Posted in

নারী ও কিশোরীর নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখছে

নেত্রকোনা থেকে রোখসানা রুমি
‘যুগে যুগে গ্রামীণ নারীর হাত ধরেই কৃষি, পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীবনযাপনের বৈচিত্র্যময় সম্পর্কগুলো গড়ে ওঠেছে, প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা পেয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু গ্রামীণ নারীর এই জ্ঞান অভিজ্ঞতাকে আমরা কখনও স্বীকৃতি দেয়নি। গ্রামীণ নারীদের হাত ধরেই টিকে থাকা বৈচিত্র্যময় শস্য ফসলের বীজ, ঔষধি জ্ঞান, বৈচিত্রময় খাদ্য উৎপাদন, নানান জাতের শস্য ফসলের বীজ বোনা, পাহাড় হাওর, সমতলে বীজ সংগ্রহ ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন করে যোগান দিয়ে যাচ্ছে যুগের পর যুগ। কুটির শিল্প বানিয়ে মাছ ধরে, কাপড় বুনে, দুর্যোগ মোকাবেলা করে, বৈচিত্র্যময় শস্য ও খাদ্য সংগ্রহ করে, গবাদি পশু লালন পালন করে, জ্বালানি কুড়িয়ে ও লোকাচার চর্চা করে এই গ্রামীণ নারীই টিকিয়ে রেখেছেন আমাদের স্থায়িত্বশীল জীবন ব্যবস্থা।
এবারের আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো: নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে গ্রামীণ নারী ও কিশোরীর অবদান। দিনটিকে সামনে রেখে দরুণ বালি কুসুমকলি কিশোরী সংগঠন ও ফচিকা অগ্রযাত্রা কিশোরী সংগঠন বীজ বিতরণ, আলোচনা ও শতবাড়ী পরিদর্শন করে দিনটি পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ফচিকা গ্রামের অগ্রযাত্রা কিশোরী সংগঠন কিশোরী তথ্যকেন্দ্রে গ্রামীণ নারী ও কিশোরীদের নিয়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপান ও পারিবারিক পুষ্টি বিষয়ে আলোচনা করেন। দরুণবালি গ্রামের কিশোরী সংগঠনের সদস্যরা আবুল কালামের শতবাড়ি মডেল পরিদর্শন ও লাউ, ডাটা, লালশাক বীজ বিনিময় করেন। আবুল কালামের শতবাড়ি মডেল ও তাঁর বীজঘর ঘুরে দেখেন।

আমাদের বর্তমান সময়ে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা। বর্তমান পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গ্রামীণ নারীদের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, লোকায়ত জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে। পরিবেশবান্ধব স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা অনুশীলনের মাধ্যেমে গ্রামীণ নারীরা দেশ তথা বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। সাথে সাথে কিশোরীদেরকে এই খাদ্য রূপান্তরের সাথে যুক্ত করতে হবে। নিম্নে গ্রামীণ নারীর অবদানগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:

গ্রামীণ নারী ও খাদ্য নিরাপত্তা
আমাদের বর্তমান সময়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিরাপদ খাদ্য ব্যবস্থাপনা। বর্তমান পরিস্থিতিতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গ্রামীণ নারীদের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, লোকায়ত জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে। পরিবেশবান্ধব স্থায়িত্বশীল কৃষি ব্যবস্থা অনুশীলনের মাধ্যেমে গ্রামীণ নারীরা দেশ তথা বিশ্ব খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। সাথে সাথে কিশোরীদেরকে এই খাদ্য রূপান্তরের সাথে যুক্ত করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও গ্রামীণ নারী
একজন মা হিসেবে বাংলাদেশের গ্রামীণ নারী জলবায়ু পরিবর্তনের কাছে অসহায়। দুর্যোগে, সংকটে, বাসস্থান, স্বাস্থ্য, পানীয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যাতায়াত, নিরাপত্তা ইত্যাদির সমস্যার মোকাবেলা নারীকেই করতে হয়। প্রতিটি সমস্যা সমাধানের লড়াইয়ে নারীকে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করতে হয়। সন্তানের ভবিষ্যত চিন্তায় মা শিশুর বইগুলো রক্ষার চেষ্টা, শিশুর খাদ্য, পুুষ্টি, ও নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। এমনও দেখা গেছে, নিজে পানিতে দাঁড়িয়ে শিশুটিকে কোমরে বেঁধে রাখে। ধান মাছ চাষ, হাঁস, মুরগি পালন বিভিন্ন আয়মূলক কাজ করে নারীরা। নারীদের এ সব প্রচেষ্টা দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যায়। স্বীকৃতি পায় না। মানুষসহ চারপাশের পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যকে ঘিরেই গ্রামীণ নারীর সংসার। গ্রামীণ নারীদের স্থানীয় সম্পদ ও জ্ঞাননির্ভর এই ঐতিহাসিক লড়াই কেবলমাত্র আমাদের জীবন ও জীবিকার অস্তিত্বই টিকিয়ে রাখছেনা বরং গ্রামীণ নারীদের ঐতিহাসিক এই কর্মপরিসর পৃথিবীর উল্টেপাল্টে যাওয়া জলবায়ুকে ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

নারী, পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তা
যে নারীর হাত ধরে কৃষির সূচনা হয়েছে। সভ্যতার বিস্তার প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণকারী সেই নারী উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারছেনা। গ্রামীণ এ নারীরা সুবিধা বঞ্চিত, ক্ষমতাহীন, স্বাস্থ্য, শিক্ষায়, দূর্যোগে অসহায়। অথচ উন্নয়নশীল বিশ্বের গ্রামীণ নারীরা হচ্ছে উৎপাদক ও খাদ্যর যোগানদাতা। ঋড়ড়ফ ধহফ অমৎরপঁষঃঁৎব (ঋঅঙ) এর মতে, উন্নয়নশীল দেশে গ্রামীণ নারীরা ৬০-৭০ শতাংশ খাদ্য উৎপাদন করে এবং পৃথিবীর অর্ধেক খাদ্যর উৎপাদক হচ্ছে গ্রামীণ নারী। কিন্তু বাস্তব কথা হলো এ নারীরা কম খাদ্য খায়, খায় সবার শেষে, অপুষ্টিতে ভোগে এবং খাদ্যের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গ্রামীণ নারীদের মূল জায়গায় আনা হলে খাদ্য নিরাপত্তা ও দরিদ্র বিমোচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

বিশ্বের জনসংখ্যার ৫০% নারী হওয়া সত্তে¡ও উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কার্য়ক্রম বাস্তবায়নে গ্রামীণ নারীসমাজ অবহেলিত। সারাবছর ঘর, সংসার, কৃষির সমস্ত কাজ কর্মের পাশাপাশি সামান্য আয়ের জন্যও চাপের মুুখে থাকতে হয় তাদেরকে। গ্রামীণ নারীদের কিন্তু দিনের অধিকাংশ সময় কাজ করেও শ্রমমূল্য ও সম্মান পান খুব কম। অত্যাচার, নির্যাতন আর বৈষম্যর মূল শিকার গ্রামীণ নারী সমাজ। অন্যদিকে কৃষি, পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গ্রামীণ নারীর অবদান সবচেয়ে বেশি। ঐতিহাসিকভাবেই প্রাণবৈচিত্র্য পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গ্রামীণ নারীর সংগ্রহে রাখা ঘরের বীজ দিয়েই কৃষকরা চাষাবাদ করে অভ্যস্ত। নারীরা সেই বীজ বাছাই, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও আদান প্রদান করে আসছেন যুগ যুগ ধরে। পাশাপাশি পরিবার ও সামাজিক পারষ্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাথে সর্ম্পকযুক্ত। অথচ এ সর্ম্পক প্রক্রিয়া, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও সুসংহত দৃঢ় ব্যবস্থাটি ক্রমাগতভাবে ভেঙ্গে দিচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানি। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে বীজ, প্রাণবৈচিত্র্য, বিনষ্ট হচ্ছে সর্ম্পক, ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ, প্রতিবেশ, বসবাসের সামাজিক বন্ধন। কৃষি, ব্যবস্থা, কাঠামো গড়ে ওঠেছে গ্রামীণ নারীদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা সযতেœ অনুশীলনের মাধ্যেমে। এক্ষেত্রে স্থানীয় ঐতিহ্যের জ্ঞানের বাহন হচ্ছে আমাদের গ্রামীণ নারী সমাজ। কিন্তু বীজ ও বিষ কোম্পানি নারীর এই জ্ঞান অভিজ্ঞতাকে চুরি করে বাজার দখল করছে। ধ্বংস হচ্ছে সকল প্রাণবৈচিত্র্যের মা, মাটি, পরিবেশ। বিলুপ্ত হচ্ছে প্রাণবৈচিত্র্য, বীজ, ধ্বংস হচ্ছে সুন্দর জীবনযাত্রা ও পারিবারিক ও সামাজিক সর্ম্পক। কোন কার্বন নির্গত না করে পরিবেশসম্মত কৃষি চর্চা, স্থানীয় চাষ পদ্ধতিতে লোকায়ত জ্ঞান ব্যবহার, প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করে গ্রামীণ নারীরা বংশপরম্পরায় পরিবেশ রক্ষা করছেন এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও সামগ্রিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য তাদের ভূমিকা অসামান্য।

গ্রামীণ নারীরা প্রচলিত অপ্রচলিত সকল ধরণের কৃষিতে ফল ফসল, বীজ ও প্রজাতি সংরক্ষণ ও আাদান প্রদান প্রতিক্রিয়ায় বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন। তাদের ভূমিকা গাছের শেকড়ের মত। গাছের শেকড় কেটে দিলে গাছ যেমন মরে যায় তেমনি পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য, বীজ, পারিবারিক, সামাজিক বন্ধন রক্ষাকারী এই শিকড়, গ্রামীণ নারীর এই অভিজ্ঞতা, জ্ঞান প্রযুক্তিকে কোন কোম্পানির হাতে আমরা তুলে দিতে পারিনা! আমাদের জীবনের জন্য, প্রতিবেশকে ধরে রাখার জন্য পরবর্তী বংশকে টিকিয়ে রাখার জন্য গ্রামীণ নারীকে রক্ষা ও মুল্যায়ন করতে হবে। গ্রামীণ নারীদের বাস্তবতাকে তুলে ধরে তাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদাকে সুসংহত করা, কৃষি পরিবেশ, ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় তাদের ভূমিকাকে সমুন্নত করা এবং তাদের অধিকার বাস্তবায়ন ও ক্ষমতায়নের জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। তবে নিজস্ব কৃষি ব্যবস্থা ও ঐতিহ্য রক্ষা পাবে, সংরক্ষিত হবে, প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

বীজ বৈচিত্র্য সংরক্ষণে গ্রামীণ নারী
আমাদের কৃষি সভ্যতার মূলভিত্তিই হলো বীজ। আমাদের দেশের নারীরাই বৈচিত্র্যময় শস্য ফসলের জাত উদ্ভাবন ও বীজ সংরক্ষণে এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। সৃষ্টির আদিতে পৃথিবী যখন বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল, যখন মানুষ কৃষি কাজ করতে শেখেনি তখনো প্রাকৃতিকভাবেই বিভিন্ন ফসল শস্যাদির চাষ হতো। গাছ থেকে ফল মাটিতে পড়তো এবং সেখানেই গাছ জন্মাতো। প্রাকৃতিক এই সমস্ত ক্রিয়াকলাপ অবলোকনের মাধ্যমে এবং নিজের জ্ঞান ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে নারীগণ বিভিন্ন ফসল চাষ এবং বীজ সংরক্ষণ শুরু করে। দিনের পর দিন বছরের পর বছর বৈচিত্র্যময় সবজি ফল শস্য তেলবীজ, ডালবীজ সংরক্ষণ করে যাচ্ছেন। কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে নারীরা সবসময়েই অন্তরঙ্গভাবে জড়িত। আগ্রাসী সুবজ বিপ্লব বীজসহ অন্যান্য কৃষি শস্য উৎপাদেনর উপর থেকে নারীর নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানির প্রতিনিধির হাতে তা অর্পণ করেছে। এত কিছ্রু পরও নারীরা এখনো পরম যতেœর সাথে আমাদের স্থানীয় জাতের বিভিন্ন শস্যের বীজ মায়ের আদরে আগলে রেখেছেন। আর এই প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়ে কৃষি প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে গ্রামীণ নারীর অবদান অনস্বীকার্য।

সবজি উৎপাদনে নারী
ঐতিহ্যগতভাবেই গ্রামীণ নারীরা কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে। মানুষের জীবনধারণের জন্য মৌলিক যে চাহিদাগুলো রয়েছে তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে খাদ্য। গ্রামের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয়ের সবচে বড় অংশ ব্যয় হয় খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করতে। ধান বা চালের পরেই যে প্রয়োজনীয় উপাদান আসে সেটা হলো সবজি। বীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণ, সবজী চাষ, পরিচর্যা, পোকাদমন, সার ও কীটনশক প্রয়োগ ফসল সংগ্রহ এই প্রত্যেকটা কাজের সঙ্গে একজন গ্রামীণ নারী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সংসারের কাজের পাশাপাশি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একজন নারী বিভিন্ন ধরণের কাজের সাথে যুক্ত থাকে। কিন্তু তাকে কখনোই আমরা কৃষক বলে মনে করিনা। বিদেশি কোম্পানির বিভিন্ন আগ্রাসী বীজের চটকদার বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে কৃষকগণ সেই দিকেই ধাবিত হচ্ছে। নিয়ে আসছে বীজ, চাষ করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু ঘরে সংরক্ষিত বীজ এবং নারীর পরিশ্রমের মূল্য কেউ দিচ্ছেনা। এক মুঠো বীজ সংরক্ষণ করতে যে পরিমাণ কাঠখড় একজন নারীকে পোড়াতে হয় তার দিকে কেউ দৃষ্টিপাত করে না। এতো কিছুর পরও নারীর কাজ থেকে থেমে থাকে না। তার অভিজ্ঞতা, জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিজের সংরক্ষিত বীজ বা কারো নিকট থেকে সংগ্রহ করা বীজ ইত্যাদি আবাদ করেন। এখনো গ্রামীণ নারীরা তার বসতভিটার পাশে লাউ, সীম, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, শশা, পুঁইশাক, মিষ্টি কুমড়া, কাকরল, এর বিষমুক্ত উৎপাদন ব্যবস্থা অব্যাহত রেখেছেন। গ্রামীণ নারীরা ঘরের পাশেই, পেঁপে গাছ, বেগুন গাছ, বারোমাসী মরিচ গাছ লাগিয়ে পরিবারকে সারাবছর সবজি উপহার দেন পুষ্টির যোগান দেন। নিজেরাই বীজ বাছাই করেন সংগ্রহ করেন, বিনিময়ে ও চাষ করেন। বৈচিত্র্যময় সবজি চাষকে গ্রামীণ নারীরাই লোকায়ত জ্ঞান ও স্থানিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগলে রেখেছেন যুগযুগ ধরে।

বৈচিত্র্যময় শস্য ফসল উৎপাদনে নারী
কৃষি সভ্যতার বিকাশের পেছনে গ্রামীণ নারীর অবদান অপরিসীম। তার লোকায়ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কৃষিখাতকে সমৃদ্ধ করেছে। নারীরাই বৈচিত্রময় বীজ সংগ্রহ করেন। মাঠে সবুজ ফসল ফলাতে কৃষককে সহায়তা দান করেন। বলা হয়, গ্রামীণ নারীর হাত ধরে টিকে আছে আমাদের বৈচিত্র্যময় শস্য ফসলের বীজ। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামই সুজলা, সুফলা, শ্যামলা। নানা জাতের বৈচিত্র্যময় ফসলের শস্যভান্ডার এই গ্রাম। আমাদের গ্রাম বাংলায় এখনো বৈচিত্র্যতা টিকে আছে এবং টিকিয়ে রাখার একমাত্র আধার হচ্ছে নারী। তিনি নিজেসহ আশেপাশের প্রতিবেশীদেরকেও বিভিন্নভাবে সাহয্য করেন। নিজের আঙ্গিনায় নানাপ্রকার সবজি, ঔষধি গাছ, ফলজ গাছ ইত্যাদি রোপণ করেন, নিজের ইচ্ছা বা পছন্দ অনুযায়ী আবাদ করেন শস্য। বাড়ির আঙিনাটিকে পরিবেশসম্মত রুচিশীলভাবে সাজিয়ে তোলেন। সেখানে স্থান পায় মৌসুমভিত্তিক নানা সবজি ও ফসল। গ্রামীণ নারীরা লাউ, শিম, মিষ্টি লাউ, শশা, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, চাল কুমড়া, টমেটো, ডেঢ়স, আলুসহ নানান জাতের সবজি, পেয়াজ রসুন, আদা, হলুদ ইত্যাদি মসলা চাষ করেন। তাছাড়া গোল আলু, ব্যাঙ্গ আলু, সোনা আলু, বইছা আলু, গাছ আলু, বিচি আলু, বেল আলু, ইত্যাদি চাষ করে ফসল বৈচিত্র্যতা রক্ষা করে চলেছে।

পশু পালন ও রক্ষায় গ্রামীণ নারী
গ্রামীণ নারীরা পশুপালন এবং রক্ষা যেন নারীরাই অবদান। দেশীয় প্রজাতির পশুপাখি পালন প্রাকৃতিক সম্পদ ঔষধি ও বনজ ব্যবহার করে রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রেখেছেন। একজন গ্রামীণ নারীর দৈনিক কার্যের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেন পশু পাখির যতœ, রক্ষা এবং উন্নয়নের স্বার্থে। তাঁরা সকালে হাঁস, মুরগি ছেড়ে দেওয়া এবং গরু ছাগল গোয়াল থেকে বের করেই কাজের সূচনা করেন। নিজের সংসারের যাবতীয় কার্যক্রম ঠিক রেখে পশু পাখির খাদ্য জোগাড়, বাসস্থান প্রস্তুতি এবং রোগবালাই প্রতিরোধ সম্পর্কে স্বজাগ থাকেন সারাদিন। পশু পালনে বড় কোন সমস্যায় পড়লে নারীরা পাশের বাড়ির অভিজ্ঞ নারীর নিকট পরামর্শের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করেন অতি সহজেই। মনে হয়, গ্রামীণ নারীরা যেন পশু পাখির ভাষা বুঝেন! কারণ ছয় ঋতুর পরিবর্তনের সাথে সাথেই পশুপাখির খাদ্যভ্যাস পরিবর্তন আনতে দেরি করেনা এক মুহুর্ত। শীতের আভাস পেলেই ছাগলের বিছানায় ছিড়া কাথা/চটের ছালা এবং গরমের আভাস পেলেই খোলামেলা পরিবেশে/উন্মুক্ত স্থানে/জানালার ব্যবস্থা করবে বিন্দুমাত্রও ত্রæটি হয় না গ্রামীণ নারীর। পশু পাখির বিষ্ঠাও যেন গ্রামীণ নারীদের অমূল্য সম্পদ। কারণ উঠানে সবজির বাগানের জন্য জৈব সার হিসাবে ব্যবহার করেন ।

ঔষধি গাছের ব্যবহার ও গ্রামীণ নারী
প্রাচীনকাল থেকে গ্রামীণ নারীরাই মানুষ অথবা পশুর চিকিৎসা ও জড়বস্তু ও বীজ সংগ্রহে গাছ গাছালির ব্যবহার করে আরছেন। তারা শুধু রোগেরও চিকিৎসা করছেন না! এসব গাছকে মানুষ জাতির অমূল্য সম্পদ মনে করে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। আমাদের চারপাশে জন্মানো বিভিন্ন বনজ গাছের রয়েছে ঔষধিগুণ। আদিকাল থেকে মানুষ এই গাছের গুণাগুণ উদ্ভাবন করেছেন এবং বিভিন্ন রোগবালাই নিরাময়ের জন্য পথ্য হিসাবে ব্যবহার করে আসছেন। অনেক নারী এখনও গাছ গাছালির দ্বারা রোগের চিকিৎসা করে আসছেন লোকায়ত জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে। গ্রামীণ নারীরাই এখনও ধরে রেখেছেন আমাদের কৃষি, কৃষি প্রাণবৈচিত্র্য ও দরিদ্র মানুষ খাদ্য, পুষ্টি স্বাস্থ্য সেবা এবং খাদ্য উৎপাদনে প্রকৃতিক সম্পদ, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যের উপর নির্ভর করে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.