সাম্প্রতিক পোস্ট

উপকূলে যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে অচাষকৃত উদ্ভিদবৈচিত্র্য

উপকূলে যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে অচাষকৃত উদ্ভিদবৈচিত্র্য

শ্যামনগর, সাতক্ষীরা থেকে বিশ্বজিৎ মন্ডল

সেই আদিকাল থেকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের মাধমে টিকিয়ে রেখেছেন প্রাণবৈচিত্র্য ও খাদ্য ভান্ডার। একই সাথে সমৃদ্ধ করেছে জ্ঞান ভান্ডার। প্রতিনিয়ত সেই জ্ঞান ছড়িয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। শুধু মাত্র খাদ্য চাহিদার ক্ষেত্রে নয় রোগ নিরাময়েও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রকৃতি থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে থাকে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকৃতির অবদান রয়েছে। আর প্রকৃতির বিভিন্ন ধরনের গাছ গাছড়া, লতা, গুল্ম সংগ্রহ করে পারিবারিক খাদ্য চাহিদা পূরণেও ভূমিকা রাখছেন গ্রামীণ জনগোষ্টী। এ গুলোর প্রয়োজনের তাগিদে প্রাকৃতিকভাবে জ¥ নেওয়া এ উদ্ভিদ বৈচিত্র্য কেউ কেউ নিজ উদ্যোগে সংরক্ষণ করছেন।

P (1)

প্রতিনিয়তি বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতার মধ্যে থেকে জীবন জাপন করতে হয় উপকূলবাসীর। একসময় উপকূলীয় এলাকায় ১২ মাস শস্য ফসলে ভরা ছিল প্রত্যেক বাড়ি। প্রত্যেক বাড়ির বাহিরের দৃশ্য দেখে বলা যেতো যে এটা একটি কৃষিবাড়ি। আর এ জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দূর্যোগ ও জনসচেতনতার অভাবে কৃষি চিত্র পরিবর্তন হচ্ছে। পাশাপাশি এলাকা থেকে অচাষকৃত উদ্ভিদ বৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়াও এর ব্যবহারও আগের থেকে কমে গেছে। বর্তমান প্রজন্মও এর ব্যবহার সম্পর্কে খুব বেশি জানে না। সেক্ষেত্রে অচাষকৃত এসকল উদ্ভিদ বৈচিত্র্য পারিবারিকভাবে চর্চা এবং নতুনদের মধ্যে ধারণা দিতে, এ উদ্ভিদের ব্যবহার ও গুণাবলীসহ সংরক্ষণের জন্য উপকূলীয় জনগোষ্ঠী সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় নানান ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছে। যেমন গ্রাম ও সংগঠন পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা, অভিজ্ঞতা বিনিময়, গ্রাম ও পাড়া মেলা, রান্না প্রতিযোগিতা, কবিরাজ কর্মশালা, হার্বেরিয়াম শিট তৈরি, স্কুল পর্যায়ে কুইজ প্রতিযোগিতা, গল্পের আসর, বিভিন্ন ধরনের প্রদর্শনী প্লট তৈরি ইত্যাদি। এর ফলে এলাকায় সচেতন ও আগ্রহী হয়ে উঠেন অনেকেই।

P (2)

ফলে শ্যামনগর উপজেলায় গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা, ইশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধুমঘাট ও কেওড়াতলী গ্রাম, কাশিমাড়ি ই্্উনিয়নের জয়নগর, খুটিকাটা ও কাঠালবাড়ি, শ্যামনগর সদর ইউনিয়নের হায়বাতপুর, বেতাঙ্গী, কালমেঘা গ্রাম, রমজাননগর ইউনিয়নের রমজাননগর ও মানিকখালী গ্রাম, কৈখালী ইউনিয়নের মধ্য কৈখালী গ্রাম, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের আড়পাঙ্গাশিয়া ও বুড়িগোয়ালিনী গ্রাম, পদ্মপুকুর ইউনিয়নের পাখিমারা গ্রাম, নুরনগর ইউনিয়নের রামজীবনপুর গ্রাম, ভুরুলিয়া ইউনিয়নের হাটছালা গ্রামের কৃষক- কৃষাণীরা তাদের বসতভিটায় সবজি চাষের পাশাপাশি অচাষকৃত উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণ করে চলেছেন।

কখনো সবজি ক্ষেতের মধ্যে, কখনো আলাদা প্লট তৈরি করে, পুকুরের পাড়ে, খালের পাড়ে, রাস্তার পাশে এসব অচাষকৃত উদ্ভিদ সংরক্ষণ করছেন। যা কিনা নিজ পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিবেশীদের খাদ্য চাহিদা পূরণে সহযোগিতা করছে। প্রতিটি উদ্ভিদের সাথে প্রতিটি প্রাণের রয়েছে পারস্পারিক আন্তঃনির্ভরশীলতা এবং নিবিড় সম্পর্ক।

P (3) (1)

এসকল বাড়িতে প্রায় ৭৬ ধরনের অচাষকৃত উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও ব্যবহার করে চলেছে। যেমন: দুধশাক, ঘুমশাক, কালোবন কচু, আদাবরুন, সেঞ্চি, ঘোড়া সেঞ্চি, থানকুনি, ক্ষুদকুড়ি, তেলাকচু, কাঁথাশাক/মাটিফোড়া, পেপুল শাক, কলমিশাক, বউটুনি, আমরুল শাক, হেলাঞ্চ, গাদামনি/নোনাগড়গড়ে, বেলে শাক, গিমে শাক, কাটানুটে, তালমাখনা, দুধ সেঞ্চি, গলগটে, পিপুল শাক, বেতো শাক, তিঁত বেগুন, হেগড়া, কুলফিনাড়ী, হিমশাক, ঢেঁকিশাক, হেটকেশাক, গন্ধ ভেজাল কালমেঘা, সাদা লজ্জাবতী, শীষ আকন্দ, হাতিশুঁড়, তুলসী, মিঠাইচন্দ্র, স্বর্ণলতা/পরগাছা, ধুতরা, বুড়িপান, বনমূলা, দূর্বা, নয়নতারা, মণিরাজ, টোপাশ্যাওলা, রক্তকেউটে, সদাবদী, সেজী গাছ, রক্তকুচ, হাড়ভাঙ্গা, আগাছা, নিলার্জী, পাথরকুচি, আচ্ছটি, কুচট গাছ, রক্তকরবী, বামন আটি, দাউদকান্দি, রাখালচুটকি, কালকিসিন্দে, ভাটই, হরকোচা, কাকলে ঘাস/কানসুড়ি, কানালী ঘাস, অনন্তমূল, পাঁসাফুল, বুনো পালং, শিয়ালকাটা (বেগুনি), শিয়ালকাটা (হলুদ), শে^তআকন্দ, মুক্তঝুরি, জহরবাত, ফুলোটেপারি, অপরাজিতা, বাগঝাপা, শে^তক্রুপ, বাসক, বিষকাঁঠালী, গদগাছ, বিষকলমী ইত্যাদি।

P (4)

এ প্রসঙ্গে শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা গ্রামের কৃষাণী ফরিদা বেগম বলেন, “২০০৯ সালের আইলার আগে আমাদের এলাকায় অনেক ধরনের অচাষকৃত শাক ছিল, আইলায় তা নষ্ট হয়ে গেছে। এগুলোকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নিয়েছি শ্যামনগর এলাকা থেকে অনেক শাক এনে আমরা লাগিয়েছি। আমাদের প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে কম বেশি এ শাক রয়েছে এবং আমরা তা ব্যবহার করছি। এছাড়া ও বারসিকের সহায়তায় আমাদের গ্রামে যে পাড়া মেলা ও রান্না প্রতিযোগিতা হয়েছে সেখান থেকে আমরা আরো বেশি আগ্রহী হয়েছি। ইতিমধ্যে আমাদের গ্রামে একটি প্রদর্শনী প্লট তৈরি করেছি।” এলাকায় কৃষক-কৃষাণীরা জানান যে, এসকল উদ্ভিদ চাষ আলাদা কোন শ্রম অর্থ লাগে না। শুধুমাত্র এগুলো চিনলে এবং এর গুণাবলী জানলে কেউ নষ্ট করার কথা ভাববে না। এসকল উদ্ভিদ যে কত উপকারে আসে তা বলে শেষ করা যায় না। কখনো কখনো কোন কোন পরিবারের মাসে ৫-৭ দিনের তরকারীর অভাব পূরণ করে। কখনো আবার ঔষধি হিসাবে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার হচ্ছে। পাশাপাশি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এসকল উদ্ভিদ ব্যবহার হচ্ছে।

ভিন্ন ভিন্ন কৃষি প্রতিবেশ ও জীবন জীবিকায় ভরপুর বাংলাদেশ ষড়ঋতুর বৈচিত্র্য দিনদিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। শত পরিবর্তন ও প্রতিকূলতার মাঝে এখনও দেশের অঞ্চল ভেদে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী নানান সংগ্রামের মধ্যে থেকে টিকিয়ে রেখেছে প্রাণবৈচিত্র্য ও জীবন। আর তাদের এ উদ্যোগ ও জ্ঞানের স্বীকৃতি খাদ্য নিরাপত্তায় সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: