সাম্প্রতিক পোস্ট

দরিদ্র প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে

নেত্রকোণা থেকে ইছাক উদ্দিন

বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৬ কোটি। দেশের মোট জনসংখ্যার ৭% প্রবীণ (ষাট্টোর্ধ)। মোট জনসংখ্যার ৭% হিসেবে দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১১২,০০০০০ (এক কোটি বারো লাখ)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর তথ্য অনুসারে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বর্তমানে নারীদের প্রায় ৭২ বছর ও পুরুষদের ৭০ বছর। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে এদেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে মোট জনসংখ্যার ৭.০ ভাগ প্রবীণ; যা ২০৩০ সালে ১১.৫% এবং ২০৫০ সালে ২১.৫% এ দাঁড়াবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। এই ক্রমবর্ধনশীল প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, স্বাস্থ্য, পেশা, মর্যাদা, বিনোদন ও নিরাপত্তাসহ জীবনধারণের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত নানান ধরণের সমস্যার সম্মূখীন হচ্ছেন; যা ক্রমান্বয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে।

Net
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা ও সার্বিক কল্যাণে বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর “জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩” প্রণয়ন করেন। জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩ এর ১৩টি উদ্দেশ্যের মধ্যে অন্যতম উদ্দেশ্য হল-‘সংশ্লিষ্ট জাতীয় নীতিমালাসমূহে (স্বাস্থ্যনীতি, নারী উন্নয়ন নীতি, গৃহায়ন, প্রতিবন্ধি ইত্যাদি নীতিমালাসমূহ) প্রবীণ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে অর্ন্তভূক্ত করা এবং যথাযথ কর্মপরিকল্পনা সুনির্দিষ্ট করে তা বাস্তবায়ন করা। স্বাস্থ্য নীতিমালা প্রণয়ন করে প্রবীণদের জন্য প্রত্যেক হাসপাতালে পৃথক ওয়ার্ড, পৃথক কাউন্টার এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা নীতিমালার অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু ২০১৭ সালের মাঝামাঝিতে এসেও সরকার পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য নীতিমালা প্রণয়ন করতে সক্ষম হয়নি এবং হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রবীণদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে প্রবীণদেরকে স্বাস্থ্য সেবা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হয়রানি ও বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। প্রবীণরা বিশেষভাবে দরিদ্র প্রবীণরা সঠিক স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন।

গ্রামীণ দরিদ্র প্রবীণদের সামান্য স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের লক্ষ্যে সম্প্রতি (২৭ এপ্রিল) জাতীয় প্রবীণ হিতৈষী সংঘের আর্থিক সহায়তায় এবং নেত্রকোণা জেলা প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও বারসিক রামেশ্বরপুর রিসোর্স সেন্টার’র আয়োজনে, জাতীয় তরুণ সংঘের (সূর্যের হাসি চিহ্নিত ক্লিনিক) কারিগরি সহযোগিতায় আটপাড়া উপজেলার চিকিৎসা বঞ্চিত দরিদ্র প্রবীণ রোগীদেরকে বিনামুল্যে স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের লক্ষ্যে বারসিক রামেশ্বরপুর অফিসে দিনব্যাপী এক স্বাস্থ্য সেবা ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। দিনব্যাপী স্বাস্থ্য সেবা ক্যাম্পে আটপাড়া উপজেলার ১২টি প্রত্যন্ত গ্রামের (দুর্গাশ্রম, দিয়ারা, কৃষ্ণপুর, ঘিডুয়ারী, শ্রীরামপুর, অভয়পাশা, রামেশ্বরপুর, শ্রীপুর, দেশিউড়া, মাটিকাটা, আইমা ও আটপাড়া) ৬৮ জন দরিদ্র প্রবীণকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র ও বিনামূল্যে ঔষধ প্রদান করা হয়। চিকিৎসা প্রদানের পূর্বে সমবেত রোগীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য প্রদান করেন বারসিক’র সহযোগি সমন্বয়কারী শংকর ¤্রং এবং জেলা প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সাধারণ সম্পাদক ও নেত্রকোনা ডায়াবেটিক সমিতির ট্রেজারার ছায়েদুর রহমান (অবঃ শিক্ষক)।

শংকর ম্রং দরিদ্র প্রবীণ রোগীদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প করায় জেলা প্রবীণ হিতৈষী সংঘ, ডাক্তার মো. সাহিদ উদ্দিন (অবঃ সিভিল সার্জন) এবং কারিগরি সহায়তা প্রদানের জন্য জাতীয় তরুণ সংঘকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। শিক্ষক ছায়েদুর রহমান সুন্দর আয়োজনের জন্য বারসিককে ধন্যবাদ জানান এবং পরবর্তীতে জেলা প্রবীণ হিতৈষী সংঘের উদ্যোগে দরিদ্র প্রবীণদের জন্য চক্ষু সেবা ক্যাম্প (আই ক্যাম্প) করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আলোচনায় প্রবীণদের পাশাপাশি আরও উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোণা চেম্বারস অব কমার্স এর সভাপতি ও প্রবীণ হিতৈষী সংঘের ট্রেজারার আলহাজ আব্দুল ওয়াহেদ, প্রবীণ হিতৈষী সংঘের সম্মানিত সদস্য মির্জা আব্দুল কুদ্দস, খন্দকার সোলায়মান ও বারসিক’র কর্মীবৃন্দ।

Net-1
জাতীয় তরুণ সংঘ (সুর্যের হাসি চিহ্নিত ক্লিনিক) এর প্যারামেডিকদের কারিগরি সহায়তায় সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত প্রবীণ রোগীদের রক্ত চাপ পরিমাপ, রোগীর উচ্চতা ও ওজনের গড় পরিমাপ-BMI (Body Mass Index) এবং রক্তের শর্করা পরিমাপ করা হয়। প্রাক্তন সিভিল সার্জন ডা. মো. সাহিদ উদ্দিন রোগীদের স্বাক্ষাৎকার নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপত্র প্রদান করেন। ডাক্তার প্রদত্ত ব্যবস্থাপত্র (পেসক্রিপশন) অনুযায়ী পরে প্রত্যেক রোগীদের মধ্যে বিনামূল্যে স্বল্প পরিমাণে ঔষধ বিতরণ করা হয়। চিকিৎসা ক্যাম্পে প্রবীণ জনগোষ্ঠী ছাড়াও বিভিন্ন গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত বেশ কিছু দরিদ্র নারীদেরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়।

গ্রামীণ পর্যায়ে দিনব্যাপী স্বাস্থ্য সেবা ক্যাম্প আয়োজনের ফলে আটপাড়া উপজেলার দরিদ্র প্রবীণ জনগোষ্ঠী নিজ এলাকার মধ্যেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা পেতে সক্ষম হয়েছেন। দরিদ্র রোগীরা জাতীয় প্রবীণ হিতৈষী সংঘের মাধ্যমে বিনামূল্যে ঔষধ ও চিকিৎসা সেবা পেয়ে খুবই উপকৃত হয়েছে। আশিতিপর প্রবীণ মো. সামসুদ্দিন এই প্রসঙ্গে বলেন, “গেরামে ডাক্তার আননে আমরার খুব বালা অইছে। আমরা বড় ডাক্তার দেহাইতে পাইছি আর মাগনা ওষুধ পাইছি। তবে চোহের ডাক্তার থাকলে আমরার আরও বালা অইত”। ক্যাম্পে আগত প্রবীণ ও গ্রামীণ নারীরা স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ও চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের নিয়ে এসে মাঝে মাঝে স্বাস্থ্য সেবা ক্যাম্প আয়োজনের দাবি জানান তিনি।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: