Posted in

কৃষি নিয়ে নুরজাহান বেগমের ভাবনা

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী

আমাদের দেশ মূলত গ্রাম প্রধান কৃষিনির্ভর দেশ। কৃষিকে কেন্দ্র করেই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকের বেড়ে ওঠা। আর প্রতিনিয়ত কাজের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠার সাথে সাথে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে, তবে সবাই সমান তালে অভিজ্ঞ হয়না। আবার অনেকের আরও জানা বুঝার বা আরও নতুন নতুন কিছু করার ইচ্ছা ও আগ্রহও থাকে না। নিজের কাজকে জানা, কি করা উচিত, কোথা থেকে পাব এই ভাবনাগুলো তাড়িত করে সাতবুড়ি কান্দা গ্রামের কৃষানী নুরজাহান বেগমকে (৩৮)। স্বামী ও দুই মেয়ে নিয়ে চার জনের সংসার। মেয়ে দু’জনই পড়াশুনা করছে। অভাবের সংসারের মধ্যে থেকে দুই মেয়ে পড়াশুনা করছে। বড় মেয়ে এমএ পাশ করেছে এবং ছোট মেয়ে দশম শ্রেণীতে পড়ছে।

Nurzahan 2
ছোট বেলায় বাবার হাত ধরে কৃষি কাজে নুরজাহান বেগমের হাতে খড়ি। কৃষি কাজের পাশাপাশি ছোট বেলা থেকেই শখ করে তিনি ষাড় গরু পালন করেন। নেত্রকোনার ঐহিত্যবাহী ষাড়েঁর লড়াই খেলায় তিনি নিজের পালিত ষাঁড় নিয়ে অংশগ্রহণ করতেন। এখনও তিনি তার এই শখ থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারেননি। তার অন্য একটি শখ হল জমিতে নতুন নতুন জাতের ফসল আবাদ করা। যেখানেই যান সেখান থেকেই তিনি স্থানীয় জাতের সবজি বীজ সংগ্রহ করে নিজের বসতভিটায় চাষ করেন। বসতভিটাসহ তার মোট জমির পরিমান ৩০ কাঠা বা তিন একর (৩০০ শতাংশ), যেখানে তিনি বছরব্যাপী বৈচিত্র্যময় সবজি ফসল চাষ করেন।

সাতবুড়ি কান্দা গ্রামে খুব কম লোকই সবজি চাষ করে। এ গ্রামের মানুষ ধান ছাড়া অন্যান্য ফসল চাষ করেনা বললেই চলে। কিছু কিছু লোকের আবার মাছের খামার রয়েছে। একমাত্র নুরজাহানই ভিন্ন, তিনি ৫ কাঠা জমিতে বছরব্যাপী পর্যায় ক্রমে জৈব উপায়ে সবজি ও অন্যান্য শস্য চাষ করেন। তিনি যেসব ফসল চাষ করেন তার মধ্যে-পেঁয়াজ, রসুন, লাউ, বেগুন, সরিষা, গম, তিল, কচু, ডাটা, কুমড়া, টমেটো, মরিচ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এক খন্ড জমিও তিনি কখনো পতিত রাখেন না। সারাবছর কোন না কোন সবজি তার জমিতে থাকেই। কোন ফসলের বীজ কখন রাখতে হয়, কিভাবে রাখতে হয় এবং কোন ফসল কোন মৌসুমে ভালো ফলে, কেন ফসল নষ্ট হলে, কিভাবে ভালো করা যায় ইত্যাদি বিষয়ে নিজের ভাবনা থেকে ব্যবস্থাপনা করে থাকেন। তিনি গ্রামের অন্যদের কাছ থেকে যেমন কৃষির বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ নেন তেমনি অন্যদেরও পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করে থাকেন। প্রতিদিন তার নিকটে বিভিন্ন্ লোক আসে কৃষি বিষয়ে জানতে এবং তার চাষকৃত ফসল দেখতে। তিনি নিয়মিত আগাম সবজি ফলান এবং বেশি মূল্যে তা বিক্রি করেন। জৈব উপায়ে চাষ করায় অন্য কৃষকদের চাইতে তার সবজি ভালো ও খেতে ভালো হওয়ায় বাজারে দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।

আগাম এবং বছরব্যাপী সবজি চাষ কেন করেন জানতে চাইলে নুরজাহান বেগম বলেন, ‘আমি আগাম কোন ফসল চাষ করলে বাজারে তার চাহিদা বেশি থাকে, দামও বেশি থাকে এবং লাভ বেশি পাওয়া যায়। আমি কখনও কোন আত্মীয় বাড়ি গেলে খোঁজ করি কোন বীজ আছে, কোনটা ভালো ফলন দেয় এবং পেলে সংগ্রহ করে বীজ নিয়া আসি। সেসব বীজ নিজে চাষ করি, বীজ রাখি এবং অন্যদেরও বীজ দেই। আমি কখনও জমি পতিত রাখি না। নিজে খাওয়ার জন্য বাজার থেকে সবজি খুব কম কিনি।’ সবজি বিক্রি থেকে সারাবছর তিনি যে পরিমাণ আয় করেন তা দিয়ে তার পরিবারের চাহিদা পূরণ হয়ে যায়।

Nurzahan

নুরজাহান বেগম তার ভবিষ্যত ভাবনা সম্পর্কে বলেন, ‘আমার শখ ভবিষ্যতে একটি গরুর খামার করা এবং নতুন প্রযুক্তিতে নতুন জাতের সবজি চাষ করা। আমার মত গ্রামের সকল কৃষক তাদের প্রয়োজনীয় ফসলের বীজ নিজেরা উৎপাদন করে সংরক্ষণ করবে এবং পরস্পরের সাথে বীজ বিনিময় করে বীজসহ সকল কৃষি উপকরণের জন্য পরস্পরের উপর নির্ভরশীল থাকবে। কৃষকদের মধ্যে আন্তঃনির্ভরশীলতা যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি শস্য বৈচিত্র্য ও প্রাণবৈচিত্র্যও বৃদ্ধি পাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ আমি স্বপ্ন দেখি চাষযোগ্য জমি পতিত থাকবেনা, সারা বছর বৈচিত্র্যময় ফসল চাষের মাধ্যমে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে, সেই সাথে খাদ্য নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাবার সকলের জন্য নিশ্চিত হবে। সকল কৃষক কৃষাণীরা বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের পছন্দের শস্য বীজ সংগ্রহ করে নিজেরা চাষবাদ করলে কৃষকদের নিকট শস্য জাত বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হবে এবং বীজের জন্য বাজারের উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পাবে। সেই সাথে কৃষকরা বাজারের বীজ কিনে প্রতারিত হওয়া ও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবে।’ এই বীজ বিনিময় মাধ্যমে তাদের গ্রামে ২৫ জন নারী সংগঠিত হয়ে ‘আমরাই পারি’ নামে একটি নারী সংগঠন গড়ে উঠেছে।

আজকে আধুনিক ডিজিটাল যুগে নূরজাহান বেগম এক মডেলের নাম। নূরজাহান বেগমের ন্যায় দেশের সকল কৃষক-কৃষাণীর ভাবনা যদি একই হয়, তাহলে বর্তমানে কৃষকরা যেসকল সমস্যার সন্মূখীন হচ্ছে এবং যার ফলে কৃষি ক্ষেত্রে যে ক্ষতি হচ্ছে তা থেকে কৃষকরা নিঃস্কৃতি পাবে। জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে, বীজের ও কৃষি উপকরণ কৃষকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে। সকলের জন্য নিরাপদ খাবার ও খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত হবে এবং প্রাণবৈচিত্র্য বৃদ্ধি পাবে এবং সকলের বৈচিত্র্যময় খাবারের স্বাদ পাবে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.