সাম্প্রতিক পোস্ট

কৃষককে সন্মান ও স্বনির্ভর করি

মানিকগঞ্জ থেকে বিমল চন্দ্র রায়

মাছ-ভাত, দুধ-ভাত ও ডাল-ভাত কথাগুলো প্রতিটি বাঙালির তিনবেলা খাদ্য তালিকার পছন্দের প্রথম দিকের রেসিপি। সকালবেলা ঘি ও আলু ভর্তার সাথে গরম গরম ভাত বা দুপুরের কাঁচা মরিচ ও পেয়াজ সহকারে পান্তা ভাতের খাওয়ার চল আছে গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে। দিনের ভিতর ভাত না খেতে পারলে মনে হবে সারা দিন যেন কিছুই খাওয়াই হয়নি। ছোট বড়, সাদা লাল, গন্ধ ছাড়া বা সুগন্ধি নানান ধরনের চালের ভাত প্রতিদিন প্রতিটি বাড়ির হাড়িতে রান্না হচ্ছে।


বাংলাদেশসহ ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলীয় দেশসমূহের নাগরিকগণ ভাত খেয়ে থাকেন। দেখা যায পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী ভাত খেয়ে থাকেন। এই সকল দেশসমূহের মধ্যে রাজনীতি ও বিভিন্ন নীতিমালা বা বিধিবিধান চাল কেন্দ্রিক বা চালের চাহিদার উপর নির্ভর করে। সাধারণ মানুষের অনেক চাহিদার মধ্যে একটি অন্যতম চাহিদা কমমূল্যে চাল চাই। চালের দাম নির্ভর করে উৎপাদনের উপর উৎপাদনের ওপর। উৎপাদন বেশি হলে দাম কমে যায় আবার উৎপাদন বা ফলন কম হলে দাম বেড়ে যায়। খাদ্য অর্থ্যাৎ চাল নিয়ে প্রতিনিয়ত সরকারের কৃষি, খাদ্য বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ধরনের টেনশন কাজ করে।

মানিকগঞ্জ জেলার সাতটি উপজেলার সকল চকে একযোগে ধান উৎপাদন হয় না; তবে রবি বা অন্যান্য ফসলের সাথে ব্যাপক গ্রীস্ম ও শীতকালিন সবজি চাষ ও উৎপাদিত হয়। সিংগাইর, সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ সদর, ঘিওর, শিবালয়, হরিরামপুর ও দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষি জমিতে বোরো মৌসুমে বোরো ধানের পাশাপাশি অনান্য্য কৃষি ফসল চাষ হয়। মানিকগঞ্জ জেলায় কত টন ধান উৎপাদিত হয় বা কত টন চাহিদা আছে সেই তথ্য আমার জানা নেই। আউশ আমন বোরো কত হেক্টর জমিতে উৎপাদন লক্ষমাত্রা সেই তথ্য জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিকট আছে। তবে মোট কত টন ধান উৎপাদন হলো তার তথ্য নেই। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসূত্রে জানা যায়, চলতি বছর ৪৭ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বোনা ও রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ হাজার হেক্টর। তবে বন্যার কারণে উৎপাদন আশানূরূপ হয়নি। ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা, প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে পেয়াজ, ৪ হাজার হেক্টর জমিতে মরিচ, ৯ হাজার হেক্টরের অধিক জমিতে নানান ধরনের সবজি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে দেখা যায়, মোট চাষযোগ্য জমির প্রায় অর্ধেকের বেশি জমিতে ধান চাষ হয় না।

বিভিন্ন সুত্র থেকে জানা যায়, মানিকগঞ্জ জেলা চাল ঘাটতিকৃত এলাকা। কয়েক বছর ধরে শুনেছি যে, আমাদের দেশ ধান উৎপাদনে সাবলম্বী হয়েছে। করোনা চলমান অবস্থায় মানিকগঞ্জ জেলাসহ অনেক জেলায় বর্ষা /বন্যা হওয়ায় আমনের উৎপাদন অনেক কম হয়েছে। কৃষক পর্যায়ে ধান বিক্রি করে চাল কিনে খাওয়ার প্রবণতায় বর্তমানে চালের দাম নির্ধারণ করে চাল বিক্রেতারা তাই অনেক ক্রেতার কাছে তা সামর্থের বাইরে। প্রতিদিন মানিকগঞ্জ পৌরসভার বিভিন্ন সরকারের কমদামে চাল বিক্রয় স্থানে ভোর থেকে দরিদ্র প্রান্তিক মানুষের দীর্ঘক্ষণ প্রতিক্ষা শেষে ৩০ টাকা কেজি চাল ক্রয় করে বাড়ি ফেরেন। গতকাল খুব ভোরে সকাল ৬টায় বেউথা ব্রীজের দক্ষিণ পাড়ে আন্ধারমানিক এলাকায় ব্যাগ বা বস্তা রেখে লাইন ধরে মানুষের জটলা দেখতে পাই। এটা প্রতিনিয়ত ঘটনা। তাছাড়া প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার সময় দেখতে পাই পোড়রা স্কুল মোড়ে অনেক নাগরিক সরকারি চাল ক্রয় করেন।


এটা এক ধরনের চিত্র। অন্যদিকে গত দুই/আড়াই মাস ধরে সবজির দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে, বিশেষ করে ফুলকপি প্রতিটি ২/৩ টাকা বাধাঁকপি ৪/৫ টাকা বেগুন ৫/৬ টাকা করে হাটে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। মূলা বিক্রি করা যায় না তাই কৃষক জমিতেই রেখে দিয়েছে। জাগির ইউনিয়নের চান্দিরচর গ্রামের যুব কৃষক দম্পতি আব্দুর রহমান ও ইসমতআরা বলেন, ‘আমরা ৫/৬ বিঘা বিভিন্ন ধরনের সবজি করি। দাম না থাকায় এ মৌসুমে আমাদের ২০/২৫ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। এ রকম অভিজ্ঞতা আমাদের আত্মীয়স্বজনসহ প্রতিবেশী প্রায় সকল কৃষকের হয়েছে।’

আমি যখন লেখাটি তৈরি করছিলাম তখন নতুন অনলাইন পত্রিকায় মানিকগঞ্জ প্রতিনিধির পাঠানো একটি নিউজের শিরোনাম ছিলো এরকম: ২ টাকায় কপি বিক্রি কৃষকের, দিনে ৫ হাজার টাকা লাভ পাইকারের। নিউজের ভিতরে বড় ফুল ও বাঁধাকপির পিস ৪ টাকা, বেগুন ৮/১০টাকা, লাউ বড় সাইজের ১৫/২০ টাকা, শিম ১২/১৩ টাকা, মূলা একভ্যান ৪০০ টাকাসহ আরো কিছু কৃষিপণ্যের দাম উল্লেখ করে প্রতিবেদন তৈরি করেছেন।


আশির দশকে বিটিভি বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো এরকম ‘ভাত কম খান আলু খান’। এটি এক ধরনের প্রচার। সেসময় আলুর ফলন বেশি হয়েছে বলে চালের ওপর চাপ কমিয়ে বেশি করে আলু খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতো। তবে বেশি উৎপাদন করেও কৃষকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হলেও মধ্যস্বতভোগী ঠিকই লাভ করেছেন সেই সময়ে। অন্যদিকে আমরা প্রায়ই শুনি যে, বেশি উৎপাদন করতে হবে কারণ সকল মানুষের খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক লাভের আশায় কৃষি ফসল উৎপাদন করেন, খাদ্যের যোগান দিয়ে থাকেন তাই কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম দিতে হবে। কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম দিতে হলে মৌসুমভিত্তিক তাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বেশি বেশি খেতে হবে এবং মধ্যস্বতভোগীরা যাতে কৃষকদের প্রতারণা করতে না পারে সেজন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে কৃষকের কৃষিপণ্য বেশি করে ক্রয় করার। তবেই কৃষিপণ্যের দাম সবসময় স্বাভাবিক থাকবে। পাশাপাশি ভাতের উপর চাপ কমবে। চালের জন্য সরকার বা বাড়ির কর্তাকে বাড়তি চাপ বা টেনশন করতে হবে না। চাল থেকে তো আমরা শুধু শর্করা পাই। আর সবজি থেকে ভিটামিনসহ সকল খাদ্য প্রাণ পাওয়া যায়। নিরোগ থাকার সুযোগ আছে। আপনার খাদ্য অভ্যাস দিতে পারে সুস্থতা ও কৃষকের নিরাপত্তা। মাঝে মাঝে বেশি বেশি সবজি খাই। সুস্থ থাকি। বাংলার কৃষি ও কৃষককে সন্মান ও স্বনির্ভর করি।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: