Posted in

‘ইয়র’ ধানের সংরক্ষক মো. দারু মিয়া

নেত্রকোনা থেকে খাদিজা আক্তার লিটা
নেত্রকোনা কৃষক দারু মিয়া দশ কাঠা নিচু জমিতে স্থানীয় জাত ‘ইয়র’ ধান চাষ করে প্রায় ৪০ মণ সংগ্রহ করেছেন। প্রায় ৬০ বছর বয়সী এই দারু মিয়া দীর্ঘদিন ধরে ‘ইয়র’ ধান চাষ ও সংগ্রহ করে আসছেন। এ ধান সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘দাদা দাদির সময় থেকে আমার পরিবার এ ধান চাষ করেছেন, আমরা নিজেরা ধান চাষের পাশাপাশি সবসময় বীজ সংগ্রহ করি।’ তিনি জানান, তাঁর ৪০ কাঠা জমিতে ধান চাষ করে যদি কোন দুর্যোগ না হয় তিনি প্রায় ২০০ মণ ধান সংগ্রহ করতে পারেন। তিনি প্রতিবছর বিআর-৪৯, বিআর-৩২ ধানের পাশাপাশি স্থানীয় জাত ‘ইয়র’ ধান চাষ করেন। মূলত দুর্যোগকালীন সময়কে বিবেচনা করেই তিনি এ ‘ইয়র’ ধান চাষ করেন কারণ এ ধানটি অনেকটা দুর্যোগ সহনশীল।

দারু মিয়া বলেন, ‘ইয়র ধান পানি সহনশীল একটি জাত। ধানের উচ্চতা অন্যান্য ধানের তুলনায় কিছুটা বেশি। এ ধান সহজে ঢলে পড়েনা। ধানের রং কিছুটা লালচে। এ ধানের ভাত খেতে যেমন সুস্বাদু তেমনি সুগন্ধযুক্ত। এ ধানে যে কোন ধরনের পিঠার তৈরি করা যায়। এর খড় গরু ছাগলের খাদ্য হিসেবেও উপযোগী এবং ঘরের ছাউনির জন্যও ভালো।’


তিনি জানান, ভাদ্র মাসের শেষদিকে এ ধান রোপণ করে অগ্রহায়ণ মাসে কাটা যায়। সময়কাল কম লাগে বলে পানিতে ধান নষ্ট হয় না। সাপমারা গ্রামে ১২ জন কৃষক বর্তমানে ‘ইয়র’ ধান চাষ করছেন। চাষীদের মধ্যে যারা বীজ সংগ্রহ করে না তারা দারু মিয়ার কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করেন। কেউ কেউ ধানের জালা নিয়ে যান। দরু মিয়া বলেন, ‘এ ধান আমাদের কাছ থেকে কৃষকরা তখন নিয়ে যান, যখন উচ্চ ফলনশীল বাজারের ধান লাগানোর মতো সময় থাকেনা।’


ভালো বীজ সংগ্রহ ও বেশি ফলনের আশায় নেত্রকোন্ াসদরের বাজারে আসা যাওয়া করতে করতে অনেক কৃষকের ধান রোপণের সময় চলে যায়। তখন তাঁরা ছুটে আসেন দারু মিয়ার বাড়িতে কিছু জ্বালা নেওয়ার জন্য। দারু মিয়া তাদের নিরাশ করে না প্রতিবছর দুর্যোগ আসতে পারে, জালা নষ্ট হতে পারে এ আশায় ইয়র ধানের বেশি পরিমাণের জালা করে রাখেন।


‘ইয়র’ ধানের প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা নিয়ে বড় হয়েছেন দারু মিয়া। নিজের দাদা ও দাদীকে হারিয়েছেন সেই কবে থেকে। কিন্তু এ ধানের সাথে কেমন যেন দাদা ও দাদীর শরীরের ঘ্রান মিশে আছে বলে তিনি মনে করেন। এ ধান কাটার পর বাড়ির উঠানে এক কোণায় কাঠের ঢেকিতে দাদীর সাথে তাঁর মা ও পাড়ার অনেক বউ মিলে ঢেকিতে ধান বানা, ঢেকি ছাটা চালের পিঠা তৈরি করা, শীতে সকালে মাটির হাড়িতে রান্না ভাতের গন্ধের স্মৃতি এখনও তিনি মনে রাখেন। তিনি মনে করেন, স্থানীয় জাতের ধানগুলো প্রতিটি এলাকার এক একটি ঐতিহ্য। একটি ধান যখন হারিয়ে যায় তখন ধানের সাথে গ্রাম বা এলাকার ঐতিহ্য হারিয়ে যায়। তাই তিনি এ ধানের বীজটি খুব যতœ করে সংগ্রহ করে আসছেন দীর্ঘদিন থেকে।


ধানের পাশাপাশি দারু মিয়া সারাবছর বাড়িতে হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল, কবুতর পালন করেন। তা দিয়ে তিনি পরিবারে পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে, বছরে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ সঞ্চয় করতে পারেন। বাড়িতে এ ধরনের বৈচিত্র্যময় গৃহস্থালী প্রাণী সম্পদের সাথে ‘ইয়র’ ধানের সম্পর্ক রয়েছে বলে কৃষক দারু মিয়া জানান।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.