সাম্প্রতিক পোস্ট

খাদ্য হিসাবে তালের আঁটির স্বাদ পরিবর্তনে সরবানু বেগমের উদ্যোগ

শ্যামনগর, সাতক্ষীরা থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল

তাল আমাদের সবার পরিচিতি একটি সুস্বাদু ফল। তালের ফল ও বীজ দুটোই প্রিয একটি খাবার। কাচা বা কচি অবস্থায় তালের বীজও খাওয়া হয় যা তালশাঁস নামে পরিচিত । আবার এই তাল পাকলে এর ঘন নির্যাস দিয়ে তালসত্ব, পিঠা, কেক , পায়েশসহ নানান ধরনের মজাদার খাবার তৈরি করা হয়। এগুলো অনেক সুস্বাদু । তাল গাছের কাণ্ড থেকেও রস সংগ্রহ হয় এবং তা থেকে গুড়, পাটালি, মিছরি, তাড়ি ইত্যাদি তৈরি হয়।

তাছাড়া তাল গাছ বজ্রপাত প্রতিরোধক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।  মানুষের জন্য উপকারি ও গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় এ ফলের গাছ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়ে গিয়েছিল। আগেকার দিনে যেমন প্রবীণ ব্যক্তিরা যেসব তালগাছ রোপণ করেছিলেন বয়সের কারণে তারা হযতোবা অনেকেই এখন বেঁচে নেই। পরবর্তী প্রজন্ম দীর্ঘদিন পরে এ গাছ থেকে ফল পাওয়া যায় বলে বীজ বা গাছ রোপণের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন।  তাল গাছের নানান ধরনের গুণাবলীর কথা মাথায় রেখে ক্রমে গাছের উপকারিতা বিষয়ে মানুষ সচেতন হওয়ায় এ গাছ রোপণের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তাল গাছের নানান ধরনের গুণাবলী আছে যা বলে শেষ হওযার নয়। এ গাছের ফল দিয়ে যেমন  বিভিন্ন ধরনের মজাদার খাদ্য তৈরি হয়। তেমনি এর গাছ দিয়ে  ঘরের খুঁটি, পাতা দিয়ে পাকা তৈরি, ঘরের ছাউনি ইত্যাদি কাজে। আবার  পাকা তালের বীচি বা আটি মাটিতে রাখলে কিছু দিন পর ভিতরে যে জিনিসটি হয় তা খেতে খুবই সুস্বাদু।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় তাল গাছ রোপণ ও সম্প্রসারণের নানান ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছে। সে অনুযায়ী উপকূলীয় এলাকায় তার ব্যতিক্রম নয়। উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার কারণে সব রকমের খাদ্যের স্বাদের তারতম্য দেখা যায়। এছাড়া গাছের বৃদ্ধি ও প্রজননও ভিন্ন হয়ে থাকে। পানি লবণাক্ততার কারণে রান্না করা খাওযারের স্বাদ ও পাল্টে যায়। আর তার জন্য উপকূলীয় এলাকার জনগোষ্ঠীরা তারা তাদের রান্নাকৃত খাবারের স্বাদ, গাছ লাগানো, বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে নানান ধরনের উদ্যোগ ও কৌশল গ্রহণ করেন।

ঠিক তেমনি সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার কাশিমাড়ি ইউনিয়নের খেজুর আটি গ্রামে কৃষাণী সরবানু বেগম লবনাক্ততা এলাকায় তালের বীচি বা আটির স্বাদ পরিবর্তন করার জন্য এক ভিন্ন ধরনের কৌশল অবলম্বন করেন। যা অন্যদের জন্য শিক্ষণীয় এবং তার এ উদ্যোগ তার বাড়ির আশেপাশের মানুষেরা চর্চায় নিয়ে এসেছেন। এ সম্পর্কে সরবানু বেগম বলেন, আমরা যেহেতু লবণাক্ততা এলাকায় বাস করি। এখানকার সব রকমের খাদ্যের স্বাদ একরকম নয। লবণ পানির জন্য আমাদের খাদ্যের স্বাদ পাল্টে যায। মিষ্টি পানি দিয়ে রান্না করার তরকারীতে যেমন স্বাদ লাগে তেমনি কিন্তু নোনা বা দুধ নোনতার পানিতে রান্না তরকারীর তেমন স্বাদ নেই। তারপরও আমরা তা খেয়ে থাকি।

তিনি আরো বলেন, ভাদ্র মাসের দিকে তাল পাকে। আর এ তালের নির্য়াস বা নোদা বের করে বিভিন্ন ধরনের খাবার তৈরি করি। এরপর তালের বীচি বা আটি আমরা মাটিতে ফেলে রাখি তা থেকে কিছুদিন পর ভিতরে এক ধরনের সাদা যে জিনিসটা হয় তা খেতে খুবই সুস্বাদু। কিন্তু এলাকা লবণ হওযায় মাটিতে লবণের মাত্রা বেশি হওযার কারণে তা খেতে মোটেও্ স্বাদ লাগে না। ফলে বাড়ির কেউ সেরকম খেতে চাইতো না বা তরকারী রান্না করে খেলেও কেমন যেন পানসে মতো লাগতো। আর এ থেকে কিভাবে তালের এ আটি বা বীচিতে স্বাদ পরিবর্তন আনা যায় তার জন্য ভাবতে থাকলাম। আর মনে করলাম মাটি যখন লবণ তখন আর মাটিতে না দিয়ে উঁচু করে মাচা তৈরি করে সেখানে দেবো। আর সে অনুযায়ী গত দুবছর তালের আটি সরাসরি মাটিতে না দিয়ে মাচা তৈরি করি। আর সেক্ষেত্রে প্রথমে চারিপাশে ইট দিয়ে উচু করে তার উপর কাঠের পাটনি/বিছানা তৈরি করে তালের আটিগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে দেই। এরপর কিছু মাটি দেয় এভাবে কিছু অংশ মাটি আবার কিছু আটি এভাবে দেই। এতে করে আটির ভিতরের অংশগুলো খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদু হয়। যা শুধু খেতে যেমন মজা তেমনি রান্না করে খেতেও মজা। আমার এটি দেখে আমাদের গ্রামের অনেকেই এভাবে তালের আটি খাবার হিসাবে সংরক্ষণ করছে।

উপকূলীয় এলাকায় সরবানু বেগমের এটি একটি ছোট উদ্যোগ হতে পারে। কিন্তু উপকূলীয় এলাকায় দরিদ্র, ধনী ও মধ্যবৃত্ত সকল পরিবার নানান ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও লবণের সাথে নানান ধরনের সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হচ্ছে। সেখানে কিছুটা হলেও সরবানু বেগমের এউদ্যোগ ও চর্চা খাদ্য নিরাপত্তায় কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখছে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: