সাম্প্রতিক পোস্ট

মাছ ধরায় স্থানীয় উপকরণের ব্যবহার

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়

আমাদের নেত্রকোণা অঞ্চলটি অসংখ্য হাওড় আর নদ-নদী দিয়ে বেষ্টিত। জানা যায়, বহু বছর আগে নেত্রকোণা জেলায় প্রায় ৫৭টি ছোট বড় নদী ও হাওড় ছিল। এসকল নদীর উপর দিয়ে একসময় বড় বড় জাহাজ চলাচল করতো। কিন্তু বর্তমানে আমাদের নদীগুলো নাব্যতা হারিয়ে মৃতপ্রায়।


নদী একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে। তাই নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে উঠে বসতি। এর কারণ হলো নদী ও এর তীরবর্তী চর এলাকার সর্বোচ্চ ব্যবহার। নদীর তীরে বসবাস করা জনগোষ্ঠী নদীর পানি ও এর বিভিন্ন সম্পদ ব্যবহার করে উপকৃত হয়। নদীর পানি যেমন অনেক কাজে ব্যবহার করা যায় তেমন নদীতে বিচরণ করা মৎস্য সম্পদ আহরণ করে অনেক পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে। আমাদের এলাকার মৎস্যজীবীরা নদীর মাছের উপর নির্ভরশীল। শুধু তাঁরাই নয়, নদীর পাড়ে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর সকল পরিবারের মাছের চাহিদা পূরণ হয় নদী থেকে।

লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়নের উপর দিয়ে মগড়া, সাইডুলি ও জিডাই নদী বয়ে চলেছে। এই নদীর তীরের বিভিন্ন গ্রামে অনেক মানুষের বসতি গড়ে উঠেছে। তাঁরা নদীর চরে শস্য ফসলের আবাদ করেন এবং নদীতে মাছ ধরে মাছের চাহিদা পূরণ করেন। গ্রামগুলোর অধিকাংশ পরিবারের নিজস্ব কোনো পুকুর নেই। তাই মাছ ধরার জন্য নদীই তাঁদের একমাত্র ভরসা। আতকাপাড়া, রামপুর, বাইশদার, তিয়শ্রি, জয়শিদ ইত্যাদি গ্রামের মানুষেরা মাছের জন্য নদীর উপর নির্ভরশীল।


এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠী তাঁদের নিজস্ব পদ্ধতি ও চর্চার মাধ্যমে নদী থেকে মাছ ধরেন। তাছাড়াও মাছ ধরার স্থানীয় অনেক উপকরণ আছে। যেমন বাইর, জাল, পলো ইত্যাদি। বর্তমান সময়ে ফরগা/পরগা নামক আরো একটি উপকরণ যুক্ত হয়েছে। এটি বাঁশের তৈরি, ত্রিকোণাকার। তবে আকৃতি অনেক বড়।


নদীতে যখন বেশি পানি থাকে তখন ফরগাটি নদীর কোল ঘেঁষে বা একটু গভীরে পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হয়। এটি যেহেতু হালকা ওজনের তাই পানিতে ভেসে উঠে। যে কারণে এর ভেতর গাছের ডালপালা রাখতে হয়। এতে করে দুইটি কাজ এক সাথে হয়। একদিকে ফরগাটি পানিতে ডুবে থাকে অন্যদিকে লতাপাতার ভেতরে গিয়ে মাছেরা আশ্রয় নেয়।
এইভাবে একদিন একরাত ফরগা নদীতে রেখে দিতে হয়। কয়েকজন মিলে এটি ডাঙায় তুলে আনে। কারণ একদিকে এটি অনেক বড় আবার ডালপালা রাখার কারণে ওজনে ভারী হয়ে যায়। গাছের ডাল সরানোর পর এর নিচে বিভিন্ন ধরণের মাছ পাওয়া যায়। এসব মাছের মধ্যে ছোট মাছই বেশি। কারণ ছোট ছোট মাছেরা ছায়াযুক্ত জায়গাতেই বেশি থাকে। ছোট মাছের মধ্যে ট্যাংরা, গুলসা, পুঁটি, মাগুর, শিং, চেলা, চিংড়ি ইত্যাদি থাকে। তবে বড় আকারের মাছ খুব কম পাওয়া যায়। এই মাছ সংগ্রহ করে গ্রামের জনগোষ্ঠী নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রিও করতে পারেন।

নদী তীরবর্তী গ্রামগুলোর মধ্যে অধিকাংশ পরিবারেই ফরগা আছে। নদীতে যখন পানি বেশি থাকে তখন ফরগা দিয়ে মাছ ধরতে হয়। কারণ এটির সাহায্যে মাছ ধরতে হলে এটি পানিতে ডুবিয়ে রাখতে হয়। বিশেষ করে বর্ষাকাল থেকে আরম্ভ করে শীতের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ফরগার সাহায্যে মাছ ধরেন। শীত মৌসুমে এই এলাকার নদীর পানি শুকিয়ে যায়। তাই এই সময়ে ফরগার সাহায্যে মাছ ধরা যায় না।

নিজস্ব উপকরণ ব্যবহার করে স্থানীয় জনগোষ্ঠী প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভর করে জীবনজীবিকা নির্বাহ করছেন। তেমনি তাঁদের বাজার নির্ভরশীলতা কমিয়ে আমিষের চাহিদা পূরণ করতে পারছেন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: