Posted in

মধুপুর বনের অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট

image is taken from wikipedia.org (under GNU-FDL) and copyright goes to wikipedia.org

:: মধুপুর, টাঙ্গাইল থেকে শংকর ম্রং::

মধুপুর শাল বন বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বন। বনটি ঝরাপাতার বন নামেও পরিচিত। ফাল্গুন মাসে এ বনের প্রায় সব গাছের পাতা ঝরে যায়। এটিকে ঝরাপাতার বনও বলা হয়। বনের প্রধান গাছ গজারি/শাল গাছের সব পাতা ঝরে গিয়ে নতুন পাতা গজায়। চৈত্র-বৈশাখ মাসে গাছে পুনরায় নতুন পাতা গজানোর পর বনটি অপরূপ সাজে সজ্জিত হয়। বনের নতুন পাতার সাথে গাছে গাছে ফুল ফুটে, ফল হয়। মৌমাছি, ভ্রমরা, কোকিল ও বউ কথা কওসহ অন্যান্য পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয় গোটা বন। ফুলের মধুর গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে অসংখ্য প্রজাতির কীট পতঙ্গের আগমন ঘটে গাছে গাছে। মৌমাছির গুনগুন শব্দ আর ফুলের মধুর ঘ্রানে তখন যে কোন মানুষের মন জুড়িয়ে যায়। মধুপুর বনের উত্তরে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা, পূর্বে ফুলবাড়িয়া, পশ্চিমে জামালপুর সদর অবস্থিত। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, মধুপুর গড় অঞ্চলটি এক সময় নাটোরের রানী ভবানীর শাসনাধীন ছিল। ২৫-৩০ বছর আগেও মধুপর বন প্রকৃতির অপরূপ সাজে সজ্জিত ছিল। প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো হাজারো প্রজাতির গাছগাছড়া, লতাগুল্ম, ফলমূল ও বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি বনকে সৌন্দর্য্যমণ্ডিত করে। মধুপুর বন ছিল প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত খাদ্যের এক অফুরন্ত ভান্ডার। প্রাথমিকভাবে মধুপুর বনে ও আশপাশে গারো ও বর্মণ (মান্দাই/কোচ) আদিবাসীর বসবাস করলেও ক্রমে অন্যান্য সম্প্রদায়ও এখানে বসতি গড়ে তুলে। আমার জন্ম মধুপুর বনের অতি নিকটবর্তী জলছত্র গ্রামে। মধুপর বনে জন্ম হওয়ায় আমার শৈশব ও যৌবন কেটেছে এ বনে। বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্ ও পরিবেশেই আমার বেড়ে ওঠা। তাই আমি খুবই কাছ থেকে এই বনের ৩০-৩৫ বছর পূর্বের প্রাকৃতিক রূপ দেখেছি। বারসিকের কাজের সাথে যুক্ত হওয়ার পর পরিবেশ-প্রতিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য ও লোকায়ত কৃষির ওপর কর্পোরেট কৃষির নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ধারণা লাভ করি। এ ধারণা আমাকে উপলদ্ধি করতে সহায়তা করেছে যে, বিগত বছরগুলোতে আমার জন্মস্থান তথা মধুপুর এলাকার কৃষি, পরিবেশ, বন, প্রকৃতিকে আমরা তথাকথিত উন্নয়নের মাধ্যমে কীভাবে ধ্বংস করে আসছি। আমি নিজেও অজান্তে হয়তো এই ধ্বংসলীলার সাথে বাধ্য হয়ে যুক্ত হয়েছি রাসায়নিক কৃষি চর্চার মধ্য দিয়ে! এই আত্মউপলদ্ধি আমাকে পেছনে ফিরে তাকাতে সাহায্য করেছে এবং বিগত ৩৪ বছর ধরে মধুপুর শাল/গজারি বনের ধ্বংসলীলা কীভাবে সংঘটিত হয়েছিলো সেই বিষয়ে সবার সাথে সহভাগিতা করার প্রয়াস পেয়েছি এই লেখার মাধ্যমে। আদিবাসী সংগঠক এবং মধুপুরের বাসিন্দা হিসেবে মধুপুর বন সম্পর্কে আমার অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণই আমার এ লেখাটির মূল উপাদান। ৩৪ বছর আগে মধুপুর বনটি কেমন ছিলো, কি কি ছিলো এই বনে এবং এই বনটির বর্তমান পরিস্থিতি কি ইত্যাদি বিষয় এই লেখাটিতে বিন্যাস করার চেষ্টা করছি একান্ত নিজস্ব কায়দায়।

মধুপুর বনের অতীত প্রেক্ষাপট

অতীতে মধুপুর বনের আদিবাসীরা জুমের মূল ফসল ধান, তুলা, আদা, হলুদ, কাসাবা (শিমুল আলু), কচু (পঞ্চমূখী/গরো কচু) চাষের পাশাপাশি সাথী ফসল হিসেবে চাষ করতো বাঙ্গি, শসা, তিল, ভূট্টা, মিষ্টি কুমড়া, চালকুমড়া, লাউ, জোয়ার, কাউন, তিসি, সরিষা, কলা, পেঁপে, ডাটা, ঢেড়স, বরবটি, সীম, মরিচসহ বিভিন্ন স্থানীয় জাতের সবজি। জুমে উৎপাদিত ফসল থেকে আদিবাসীদের সারা বছরের খাদ্যের চাহিদা পূরণ হতো। আমি আমার মা ও নানা-নানীকে সকাল বেলা দা, কোদাল, টুকরি ও নিড়ানি নিয়ে জুমে যেতে দেখেছি। দুপুর বেলা বড় ভাই ও আত্মীয়দের জন্য হাড়িতে পানি নিয়ে জুমে গিয়ে খিদে পেলে জুম থেকে শসা, বাঙ্গী, পেঁপে, ভূট্টা, কাসাবা প্রভৃতি সংগ্রহ করে খেতাম। অনেক সময় আঠা বিন্নি (মি মিদ্দিম) চাল ধুয়ে পাতায় মুড়িয়ে, চেপা শুটকী (নাখাম), লবণ ও চু (ভাতের তৈরি এক জাতীয় পানীয়) জুমে নিয়ে যাওয়া হত। প্রচন্ড রোদে নানা-নানী ও মামারা চু পান করে তৃপ্ত হত। অবসরে বাঁশের চোঙায় বাড়ি থেকে সাথে নিয়ে আসা ধোয়া বিন্নি চাল ভরে চোঙার এক মুখ পাতা দিয়ে শক্ত করে আটকিয়ে লাকড়ির আগুনে পোড়ানো হত। চাল ধোয়ার ফলে চোঙার ভেতর চাল আগুনের তাপে সেদ্ধ হত। বাঁশের চোঙা পোড়া পোড়া ভাব হলে আগুন থেকে তোলে চোঙাটি দা দিয়ে কেটে বিন্নি চালের ভাত আজকী পাতা/কলা পাতা/ছটি পাতায় নিয়ে শুধু ভাত (মিমিদ্দিম) আবার কেউ কেউ চেপা শুটকী (নাখাম) ভর্তায় মিশিয়ে এক-দু‘মুঠি করে খেয়ে পানি পান করতাম। আদিবাসীরা বনের বিভিন্ন গাছের পাতা (ছটি, কলা, আজকী পাতা) থালা/খাবারের পাত্র হিসেবে ব্যবহার করত। বিন্নি চালের ভাত ও চেপা শুটকীর ভর্তা আদিবাসীদের খুবই প্রিয়। এ দু’টি খাবার হলে আদিবাসীদের আর কিছু প্রয়োজন হয় না। পার্শ্ববর্তী উপজেলার অনেক অ-আদিবাসী পাইকার জুমে গিয়ে আদিবাসীদের কাছ থেকে বিভিন্ন কৃষিজ ফসল ক্রয় করে অন্যত্র বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

ছোটকালে পাড়ার সাথীদের সাথে গরু চড়াতে নিয়মিত বনে যেতাম। বর্তমানে ‘পঁচিশ মাইল’ বাজারটির ছিল ঘন বনে আচ্ছাদিত, পঁচিশ মাইল থেকে হাসপাতাল রোডের পূর্ব পাশে কোন বসতি ছিল না। শুধুমত্র দু‘একটি দোকান ছিল। আমরা গ্রাম থেকে বের হয়ে গরুর পাল নিয়ে বনের ভেতর ছেড়ে দিয়ে ময়মনসিংহ-টাঙ্গাইল সড়কে বসে অথবা বনের ভেতর মাঠে (জলাধার) ছয়গুটি, ষোল গুটি বা ডাঙ্গুলি খেলতাম। অনেকে আবার গাছে দা দিয়ে খোদাই করে নিজের নাম লিখত। ক্ষুধা পেলে বনের বিভিন্ন ফল সংগ্রহ করে খেতাম। বিশেষভাবে ময়মনসিংহ সড়কের পাশেই বহেরা, নিয়র, জয়না ফল ও বন আমড়া (আমলকী) পাওয়া যেত। আষাঢ় মাসে জয়না ও নিয়র ফল পাকত এবং নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের দিকে বহেরা ফল পেকে মাটিতে ঝরে পড়ে থাকত। আমরা সড়কের ধারে বহেরা গাছের নিচ থেকে ঝরে পড়া শুকনো বহেরা সংগ্রহ করে পাতার আগুনে পোড়াতাম। খোসাসহ অর্ধ পুড়ানো বহেরা ফল দায়ের বাট দিয়ে বা ইটের টুকরো দিয়ে ফাটানোর পর ছোলার আকৃতির মাংসল অংশ বের হত, যা খেতে বাদামের মত সুস্বাদু ছিল। নিয়র, জয়না ও আমলকি ফল খেতে টক-মিষ্টি লাগত। নিয়র, জয়না ও আমড়া ফল পাকলে গাছগুলোতে বানর, হনুমান ও বাদুরসহ বিভিন্ন পশু পাখির সমাগম হত। খুব বেশি পিপাসা পেলে গাছের আমলকি মুখে রেখে চিবুতাম। আমলকি খাওয়ার পর পানি পান করলে পানি মিষ্টি লাগত, ফলে অনেক পানি পান করা যেত। আমরা মূলত গরু চড়ার পাশাপাশি মধু, বনজ আলু এবং শুকনা লাকড়ী সংগ্রহ করতাম। এরপর সংগৃহীত আলু আগুনে পোড়াতাম। আলু পোড়া হলে দা দিয়ে সেগুলো ছেঁচে পরিস্কার করে আজকী/ছটি পাতায় মুড়িয়ে রাখতাম। আগুনে পোড়া আলুতে মধু মিশিয়ে সবাই মিলে খেতাম। জলাশয়ের পানি পান করে তৃষ্ণা মেটাতাম। বর্ষা মৌসুম শেষে বাইদ/জলাশয়ের পানি কমে আসলে মাছ ধরে বাড়ি ফিরতাম।

ছোটকালে দেখেছি মধুপুর বনটি প্রাণবৈচিত্র্যে ভরপুর ছিল। অসংখ্য প্রজাতির গাছ-গাছালি, লতাগুল্ম, ফল-মূল, সরিসৃপ ও পশু-পাখিতে ভরপুর ছিলো এই বন। বনটি এতটাই গভীর ছিল যে, একা এই বনে প্রবেশ করা দুঃসাহসের ব্যাপার ছিলো।

উদ্ভিদবৈচিত্র্যের বন

মধুপুর বনের মূল বৃক্ষ গজারি বা শাল। এই শাল/গাজারি গাছের জন্যই এই বনের নামকরণ হয় মধুপুর শাল বন বা গজারি বন নামে। শাল ছাড়াও এ বনে রয়েছে অসংখ্য স্থানীয় প্রজাতির উদ্ভিদ ও বৃক্ষ। জানা যায়, ১৯৭১ সালেও প্রাকৃতিক শাল বনের আয়তন ছিল প্রায় ৩০ হাজার একর। এই বনে ৩০ প্রজাতির বৃক্ষ, ৬০ প্রজাতির পাখি ও ২৩/২৪ প্রজাতির জীবজন্তু আছে। মধুপুর শাল বনের স্থানীয় বৃক্ষগুলোকে দু’টি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়, যথাঃ- কাঠ জাতীয় বৃক্ষ এবং ফল জাতীয় বৃক্ষ। কাঠ জাতীয় বৃক্ষের মধ্যে রয়েছে সেগুন, সোনালু, কড়ই, শীল কড়ই, শেষ্রা, সিদার, লোহা, গামার, অর্জুন, গর্জন, জারুল, বুতুম, পলাশ, শিমুল, গাদলা, লাইলটা, শায়তান, জিকা-লাল জিকা, সাদা জিকা, হিজল, তমাল, রঙ্গিন কাঠ, বট, পাকুর, সিন্দুর, দুধকরচ, কাইক্কা, বাবলা, শিরিষ প্রভৃতি। এছাড়াও অনেক উদ্ভিদ বৃক্ষ ও লতাগুল্ম প্রজাতি রয়েছে যেগুলোকে আমি এখনও গারো আদিবাসীদের ও স্থানীয় ভাষায় চিনি, যেমন-ওয়াকখিন্তি (স্থানীয় নাম-হুইরাগোছা), মটন গাছ বাবারি, ছুসতুম, বলবুদ, দামন প্রভৃতি। ফল জাতীয় বৃক্ষের মধ্যে রয়েছে গান্দি গজারি, আজকী, ডুমুর, হরিতকি, আমলকি, বহেরা, বরই, টুন্টি বই, আনাই গোটা, পিরিলা, আম, জাম, কালো জাম, টিট্টি জাম, কাঠ জাম, জয়না, নিয়র, চাম্বল, বন আমড়া, তেঁতুল, মন, সামাদুরাক প্রভৃতি। এছাড়া মধুপুর বনে রয়েছে আলত (বাসক প্রজাতি), বন বেগুন, টিপবাহর, কালোকচু, বিভিন্ন প্রজাতির জংলি আলু (যার অধিকাংশই আদিবাসী ভাষার নাম রয়েছে) যেমন- দুধ আলু, থাআ্জা, আমপেং, থাদাম্বং, থাআক, স্টেং, থাস্টেং, আদুরাক, সামাদুরাক (টক পাতা), সেরেংকি, পাসিম (পাদুলি পাতা) প্রভৃতি উলে­খযোগ্য। লতা জাতীয় উদ্ভিদের মধ্যে বেত, হারজোড়া, মারিবিদু, উম্মাক, কাক্কু বিদু, রিফুজি লতা প্রভৃতি।

এই দু’টি শ্রেণীর কাঠ ছাড়াও মধুপুর বনে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন ঔষধি উদ্ভিদ ও লতাগুল্ম রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উলে­খযোগ্য হল-আমলকি, হরিতকি, বহেরা, ওলটকম্বল, শতমূল, শিমূল, অর্জুন, বানর লরি, জয়না, খারাজোড়া, বাসক (আলত), টিপবাহর, শিয়ালমতি, হারজোড়া, মারিবিদু, শটি, পাসিম (পাদুলি পাতা), কালকচু, কাক্কু বিদু, কালোমেঘ, আদুরাক, সেরেংকি, আলত, ফুলকড়ি, চিনিসাম, আগনসরি, জংলি আদা প্রভৃতি উলে­খযোগ্য।

ছিলো অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীও

২৫-৩০ বছর আগে মধুপুর বনে অনেক প্রজাতির পশু-পাখি বিচরণ করতে দেখা যেত। এ বনে আমি বিভিন্ন প্রজাতির পশুপাখি ও সরীসৃপ বিচরণ করতে দেখেছি। এসব পশু প্রজাতির মধ্যে বানর, হনুমান, উল্লুক, শিয়াল, বাগদাসা, কালোচিতা, বন বিড়াল, কাঠবিড়ালী (২ প্রজাতি), খাটাস, হরিণ, বন্য শুকর, বেজি, সজারু, খরগোস প্রভৃতি উলে­খ্যযোগ্য। অন্যদিকে সরীসৃপ প্রজাতির লাউডগা, গোখরা, দারাইস, দু’মাথা, পদ্ম গোখর, পঙ্খিরাজ, দুধরাজ, কামট, দুরাসাপ, গুইসাপ, এঞ্জেলা, গিরগিটি, কক্ক সাপ, পানি ব্যাঙ, সোনালি ব্যাঙ, কুনো ব্যাঙ, গেছো ব্যাঙ ও বিভিন্ন প্রজাতির শামুক উলে­খযোগ্য। মধুপুর বনে তিন প্রজাতির ঘুঘু-(দুপি, রামঘুঘু, কবুতর ঘুঘু), ঝুঁটি শালিক (ভাত শালিক), ময়না শালিক, মাইটা শালিক (ধান শালিক) ও গাং শালিক, বুলবুলি, টিয়া, দোয়েল, শ্যামা, কুতুম, হলদে পাখি, চাতক, টুনটুনি, কোকিল, বাদুর, গরিয়াল (হরিকল), কাক, বউকথাকও, চুড়ুই, বাবুই, বন মুরগি, ভুতুম পেঁচা, লক্ষী পেঁচা, বাজ, চিল, শকুন, তিন প্রজাতির কাঠ ঠোকরা, তিন প্রজাতির মাছরাঙা, ছাতক, হটটিটি, ডাহুক প্রভৃতি দেখা যেতো। এছাড়াও অনেক পাখি রয়েছে যাদের নাম আমার জানা নেই, দু’একটি পাখিকে আমি স্থানীয় নামে চিনি। যেমন- দুঅ্জিলমা, দুঅ্বুলদক, তীরধনুক, থেউথেউ পাখি প্রভৃতি।

পিপিলিকা প্রজাতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো, চার প্রজাতি লাল পিপড়া, দই প্রজাতি কালো পিপড়া, চার প্রজাতির বিষ পিপড়া। মধুপুর বনে পোকা প্রজাতির মধ্যে, যেগুলোকে আমি স্থানীয় নামে চিনি তা হলো-কাঠ পোকা, চেংগা পোকা, শুং পোকা, সবুজ পাতা পোকা, চার প্রজাতির কাড়া। এছাড়াও নাম না জানা বিভিন্ন প্রজাতির পোকার আধিক্য ছিলো তখনকার মধুপুর বনে। অন্যদিকে মাছি প্রজাতির মধ্যে উল্লেখ্য ছিলো-তিন প্রজাতির মৌমাছি (এপিক সেরেনা, এপিক দরসাটা, এপিক ক্লকরিয়া), তিন প্রজাতীর ভীমরুল, চার প্রজাতীর মাছি।

আদিবাসী খাদ্যের যোগানদার

শৈশবে আমি মধুপুর বনে হরেক রকমের খাদ্য প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যেতে দেখেছি। খাদ্যের জন্য আমরা খুব বেশি চিন্তিত হতাম না। বনে গেলেই হরেক রকমের বনজ খাদ্য পাওয়া যেত। আমাদের গারো পরিবারগুলো মধুপুর বন থেকে এসব প্রাকৃতিক খাদ্য সংগ্রহ করতো। এসব প্রাকৃতিক খাদ্যসমূহের মধ্যে ছিল বিভিন্ন প্রজাতির ফলমূল, শাকসবজি ও লতাগুল্ম। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত ফলমূল, শাকসবজি ও লতাগুল্ম সংগ্রহ করে আপদকালীন সময়ে (অভাবের সময়) মধুপুর অঞ্চলের আদিবাসী ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর লোকদের (দরিদ্র বাঙ্গালী জনগোষ্ঠী) খাদ্যের চাহিদা পূরণ হত। আবার অনেক পরিবার ছিল যারা এসব প্রাকৃতিক সম্পদ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। মধুপুর বনে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত খাদ্যসমূহ যেগুলো সংগ্রহ করে আমরা বিভিন্ন সময়ে ক্ষুধা নিবারণ করেছি তার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে দেওয়ার চেষ্টা করছি-
মধুপুর বনে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত ফল জাতীয় খাদ্য যেগুলো এলাকার দরিদ্র ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী সংগ্রহ করে খাদ্যের চাহিদা মেটাত এবং জীবিকা নির্বাহ করত তার মধ্যে ছিলো হরিতকি, আমলকি, বহেরা, আমড়া, চাপালিশ ফল (চাম্বল ফল), নিয়র ফল, জয়না ফল, আনাই গোটা, টুন্টি বরই, পিরিলা ফল, আজকী ফল, ডুমুর, মন ফল, বন কলা, জাম (কাল জাম, টিট্টি জাম, কাঠ জাম), কাঠ সীম, তেঁতুল, আম, আদুরাক ও শামাদুরাক ফল, বট ফল, পাকুর ফল, মটন গোটা, বজনা গোটা প্রভৃতি উলে­খযোগ্য। এসব ফল এলাকার জনগোষ্ঠী খুব সহজেই বন থেকে সংগ্রহ করতে পারত। এজন্য বন বিভাগ থেকেও কোনরূপ বাধা দেওয়া হত না। এসব ফলের অধিকাংশই মানুষ, গৃহপালিত পশু ও বন্য পশুপাখির খাদ্য ছিল। ফলগুলোর মধ্যে গান্দি গজারী ফল, মটন গোটা, বাজনা গোটা, বট ফল, পাকুর ফল, লাইলটা গোটা প্রভৃতি শুধুমাত্র পশু পাখির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হতো।

বনে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত শাক সবজির মধ্যে ছিলো আদুরাক (চুকাই), হুইরা আলুর ডগা (স্টেং খাম্বি), কার্মান শাক, সেরেংকি, ঢেঁকি শাক, আলত, টিপবাহর (বন বেগুন), পিরিলা ফুল ইত্যাদি। বন্য আলুর মধ্যে ছিলো হুইরা আলু (স্টং), থাআ্জা, থাআ্ দাম্বং, থাআ্গিছাক, থাআ্দাম্বং প্রভৃতি উলে­খযোগ্য। বন্য আলুগুলো সেদ্ধ করে এবং সবজি হিসেবেও খাওয়া যায়। সাধারণত হুইরা আলু আদিবাসী গারোরা খারি তরকারি হিসেবে রান্না করে খায়। এছাড়াও থাআ্জা ও থাআ্ দাম্বং আলু তিন ভাগে ভাগ করে একভাগ (মাথার অংশ পরবর্তীতে পুনরায় আলু গাছ জন্মানোর জন্য) মাঝের অংশ সবজি হিসেবে তরকারি খাওয়ার জন্য এবং নিচের সাদা অংশ সেদ্ধ খাওয়া হয়। বাঙালি জনগোষ্ঠী সাধারণত পুরো আলুটাই সবজি হিসেবে ব্যবহার করে। বন্য আলু ও গাছ আলু বনের বিভিন্ন প্রাণীদের প্রিয় খাদ্যও বটে।

প্রচলিত ছিলো লোকায়ত কৃষির চর্চাও

আজ থেকে প্রায় ২৮-৩০ বছর পূর্বেও মধুপুর বনাঞ্চলের কৃষি ছিল পরিবেশবান্ধব। কৃষকরা তাদের লোকায়ত জ্ঞান ব্যবহার করে স্থায়িত্বশীল কৃষি চর্চা করতেন। বাইরের কোন উপকরণ এ এলাকায় প্রবেশ করেনি তখন। কৃষকরা নিজের সংরক্ষিত বীজ, তৈরি জৈব সার ব্যবহার করে আমন ও আউশ মৌসুমে ধান উৎপাদন করতেন। আউশ মৌসুমে মূলত বোনা পদ্ধতিতে বিভিন্ন জাতের ধান চাষ করা হত। সাধারণত উঁচু জমিতে (চালা জমি) চৈত্র মাসে বৃষ্টি হলে কৃষকদের বাড়িতে সংরক্ষিত পচা গোবর ও ছাই পর্যাপ্ত পরিমাণে জমিতে ছিটিয়ে দিয়ে কাঠের লাঙল দিয়ে ৪/৫টি চাষ দিয়ে ও ভালোভাবে মই দিয়ে মাটি গুড়ো করে জমিতে জো থাকা অবস্থায় বীজ ধান বোনা হত। বীজ বোনার পর থেকে ধান কাটার পূর্ব পর্যন্ত দু’বার ধানের জমি আগাছা মুক্ত করা হত। ধানের চারার বয়স একমাস থেকে দেড় মাসের মধ্যে লাঙ্গইলা (গরু দিয়ে টানা কাঠের তৈরি আচড়া) দিয়ে ধানের জমি আচড়ে দেওয়া হত। অনেকে আবার মই দিয়ে আগাছা ও ধানের চারার গোড়া ভেঙে দিত। আচড়া বা মই দিয়ে আগাছা ও ধানের গোড়া ভেঙে দেওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে আগাছাগুলো নিড়ানি দিয়ে বাছাই করা হত। ধানের গোড়া ভেঙে দেওয়ায় গাছের গোড়া থেকে ৪/৫টি করে নতুন চারা জন্মাত। জমিতে কোন ধরনের সার উপরি প্রয়োগ করা হত না। জমিতে পোকা দেখা দিলে ভোর বেলা চুলার বাসী ছাই ছিটিয়ে দিয়ে পোকা দমন করা হত। ধানের সাথে কাউন, ডাটা, পুঁইশাক, শসা, বাঙ্গি, তিল, দেওদান ও ভুট্টা সাথী ফসল হিসেবে বোনা হত। তিল ফসল ধানের জমিতে বোনা হলেও দেওদান ও ভুট্টা জমির চারপাশে ঘেড়া হিসেবে বোনা হত। বিভিন্ন ফসল বোনায় ধানী জমিতে নানা জাতের পাখির সমাগম হত। পাখি ধানের জমির পোকা খেয়ে ফেলায় পোকা দমনের জন্য কোন কীটনাশক ব্যবহার করতে হত না। ধান কাটার পূর্ব পর্যন্ত কৃষকরা একই জমি থেকে ডাটা, পুঁই শাক, শসা, বাঙ্গি ভূট্টা প্রভৃতি ফসল সংগ্রহ করতে পারতো। ধান কাটার পূর্ব সময় পর্যন্ত খাদ্যের অভাব সাথী ফসল দিয়ে দূর করা সম্ভব হত। ধান পাকার পর সকল কৃষক জমিতে এক-দেড় ফুট নাড়া রেখে ধান কাটতেন। আদিবাসী কৃষকরা শুধুমাত্র ধানের শীষের অংশটুকু কেটে নিয়ে আসতেন। ফেলে রাখা নাড়া জমিতে অনেক ঘাস জন্মাত এবং সেই ঘাস ও নাড়া গরু ছাগলের খাদ্যের সংস্থান হত। নাড়া এবং ঘাস পচে এবং গরু ছাগলের গোবর জমিতে বাড়তি জৈব সারের যোগান দিত।

আদিবাসীরা অবশ্য জুমের জমিতে পাহাড়ি এলাকার বেশ কিছু ধানের জাত চাষ করতেন, যে জাতগুলো অনেক আগে থেকেই তারা নিজেরা সংরক্ষণ ও চাষ করতেন। জুমে আদিবাসীদের উৎপাদিত ধানের জাতগুলো এলাকায় গারো ধান নামেই পরিচিত ছিল। সাধারণত চৈত্র মাসে বনের উর্বর জমি বাছাই করে বনের ছোট ছোট ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে এবং বড় গাছের ডালপালা ছেটে পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হত। আগাছা পরিষ্কার করে জমির চারদিক কাটাযুক্ত লতা জাতীয় উদ্ভিদ (আনাইগোটা গাছ, টুনতি বরই, মনকাটা প্রভৃতি) দিয়ে ঘিরে দেওয়া হত। বৈশাখ মাসে প্রথম বৃষ্টি হলে জমিতে ধান বীজ রোপণ করা হত। সাধারণত বাঁশ বা সিন্দুর গাছের ৪/৫ ফুট লম্বা চিকন ডালের এক দিক সূঁচালো করে সেটি দিয়ে বৃষ্টি ভেজা নরম মাটি খুঁচিয়ে খোঁচানো গর্তে (১-১.৫ ইঞ্চি গভীর) ৫/৬টি করে ধানের বীজ ফেলে পা দিয়ে মাটি ফেলে গর্তটি ঢেকে দেওয়া হত। জুমের জমি হাল চাষ করার তেমন প্রয়োজন হত না, কোদাল বা বাক্কু দিয়ে জমির উপরি অংশ আগাছা পরিস্কারের সময় জমির মাটি আগলা করে দেওয়া হত। ধানের সাথে জুমের জমিতে একই সাথে কাউন, ডাটা, পুঁইশাক, শসা, বাঙ্গি, তিল, পেঁপে, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, কচু, আদা, হলুদ, দেওদান ও ভুট্টা জাতীয় ফসলের বীজ বপন করা হত। পেঁপে, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, দেওদান ও ভুট্টা জাতীয় শস্য শুধুমাত্র জমির চারপাশে রোপণ করা হত। জমিতে আগাছা দেখা দিলে নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে সেগুলো পচানোর জন্য জমিতেই ফেলে রাখা হত। আগাছাগুলো পচে সার হত। বনে অনেক পশু পাখি থাকতো বলে ফসলে তেমন কোন পোকার আক্রমণ হত না বললেই চলে। ধান পাকার পর জুম থেকে শুধুমাত্র শীষ কেটে আনা হত। ধানের বাকি সব গাছই জমিতে পরে থাকত এবং সেগুলো তৃণভূজি পশু পাখির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হত। আবার সেগুলো পচে পরবর্তী বছরের জন্য জৈব সার তৈরি হত। এভাবে বলতে গেলে বিনা খরচে শুধুমাত্র কৃষক কৃষাণীদের কায়িক শ্রম দিয়ে ফসল উপাদন করা সম্ভব হত। কাজের বেশি চাপ হলে ধারে শ্রম দিয়ে কাজগুলো চালিয়ে নেওয়া হত। জুমের জমিতে বিভিন্ন ধরণের ফসল চাষের ফলে ব্যাপক প্রাণবৈচিত্র্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যেত। জুম পদ্ধতিতে একটি জমিতে দুই থেকে তিন বছর কৃষিকাজের পর সেই জমিতে আর কৃষি কাজ করা হতো না। ফলে সেই পরিত্যক্ত জমিতে আবার জঙ্গল বেড়ে উঠতো। পাকিস্তান শাসনামলে বন আইনের মাধ্যমে জুমের অধিকার কেড়ে নেওয়া হলেও বনবিভাগের সাথে শর্তসাপেক্ষে লট বরাদ্দের মাধ্যমে জুম চাষ করা হতো। আদিবাসীরা জুম চাষের পাশাপাশি সেই লটে শালগাছ বুনত।

মধুপুর বনাঞ্চলে আমন মৌসুমে বাইদ জমি ও বিলের জমিতে স্থানীয় জাতের ধান চাষ হয়ে থাকে। আমন মৌসুমে সাধারণত স্থানীয় জাতের ধান যেমন-পাজাম, আঠা বিন্নি, নাজিরশাইল, বাশিরাজ, কালোজিরা, বেগুনবিচি, তুলসিমালা, অদুবআলী, পাজাম, নাজিরশাইল, বাশিরাজ, মি সারাং, মি জেংগেল, মি সারেংমা, মি খচ্চু প্রভৃতি ধান চাষ হত। সাধারণত হালের লাঙল দিয়ে জমি চাষ করে কৃষকের ঘরে সংরক্ষিত পচা গোবর ও ছাই প্রচুর পরিমাণে ছিটিয়ে জমিতে শ্রাবণের মাঝামাঝি সময়ে আমন ধানের চারা রোপণ করা হয়। বিলের জমিতে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত স্থানীয় জাতের ধান রোপণ করা হত। চারা রোপণের পর সাধারণত কোন ধরণের সার উপরি প্রয়োগ করা হত না। চারা রোপণের পর থেকে ফসল তোলার সময় পর্যন্ত দু’বার আগাছা বাছাই করা হত। কৃষকরা পাখি বসার জন্য বাঁশ বা গাছের ডাল জমিতে পুঁতে দিতেন। পুঁতে দেওয়া বাঁশ বা গাছের ডালে শালিক, ফিঙে প্রভৃতি বসে জমিতে থাকা পোকামাকড় খেয়ে ফেলায় পোকা দমনের জন্য কোন কীটনাশক প্রয়োগ করতে হত না। তবে বেশি পোকার আক্রমণ হলে বিশেষভাবে পামরি পোকার আক্রমণ হলে দুধকরচ গাছের পাতাযুক্ত ডাল আক্রান্ত জমিতে পুঁতে দিতে দেখা যেত। দুধকরচ গাছের পাতার গন্ধে পামরি পোকা জমি থেকে অন্যত্র চলে যেত। আবার অনেক কৃষককে ভোরবেলা চুলার বাসী ছাই আক্রান্ত জমিতে ছিটিয়ে দিয়ে পামরি পোকা দমন করতে দেখা গেছে। বলতে গেলে আউশ ও আমনই ছিল মধুপুর বনাঞ্চলের প্রধান ফসল।

জুম চাষ আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার পর চালা জমি ও বনে জুমের জমিতে আনারস, আদা, হলুদ ও পঞ্চমূখী কচু‘র ব্যাপক চাষ হত। নভেম্বর মাসে আনারস চাষের জন্য জমি প্রস্তুতির কাজ শুরু হতো। এসময় হালের লাঙল দিয়ে জমি ১/২টি চাষ দিয়ে ফেলে রাখা হতো। ডিসেম্বর মাসের ২/৩টি চাষ দিয়ে মাটি ঢেলাগুলো ভেঙে দেওয়া হতো। মাটি গুড়ো করার পর জমিতে সরিষা বীজ বোনা হতো। সরিষা বীজ অঙ্কুরোদগমের আগেই লাইন করে আনারসের চারা জমিতে রোপণ করা হতো। চারা রোপণের দু’ এক দিনের মধ্যে সরিষা বীজ থেকে চারা বের হয়ে আসতো। জমিতে আনারসের সাথে সরিষা ফসল থাকায় জমিতে তেমন আগাছা উঠতে পারত না। সরিষা আনারসের জমিতে আছাদন তৈরি করে রাখতো। সরিষা তোলার পর আনারসের জমি (লাইনের খালি জমি) কোদাল দিয়ে কুপিয়ে মাটি আগলা করার পর সারি করে আদা/হলুদ/কচু বীজ রোপণ করা হত। আদা ও হলুদ এর মাঝে মাঝে কাসাবা, পেঁপে ও কলা চারা রোপণ করা হতো। বীজ রোপণের পর পুরো আনারসের জমি শুকনা পাতা ও শুকনা খড় দিয়ে ঢেকে (মালচিং) দেওয়া হত। পাতা ও খড়ের আছাদনের ফলে আনারসের জমিতে একদিকে যেমন আগাছা জন্মাতে পারত না অন্যদিকে মালচিং’র ফলে অতিবৃষ্টিতে মাটি ধুয়ে যাওয়া এবং বীজসহ আদা, হলুদ ও কচু চারা উপড়ে পরা সমস্যা রোধ হত। আবার বৃষ্টিতে এসব পাতা ও খড় পচে জমিতে জৈব সার তৈরি হত। ফলে আনারস, আদা, হলুদ ও কচুর জন্য কোন ধরণের সার উপরি প্রয়োগ করতে হত না। আবার আদা ও হলুদ এর পাতা পচেও জমিতে জৈব সার ও জৈব কীটনাশক তৈরি হত। অন্যদিকে মালচিং’র জন্য প্রয়োজনীয় শুকনা পাতা বন থেকে বিনামূল্যে সংগ্রহ করা যেত। ফলে এসব ফসলের উৎপাদন খরচ ছিল খুবই কম। আদা, হলুদ ও কচু ফসল প্রায় পিঠাপিঠি সময়ে সংগ্রহ করা যেত বলে আনারস ফসলের জন্য কৃষকদেরকে দেড়/দু’বছর অপেক্ষা করতে হয় না। এভাবে একই বাগানে পরপর দু’টি মৌসুম আদা/কচু/হলুদ চাষ করা যেত। অনেকে আবার আনারসে লাইনের ফাকে ফাকে পেঁপে ও কলার চাষও করতেন। স্থানীয় জাতের কলা ও পেঁপে হওয়ায় একবার রোপণ করার পর তিন বছর পর্যন্ত কলা ও পেঁপে ফসল সংগ্রহ করা যেত। আনারসের জমিতে একাধিক সাথী ফসল চাষ করার ফলে এলাকার কৃষকরা আর্থিকভাবে খুবই লাভবান ছিল। অনারসের জমিতে একই সাথে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা গাছও রোপণ করা হত।

বিপন্ন মধুপুর বন, বিপন্ন জনজীবন ও পরিবেশ

মধুপুরের সেই সমৃদ্ধ অতীত আজ আর নেই! নেই হয়েগেছে বন ও মানুষের মধ্যকার আত্মিক সম্পর্ক। আধুনিক কৃষির প্রবর্তন, তথাকথিত উন্নয়ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন ভ্রান্ত ও পরিবেশবিনাশী নীতিমালার কারণে মধুপুর বনটি আজ তার সেই জৌলুস ও ঐতিহ্য হারিয়ে ফেলেছে। মধুপুরের আদিবাসীসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষেরা বর্তমানে অল্পসংখ্যক উদ্ভিদ প্রজাতির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই অল্পসংখ্যক প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে জাতের ভিন্নতাও খুব কম। মধুপুর বনাঞ্চলে খাদ্যের বাজার এবং রুচির বিশ্বায়নের ফলে বহুমূখি খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এক সময় মধুপুরের কৃষকরা একই জমিতে একই সাথে একাধিক প্রজাতির শস্য চাষ করতেন, বর্তমানে কৃষকরা বহুমূখি শস্য চাষ না করে একক শস্য চাষের দিকে ধাবিত হয়েছে।

রাবার বাগান, সামাজিক বনায়ন ও উডলট বনায়নের ফলে বর্তমানে বনের ভেতর পশুর চারণ আর নেই। আগ্রাসী প্রজাতির গাছ দিয়ে বনায়নের ফলে (ইউক্যালিপটাস, এ্যাকাশিয়া, মিনজিয়াম প্রভৃতি) বাইদ ও জলাভূমিগুলো পানি শুন্য হয়ে পড়েছে। বনে আগের মত পশু খাদ্য না থাকায় গৃহপালিত জীবজন্তুর পরিমাণ আশংখ্যাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। জলাভূমিগুলো বছরের নয়/দশ মাস পানিশুন্য থাকায় সেখানকার মাছ প্রজাতিগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বনের ভেতরে বাইদ, ছড়া ও পুকুরগুলো লিজ নিয়ে মনোসেক্স প্রজাতির তেলাপিয়া, পাঙ্গাস, সিলভারকার্প প্রভৃতি মাছ চাষের ফলে স্থানীয় মাছের প্রজাতিগুলো বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম। স্থানীয় জাতসমূহের স্থলে বিদেশী জাত প্রতিস্থাপিত হওয়ায় এই এলাকার প্রাণবৈচিত্র্য ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। নতুন ও অপরিচিত প্রজাতির পশু পাখি ও গাছের সাথে মধুপুর বনে নতুন নতুন প্রজাতির ক্ষতিকর পোকা মাকড়ের আগমন ঘটেছে। মধুপুরের কৃষকরা মনে করেন, সামাজিক বনায়ন ও উডলট বনায়নের জন্য বিদেশ থেকে আমদানী করা এ্যাকাশিয়া ও মিনজিয়াম গাছ রোপণের পর থেকে কৃষিজমিতে গান্ধী পোকার আক্রমণ বেশি দেখা গেছে। বনে এবং ভিটা জমিতে এসব আগ্রাসী প্রজাতির গাছ ব্যাপকভাবে রোপণের পর প্রতি মৌসুমে গান্ধী পোকার আক্রমণ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। কৃষকদের মতে, গান্ধী পোকা এ্যাকাশিয়া ও মিনজিয়াম গাছের পাতায় ডিম দেয় ও বাচ্চা ফোটায়। ধানে শীষ আসার সময় হলে পোকাগুলো ধানের জমিতে আক্রমণ করে ধানের দুধ শুষে চিটায় পরিণত করে।

কেঁচো তার স্বভাবচরিতভাবেই নিচের মাটি উপরে এবং উপরের মাটি নিচে ওলটপালট করে মাটির উর্বরতা বাড়িয়ে ফসল চাষ উপযোগী করে তোলে বলে কেঁচোকে প্রাকৃতিক লাঙ্গল বলা হয়। চাষবিহীন জমিতে কেঁচোই প্রাকৃতিকভাবে মাটির সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় ফসলের শেকড় মাটিতে বিস্তার ও বেড়ে ওঠতে সাহায্য করে। মধুপুর বনাঞ্চলে একসময় এতটাই কেঁচোর উপস্থিতি ছিল যে, বনের জমিতে হাটলেই কেঁচোর সদ্যতোলা কাঁদা মাটি পায়ে লাগত। জমিতে কোদালের কোপ বসালে প্রতি কোপেই ৪/৫টি করে কেঁচো কাটা পড়ত। বর্ষা শেষে ধানী জমিতে অসংখ্য পরিমাণে শামুক খেকা যেত। শামুকের জন্য জমিতে কোদালের কোপ দেওয়া যেত না বলা চলে। তবে এসব এখন কেবল আমাদের স্মৃতিতে আছে! বাস্তবে মধুপুর এলাকায় কদাচিৎ কেঁচো ও শামুক দেখা দেয়। জমিতে উফশী ও হাইব্রিড ধান এবং চালা জমিতে কলা ও আনারস চাষের ফলে দেদারসে রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও হরমোন ব্যবহারের করায় কেঁচোর অস্তিত্ব আজ বিলীন হওয়ার পথে। আনারস ও কলার জমিতে অণুজীবাণুর সংখ্যা কমে যাওয়ায় শেওলা পড়ে মাটি পিচ্ছিল হয়ে পড়ছে। কোদাল দিয়ে কোপ দিলে কোদাল মাটির গভীরে ঢুকছে না, মাটি রাবারের মত স্প্রিং করে। ফলে পাওয়াটিলার (ছোট ট্রাক্টর) দিয়ে আনারস ও কলার জমি চাষ করা যাচ্ছে না, প্রয়োজন হচ্ছে মহেন্দ্র/সোয়ারেজ/টাফে’র মত বড় ট্রাক্টর ও লাঙ্গলের। ট্রাক্টর থেকে চুয়ে পড়া ডিজেল ও মবিল জামির পানির সাথে মিশে মাটিতে থাকা অণুজীবাণু ও জলজ প্রাণীগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন মাটির উর্বরাশক্তি হ্রাস পাচ্ছে অন্যদিকে মাটির ভেতরে অবস্থান করা অণুজীব ও জলজ প্রাণীগুলোর বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

পরিবেশ-প্রতিবেশবিনাশী কৃত্রিম বনায়ন, রাসায়নিক কৃষি এবং অন্যান্য উন্নয়ন উদ্যোগ

মধুপুর প্রাকৃতিক শালবন ও বনের প্রাণবৈচিত্র্যের বিপর্যয় হঠাৎ করে সংঘঠিত হয়নি। পাকিস্তান আমল থেকে এই ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছিলো এবং যার পরিপূর্ণ রূপ পেয়েছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে। পাকিস্তান সরকার ১৯৫২ সালে মধুপুরের কাকরাইদ-এ ৫৫০ একর জমি অধিগ্রহণ করে। অনেকে মতে, মধুপুর বনের বিপর্যয় এখান থেকে সূত্রপাত হয়েছে। কারণ ৫৫০ একর জমি অধিগ্রহণের কারণে মধুপুরের বেশ কয়েকটি গ্রাম উচ্ছেদিত হয়েছে। এসব গ্রামের মানুষকে পূর্নবাসন না করায় আদিবাসী গারোদের অধিকাংশই ভারতে চলে গেলেও কিছু পরিবার পার্শ্ববর্তী গ্রামে বসবাস করতে শুরু করে। অন্যদিকে উচ্ছেদ হওয়া শতাধিক বাঙালি পরিবার বনের পাশে খাস জমিতে আশ্রয় নেয়। তারা ধীরে ধীরে বনের গাছ কেটে পরিষ্কার করে কৃষিজমি তৈরি করে। ফলে বনের পরিমাণ কমতে থাকে, কমতে থাকে বনের সম্পদ ও বৈচিত্র্য।

নিদির্ষ্ট করে বললে মধুপুর বনের ওপর প্রথম বড় আঘাত আসে ১৯৭৭-৭৮ সালে যখন এই বনে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ‘ফায়ারিং রেঞ্জ’ স্থাপন করা হয়। ‘ফায়ারিং রেঞ্জ’ স্থাপনের জন্য একটি আদিবাসী গ্রাম উচ্ছেদ করা হয়। কেটে ফেলা হয় ১০০০ একর জমির শালবন। বছরে ২/১ বার সর্বোচ্চ দুই মাস বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ফায়ারিং রেঞ্জে বোমা নিক্ষেপ প্রশিক্ষণের সময় বিমান ও বোমার বিকট শব্দে বনের পশু পাখি থেকে শুরু করে মানুষও আতঙ্কে থাকে। বোমারু বিমান থেকে ছোড়া গোলা ও স্থল মাইনের বিকট শব্দে বনসহ লোকালয়ের মাটি জোরে কেপে উঠায় বনের ভেতর ও চারপাশের মানুষের ঘরের মাটির দালানে ফাটলের সৃষ্টি হয়। অনেক সময় বিমান থেকে নিক্ষিপ্ত গোলা লোকালয়ে পরে ঘরবাড়ি ও জানমালের ব্যাপক ক্ষতি করে। আমি নিজে দুইটি বোমা নিক্ষেপকারী বিমান প্রশিক্ষণকালীন সময়ে উপরে বিধ্বস্ত হয়ে লোকালয়ে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়তে দেখেছি। টুকরোগুলোর আঘাতে বেশ কিছু লোক ও গৃহপালিত পশু আহত হয়েছে।

১৯৮৬ সালে রাবার চাষের মাধ্যমে মধুপুর বনকে আরও ক্ষত-বিক্ষত করা হয়। এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক’র অর্থায়নে সরকার বন শিল্প উন্নয়ন প্রকল্পের নামে মধুপুর শালবনের (পীরগাছা ও কামারচালা বিটের অধীন) প্রায় ৭৮০০ একর জমিতে রাবার চাষ শুরু করে। রাবার বাগান সৃজনের জন্য প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গজারি ও সেগুনসহ স্থানীয় অসংখ্য প্রজাতির গাছ, লতাগুল্ম ও ঔষধি গাছ উপড়ে ফেলা হয়, ধ্বংস করা হয় বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক উদ্ভিদগুলোকে। এমনকি বনবিভাগের জমি ছাড়াও বনের নিকটবর্তী অনেক গারো আদিবাসীদের রেকর্ডকৃত জমিগুলোতে জোর করে রাবার চাষ করা হয়। যে উদ্দেশ্য নিয়ে রাবার বাগান করা হয়েছে সে উদ্দেশ্য তো পূরণ হয়নি বরং রাবার উন্নয়ন প্রকল্পটি প্রতিবছর লাখ লাখ টাকার লোকসান গুণছে। এই প্রকল্পটির কারণে প্রাণবৈচিত্র্যসহ অন্যান্য ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ তো রয়েছেই।

১৯৮৭-৮৮ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়িত সামাজিক বনায়ন প্রকল্পটিও মধুপুর বন ধ্বংসের ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে। মধুপুর শাল বনের যে অংশটুকুতে কোন গাছ নেই বা ক্ষয়িত বন এলাকায় এই সামাজিক বনায়ন প্রকল্প করার কথা থাকলেও বাস্তবে গভীর বন কেটে এই সামাজিক বনায়ন সৃজন করা হয়, যা মধুপুর বনের প্রাণী ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্যকে হ্রাস করতে ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে ১৯৮৯ সালে থানা বনায়ন ও নার্সারী প্রকল্পের মাধ্যমেও মধুপুরের প্রাকৃতিক বনকে ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা হয়। কারণ উডলট প্রকল্পের জন্য শাল গাছ কেটে জমি খালি করে সেখানে লাগানো হয় বিদেশ থেকে আমদানী করা আগ্রাসী প্রজাতির গাছ। বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থে পরিচালিত প্রকল্পে মধুপুরে ৩৪৩২ একর জমিতে উডলট বনায়ন করা হয়। এছাড়া ১৯৯৭-১৯৯৮ অর্থবছরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে উডলট বাগান, ষ্ট্রীপ বাগান এবং কৃষি বনায়নের জন্য একই ধরণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে সামাজিক বনায়নের অধীনে এসব উডলট প্রকল্প অব্যাহত আছে। একটি উডলট প্রকল্পের মেয়াদ ১০ বছর। মধুপুর বনের কয়েক হাজার একর জমির গজারীসহ হরেক রকমের কাঠ জাতীয় গাছ, অসংখ্য স্থানীয় প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ, লতা গুল্ম উৎাড় করে সামাজিক বনায়ন ও উডলট বনায়নের মাধ্যমে রোপণ করা হয় এ্যাকাশিয়া, মিনজিয়াম, ক্রশমিনজিয়াম, ইউক্যালিপটাস, বকায়ন, গামার প্রভৃতি জাতীয় আগ্রাসী বিদেশি গাছ। ২০০৩ সালে ইকো পার্ক প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমেও মধুপুর বনকে বিপদাপন্ন করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। উপরে উল্লেখিত গৃহীত বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগের কারণে মধুপুর বনে যেসব বৃক্ষ আজ বিলুপ্ত এবং বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে সেগুলো হলো: গান্ধি গজারি, শিরিস, শিল কড়ই, সাদা কড়ই (শেশ্রা), হরিতকি, বাবারি, মারি বিদু, উম্মাক বিদু, পিরিলা, আনাইগোটা, তিন জাতের জাম, বট, শায়তান গাছ, ওলটকম্বল, জয়না ও লোহা গাছ উলে­খযোগ্য। বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদ ও বৃক্ষ প্রজাতির মধ্যে- হুইরাগোছা, পলাশ, সিন্দুর, দামন, মনকাটা, অশ্বথ, আজকী, আমলকি, বহেরা, নিয়র, চাম্বল, গর্জন, জারুল, সোনালু, মিনজিরি, সেগুন, জিকা ও পাকুর ইত্যাদি।

বিপন্ন কৃষি, বিপন্ন বন

সত্তর দশকের মাঝামাঝিতে (১৯৭৬-৭৭) মধুপুর বনাঞ্চলে সবুজ বিপ্লবের নামে সূচিত হলো আধুনিক কৃষি। এর পেছনে বড় অবদান রেখেছে জলছত্র খ্রীস্টান মিশন। ফিলিপিন্স কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্র (ওজজও)‘র একজন কৃষিবিদ ও প্রশিক্ষক মি. আলেক্স রাবানল ধানী জমিতে এলাকার আদিবাসী ও বাঙালি কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে ধান ও ফলের চাষ বিষয়ে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেন। প্রশিক্ষিত কৃষকরা বোরো মৌসুমে উন্নত (উফশী) জাতের ধান চাষ শুরু করেন। প্রথম পর্যায়ে এলাকায় ইরি ধান নামের একটি জাত (ইরি-৮) কৃষকরা চাষ করতে শুরু করে। এরপর বাংলাদেশ ধান গবেষণা কেন্দ্র (ইওজও) ও বিনা‘র বিজ্ঞানীরাও একাধিক উফশী জাত আবিষ্কার করে কৃষি স¤প্রসারণ বিভাগের মাধ্যমে বীজ ও প্রযুক্তি কৃষক পর্যায়ে স¤প্রসারণ করে। এ এলাকার কৃষকরাও এসব জাত নিয়ে চাষ করতে শুরু করেন। অধিক ফলনের জন্য তারা জমিতে রাসায়নিক সার (ইউরিয়া, টিএসপি, পটাস, জিংক প্রভৃতি) এবং পোকামাকড় দমনের জন্য রাসায়নিক কীটনাশক (ফুরাডান, ডায়াজিনন, নগস, বাসুডিন, ডাইমেক্রন প্রভৃতি) ব্যবহার করতে শুরু করে। সরকার ভর্তুকিতে স্যালো মেশিন, ট্রাক্টর এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দেওয়ার ফলে উৎপাদন খরচ কম এবং অধিক ফলন পাওয়ায় কৃষকরা আধুনিক পদ্ধতিতে ধান চাষে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। যদিও পরবর্তীতে তারা আবিষ্কার করেন যে, ধীরে ধীরে ফলন কম হলেও উৎপাদন খরচ বেড়েই চলেছে। বর্তমানে অধিকাংশ কৃষক আমন ও বোরো মৌসুমে উফশী জাতের ধান চাষ করছেন। বোরো মৌসুমে উৎপাদিত উফশী ধানের জাতগুলোর মধ্যে ইরি-৮, ইরি-৫০, বিআর-২৮, বিআর-২৯, ইরিটন, বিআর-১৪ বিনা-৬ এবং হাইব্রিড জাতগুলোর মধ্যে-আলোক, হীরা-১, আফতাব, আলোড়ন জাত ইত্যাদি। এভাবে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত বীজের (উফশী ও হাইব্রীড বীজ) পক্ষে কৃষি স¤প্রসারণ বিভাগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশেষভাবে রেডিও, টেলিভিশন এবং ভ্রাম্যমান প্রচারণা ও কৃষি প্রদর্শনী প্লট করে এবং কখনো কখনো বিনামূল্যে নগদ অর্থ, বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ প্রদান করে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত করে থাকে।

নব্বই দশকের শেষ দিকে বিভিন্ন এনজিও ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যেমন- ব্র্যাক, এসিআই, আফতাব প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান আলোক, সোনারবাংলা, হীরা, আফতাব-১, ২ প্রভৃতি হাইব্রিড ধান বীজ এবং সুফলা বীজ, লাল তীর প্রভৃতি নামের হাইব্রিড সবজি বীজ বাজারজাত শুরু করে। প্রতিষ্ঠানগুলো হাইব্রিড ধান ও হাইব্রিড সবজি চাষের জন্য কৃষকদেরকে বিভিন্নভাবে প্রলুদ্ধ করে। প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত এসব জাত চাষের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন (ভিটামিন) ও গুটি ইউরিয়া সার বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার ন্যায় মধুপুর বনাঞ্চলের কৃষকদের নিকটও বাজারজাত করতে শুরু করে। ব্র্যাক ২০০০ সালের দিকে ‘আলোক’ ধান নামে হাইব্রিড বীজ প্রথম বাজারজাত শুরু করে। আলোক ধান চাষের জন্য ব্র্যাক গুটি ইউরিয়া সার এবং ধানের হরমোনও বিক্রি করে। এসব এনজিও এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে উফশী ও হাইব্রিড জাতের বিভিন্ন রকমের সবজি বীজ, সরিষা, পেঁপে ও কলা বীজ নিয়ে এলাকার কৃষকরা আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করতে থাকে। কৃষকরা এনজিও কর্মকর্তা, কোম্পানির প্রতিনিধি ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তাদের পরামর্শে অধিক ফলনের আশায় আনারস, আদা, হলুদ, পেঁপে ও কচু চাষে রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে শুরু করে।

কৃষকদের রাসায়নিক সার নির্ভরশীলতা ও সার বিপ্লব

অধিক সার প্রয়োগ করলে আনারস ও কলার আকার অনেক বড় হয় এই ধারণা থেকে মধুপুর বনাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে বাগানে বেশি করে সার প্রয়োগের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এমনও দেখা গেছে আনারস চাষিরা ইউরিয়া সার বাগানে হাত দিয়ে না ছিটিয়ে বস্তার এক মাথার দুই কোনা কেটে আনারস গাছের লাইন দিয়ে টেনে নিয়ে যায়। এই সুযোগে ডিলাররা সারের যোগান কমিয়ে দাম বাড়িয়ে দেয়। কৃত্রিম সার সংকট সৃষ্টি করে তারা হাতিয়ে নেয় অধিক মুনাফা। রাসায়নিক সারের উপর মধুপুর অঞ্চলের কৃষকদের নির্ভরশীলতার প্রতিফলন দেখা যায় ১৯৯৩ সলে টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল উপজেলায় সারের দাবিতে কৃষকরা আন্দোলন করলে পুলিশের গুলিতে দুই জন কৃষক মারা যায়। সার সঙ্কটের কারণে কৃষকরা ৩৬০ টাকা মূল্যের পঞ্চাশ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার ১০০০-২৫০০ টাকায় কিনতে বাধ্য হয়েছে। আমি দেখেছি পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে কৃষকরা মধুপুরে ডিলারদের নিকট প্রতি বস্তা ইউরিয়া সার ২০০০ টাকা বিনিময়ে না পেয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। কৃষকরা অধিক মূল্যে সার কিনে আনারস, আদা, কচু ও কলা ক্ষেতে প্রয়োগ করতে বাধ্য হয়। ফলে উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বাজার মূল্য না পাওয়ায় তারা দারুণভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মূখীন হয়।

নব্বই এর দশকে কিছু বহুজাতিক কোম্পানি মধুপুর এলাকায় অমৌসুমে আনারসের ফলন আনার জন্য এক ধরণের হরমোন বাজারজাত করতে শুরু করে। হরমোন প্রয়োগ করে গাছের উপযুক্ত বয়স হওয়ার আগেই ফলন আনা সম্ভব হয়। হরমোন প্রয়োগ করে আগাম আসা আনারস আকারে ছোট হলেও অমৌসুমের হওয়ায় এবং সে আনারসের ভালো দাম পাওয়ায় অনেক কৃষক আনারস বাগানে হরমোন প্রয়োগ করতে শুরু করে। আবার ভিন্ন একটি হরমোন (ইথরেল- ফল পাকানোর) কাঁচা অবস্থায় আনারসের উপর প্রয়োগের করলে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পেঁকে যায় এবং সুন্দর রঙ ধারণ করে। ফলে কৃষকরা রসালো হওয়ার আগেই হরমোন দিয়ে আনারস পাঁকিয়ে বাজারে বিক্রি করে ভালো দাম পেয়ে থাকে। আনারস সংরক্ষণের জন্য কোন হিমাগার না থাকায় চাষিরা তাদের উৎপাদিত আনারসের জন্য সরাসরি নগদ ভোক্তাদের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু হরমোন দিয়ে পাঁকানো কাঁচা আনারস ভোক্তারা আকৃষ্ট হয়ে একবার কেনার পর আর দ্বিতীয়বার কিনতে আগ্রহী হয় না। কারণ হরমোন দিয়ে পাঁকানো আনারস বাইরে থেকে দেখতে খুব আর্কষণীয় হলেও কাটার পর দেখা যায় আনারটি সাদা রসহীন। এভাবে হরমোন দিয়ে পাঁকানো আনারস কিনে প্রতারিত হয়ে ভোক্তারা মধুপুরের আনারসের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। হরমোন দেওয়া বাগানের প্রায় সব আনারস এক সাথে পাঁকে এবং সে আনারস অধিক রসালো হওয়ায় ২/৩ দিনের বেশি সংরক্ষণ করা যায় না। বাগান থেকে ফল দ্র”ত কেটে বাজারে নিলেও যোগান বেশি থাকায় এবং তাড়াতাড়ি পচে যায় বলে ব্যবসায়ীরা তা কিনতে চায়না। ফলশ্র”তিতে সস্তা দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়ে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কলা চাষ লাভজনক হওয়ায় ২০০৪-২০০৫ সালের দিকে মধুপুর বনাঞ্চলে এমন কোন উঁচু বা চালা জমি ছিল না যেখানে কৃষকরা কলা চাষ করেনি! এমনকি ঘরের উঠান ঘেঁষেও কলা চাষ করা হয়েছিল। যারা আগে আনারস চাষ করতেন তারাও আনারস চাষ কমিয়ে কলা চাষ শুরু করে। সবাই চাষ করেন বলে উৎপাদিত কলা ও আনারসের যোগান বেশি হওয়ায় দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। কম দামে উৎপাদিত কলা ও আনারস বিক্রি করে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া হরমোন, কীটনাশক ব্যবহার করায় মানবস্বাস্থ্যের জন্য এসব কলা ও আনারস ক্ষতিকর বলে সরকার পক্ষ থেকে প্রচারণা চালালে আকস্মিকভাবে মধুপুরের কলা ও আনারসের চাহিদা কমে যায়, যা কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কলা চাষের জন্য অনেক পূঁজির প্রয়োজন হয়। অধিক লাভের আশায় দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা নিজের জমিতে এবং জমি লিজ নিয়ে কলা চাষ শুরু করে। কলা চাষের জন্য তার এলাকার ও এলাকার বাইরের মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেয়। ঋণের বিপরীতে মহাজনদেরকে শতকরা ১০/১৫ টাকা মাসিক সুদ পরিশোধ করতে হয়। ঋণের মাসিক সুদ প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সময়ে কৃষকদেরকে পরিশোধ করতে হয়। ফলে এলাকায় ছোট বড় অসংখ্য মহাজনের সৃষ্টি হয়। চড়া সুদ নিয়ে কৃষকরা কলা চাষ করে নিঃস্ব হলেও এসব মহাজনরা প্রচুর মুনাফা অর্জন করে।

বিপন্ন খাদ্য নিরাপত্তা

কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের ফলে মধুপুর গড় এলাকায় বসবাসরত প্রাকৃতিক বনের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা বিঘিœত হচ্ছে। আউশ মৌসুমে এখন ধান চাষ হয়না বললেই চলে। আউশের জমিতে আনারস, আদা, কচু, কলা, পেঁপে. হলুদ চাষ করা হচ্ছে। অথচ কৃষকরা এসব ফসল নিজেরা না খেয়ে সম্পূর্ণ বিক্রি করছে। তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন-চাল, ডাল, তেল, লবন, কেরোসিন, কাপড় ও অন্যান্য তরিতরকারির জন্য তারা সম্পূর্ণ বাজারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। একসময় বনে জন্মানো ফলমূল, লতা-পাতা ও পোকামাকড় খেয়ে বনের পশু পাখি জীবনধারণ করত। পশু পাখির নিরাপদ আশ্রয় ও নিরপাদ প্রজনন স্থল ছিল এই বন। বনাঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর খাদ্যের একটি বড় অংশ যোগান দিত এই বন। বলতে গেলে পশু পাখি ও বনবাসীদের আপদকালীন খাদ্য নিরাপত্তা দিত এই প্রাকৃতিক বন। কাজহীন সময়ে এলাকার আদিবাসীসহ অন্যান্য দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্যের চাহিদা পূরণ হত বন থেকে বিভিন্ন ফলমূল, লতা গুল্ম সংগ্রহ করে। বনাঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠী বন থেকে বহেরা, আমলকি, হরিতকি, নিয়র, জয়না, আনাইগোটাসহ হরে রকমের ফল, হরেক রকমের বন্য আলু, শটি, ওলটকম্বল, শতমূলসহ বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধি গাছ ও লতা গুল্ম সংগ্রহ করে, বনের শুকনা লাকড়ি ও বিভিন্ন গাছের পাতা (গাদলা পাতা, শটি পাতা, আজকী পাতা, গজারি পাতা) সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করত। এক বেলা খাবার না থাকলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী একটি কোদাল ও খন্তা (শাবল) নিয়ে বনে ২/৩ ঘণ্টা পরিশ্রমে দুই বেলার খাদ্য (সুস্বাদু বন্য আলু) সংগ্রহ করতে পারত। বনে কেমন আলু পাওয়া যায়? এমন প্রশ্নের উত্তরে গাছাবাড়ি গ্রামের বনজ আলু সংগ্রহকারী একজন আদিবাসী নারী জানান যে, অনেক বাঙালি নারী পুরুষ বন থেকে আলু সংগ্রহ করে বিক্রি করে। তবে আলু তোলার পর আলু গাছের মাথা মাটিতে পুনরায় রোপণ না করে উপড়ে ফেলায় সেই গাছগুলো মরে যাচ্ছে। এছাড়া আগের তুলনায় বনে আলু গাছের সংখ্যা কমছে। বিভিন্নভাবে প্রাকৃতিক বন উজাড় করায় এসব আলু দিনে দিনে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

বনের পশু পাখি বনে জন্মানো ফলমূল খেয়ে নিরাপদে বিচরণ করত। কিন্তু প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে আগ্রাসী প্রজাতির কৃত্রিম বন সৃজনের ফলে বনাঞ্চলের অধিবাসী ও পশুপাখির খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। এসব আগ্রাসী গাছের আগ্রাসনে স্থানীয় জাতের গাছপালা ও লতাগুল্মগুলো বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে। অন্যদিকে স্থানীয় জাতের ফলদ গাছ কেটে ফেলায় পশু পাখির খাদ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আগ্রাসী প্রজাতির গাছগুলোতে যে ফল হয় তা পশু পাখিতে খায়না। এমনকি এসব গাছের ঘন ডালপালা না থাকায় পশু পাখি এসব গাছে বাসা তৈরি করতে পারে না। ফলশ্রুতিতে খাদ্যাভাবে, বাসস্থানের অভাবে এবং প্রজননের অনুকূল পরিবেশ না থাকায় বনের পশু পাখিদের প্রজনন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। বনে খাদ্য ও আবাসন সংকট হওয়ায় অনেক পশুপাখি খাদ্যের সন্ধানে এবং প্রজননের নিরাপদ আবাসন খুঁজতে লোকালয়ে এসে মানুষের হাতে এবং গৃহপালিত পশু পাখির আক্রমণের শিকার হচ্ছে। বিশেষভাবে বনের শেয়াল, বানর, হনুমান, উল্লুক, বাগদাসা, হরিণ, খরগোস, বন মুরগি, ঘুঘু, হরিকল প্রভৃতি প্রাণী খাদ্য ও প্রজননের জন্য নিরাপদ আবাসন খুঁজতে লোকালয়ে এসে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। বনে এখন শেয়াল ও হনুমান দেখা যায় না বললেই চলে। লোকালয়ে খাদ্য বেশি থাকায়, শেয়াল ও হনুমান বিপদ থাকা সত্তে¡ও সেখানে আশ্রয় নিচ্ছে। পরিবেশ, পরিস্থিতির পরিবর্তনে বিশেষত প্রাণবৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হওয়ায় বনাঞ্চলের দরিদ্র ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী বর্তমানে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।

সামাজিক বনায়ন ও উডলট বনে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কৃষি ফসল উৎপাদনের জন্য প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দিয়ে উৎপাদিত ফলমূল খেয়ে বনের শেয়াল, সজারু, সাপ, বন মুরগি, বানর, হনুমান, উল­ুকসহ বিভিন্ন পশু পাখি প্রায়শই মারা পড়েছে। একদিকে ফসল উৎপাদনের জন্য প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার এবং আগ্রাসী প্রজাতির গাছের অধিক খাদ্য গ্রহণে বনের জমি দিন দিন তার উৎপাদন শক্তি হারাতে বসেছে। বনে স্থানীয় প্রজাতির গাছ কমে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় পাতার অভাবে কৃষকরা আনারস, আদা, কচু, হলুদ প্রভৃতি ফসলের জমিতে মালচিং করতে পারছে না। ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সার ও কৃষি উপকরণের জন্য পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে বাজারের উপর। যার ফলশ্র”তিতে মধুপুর বনের পরিবেশ ব্যাপকভাবে দূষিত হচ্ছে।

উপসংহার
মধুপুরের বনবাসীরা বিশ্বাস করেন যে, এখনো যে পরিমাণ প্রাকৃতিক বনভূমি রয়েছে সেগুলো যদি ৫-১০ বছর কোন রকম স্পর্শ না করে যতœ নেওয়া হয় তা হলে অবশিষ্ট প্রাকৃতিক বন সেই ঐতিহ্যবাহী শালবন সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। মধুপুর বনের সমৃদ্ধ অতীত ফিরিয়ে আনার জন্য স¤প্রতি আইপ্যাক প্রকল্পের মাধ্যমে সরকার বেশ ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে। গাছ চুরি বন্ধসহ এলাকার মানুষকে সম্পৃক্ত করে বন রক্ষার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এ ভালো উদ্যোগ ছাড়াও প্রাকৃতিক বন রক্ষার পাশাপাশি বন বিভাগকে সামাজিক বনায়ন ও উডলট বনে স্থানীয় প্রজাতির গাছ যেমন-আম, জাম, গামার, অর্জুন, গর্জন প্রভৃতি গাছ রোপণ করা প্রয়োজন যাতে করে ওই এলাকার বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়। বলা বাহুল্য যে, বননির্ভর জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বশীল কৃষির উন্নয়নের জন্য মধুপুর বনাঞ্চলের পরিবেশ ও কৃষি প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য জরুরি ভিত্তিতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পদক্ষেপগুলো নিম্নরূপ হতে পারে:

১. সামাজিক বনে আগ্রাসী প্রজাতির গাছ রোপণ বন্ধ করে স্থানীয় জাতের কাঠ, ফলদ ও ঔষধি গাছ রোপণ করা।
২. কৃত্রিম বনে বাণিজ্যিকভাবে কলা ও আনারস চাষ বন্ধ করে যেসব ফসলে কম সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয় বা শুধুমাত্র
জৈব সার দিয়েই চাষ করা যায় এমন ফসল চাষ করা।
৩. প্রাকৃতিক বন এখনো যেটুকু অবশিষ্ট রয়েছে তা সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।
৪. কৃত্রিম বন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বনাঞ্চলের স্থায়ী অধিবাসীদের অংশীদারিত্ব প্রদান করতে হবে।
৫. জমিতে বৈচিত্র্যময় শস্য-ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্যোগী হতে হবে।
৬. বনাঞ্চলে কোন প্রকল্প গ্রহণ, বিশেষভাবে কৃষি প্রাণবৈচিত্র্যের সঙ্গে সম্পর্কীত এমন প্রকল্পের বেলায় স্থানীয় বনবাসীদের সম্পৃক্ত
করা বা তাদের অবহিত করা এবং বনবাসীদের সংগঠনগুলোকে প্রকল্পের সাথে সম্পৃক্ত করা।
৭. বনের বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।

উপরোক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে মধুপুর বনের সেই সমৃদ্ধ অতীত ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও অবশিষ্ট প্রাকৃতিক বন টিকে থাকবে। কে জানে অবশিষ্ট এই প্রাকৃতিক বন রক্ষা পেলে মধুপুরবাসীর মানুষেরা খাদ্য, জ্বালানী, ঔষুধসহ বিভিন্ন ধরনের প্রয়োজনীয় উপকরণ বন থেকে সংগ্রহ করতে পারবে, প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো উদ্ভিদ ও লতাগুল্ম বনে ভরপুর হবে। এতে করে পশু-পাখির কলকাকলিতে আবার মূখরিত মধুপুর বন!

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.