ক্ষুদ্র ব্যবসা করে পরিবারে আয় বাড়াতে চান মেহেরুন্নেছা

সাতক্ষীরা থেকে মহিরঞ্জন মন্ডল

সাতক্ষীরার উপকুলীয় শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পূর্ব গড়কুমারপুর  গ্রামে একটি অসহায় ও হত দরিদ্র পরিবারের নারী মেহেরুন্নেছা । খোলপেটুয়া নদীর চরে তার বসবাস। প্রকৃত অর্থে Vulnerable  বা  Exposure বলতে যেটা বোঝায় ঠিক সেই পরিবেশের মধ্য দিয়ে তিনি জীবন সংগ্রাম করে বসবাস করে আসছেন। বর্ষাকালের ভরা জোয়ারে তার বাড়ির উঠানে পানি চলে আসে। আর যে কোন ছোট খাটো প্রাকৃতিক দূর্যোগে তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না তার ঘরের মেঝে পর্যন্ত পানি চলে আসে। কোন কোন সময় ঘরের বেড়া পড়ে যায় আবার ঘরের চাল উড়ে চলে যায় দুর্যোগে। এভাবেই চলে মেহেরুন্নেছার জীবন সংগ্রাম। এক মেয়ে  ও দুই ছেলে নিয়ে অভাবের সংসারে দিন কাটে মেহেরুন্নেছার ৷ স্বামী দিন মুজুরের কাজ করেন ৷ বছরের সব সময় কাজ হয় না৷ অন্যের মাছের ঘেরে কৃষি দিনমজুর হিসেবে বছরে দুই থেকে তিন মাস কাজ করতে পারেন তরিকুল ইসলাম ৷ এদিকে মেহেরুন্নেছাও অসুস্থ, কিডনির সমস্যা।  বাড়ির গৃহস্থালির কাজ ছাড়া তেমন কোনো ভারী কাজ করতে পারে না তিনি ৷ মেয়েটার বয়স ১৫ বছর, বড় ছেলেটার বয়স ১৩ বছর, মাদ্রাসায় পড়ে। এর মধ্যে মেহেরুন্নেছার কোলজুড়ে  আসে আরেকটা ছেলে৷  ফলে এমনিতেই অভাবের সংসার তার উপর এতোগুলো মানুষের খরচ চালাতে হিমসিম খেতে হয় মেহেরুন্নেছাকে। 

মেহেরুন্নেছা ও তার পরিবার যখন পুরোপুরি দিশেহারা ঠিক তখনই  পিআরএ এর মাধ্যমে বারসিক পরিবেশ প্রকল্পের সূর্যমুখী দলের সদস্য হিসাবে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যুক্ত হন মেহেরুন্নেছা খাতুন  ৷ তিনি প্রতি সপ্তাহে গ্রুপ মিটিং এ হাজির হতে থাকেন এবং একটা পর্যায়ে জলবায়ু সহনশীল কৃষি চর্চা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রাণী সম্পাদের লালন পালন, পরিচর্যা ও বসতভিটায় যে সামন্য জায়গা রয়েছে সেটাকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে সবজি চাষ করতে হয় সে বিষয়ে জানতে পারেন৷ মেহেরুন্নেছা  তার পরিবারের সাথে পরামর্শ করে আইজিএ, হিসাবে ক্ষুদ্র ব্যবসা  করার সিদ্ধান্ত নেন৷ তিনি ঠিক করেন খোলপেটুয়া নদীর ওপারে নওয়াবেঁকি বাজার থেকে জুতা, স্যান্ডেল কিনে এনে পূর্ব গড়কুমারপুর গ্রামের রাস্তা দিয়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করবেন  এবং তিনি সেটাই করলেন।

নেটজ্  বাংলাদেশের সহায়তায় বারসিক পরিবেশ প্রকল্পের মাধ্যমে ১০৫৩৫ টাকার পাইকারী দরে  জুতা কিনে আনেন বাজার থেকে  এবং দুটি গাছের চারা ও দুটি পাতীহাঁস  সহযোগিতা পান পরিবেশ প্রকল্প থেকে ৷ এবার তিনি তার পরিবারটাকে একটু স্বচ্ছল করার জন্য স্বপ্ন পুরণের পথচলা শুরু করেন। তিনি সকালে বাচ্চাদের খাবার দিয়ে তার দুই হাতে দুটি বড় ব্যাগে বেশ কিছু পরিমাণে জুতা ভরে গ্রাম দিয়ে হকারী করার জন্য বের হয়ে পড়েন ৷ তিনি দেখেন যে এতে তার বিক্রিও মোটামুটি ভালো। তিনি লাভের টাকা সংসার চালানোর কাজে অল্প কিছু খরচ করে পুনরায় আবার জুতা কিনে আনেন। সেগুলোও কিছুদিনের মধ্যে বিক্রি হযে যেতে লাগলো।  এভাবেই তিনি কিছুটা সাহস ফিরে পান। তিনি নিজের ভিতর আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেন যে হ্যাঁ আমি পারবো। তার বাড়ি নদীর চরে ওয়াব্দা রাস্তার পাশে হওয়ায় তিনি বাড়ির পাশে রাস্তার উপরে বিকালে একটা বস্তার উপর ঢেলে জুতার দোকান দেওয়া শুরু করেন। সেখান থেকেও পথচলা মানুষ তার কাছ থেকে জুতা কিনতে থাকে। বর্ষাকাল চলে আসায় তিনি দেখেন যে এভাবে মাটিতে কাদার উপরে বস্তায় জুতা ঢেলে বিক্রি করতে একটু অসুবিধা হচ্ছে । তাই তিনি তার ব্যবসার লাভের ১৫০০ টাকা দিয়ে রাস্তার পাশে এস্থায়ী একটি  খাঠ বা পাড়াং তৈরী করে তার উপরে জুতা রেখে বিকালে বিক্রি করেন। আর সকালে গ্রামে গ্রামে হেঁটে  বিক্রি করেন। এমনকি তিনি প্রতি সপ্তাহে  যে দিন গ্রুপ মিটিং এ যান সেদিনও একটা ব্যাগে করে কয়েক জোড়া জুতা বিক্রির জন্য নিয়ে যান এবং গ্রুপের অন্যান্য সদস্যরা তার কাছ থেকে জুতা কেনেন। তার ব্যবসায় ভালোই লাভ হচ্ছে। তিনি এখন প্রত্যেক সপ্তাহে সপ্তাহে জুতা কিনে আনেন বাজার থেকে এবং পরো সপ্তাহে সেগুলো বিক্রি করেন। সপ্তাহে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকার মত বিক্রয় হয়। বারসিক পরিবেশ প্রকল্পের মাধ্যমে মেহেরুন্নেছা ক্ষদ্র ব্যবসার জন্য সহায়তা নিয়েছিলেন মাত্র দশ হাজার টাকার জুতা কিন্তু তার ব্যবসা রোলিং হতে হতে তার কাছে এখন প্রায় ৫০,০০০ টাকার জুতা আছে। 

মেহেরুন্নেছা এখন নতুন করে স্বপ্ন বুনছেন তার এই ব্যবসাটাকে কিভাবে আরো বড় করা যায়। মেহেরুন্নেছা চিন্তা করছে বসবাসের ঘরটি নতুন করে মেরামত করে দূর্যোগের সাথে মোকাবেলা করে যাতে টিকে থাকতে পারে সে জন্য ঘরের ভিতটা অন্তত পাকা করবেন এবং ছেলে মেয়েকে ভালো স্কুলে পড়াবে, সংসারে পুরোপুরি স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনবেন। ক্ষুদ্র ব্যবসা করে জীবন পাল্টে গেছে মেহেরুন্নেছার। তিনি এখন অনেক খুশি। বারসিক এবং নেটজ্ বাংলাদেশের প্রতি অনেক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মেহেরুন্নেছা ও তার পরিবার।

happy wheels 2

Comments