সাম্প্রতিক পোস্ট

‘রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিটুকু পেলে যেন মরেও শান্তি পাবো’

আব্দুর রাজ্জাক, ঘিওর (মানিকগঞ্জ) ॥
মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে গর্বিত জাতি হিসেবে বাঙালি জাতি যে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন, তারই ফলশ্রুতিতে আমরা পেয়েছি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি। ভাষা সেই মহান ভাষা সৈনিকদের অবদান ফেব্রুয়ারিতে স্মরণ করা হলেও সারাবছরই থাকেন তারা উপেক্ষিত। ভাগ্যে জুটেনি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। অভাব অনটনে টেনে নেয়া জীবনের বাঁকে দীর্ঘশ্বাস আর উপেক্ষার যাতনা। এমন আক্ষেপের সুরে কথা বললেন ভাষা সৈনিক মিরান উদ্দিন মাস্টার ও কমরেড আব্দুল হাকিম।

মানিকগঞ্জে ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত হয় তেরশ্রী কে. এন. ইনিস্টিউট থেকে। মূলত এই বিদ্যালয়ের সহকারি প্রধান শিক্ষক প্রমথনাথ নন্দী ছিলেন ভাষা আন্দোলনের পুরোধা। তার সাথে যুক্ত হোন এ প্রতিষ্ঠানের ক্রীড়া শিক্ষক আফসার উদ্দিন আহম্মেদ। আন্দোলনে শামিল হন মানিকগঞ্জের আরো ২১ জন কৃতি সন্তান। তাদের মধ্যে এখনো বেঁচে আছেন দুই ভাষা সৈনিক। শ্রদ্ধেয় মিরান উদ্দিন ও আব্দুল হাকিম মাস্টার। সম্প্রতি তারা জানালেন তাদের প্রত্যাশা, প্রাপ্তি এবং জীবনের নানা বিষয়।

মিরান উদ্দিন মাস্টার
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সেই ৯ম শ্রেণীর টগবগে কিশোর মিরান এখন ৮৫ বছরের এক বৃদ্ধ। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরটা এখন আর আগের মতো সচল নেই। তবুও স্মৃতি হাতড়ে খুঁজে ফেরেন জীবনের সমৃদ্ধ অতীত। ফ্রেব্রুয়ারি এলেই মনে পড়ে সেই উত্তাল দিনগুলো। মাতৃভাষা জন্য জীবন উৎসর্গ করতে সেদিন এতটুকু দ্বিধা বা ভয় ছিল না তার। বাঙালির মাথা উচুঁ করে দাঁড়ানোর সেই আন্দোলনের একজন অংশীদার হিসেবে এখনও গর্ববোধ করেন তিনি।
বলছিলাম ভাষা সৈনিক মিরান উদ্দিনের কথা। যার হৃদয় ও কণ্ঠে এখনও বেজে ওঠে ভাষার গান। যার চিত্ত এখনো ব্যাকুল মা, মাটি, মানুষ, মাতৃভাষা ও মাতৃভ’মির মঙ্গল কামনায়।

1 (14)

১৯৩৪ সালের ২৮ আগষ্ট জন্ম নেয়া প্রবীণ এই ভাষা সৈনিকের সঙ্গে কথা হয় তার ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরী গ্রামে তার বাড়িতে। স্মৃতি হাতড়ে অনেকটা আক্ষেপের সুরে এ ভাষা সৈনিক বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি মাস আসলেই ডাক পড়ে আমাদের কিন্তু এর পর আর কেউ খোঁজ রাখে না। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের শুরুর সেই সময় (১৯৪৯ সালে) ৯ম শ্রেণীর কিশোর আমি। স্কুল প্রাঙ্গণের পলাশ গাছটি ফুলে ফুলে রক্তিম ছিল। আমি ছিলাম নবম শ্রেণি ক্লাসের ক্যাপ্টেন। সেদিন স্কুলে আসার পর আমাকেসহ সহপাঠি ওয়াজেদ উদ্দিন, ভুপেন্দ্র নাথ, রেহাজ উদ্দিন, মুকুল চন্দ্র সরকার, নিরঞ্জন, যতিনকে ডেকে পাঠান স্কুলের শিক্ষক প্রমথনাথ নন্দী ও আফসার উদ্দিন। ঢাকায় বাংলা ভাষা নিয়ে আন্দোলন সম্পর্কে আমাদের বোঝান দুই শিক্ষক। বলেন উর্দু যদি রাষ্ট্রভাষা হয় তা হলে বাঙালিদের নিজস্বতা বলতে কিছু থাকবে না। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। ঢাকা থেকে ছাত্র সংগ্রামের নেতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র আব্দুস সালামের পাঠানো লিফলেট আমার হাতে দিয়ে শিক্ষক প্রমথনাথ নন্দী বলেন, এগুলো ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে ছাত্রদের মাঝে বিলি করতে হবে। স্কুলের দপ্তরী মনমোহন দাসের সহায়তায় প্রত্যেক ক্লাসে আমি হ্যান্ডবিল বিলি করি। ছাত্রদেরকে সংগঠিত করি এবং স্যারের নির্দেশে ছুটির ঘণ্টা বাজার সাথে সাথে মিছিল নিয়ে ঘিওর অভিমুখে রওনা হই। কিন্তু, পুলিশ ঘিওর নদীর পাড়ে আমাদেরকে অস্ত্রের মুখে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। আমরা বাধ্য হয়ে মিছিলটি চড় বাইলজুরী গ্রামের ভেতর দিয়ে আরো ৪/৫টি গ্রাম প্রদক্ষিণ করি। মনে পড়ে সেদিন আমাদের মিছিল দেখতে গ্রামের শত শত নারী পুরুষ সমাবেত হয়েছিল। পরে মিছিল শেষে আমরা স্কুল মাঠে সমাবেশ করি। সেই সমাবেশে আমি আমি বক্তব্যে বলি, যেকোন মূল্যেই মায়ের ভাষা বাংলাকে রক্ষা করবো এবং আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। উপস্থিত সমবেত মানুষের সেই করতালি যেন আজো আমার কানে বেজে ওঠে। পরবর্তীতে মামলা করে হুলিয়া জারি করে আমার বিরুদ্ধে এবং সহপাঠী রেহাজ উদ্দিন, ওয়াজ উদ্দিন, ওয়ারেশ পাশা ও জাফর আলমকে গ্রেফতার করে তৎকালীন প্রশাসন।’

2 (8)

তিনি বলেন, ‘আমার জন্ম দৌলতপুর উপজেলার ধামশ্বর ইউনিয়নের কলিয়া গ্রামে। আমি তখন তেরশ্রী গ্রামে দরবেশ আলী মীরের বাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা করি। তখনকার চেয়ারম্যান তাহের উদ্দিন ঠাকুর লোক মারফত খবর পাঠান পুলিশ আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। আমি যেন দ্রুত পালিয়ে যাই। খবর শোনা মাত্র এক কাপড়েই রওয়ানা হই অজানার উদ্দেশ্যে। রাতে আশ্রয় নেই বড়বিলা গ্রামে আমার এক বন্ধু সাত্তার মুন্সীর বাড়িতে। সেখানে আতংকে রাতটুকু পাড় করার পরদিন ভোরে চলে যাই টাঙ্গাইলের নাগরপুর থানার ভাদ্রা গ্রামে। কত রাত কত দিন যে এভাবে পালিয়ে পালিয়ে কাটিয়েছে। মায়ের ভাষাকে রক্ষা করতে যেয়ে নিজের মাকে মা বলে ডাকিনি কত দিন।’ কথাগুলো বলতে বলতে আবেগাপ্লুত মিরান উদ্দিন ঝাপসা দৃষ্টির চোখদুটো হাত দিয়ে বার বার মুছতে থাকেন। স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন গত হয়েছেন বছর চারেক আগে। শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসরে যাওয়ার পর একমাত্র মেয়ে আর মেয়ের ঘরে দুই নাতিনদের সাথেই সময় কাটে তার।

তিনি আরও বলেন, ‘ভাষার লড়াইয়ে নির্যাতন-জুলুমের শিকার হয়েছি। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং ৭১ এর মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। জীবনের পড়ন্ত বেলায় কষ্ট একটাই বরাবরই অবহেলার শিকার ভাষা সৈনিকরা। মফস্বলের ভাষা সৈনিকদের তো কোন স্বীকৃতিই নেই।’ রাষ্ট্রের কাছে তার একটাই চাওয়া, সবখানে বাংলা ভাষার প্রচলন থাক, শুদ্ধ বাংলা চর্চায় বড় হোক নতুন প্রজন্ম। প্রাণ পাক প্রাণের ভাষা।’

কমরেড আব্দুল হাকিম
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও স্মৃতিকথা তুলে ধরেন জীবন্ত কিংবদন্তি ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আব্দুল হাকিম মাস্টার। তিনি বলেন, ‘আমাদের নেতা ছিলেন তৎকালীন আন্দোলনের পুরোধা প্রয়াত প্রমথনাথ নন্দী। তার উৎসাহ আর উদ্দীপনায় আমরা ভাষা আন্দোলনে যোগদান করি। তৎকালীন উত্তাল সেই সময়ে পুলিশের রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে মিছিল করি। স্লোগান দেই, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’; ‘উর্দু ভাষা চলবে না’।

3 (6)

‘আন্দোলনে আমাদের সাথে যারা ছিলেন-যতদূর মনে পড়ে- তেরশ্রী কে. এন. ইনিস্টিটিউট এর সহকারি প্রধান শিক্ষক প্রয়াত প্রমথনাথ নন্দী, ক্রীড়া শিক্ষক আফসার উদ্দিন আহমেদ, কলেজ শিক্ষার্থী প্রমথনাথ সরকার, মোবারক আলী, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র আব্দুস সালাম। ওই বিদ্যালয়ের ম্যাট্রিক পরিক্ষার্থী আব্দুল হাকিম, আব্দুর রহমান ঠাকুর, মনিন্দ্র নাথ সরকার, সিরাজ উদ্দিন মৃধা; নবম শ্রেণীর ক্যাপ্টেন মিরান উদ্দিন, ছাত্র মো. ওয়াজ উদ্দিন, রেহাজ উদ্দিন প্রমুখ। মানিকগঞ্জ শহরের ছিলেন-ডা.শামসুর রহমান, সৈয়দ আনোয়ার আলী চৌধুরী, ওয়ারেশ উদ্দিন পাশা, জাফর আলম চৌধুরী, খন্দকার দেলোয়ার হোসেন প্রমুখ।’ তিনি আরো বলেন, ‘আন্দোলনের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং পুলিশ হুলিয়া জারি করে এর মধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করে। আমরা আত্মগোপনে থেকে আন্দোলনের কাজ চালিয়ে যাই।”

বর্তমানে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী গ্রামের ভাষা সৈনিক কমরেড আ. হাকিম মাস্টার। তিনি ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হলেও ভাগ্যে জোটেনি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। ধামশ্বরের কলিয়া গ্রামের আব্বাস উদ্দিন ও আছিরুন বেগমের ৩ ছেলের মধ্যে আব্দুল হাকিম মেঝো। ২ মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে তার সংসার। দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে তিনি মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। কর্মজীবনে কমরেড আ. হাকিম মাস্টার তেরশ্রী কে.এন. ইনস্টিটিউশনের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ৯০’এর স্বৈরাচারী বিরোধী আন্দোলনে তিনি রাজপথে থেকে সক্রিয় আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৯ সালে আ. হাকিম মাস্টার তেরশ্রী কে.এন. ইনস্টিটিউশনের ছাত্র থাকাকালীন ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েন।

4 (5)

ভাষা সৈনিক কমরেড আব্দুল হাকিম মাস্টারের সাথে আলাপকালে তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘ভাষার জন্য আমরা সংগ্রাম করেছি, জেল খেটেছি, জুলুম-অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে দিনের পর দিন পালিয়ে থেকেছি। মায়ের ভাষার জন্য এ দেশের ছাত্ররা ঢাকা রাজপথে বুকে রক্ত ঢেলে দিয়েছে। এতোকিছুর পরেও ভাষার প্রতি চলছে চরম অবজ্ঞা।’ তিনি আরও বলেন, ‘২১শে ফেব্রুয়ারি আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস হওয়ায় বুকটা গর্বে ভরে গেছে। আবার দূঃখে কান্না আসে, আনন্দটা ম্লান হয়ে যায়। যখন দেখি আমাদের দেশে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার এখনও যথার্থ প্রয়োগ নেই। সব বিতর্কের উর্ধ্বে উঠে সর্বস্তরের বাংলা ভাষার ব্যবহার বাস্তবায়ন করা হোক।’

বয়সের ভারে শরীরের বেঁধেছে নানা অসুখ-বিসুখ। স্মৃতিশক্তিও কমে গেছে। কথায় এসেছে জড়তা। সহ-আন্দোলনকারীদের দু একজন ছাড়া কেউই আর বেঁচে নেই। উদাসী দৃষ্টিতে যেন কিছুটা অপ্রাপ্তির ছায়া। যাদের আন্দোলনের ফসলে আমরা আজ মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলি। সেই ভাষা যোদ্ধার জীবনের শেষ চাওয়া, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিটুকু পেলে যেন মরেও শান্তি পাবো।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: