সাম্প্রতিক পোস্ট

জল, জলাশয় ও জেলে জীবনের আখ্যান

::নেত্রকোনা থেকে মো. আলমগীর ও অহিদুর রহমান::

গারো পাহাড়ের পাদদেশ লেহন করে এঁকেবেকেঁ কংশ্ব, স্বমেশ্বরী, গোরাউৎরা, মগড়াসহ নানা নদীর শাখা উপশাখা নিয়ে বর্তমান নেত্রকোনা জেলার উদ্ভব। ফলে এই জেলার বিভিন্ন অংশে তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিক জলাশয়, যা এলাকার হাওর বিল নামে পরিচিত। এই জলাশয়ের পানির উৎস গারো পাহাড় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, বর্ষাকালের বৃষ্টির পানি, পাহাড়ের ঝর্ণার পানি প্রভৃতি নদী বেয়ে সারাবছর পানি নেমে আসে এই পাদদেশে। যুগ যুগ ধরে পানি প্রবাহের কারণে পলিমাটি যুক্ত হয়ে এই অঞ্চলের ভূমি হয়েছে প্রাকৃতিকভাবে উর্বর ও জলাশয়গুলো হয়েছে প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন মাছের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। এছাড়া পলিবাহিত উচু উর্বর জমিতে প্রাকৃতিকভাবেই জন্মে নানা ধরনের গাছপালা। বাঙালির চিরন্তন বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রাকৃতিক মাছের প্রাপ্তিস্থলের কাছাকাছি থাকা। অনুমান করা হয় এইসব প্রাকৃতিক সম্পদের সহজলভ্যতার কারণেই এই এলাকায় জনবসতি গড়ে উঠে। সুবিশাল ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্বপাশে গারো পাহাড়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাওর, বাওর, খাল-বিল, নদী-নালা, কৃষিজমি আর ছোট ছোট বন জঙ্গলের সমন্বয়ে গড়ে উঠা ২৭৮৫.৬৮ বর্গ কিলোমিটারের জনপদ নেত্রকোনা। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের লীলাভূমিতে নানা নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের জনগোষ্ঠী নিয়ে গড়ে উঠেছে নেত্রকোনার জনপদ। নদী, বিল, হাওর, জলমহালকে ঘিরে এই নেত্রকোনা অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল জেলেদের বৈচিত্র্যময় পরিবেশবান্ধব এক জীবনব্যবস্থা। দেশের আমিষ তথা মাছের চাহিদার একটা বড় অংশই পূরণ করে আসছে নেত্রকোনা অঞ্চলের এই জলমহালগুলো ।

প্রেক্ষাপট মগড়া নদী

 

বাংলাদেশের ঐতিহ্য বা ইতহাস যেটাই বলা হোক না কেন এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে দেশের জল জলাশয় ও জেলেদের এক নিবিড় সম্পর্ক। এই অঞ্চলের জেলেদের ইতিহাস পর্যালোচনা করে জানা যায় যে, ভারত উপমহাদেশের দক্ষিণাঞ্চল বিশেষ করে বাংলাদেশ, মেঘালয়, আসাম, পশ্চিমবঙ্গে নদী তীরবর্তী এলাকায় জেলেরা বংশ পরস্পরায় বসবাস করে আসছে। ভাটি অঞ্চল হিসেবে খ্যাত এই এলাকার নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওড় জলাভূমি বেষ্টিত এই অঞ্চলে মাছের উৎসস্থলকে কেন্দ্র করে জেলে পরিবারগুলো বসবাস শুরু করে। বাংলাদেশের উত্তর পূর্বকোণে নদী জলাশয় হাওর বেষ্টিত একটি জেলা নেত্রকোণা। নেত্রকোণা জেলার আটপাড়া উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত মগড়া নদী। একসময় এই মগড়া নদী ছিল খরস্রোতা, নদীতে ছিল বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক মাছে পূরিপূর্ণ। মাছের প্রাচুর্যতা, সহজলভ্যতা এবং প্রাপ্তির সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করেই মগড়া পাড়ের বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠে জেলে পাড়াগুলো যাদের জীবন উৎস-ই হচ্ছে মগড়া নদী। মগড়া পাড়ের জেলেদের সাথে আলোচনা করে জানা যায়, প্রায় ৩০০ বছর পূর্বে তাদের পূর্বপুরুষেরা খালিয়াজুরী এলাকার ঘাগলাজুর ও কলমাকান্দার লেংগুরা এলাকা থেকে এখানে এসে বসবাস শুরু করে। সেসময় এসব এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্যার কারণে ঘর বাড়ি বেঁধে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। বৈরি পরিস্থিতিতে টিকেতে না পেরে জীবিকার সন্ধানে এ এলাকায় এসে মগড়া নদীর তীরে বিভিন্ন গ্রামে তারা বসবাস শুরু করে। মগড়া নদীর অফুরস্ত স্থানীয় মাছের আধারকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এসব জেলে পাড়াগুলো। নিজস্ব পেশা, জল, জলাশয় আর জীবন-জীবিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলে মৎস্যকেন্দ্রিক এক জীবনব্যবস্থা।

জাল, জল, জলাশয়, নদী বিল হাওর নিয়ে নেত্রকোণা অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল জেলেদের বৈচিত্র্যময় এক জীবন ব্যবস্থা। বাংলাদেশের ২৩০টি নদীর মতোই কালো মগড়া একটি নদী। এ নদী নেত্রকোণা জেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ধনু নদীর সাথে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। আটপাড়া উপজেলায় মগড়া তীরে বসবাস করে ৩৭৬টি প্রকৃত জেলে পরিবার। মগড়া নদীকে ঘিরেই গড়ে ওঠেছিল এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-সংস্কৃতি যা এলাকার বসবাসকারী বিভিন্ন পেশার মানুষের সাথে সমন্বয় রেখে প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছে এক স্থায়িত্বশীল জীবনচর্চা। কিন্তু এই ধারা খুব বেশিদিন স্থায়ি হয়নি, স্থানীয় জনগণের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা পারস্পারিক সমন্বয়ের জায়গাটিকে বিবেচনা না করে জলাশয়গুলো থেকে সরকারি রাজস্ব আদায়ের নামে জলাশয় লীজ দেওয়া, তথাকথিত উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত বাঁধ, কালভাট নির্মাণ, পাহাড়ি ঢল-পাহাড়ি বালি, মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির নামে আগ্রাসী প্রজাতির মাছ চাষ, সার বিষনির্ভর রাসায়নিক কৃষি প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে প্রাকৃতিক মাছের অবাধ বিচরণ ও বিস্তারকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। একে একে জলমহলগুলো তুলে দেওয়া হয় অ-মৎস্যজীবীদের হাতে। ফলে এই অঞ্চলের জেলেরা নিজ পেশা হারিয়ে, জীবন-জীবিকার ছন্দ হারিয়ে, জল জলাশয় কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল ভুলে এবং আচার অনুষ্ঠান ছেড়ে এক মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে। একসময় এই মগড়া নদীতে এই এলাকার জেলেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল, অধিকার ছিল জল জলাশয় কেন্দ্রিক জীবনযাপনের। সেসময় জেলেরা নদীতে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করত, মাছের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করা এবং মা মাছকে সংরক্ষণের জন্য পালন করা হত বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানসহ নানান উদ্যোগ। মাছের পুনরুৎপাদনের সময়টিতে নিজেদের পেশা টিকিয়ে রাখা এবং জনগণের আমিষের বিষয়টি বিবেচনা করে জেলেরা তৈরি করত নানা ধরনের মাছের শুটকি। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে জেলেরা টিকিয়ে রাখতো স্থানীয় জাতের মাছ বৈচিত্র্যকে। মাছ কেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা হওয়ায় জেলেরা মাছকে ধ্বংস না করে তা সংরক্ষণ ও বিস্তারকেই সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব দিয়েছে। তাই নদী, জাল, জল, মাছ, এগুলো জেলেদের প্রাণের সাথে, জীবনের সাথে একাকার হয়েছিল। প্রাকৃতিক জলমহালে জেলেদের পূর্ণ অধিকার ছিল, জীবনে সুখ ছিল, জীবনযাত্রায় বৈচিত্র্যতা ছিল। জেলে বংশপরস্পরায় পেশা রক্ষা করে আসছিল। হিদল, শুটকী অভাবের সময় বিক্রি করে সংসারের খরচ চালাত। মাছের তেল দিয়ে বাতি জ্বালাত, পিঠা ভাজতো, মাছ ভাজতো, বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠানাদি করে গড়ে তুলেছিলো এক সমৃদ্ধ মৎস্যবান্ধব জীবনসংস্কৃতির, যার মধ্য দিয়ে শুধু জেলেদের জীবন-জীবিকা নিশ্চিতই হয়নি সেই সাথে সংরক্ষিত হয়েছে বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদও।

বর্তমানে মগড়া পাড়ের জেলেদের বৈচিত্র্যময় জীবনে নেমে এসেছে নানা সংকট। বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মগড়া যা এক সময় ছিলো এই জেলেদের জীবন-জীবিকার উৎস তা আজ এলাকার অ-মৎস্যজীবী প্রভাবশালীদের দখলে। জাল, জল, জলমহাল, নদী, খাল, বিল হাওরের ওপর জেলেদের অধিকার সঙ্কুচিত হয়েছে। তারা এখন অনেকটা পেশাহীন, পেশাকে আর টিকিয়ে রাখতে পারছে না, অমৎস্যজীবীরা দখল করে নিয়ে যাচ্ছে একের পর এক জলমহালগুলো। মাছের বাজার ব্যবস্থা এখন পুরোটাই অমৎস্যজীবীদের দখলে, যেখানে জেলেরা অমৎস্যজীবীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা জলাশয়গুলো থেকে মাছ ধরার জন্য সর্বোচ্চ একজন শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ পেতে পারে। মগড়া পাড়ের জেলেদের বর্তমানে রুটি-রুজির আশ্রয়স্থল মগড়া নদীতে কোন অধিকার নেই। জাল নেই, জলমহাল নেই, মাছ নেই, সেই সাথে নেই পেশাও। চিরচেনা এই পেশা ছেড়ে তাই জেলেরা বাধ্য হচ্ছে অন্য পেশায় যুক্ত হতে বিশেষ করে কৃষি পেশায় একজন কৃষি শ্রমিক হিসাবে। যে পেশায় তারা সম্পূর্ণ নতুন, অদক্ষ শ্রমিক। কিন্তু বংশ পরস্পরায় চলে আসা চিরচেনা সেই পেশা ছেড়ে, পেশাকেন্দ্রিক জ্ঞান, অভিজ্ঞতাকে বিসর্জন দিয়ে নতুন পেশায় তারা বড়ই বেমানান, বড়ই নাজুক!

 

দিনকে দিন কমে যাচ্ছে মাছের বৈচিত্র্য

 

মৎস্যভান্ডার নামে খ্যাত নেত্রকোণা অঞ্চলে এখন শুধুই মাছের অকাল। এলাকা যে মৎস্যশূন্য হয়ে পড়ছে। স্থানীয় বাজারগুলোতে স্থানীয় জাতের মাছের পরিবর্তে আগ্রাসী বা বিদেশি মাছে ভর্তি। নেত্রকোণা জেলার আটপাড়া উপজেলায় ছোট বড় ৩৮টি জলমহাল আছে। সারাবছর এসব জলমহালে ছোট বড় নানা বৈচিত্র্যময় মাছে ভরপুর থাকত। এলাকার চাহিদা মিটিয়ে বাইরেও রপ্তানি হতো। বর্তমানে পুকুরে চাষকৃত মাছই একমাত্র ভরসা। সরকারিভাবে প্রতিবছর মুক্ত জলাশয়ে লাখ লাখ পোনা মাছ উন্মুক্ত করা হয় কিন্তু মৎস্য আইন অমান্য করে কারেন্ট জাল ব্যবহার করে অবাধে পোনা মাছ নিধন করা হচ্ছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে সরকারি উদ্দেশ্যে ও কার্যক্রম। প্রভাবশালী অমৎস্যজীবী জাল ব্যবসায়ীদের দাপটে প্রকৃত মৎস্যজীবীরা তাদের পৈত্রিক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অতিলোভী অমৎস্যজীবী লোকদের হাতে জলমহাল থাকায় অবাধে মৎস্য সম্পদ শিকার করে মাছবৈচিত্র্য ধ্বংস করে দিচ্ছে। কারণ তাদের কাছে জলমহাল কেবলমাত্র লাভ-ক্ষতির একটি ব্যবসা! এই জলমহাল থেকে যত বেশি লাভ করা যায় ততই ভালো তাদের জন্য। জলমহালের মাছ আছে কি নেই, মাছ ঠিকমতো বংশবিস্তার করছে কি না কিংবা অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে জলমহাল মাছশুন্য হয়েছে সেগুলো দেখার প্রয়োজনবোধ করে না। তবে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের কাছে জলমহাল শুধুমাত্র লাভ ক্ষতির বিষয় নয়, এটা তার পেশা, জীবন-জীবিকার উৎস্য বা তার সংস্কৃতি। একজন মৎস্যজীবী কখনো মাছকে বিলুপ্ত হতে দেয় না, কেননা এটার মাধ্যমেই তার জীবন-জীবিকা নিশ্চিত হয়, সে তার পেশাকে টিকিয়ে রাখতে চায়। তাই সে কখনো মা মাছ বা ডিমওয়ালা মাছ ধরে না, মাছের বংশবিস্তারে বাধা সৃষ্টি করে না। বরঞ্চ তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় মাছের বংশবিস্তারে সহযোগিতা করে। অপরদিকে রাসায়নিক কৃষি প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে জমিতে অবাধে সার, বিষ, কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাছের প্রজনন নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

স্থানীয় মাছ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে রাসায়নিক কৃষির পরিবর্তে জৈব কৃষির দিকে আমাদের সকলের মনোযোগ দিতে হবে। বিদেশী আগ্রাসী মাছ চাষ, কারেন্ট জালের ব্যবহার, সেচের মাধ্যমে মাছ শিকার, মা মাছ হত্যা, অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে দিন দিন প্রাকৃতিক মাছে পরিমাণ ও বৈচিত্র্যতা আশংকাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। যেমন শিং, কৈ, মাগুর, শোল, বোয়াল, চিতল, টেংরা, পাপদা, কাচকি, পুঠা, চান্দা, বাইম, গুজি, আইড়, কানলা, খৈলা, ভেদুরী, লাচু, নানিদ, রাণী, চেলাপাতা, এ্যালং, চাপিলা, রিটা, গাং মাগুর, গনিয়া, ফলি গজার ইত্যাদি মাছগুলো আজ এলাকায় কমে গেছে। কোন কোন মাছ তো বিলুপ্তির তালিকাতেও যুক্ত হয়েছে।

আমরা সকলেই জানি, যে মানুষ যে পেশার সাথে যুক্ত থাকে সেই পেশা সম্পর্কে সেসব মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সবচেয়ে বেশি থাকে। জেলেদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোন সময়ে মাছ ধরতে হবে, কোন সময়ে মাছ ধরা যাবে না, কোন ধরনের মাছ ধরা যাবে না, কেন এ মাছ ধরা যাবে না সেই বিষয়গুলো একজন জেলেই সবচেয়ে ভালো জানে। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে জেলেরা নদী, খাল বিল, জলাশয় থেকে মাছ না ধরে সেই সময়ে মাছের বংশবিস্তারে সহযোগিতা করে। এই সময়ে মানুষের মাছের চাহিদা পুরণের জন্য বিকল্প হিসেবে তারা মাছকে দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের জন্য এমন এক ধরনের পদ্ধতি প্রয়োগ করেন যার মাধ্যমে মাছকে একটা দীর্ঘ সময় সংগ্রহ করে রাখা যায়। এই পদ্ধতি আমাদের কাছে শুটকী হিসেবে পরিচিত। জেলেরা কার্তিক/অগ্রহায়ণ মাসে শুটকী দিত, হিদল দিত, এগুলো যখন এপ্রিল-জুন মাসে মাছের প্রজননের সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখতো তখন বিক্রি করে সংসার চালাতো। কিন্তু মাছ কমে যাওয়ায় হিদল, শুটকী দিতে পারছে না। সংকটের সময় বিক্রিও করতে পারছে না। এখন জেলেরা সামুদ্রিক শুটকি মাছের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এলাকার অনেক জেলে মহাজনের নিকট থেকে সামুদ্রিক মাছের শুটকী এনে স্থানীয় বাজারে মানুষের চাহিদা মেটায়। স্থানীয় মাছের শুকটি এখন আর পাওয়া যায় না। যদিওবা পাওয়া যায় তাতে দাম অনেক চড়া। যে সকল মাছ শুটকীর জন্য ব্যবহার করা হতো তা হলোঃ- পুঁটি, এলং, বাতাই, বাইম, চিকড়া, রুই, ভেদুরী, গুতুম, ইছা, বৈচা, চান্দা।

মাছ মানুষের শরীরের আমিষের দাহিদা পুরনের জন্য তরকারী হিসেবে খেলেও জেলেরা তাদের জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা দিয়ে মাছের নানামুখি ব্যবহার আমাদের শিখিয়েছে। জেলেরা সব সময় তাদের দীর্ঘদিনের চর্চার মধ্য দিয়ে যে জ্ঞান অভিজ্ঞতা হয়েছে তার আলোকেই তারা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এখানে বারবার বলা হয়েছে জেলেরা কখনো মাছ ধ্বংশ করেনা তারা বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মাছকে সংরক্ষণ করার চেষ্ট করে। আর এই বিষয় আমাদের কাছে পরিস্কার হয় তাদের মাছ ধরার কৌশলগুলো জানার মধ্য দিয়ে।

জেলেদের অধিকারের প্রতীক জানমা (জাল-নদী-মাছ) সংগঠনের আত্মপ্রকাশ

 

তবে জেলেরা আজ আর বসে নেই। নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তারা রীতিমতো আন্দোলন সূচনা করছেন। অতীতের ঐতিহ্যবাহী পেশাকে ধরে রাখা এবং এই পেশার উত্তরোত্তর উন্নয়নের জন্য তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন। জাল, জল, জলমহাল এবং হাওর-বিলের ওপর তাদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য তারা সংগঠনগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন। এর নেপথ্যে অবশ্য বেশ কয়েকজন দক্ষ ও সুযোগ্য সংগঠক রয়েছেন। নেত্রকোণা জেলার মগড়াপাড়ের জেলেরা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য সবার মতামতের ভিত্তিতে গড়ে তুললেন ‘জানমা’ সংগঠন। জেলেদের অধিকার আদায়ের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। ‘জানমা’ অর্থ জা-জাল, ন-নদী, মা-মাছ। এই তিন শব্দের সমন্বয়ে মগড়া পাড়ের অধিকার বঞ্চিত জেলেরা গড়ে তোলে জানমা মৎস্যজীবী সংগঠন। ২০০৫ সালে স্বরমুশিয়া গ্রামের কিছু জেলে পরিবারের সুদুরপ্রসারী চিন্তা থেকে গড়ে ওঠা এই সংগঠন সময়ের ধারাবাহিকতায় আজ সমগ্র আটপাড়া উপজেলার সব জেলে সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। জল, জলাশয়কেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা ও স্থানীয় জাতের মাছবৈচিত্র্য সংরক্ষণের তাগিদ থেকে গড়ে উঠা এই সংগঠন আজ এই এলাকার জেলেদের প্রানের সংগঠন। মগড়াপাড়ের জেলেদের সংগঠিত করার সেই সুদুরপ্রসারী চিন্তা আজকে এই এলাকার জল ও জলাশয় থেকে অধিকার বঞ্চিত অসংগঠিত জেলেদেরকে সংগঠিত করার মধ্য দিয়ে প্রাকৃতিক জলাশয়নির্ভর জেলে জীবনের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

এভাবে জেলে থেকে জেলে, গ্রাম থেকে গ্রামে, মৎস্যজীবী সংগঠন থেকে অন্য মৎস্যজীবী সংগঠনের সাথে যোগাযোগ শুরু হয় জেলেদের। এলাকার সাতটি সংগঠনের ১৪ জন জেলে প্রতিনিধি স্বরমুশিয়া জানমা মৎস্যজীবী সংগঠনের কার্যালয়ে বসে জেলেদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেন। অধিকার নিয়ে কথা বলেন। ভাবেন। জলমহালের অধিকারের কথা তুলে ধরেন। যোগশ চন্দ্র দাসসহ অনেক জেলে নেতার নেতৃত্বে জেলে সংগঠকগণ গ্রামে গ্রামে ঘুরে জেলেদের অধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে প্রচার-প্রচরণার মাধ্যমে সচেতনতা গড়ে তুলেন। এভাবে তারা প্রতিটি সংগঠনের কমিটি গঠন করেন। এসব মাঠ আলোচনা বা সচেতনতামূলক উদ্যোগের ফলে মগড়া পাড়ের সব জেলেরাই মনে করেন যে, তাদের সবার সমস্যা একই। তারা অনুধাবন করেন যে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য জলমহালের ওপর তাদের পুর্ণ অধিকার থাকতে হবে। প্রত্যেক সংগঠন থেকে তিনজন করে সদস্য নিয়ে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের হাতে এলাকার নদ-নদী-খাল-বিল-হাওর-বাওর-জলাশয় তুলে ধরার জন্য প্রচার-প্রচারণা শুরু করেন। এই লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয় জানমা আটপাড়া উপজেলা কমিটি। প্রতি তিনমাস এই কমিটির সভা বসে যেখানে আলোচিত হয় জেলেদের সার্বিক বিষয়। জেলেদের কর্তৃক চিহ্নিত সমস্যাগুলোর সঠিক সমাধানের জন্য জেলে নেতাদের নেতৃত্বে জেলেরা বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করেন। এই দাবিগুলো আদায়ে তারা বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেন। সরকারি কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে আলোচনা, এলাকার সংসদ সদস্যকে অবহিতকরণ, র‌্যালি ও সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা এবং প্রশাসনে স্মারকলিপি প্রদান পর্যন্ত তাদের কর্মসূচির ব্যাপ্তি ঘটে। যা অতীতে কল্পানও করা যেতো না। জেলেরা বর্তমানে দাবি করেন প্রাকৃতিক জলমহালে তাদের প্রথাগত অধিকার প্রতিষ্ঠা করার, তাদের লোকায়ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নেওয়া এবং অমৎসজীবীদের সংগঠন বাতিল করে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের সংগঠনগুলোর কাছে জলমহালের লীজ প্রদানসহ জল নদী, মাছ কেন্দ্রিক জীবন-জীবিকাকে শক্তিশালী করার দাবি জানান।

এভাবে জানমা’সংগঠনের সাফল্য এবং নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্বরমুশিয়া গ্রামের জেলেদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের জেলেদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে। তারাও জানমা’র মতো নিজেদের স্ব স্ব গ্রামের জেলেদের নিয়ে গড়ে তুলে বিভিন্ন জেলে সংগঠন, যা জানমা’র উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিলো।

প্রকৃত মৎস্যজীবীদের হাতে এ এলাকার নদ-নদী-খ্লা-বিল-হাওর-বাওর-জলাশয়ে নামার পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাকৃতিক ম্ৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও জেলেদের স্থায়িত্বশীল জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্যে জেলেরা যেসব কার্যক্রমকে অগ্রাধিকারে ভিত্তিতে চিহ্নিত করেন তা-জলমহালের উপর জেলেদের পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করা, জেলেরা তাদের প্রথাগত পদ্ধতির মাধ্যমে প্রাকৃতিক মাছের বৈচিত্র্যতা সংরক্ষণসহ বর্ধনের যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা রয়েছে তাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রাকৃতিক মৎস্য সংরক্ষণে উদ্যোগ গ্রহণ করা। অমৎসজীবীদের সংগঠন বাতিল করে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের সংগঠনকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে প্রাকৃত্কি মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া।

জানমা সংগঠনের দাবি ও সুপারিশমালা

আটপাড়া উপজেলার প্রকৃত জেলে সংগঠনগুলোর সাথে আলোচনা করে তাদের পেশা, পেশার অধিকার জল, জাল, জলমহালের উপর অধিকার আদায় ও নানা সমস্যা সমাধানের যে সব সুপারিশগুলো তুলে ধরেছে তা উপস্থাপন করা হলোঃ-

(১)          অমৎস্যজীবীদের সংগঠনের রেজিষ্ট্রেশন বাতিল করতে হবে।

(২)          নতুন করে কোন অমৎস্যজীবী সংগঠনের রেজিষ্ট্রেশন দেওয়া যাবে না।

(৩)         কারেন্ট জাল, কনা জাল নিষিদ্ধ করতে হবে।

(৪)          জেলেদের জলমহালের উপর পূর্ণ অধিকার দিতে হবে।

(৫)          সুমাইখালী, নাসির খালীসহ, যেসকল খাল হাওরের সাথে সংযুক্ত সেগুলো ইজারা দেওয়া চলবে না। উন্মুক্ত রাখতে হবে।

(৬)         এপ্রিল-জুন মাসে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করতে হবে।

(৭)          এ সময়ে জেলেদের জন্য বিনাসুদে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।

(৮)         উন্মক্ত জলাশয়ে এবং জলাশয়ে, মাছের প্রজনন কেন্দ্রে সার বিষ ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে।

(৯)          ভরাট নদী ও খাল সরকারিভাবে খনন করার ব্যবস্থা করতে হবে।

(১০)       স্থানীয় বাজার, মাছ প্রক্রিয়া ও রপ্তানীতে জেলেদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।

(১১)       ২০ একর নীচে জলমহালগুলো বংশ পরম্পরায়ভাবে প্রকৃত মৎস্যজীবী স¤প্রদায়কে সরাসরি ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

(১২)        উন্মক্ত জলাশয় ইজারা দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

জেলেদেরকে এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। জল, জলমহালসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদে তাদের অভিগম্যতা বৃদ্ধি করতে। আমাদের দেশের অনেক জলমহাল এখনও প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যেখানে আগ্রাসী মাছচাষসহ প্রাকৃতিক মাছ নিধন দেদারসে চলছে। এসব এলাকায় জেলেদের পেশা আজ অনেকটা বিপন্ন। জেলেদের পেশা বিপন্ন হওয়ার কারণে মাছবৈচিত্র্যসহ অন্যান্য জলজপ্রাণবৈচিত্র্য হুমকির সন্মূখীন হচ্ছে। জেলেদের পেশা বিপন্ন হওয়ায় তারা অন্য পেশার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। অদক্ষ হওয়ায় তাদের জীবিকা যেমন নিশ্চিত হতে পারেনি তেমনি অন্য পেশায় যুক্ত হওয়ার কারণে ওইসব পেশার (কৃষিমজুর, দিনমজুরসহ বিভিন্ন পেশা) ওপর চাপ পড়ছে। জানমার সফলতা বাংলাদেশের অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনগুলোর মধ্যেও আলোর সঞ্চার করুক। প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর জীবন-জীবিকার স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মানবিক/সামাজিক/সাংস্কৃতিক উন্নয়নে এসব পেশাজীবী সংগঠনের ভূমিকা যে রাখবে তা বিন্দুটুকু সন্দেহ নেই আমাদের!

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: