সাম্প্রতিক পোস্ট

আগাম বৃষ্টি ও বন্যা : হাওর ও সীমান্তবর্তী কৃষকের ফসল হারানোর রোদন

কলমাকান্দা নেত্রকোনা থেকে গুঞ্জন রেমা

কথিত আছে বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। কৃষির উপর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে ৮০ ভাগ লোক নির্ভরশীল। এই কৃষিক গ্রাম বাংলার মানুষ বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। যদিও প্রকৃতি কখনো কখনো কৃষকের স্বপ্ন ও ভালো থাকা চ্যালেঞ্জে পরিণত করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এই বছর আগাম বৃষ্টির ফলে হাওরে ফসল ডুবির ঘটনা। হাওরের মানুষের কান্না এখন সারাদেশেই ছড়িয়েছে; তাদের ফসল ও জীবিকা হারানোর শোক এখনও কাটেনি। হাওরবাসীর কান্না জানি না কবে থামবে? জানি না তাদের অশ্রু কবে শুকাবে। জানি না তাদের এই অশ্রু মুছে দেওয়ার জন্য কেউ এগিয়ে আসবেন কিনা? আসলেও কতটুকু কার্যকর হবে। এই আগাম বন্যায় হাওরবাসীর ফসলহানির দুঃখ ভুলে যাওয়ার কোন কৌশল আদৌ আছে কিনা তা আমার জানা নেই।

Gun
এ বছরের আগাম বৃষ্টিপাত যে শুধু হাওরবাসীর ফসলকে তলিয়েছে এমন নয়। হাওর ছাড়াও সীমান্তবর্তী এলাকাতেও ফসল নষ্টের ঘটনা ঘটেছে। শিষকাটা রোগের কারণে এবার অনেক ফসলী জমি নষ্ট হয়েছে। ধান ক্ষেতে যখন ধান পাকা শুরু করে তখন ধানী জমি সোনালি বর্ণে রঙিন হয়ে ওঠে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এ বছর কোথাও কোথাও ফসলের সাদা বর্ণ ধারণ করতে দেখা গেছে! যার কারণ হচ্ছে শিষ কাটা বা ব্লাস্ট রোগ। ব্যাপক আকারে শিষকাটা রোগ এ বছর সীমান্তবর্তী ইউনিয়নের ধানী জমিগুলোতে দেখা দিয়েছে। শিষ কাটা রোগ থেকে রেহাই মেলেনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের  প্রদর্শনী প্লটও। অনেক চেষ্টা করার পরও কৃষকরা ফসল রক্ষা করতে পারেননি।

শিষ কাটা রোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কলমাকান্দা উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ট্রিসলী রাংসা বলেন, “এই শিষ কাটা রোগটির নাম হলো ব্লাস্ট রোগ। এটি ধান গাছের পাতা, কান্ড ও শিষের মধ্যে আক্রমণ করে। যখন পাতায় আক্রমণ করা হয় তখন যদি প্রতিরোধ করা যায় তবে ভালো হয়। নয়তো আর ভালো করা সম্ভব হয় না।” এই বছর এমন ব্যাপক আকারে এই রোগটি হওয়ার করণ সম্পর্কে তিনি বলেন, “আগাম বৃষ্টির জন্যই এই রোগটির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তবে যদি বৃষ্টি হওয়ার সাথে সাথে ছত্রাকনাশক ঔষধ স্প্রে করা যেত তবে এমন সমস্যা হতো না।” ফসলের এই অবস্থা দেখে কোন কৃষকই আর স্বস্তি পাচ্ছেন না; পারছেন না লাভ ও লোকসানের অংক মিলাতে।

Gun-1সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে মূলত রংছাতি, খারনৈ, লেঙ্গুরা ও নাজিরপুর ইউনিয়নের কিছু অংশ এই ব্লাস্ট রোগটি আক্রমণ করেছে।  ফসলের এমন ক্ষতির ফলে নিজেদের কি সমস্যা হতে পারে তা কৃষকরা নিজেরাই আন্দাজ করতে পারছেন । যেমনটি আব্দুল মোতালেব বললেন, “আগে যখন ফসল কাটার সময় হইতো তখন কত বালা লাগতো আর অহন একদিকে হাওরের ফসল নষ্ট হইলো পানিতে; আমরারদা নষ্ট হইলো পোকার আক্রমণে। লাভ তো দূরের কথা আসলটাও তো পাইতাম না”। এই শিষ কাটা রোগে ধানী জমি নষ্ট হওয়ার কথা বলতে গিয়ে খারনৈ ইউনিয়নের বনবেড়া গ্রামের কৃষক আরদিশ হাজং বলেন, “আমি ১২ কাঠা জমি রোপণ করেছি। এর মধ্যে ৭ কাঠা জমি একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। এ বছর আর ধানের আশা করতে পারছি না  বাকি ৫ কাঠা কোন রকম আছে সেটাও জায়গায় জায়গায় মরে গেছে। এবারই প্রথম আমার বোরো জমি শিষকাটা রোগে নষ্ট হয়েছে।” একই মন্তব্য করেছেন বটতলা গ্রামের কৃষক মো. জয়নাল মিয়া। তিনিও জানান, তাঁর জমিতে মরা শিষের সংখ্যাই বেশি যার জন্য খরচের টাকাও তুলতে পারবেন কিনা সন্দেহ। লেঙ্গুরা ইউনিয়নের কালাপানি গ্রামের কৃষাণী জরিনা রিছিল তার উঠানে কেটে রাখা ধানগুলো দেখিয়ে বলেন, “দেখেন এই বছর সবই ছুছা হয়েছে ধান নাই বললেই চলে।”

এ বছর অনেক কৃষকের বোরো ধান ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। তাদের এই ফসল হানি তাদেরকে প্রতিনিয়ত পীড়া দেয়; যা দেখার মতো কেউ নেই! এবারের মৌসুম কৃষকের জন্য নিয়ে এসেছে হতাশার বাণী। একদিকে হাওরবাসীর আগাম বন্যার ফলে ফসল নষ্ট হয়েছে।  অন্যদিকে সীমান্তবর্তী কৃষকের ব্লাষ্ট রোগের জন্য ফসল নষ্ট হয়েছে। এই দুই প্রান্তে দু’টি সমস্যাকে কেন্দ্র করে ফসলহানির যে পরিস্থিতি কৃষকেরা শিকার হয়েছেন সেটি কাটিয়ে উঠতে জানি না তাদের কত কাঠখড় পোহাতে হবে। কৃষকের মুখে এখন একটাই ভাষ্য যে, “আমরা এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো? কৃষকদের এই আকুতি কি শোনা যায়?

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: