হালখাতা খুলে দেনাদার পাওনাদার এর মধ্যে মিষ্টিমুখ করিয়ে প্রীতির হাসি সৃষ্টি করেন। কবি সাহিত্যকরাও তাদের ডায়রি বদল করেন, নতুন বই প্রকাশ করেন। বৈশাখকে তারা কল্পনা করেন সময় পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে। পুরাতন বছরের রোগ, শোক, ব্যথা, ব্যর্থতা, হতাশা ভুলে তারা নতুন করে ভালোবাসা-প্রেমে,শস্যে-সংঙ্গীতে,সুখে-শান্তিতে যেন ভরে দেয় তাদের জীবন সংসার। এই সব কারণে বৈশাখ ধরা দেয় কবিদের কাছে রুদ্র রূপে। শুধু তাই নয় বৈশাখের রুদ্র রূপে তারা বিচলিত নন বরং বৈশাখের কাল বৈশাখীর জন্য তারা পথ চেয়ে থাকেন উদগ্রীব হয়ে, যাতে জীর্ণ পাতারা ঝরঝর করে ঝরে পড়ে,স্বপ্ন দেখে নতুন পল্লবে ভরে উঠবে জীবনের ডালপালা। নতুন রঙে, নতুন সঙে, নতুন গানে, আয়োজনের মিলনমেলায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে বাংলার পথ ঘাট। তবে সকল অঞ্চলেই হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে এক চাদরের তলে বৈশাখী অনুষ্ঠানমালার মিলন মেলায় শামিল হয়। সময়ের প্রয়োজনীয়তায় এই উৎসবে যোগ হয়েছে বিভিন্ন উপাদান। কাচা মরিচের পান্তাভাত, শাক পোলাও, মাংস,খিচুরীসহ হরেক রকমের খাওয়ার আয়োজন তো আছেই। পুঁিজবাদী এই সমাজে নতুন করে যোগ হয়েছে পান্তা ইলিশের ঘনঘটা। এসব প্রতিযোগিতায় শিশু-কিশোর-ছাত্র-যুবকদের সাথে যুক্ত হয়েছে গ্রামীণ কৃষক-কৃষাণী ও নবীণ প্রবীণের মহা সম্মিলনে বাড়ছে আন্তঃনির্ভরশীলতা তৈরি হচ্ছে পারস্পরিক নির্ভরশীলতার আন্তঃপ্রজন্ম। ইতিবাচক এই সব সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত থাকলে পরিবর্তনকারী যুব সংগঠন দ্বারা সমাজে নারী-পুরুষের সামাজিক ন্যায্যতা সৃষ্টি করা সম্ভব।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ইতিবাচক চর্চাগুলো হ্রাস পেয়ে নেতিবাচক চর্চা প্রসারিত হচ্ছে। বৈশাখী মিলন মেলায় আনন্দের পাশাপাশি আগে থেকেই কমবেশী গ্রামীণ মেলা, হাতের তৈরি খেলনা, গহনা পোশাকসহ বিভিন্ন আয়োজনে সীমিত আকারে অর্থনৈতিক দেনদরবার চলত। এদিক থেকে সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর প্রভাবও কম বেশি দেখা যেত। অর্থনীতির ভাষায় টাকার যত বিনিময় ঘটবে অর্থনীতির চাকা তত গতিশীল থাকবে। সময়ের আবর্তে আধুনিকতার দাপটে এটি আজ উৎসব থেকে মহাউৎসবে পরিণত হয়েছে। এই দিনকে কেন্দ্র করে এখন কারবার, ফটকা কারবার এবং বাজার অর্থনীতিতে সম্প্রীতি ও নির্ভরশীলতাকে পিছনে ফেলে মুনাফাই যখন মূখ্য তখন বাকি সব আয়োজন হয়ে যাচ্ছে তুচ্ছ। বর্তমান মুনাফা কেন্দ্রিক উৎসব বহুকেন্দ্রিক নয় এককেন্দ্রিক। সেটি হলো বাজার কেন্দ্রিক মনোপলি ব্যবসা যেটি গুটিকয়েক পরিবারকে ধনী থেকে আরো ধনী করছে। একদিকে আমরা দেখছি লোকায়ত সংস্কৃতির উপাদানগুলো হারিয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে ভোগবাদীরা সেই উপাদনগুলোকে আত্মসাৎ করে তাকে প্যাটেন্টসহ নতুন রূপ দিয়ে গুটি কয়েক কোম্পানি বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে এবং তারা বিজয়ীও বটে। যেমন- কৃষক নিজ হাতে সরিষার তৈল করে সংসার সামলাতেন। গ্রামে তৈল উৎপাদনকারিকে কুলু বলা হত। তারা গাওয়াল করত। বৈশাখের দিন হাতের তৈরি তৈল দিয়ে ভর্তাসহ অন্যন্য তরকারির জুড়ি ছিল না। কাসিন্দ তৈরি ও গাওয়াল করা ছিল হিন্দুদের বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রধান পেশা। হলুদ, মরিচ, আদাসহ অধিকাংশ মসলা নিজেরাই তৈরি করত এবং পাটায় বেটে রান্না করার মজাই ছিল আলাদা। মাটির হাড়িতে রান্না, বাসনে খাবার, কলাপাতায় সিন্নি, পাটিতে দাওয়াত, হাতে ভাজা মুরি,খই,বিন্নিসহ হরেক রকমের খাবার ও তৈজসপত্রের ইয়াত্তা নেই। সাংস্কৃতিক চর্চাগুলোতে অপসংস্কৃতির ছত্রছায়া চরমভাবে বিদ্যমান। যেমন- গানবাজনায় আধুনিক সাজসরঞ্জাম, উচ্চতর ভলিওমের বাদ্যযন্ত্র,বিদেশী ভাষার গান কোমলমতি তরুণপ্রজন্মকে দ্রুত আকৃষ্ট ও নিজস্বসংস্কৃতি থেকে বিপথগামী করছে।

বিশ্বায়নের এই যুগে এগুলো দিয়ে আসক্তি করে প্রযুক্তির মাধ্যমে মুনাফা লুফে নিচ্ছে বিদেশী কর্পোরেট কোম্পানিগুলো। বাজার অর্থনীতিতে মানুষ নিজেই যখন পণ্যে পরিণত হয়েছে তখন উৎসব সম্পর্কীত লেখার আকার এই লেখায় আর বাড়াতে চাই না শুধুমাত্র উপাদানগুলোর কযেকটি উদাহরণ টানলাম বিশ্লেষণ নয়। তারপরও আমরা স্বপ্ন দেখি সুন্দর ভোরের, সুন্দর আগামীর, আদর্শীক নীতিনিষ্ঠ সমাজের। যেখানে সমাজ হবে শোষণমুক্ত এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার উপাদানগুলো বিদ্যমান থাকবে শতভাগ। কবি সাহিত্যকদের লেখার উপাদান ও চারণভূমি হবে লোকায়ত ত্রিভূবন। শিল্পকর্মে ফুটে উঠবে কবি নজরুল,কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কীটস, বাইরন শেলির মত শক্তিমান কবিদের আছর।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ শিল্প ও সাহিত্য, মোহাম্মদ শরীফ, নতুন দিগন্ত ত্রৈমাসিক, এপ্রিল, ২০১৮, সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সাপ্তাহিক একতা,উইকিপিডিয়া

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: