Posted in

মানিকগঞ্জের স্থাপত্য পুরাকীর্তি ও শত মানিকের স্বর্গ ভূমি মত্ত গ্রাম

মানিকগঞ্জ থেকে মো. নজরুল ইসলাম
ভারতীয় উপমহাদেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন স্থাপত্য পুরাকীর্তির ঐতিহ্য। বাংলাদেশের মধ্য সমতল ভূমির অন্যতম জেলা মানিকগঞ্জ। ধলেশ^রী নদীর তীরে অবস্থিত আমাদের প্রিয় মানিকগঞ্জ জেলা। মানিকগঞ্জ পৌরসভা তথা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত স্থাপত্য পুরাকীর্তি ও শত মানিকের স্বর্গ ভূমি মত্ত গ্রাম।
বর্তমান মানিকগঞ্জ সদরের মাত্র দেড় মাইল পূর্বে মত্ত গ্রামটিতে এক সময় প্রতাপশালী জমিদারদের বসবাস ছিলো। তাদের মধ্যে রামকৃষ্ণ সেন এবং তার ছেলে প্রসন্ন কুমার সেনের নাম উল্লেখযোগ্য। মানিকগঞ্জের পুরাকীর্তির ইতিহাসে সদর উপজেলার মত্ত গ্রামের গুপ্ত পরিবারের অবদানের স্বীকৃতি পাওয়া যায়। এ পরিবারের আদি পুরুষ ছিলেন শিবানন্দ গুপ্ত। শিবানন্দ, প্রভাস গুপ্ত, শিশির গুপ্ত এবং প্রবোধ গুপ্ত পর্যন্ত মোট ২৩ পুরুষের সন্ধান জানা গেছে। গুপ্ত বংশের প্রতিষ্ঠাতা শিবানন্দ গুপ্ত নামকরা কবিরাজ ছিলেন। তিনি পাঠান সেনাপতি মীর মকিমের পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন। অনুমিত হয় যে, বাংলাদেশে পাঠান শাসনামলে মত্তের গুপ্ত বংশীয় উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ এ এলাকায় যেমন বিশেষ প্রাধান্য বিস্তার করেছিলো তেমনি ভেষজ চিকিৎসা শাস্ত্রে তাদের অগাধ বুৎপত্তি ও চিকিৎসা সেবা প্রবাদের মতো লোকমুখে আজও বেশ শোনা যায়।


মানিকগঞ্জ শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে ঐতিহ্যবাহী গ্রাম মত্ত। এলাকার বিশাল উচ্চতার মত্ত মঠের নজর কাড়ে বহুদূর থেকেই। মঠের ঠিক পেছনে টলমলে জলের বিশাল একটি দীঘি। দীঘির চারপাশ আগাছা আর জঙ্গলে ভরপুর ছিল দীর্ঘদিন। বর্তমানে পৌর কর্তৃপক্ষ মত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের পুকুরটি বিদ্যালয়ের নামে পুকুর ঘাটলা দিয়ে সংস্কার ও ব্যাবহার উপযোগী বেশ সুন্দর করেছেন। পুকুরের চারপাশ দিয়েই এখন পাকা রাস্তা হয়েছে। এই রাস্তার মধ্যখানে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ দিকে তাকালেই নজর পড়ে টিনের ছাউনি ও ইটের গাথুনি দিয়ে কুড় খানেক কাঁচা-পাকা জড়াজীর্ণ ঘর। আর বাড়ির আঙিনায় মেহগনি গাছের বাগান। এক সময় জজবাড়ি হিসেবেই বাড়িটিকে চিনতেন এলাকার মানুষ। তবে জজবাড়ির একটি ইট-কাঠও আজ অবশিষ্ট নেই। হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। মানিকগঞ্জ পৌরসভার এ গ্রামেই একই পরিবারে শিকড় প্রথিত রয়েছে দেশ এবং জগৎখ্যাত এক ঝাক মানুষের। এ বাড়ির সন্তান বাঙালির গর্ব অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড.অমর্ত্য সেন, একই পরিবারে পাশের গ্রামের বগজুরিতে জন্ম উপমহাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা হিরালাল সেন, বাংলা লোক গান ও ময়মনসিংহ গীতিকার সংগ্রাহক ড. দিনেশ চন্দ্র সেন প্রমুখ।


এ গ্রামটিতে একসময় প্রতাপশালী জমিদারদের বসবাস ছিল। তাদের মধ্যে রামকৃষ্ণ সেন এবং তার ছেলে প্রসন্ন কুমার সেনের নাম উল্লেখযোগ্য। মানিকগঞ্জের পুরাকীর্তির ইতিহাসে মত্ত গ্রামের গুপ্ত পরিবারের অবদানের স্বীকৃতি পাওয়া যায়। এ পরিবারের আদি পুরুষ ছিলেন শিবানন্দ গুপ্ত। শিবানন্দ, প্রভাস গুপ্ত, শিশির গুপ্ত ও প্রবোধ গুপ্ত পর্যন্ত মোট ২৩ পুরুষের সন্ধান জানা যায়। গুপ্ত বংশের প্রতিষ্ঠাতা শিবানন্দ গুপ্ত নামকরা কবিরাজ ছিলেন। তিনি পাঠান সেনাপতি মীর মকিমের পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন। বাংলাদেশে পাঠান শাসনামলে মত্তের গুপ্ত বংশীয় উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ এ এলাকায় যেমন বিশেষ প্রাধান্য বিস্তার করেছিল তেমনি ভেষজ চিকিৎসা শাস্ত্রে তাদের অগাধ বুৎপত্তি প্রবাদের মতো লোকমুখে আজো উচ্চারিত হয়।


১৯৪৭ সালে দেশভাগের ক’বছর আগে জজবাড়ির লোকেরা অনেক স্মৃতি, অনেক মায়া পেছনে ফেলে ভারতে চলে যান। হত দরিদ্র ইদ্রিস আলী, আনিছ উদ্দিন,ময়জুদ্দিন ও শুক্কুরী বেগমের মতো ১০-১২টি দরিদ্র ভূমিহীন পরিবার এখন ওই বাড়িতে বসাবাস করেন। পেশায় এদের কেউ ভ্যানচালক, আটোবাইক চালক আবার কেউ দিনমজুর, ক্ষুদ্র দোকানি। এদের অনেকে জানেন না এ বাড়ির জজ সাহেবের ইতিকথা। বোঝেন না নোবেল পুরস্কার কি ও অর্থনীতিবিদ ড, অমর্ত্য সেনকে এবং তারা কার জায়গায় বসবাস করছেন।


১৯১৮ সাল থেকে ১৯২০-এর মাঝামাঝি সময়ে সারদা প্রসাদ সেন ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে পেয়েছিলেন দেওয়ান বাহাদুর উপাধি। পেশায় ছিলেন সেশন জজ। তার ছোট ভাই অন্বিকা প্রসাদ সেনও ছিলেন সাবজজ। আর এ কারণে তাদের এ বাড়িটি সবাই জজবাড়ি বলত। সারদা প্রসাদের ছেলে বিলেত পড়া আশুতোষ সেন শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন ‘নটির পূজা’ নাটকটি দেখতে। নাটকের অভিনেত্রী অমিতাকে তার বেশ ভালো লেগে যায়। নিজেই সিদ্ধান্ত নেন তাকেই জীবনসঙ্গী করবেন। বাবাও বুঝতে পেড়ে অমত করেননি। সেই সুবাদে অমিতাকে বিয়ে করে আশুতোষ সেন ফিরে আসেন মানিকগঞ্জের এই মত্ত গ্রামে। নতুন বউ দেখতে সেদিন পুরো গ্রাম ভেঙে পড়েছিল জজবাড়ির উঠানে।


এই আশুতোষ সেন আর অমিতা সেনের ঘরেই জন্ম নিয়েছিলেন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ নোবেল জয়ী ড. অমর্ত্য সেন। সে সময়ের আলোচিত জজবাড়িতে ছিল ৭-৮ টি নকশাদার দৃষ্টিনন্দন টিনের ঘরসহ বাড়ির চারদিকে যেন শৈল্পিক নির্দশনে ভরপুর। চাকরি সূত্রে জজবাড়ির দুই জজ ভাই বাইরে থাকলেও তাদের বাবা মা স্থায়ীভাবেই থাকতেন এ বাড়িতে। আর অমর্ত্য সেন নিজের বাবা মায়ের সাথে ঢাকার ওয়ারীর বাড়িতে বড় হয়েছেন। অমর্ত্য সেনের বাবা আশুতোষ সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপক ছিলেন। দেশ ভাগের পরে আশুতোষ সেন দিল্লিতে ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন দীর্ঘ দিন। তবে বিভিন্ন উৎসব, পূজাপার্বণের ছুটি পেলেই বাবা-মায়ের সাথে ছুটে আসতেন অমর্ত্য সেনও।


এসব তথ্য বলার মতো বয়সী মানুষ মত্ত গ্রামে আজ আর বলতে গেলে একজনও নেই। যা বলবার তা বলছিলেন, এলাকার সর্বজন শ্রদ্ধেয় ৯০ পেরুনো সবার প্রিয় মাস্টার মশাই। ৮৮’র বন্যার আগে অমর্ত্য সেন যখন বিশ্বখ্যাতি পাননি তখন একবার হঠাৎ করেই নাড়ির টানে পূর্ব পূরুষের ভিটেমাটির স্পর্শ নিতে মত্ত গ্রামে এসেছিলেন। সাথে ছিলেন পাশের বাড়ির চিরকুমার মাস্টার মশাই।


অমর্ত্য সেন সেদিন ঘুরে ঘুরে হেঁটেছেন যেখানে তার স্মৃতিতে ছিল তার বসতবাড়ি, পূজামন্ডপ ও স্বপ্নময় উঠোন। তার ডাক নাম ছিল বাবলু। পরম মমতায় হাত বুলিয়েছেন সেখানে বসবাসরত ইদ্রিস আলীর লাগানো লাউয়ের ডগায়। এক সময়ের আলোচিত জজবাড়ি এখন অর্পিত সম্পত্তি। এছাড়াও একই পরিবারে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন ও হীরালাল সেনের সম্পর্ক ছিল পিসাতো দাদু। তাঁর পিসতুতো দাদা রায় বাহাদুর ডঃ দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ের লেখা আত্মজীবনী মূলক বই ‘ঘরের কথা ও যুগ সাহিত্য’ পড়লে তাদের সম্পর্কে বিশদভাবে জানা যাবে। যাইহোক, হীরালাল সেনের পিতা চন্দ্রমোহন সেনের ছোটবোন অর্থাৎ হীরালালের ছোটপিসি রূপলতার সাথে বিয়ে হয় ঈশ্বরচন্দ্র সেনের। ঈশ্বরচন্দ্র সেন ও রূপলতার সন্তান হল দীনেশচন্দ্র সেন।


যাহোক মত্ত গ্রামে কথা হয়েছিল তাদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া ছিন্নমূল মানুষগুলোর সাথে। ড. অমর্ত্য সেনের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া ৭০ বছরের বৃদ্ধ ময়জুদ্দিন জানালেন, অমর্ত্য সেন সর্বশেষ যেদিন মত্ত গ্রামে তাদের বাড়িতে এসেছিলেন সেদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, আপনারা চিন্তা করবেন না যে আমি বাড়িটি ফিরিয়ে নিতে আসিনি, কেবল মাটির গন্ধ নিতে এবং বাবার ভিটা দেখতে এসেছি। ময়জুদ্দিন বলেন, ভিটেমাটিহীন ছিলাম বলেই স্বাধীনের কয়েক বছর আগে এই বাড়িতে একটি ঝুপড়িঘর তুলে বসবাস করে আসছি। প্রতি বছর সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে এখনো থাকতে হচ্ছে। অমর্ত্য সেনের বাড়ি হওয়ায় প্রায় প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ এখানে আসেন। দেখে আবার চলে যায়। এ বাড়িতে থাকতে পেরে আমরাও গর্বিত। সবার কাছে গর্ব করে বলতে পারি আমরা বিশ্বখ্যাত নোবেল জয়ী অমর্ত্য সেনের বাড়িতে থাকি।


মত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও হিরালাল সেন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড আব্দুল জলিল মাস্টার বলেন, আমার জীবন ধন্য যে মত্ত গ্রামের এই পূণ্য ভূমিতে মত্ত উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সুবাদে যৌবনের একটা বড় সময় অতিবাহিত করেছি। যা কিছু সবই অতীত হলেও বর্তমান প্রজন্মকে ইতিহাসের কাছে আসতেই হবে শিক্ষা নিতেই হবে। আমি সকলের প্রতি আহবান করি অমর্ত্য সেন,দিনেশ চন্দ্র সেন ও হিরালাল সেনকে অবশ্যই জানতে হবে।


মানিকগঞ্জ পৌরসভার স্থানীয় ৪ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো: আরশেদ আলী বিশ্বাস জানান, নোবেল জয়ী ড. অমর্ত্য সেনের বাড়ি, পাশের ঐতিহাসিক মঠসহ এই গাঁয়ের আরো প্রাচীন স্থাপনাগুলো আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক। আমাদের অতীত গৌরবের সাক্ষী। এগুলো সংরক্ষণ করা প্রয়োজন আমাদের নিজেদের স্বার্থেই। এর জন্য উদ্যোগী হতে হবে সরকারকেই। অবহেলায় ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস হওয়া শুধু দুঃখজনকই নয়, জাতি হিসেবে আমাদের জন্য চরম অগৌরবজনকও।


বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের জেলা সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, মত্ত গ্রামে সেন পরিবার এর কৃষ্টি,সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের নিদর্শন গ্রামকে দিয়েছে বিশ^মানের দর্শনীয় স্থানের মর্যাদা। এবং কেবল মত্ত গ্রাম নয় মানিকগঞ্জ জেলাম নাগরিক হিসেবে আমাদেরকে করেছে মহিম্মানিত। আমরা তাদের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে নতুন প্রজন্মের মাঝে ইতিহাস ঐতিহ্যের চাষ করে নতুন কিছু আবিস্কার করতে চাই।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.