Posted in

গ্রামের যার যে জিনিস প্রয়োজন হয়, আমার বাড়ি থেইক্যা নিয়া যায়

নেত্রকোনা থেকে হেপী রায়
‘কৃষি’ শব্দটি শুনলে স্বভাবতই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে দিগন্তজোড়া ধানফসলের মাঠ। যেখানে অবারিত সবুজ শীষ, সোনালী ধান বাতাসে দোল খায়। কিন্তু বাড়ির আঙিনার নিকোণো উঠান, উঠানের পাশে মাচায় লিক্লিক্ করে বেড়ে উঠা পুঁই, শিম আর সবুজ-কচি লাউয়ের ডগার ছবিটিও যে কৃষির আরেক রূপ সেটি আমরা ভুলে যাই। আমাদের গ্রামীণ পরিবেশে গড়ে উঠা বাড়িগুলোতে ঢুকলেই চোখে পড়ে আঙিনায় কয়েকটি মাচা, ঘরের কোণে বারোমাসী বেগুন ও মরিচের গাছ। আরো আছে বাড়ির সামনে পুকুর, সেই পুকুর পাড়ে নানান ধরণের ফলজ গাছ। লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়নের গদাইকান্দি গ্রামের কৃষক সাইদুল ইসলামের বাড়িটিও এর ব্যতিক্রম নয়।

গদাইকান্দি গ্রামটি মগড়া নদীর পাড়ে অবস্থিত। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই নদীর উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। নদী থেকে মাছ ধরা, নদীর পানি দিয়ে সেচ কাজ, গোসল করা, নদীর পাড়ে সব্জী চাষ, বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি কাজে নদীর ব্যবহার হয়ে থাকে। সাইদুল ইসলামের বাড়িটিও নদীর পাড়ে অবস্থিত। তাই এই প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযোগ্য ব্যবহার করে তিনি তাঁর প্রয়োজন মিটিয়ে থাকেন।

সাইদুল ইসলামের বসত ভিটার পরিমাণ ২ কাঠা (২০শতাংশ)। এর আশে পাশে মাচা তুলে এখানে তিনি বিভিন্ন সব্জী চাষ করে থাকেন। দেশিলাউ, শিম, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, পুঁইশাক, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা ইত্যাদি। এছাড়া নদীর চরে প্রায় ৯.৫ কাঠা জমিতে শশা, বেগুন, টমেটো, আলু, মরিচ, ধনিয়া, সরিষা, গুয়ামুড়ি ইত্যাদি চাষ করেন। ১২ জন সদস্য নিয়ে তাঁর যৌথ পরিবার। এসমস্ত সব্জী ও মসলা দিয়ে তাঁদের সারাবছরের খাওয়া চলে।

তাঁর বাড়িতে বর্তমানে ৮টি গরু, ১০টি ছাগল, ১৩টি রাজহাঁস, ৪০টি মুরগি (ছোটও বড় মিলিয়ে) ও ২২টি পাতিহাঁস আছে। হাঁস ও মুরগীর ডিম মাঝে মধ্যে বাজারে বিক্রি করেন। এছাড়া নিজেরাও খেয়ে থাকেন। প্রাণিসম্পদ বিক্রি করে বছরে আনুমানিক ৮০ হাজার থেকে এক লাখ পর্যন্ত আয় করেন।

বর্ষাকালে নদী থেকে ‘জাইট’ (স্থানীয় পদ্ধতি) নদীর কূল ঘেঁষে খুঁটি পুঁতে দিয়ে এর সাথে সেওড়া গাছের ডাল বেঁধে রাখা হয়। এই ঝোঁপের নিচে ছোট ছোট মাছ এসে জমা হলে তখন জালের সাহায্যে সেই মাছ ধরা হয়ে থাকে) পদ্ধতিতে মাছ সংগ্রহ করেন। ভালো কোনো মাছ পেলে পুকুরে ছেড়ে দেন। এছাড়া নদীর পানি যখন শুকিয়ে যায় তখন কুঁচ (মাছ ধরার স্থানীয় উপকরণ) দিয়ে বিভিন্ন মাছ যেমন, উহল (টাকি), পুঁটি, চিকরা, গুজি, শিং, মাগুর ইত্যাদি মাছ ধরেন। এছাড়া ১৫শতাংশ পরিমান পুকুরে বিভিন্ন ধরণের স্থানীয় মাছ যেমন কৈ, শিং, মাগুর, পুঁটি, স্বরপুটি, কালবাউশ, চিংড়ি, গুতুম, টেংরা, চিকরা, মৃগেল, রুই, কাতলা, মলা, চান্দা ইত্যাদি আছে। যা দিয়ে সারা বছর পরিবারের চাহিদা পূরণ হয়।

সব ধরণের স্থানীয় জাতের ফলজ গাছ যেমন আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, বেল, জাম্বুরা, আমড়া, নারিকেল, আতাফল, ডালিম, বড়ই, পেয়ারা, লেবু, কলা, অড়বড়ই, চালতা, বুবি, গোলাপজাম, গাব, কামরাঙ্গা ইত্যাদি। ফল কখনো বিক্রি করেনা। নিজেরা খায় আবার প্রতিবেশিদের মাঝেও বিতরণ করেন। এবছর তিনি পুকুর পাড়ে বাঙ্গি চাষ করেছেন। বিগত একমাসে প্রায় ৫০টি’র মতো বাঙ্গি সংগ্রহ করেছেন। নিজেরা খেয়েছেন এবং আত্মীয়দের মাঝে বিতরণ করেছেন। বাড়িতে উৎপাদিত সব্জী ও ফল তিনি কখনো বাজারে নিয়ে বিক্রি করেন না।

তিনি বলেন, ‘আমি বাড়িতে যা মাড়াই(চাষ করি) কোনো সময় বাজারে নিয়া যাইনা। গ্রামের যার যে জিনিস প্রয়োজন হয়, আমার বাড়ি থেইক্যা নিয়া যায়। আমি তাদের কাছ থেইক্যা টাকা নেই না। আমার আছে বেশি, অন্যজনের কম। আমার কাছ থেইক্যা নিয়া যদি একজনের প্রয়োজন মিটে, আমি তাতেই খুশি। গ্রামের ছোট ছোট পোলাপানেরা সারাক্ষণ আমার বাগানের ফল গাছের নিচে ঘুইরা বেড়ায়। আল্লাহর রহমতে ফল খাইয়া তাদের পেট ভরে।’

চলতি বর্ষা মৌসুমে তিনি তাঁর বাড়িতে ৪০টি লেবু, ৭০টি সুপারি, ২০টি নারিকেল, ২৫টি মেহগনি, ৪টি কমলা, ৩টি আপেল ও ৩টি মাল্টা গাছের চারা রোপণ করেছেন। সব্জী চাষের ক্ষেত্রে তিনি গোবর সার ব্যবহার করেন। আবার ধান রোপণের আগে ধানের জমিতেও বেশিরভাগ গোবর ব্যবহার করেন।

ধান চাষ করার মতো জমি আছে প্রায় ৭৫ কাঠা। এই জমিতে বিআর ৪৯, ৩৪, পিঁপড়ার চোখ, কালিজিরা ধান চাষ করেন। সারাবছরের খাবারের পরিমাণ রেখে বাকি ধান বিক্রি করে দেন। সব্জীক্ষেত, পুকুরপাড় ও বসতভিটার পতিত জায়গা থেকে বিভিন্ন অচাষকৃত উদ্ভিদ যেমন কলমীশাক, হেলেঞ্চা, পালই, কচুশাক, খুইরা, বউত্তা, এংচি সোনাবন) ইত্যাদি সংগ্রহ করে খেয়ে থাকেন।

এই ব্যাপক পরিমাণ কৃষিকাজে সাইদুল ইসলামকে সহযোগিতা করেন তাঁর প্রবীণ মা। যিনি দিনের প্রায় অধিকাংশ সময় সব্জী, ফল ইত্যাদির পরিচর্যা করেন। এছাড়া তাঁকে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েও সহযোগিতা করেন। পারিবারিক কৃষির অন্যতম উদাহরণ হচ্ছেন কৃষক সাইদুল ইসলাম। গদাইকান্দি গ্রামের একজন আদর্শ কৃষক তিনি। যিনি তাঁর পরিবারের সকল প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান নিজের বাড়ি থেকে সংগ্রহ করেন। বাজারের উপর তিনি কখনোই নির্ভরশীল নন। তাঁর চাষকৃত সকল ধরণের বীজ তিনি সংরক্ষণ করেন। নিজে রোপণ করার পাশাপাশি গ্রামের অনেক কৃষকের মাঝে এসকল বীজ বিতরণ করেন। তাঁর কার্যক্রম দেখে এই গ্রামের অনেকই উৎসাহিত হয়ে বসত ভিটায় সব্জী চাষ, ফলজ বৃক্ষরোপণ ইত্যাদি শুরু করেছন।

একদিকে প্রবাহমান নদীর পানি অন্যদিকে স্থিতিশীল নদীর চর, এই গ্রামের মানুষকে করে তুলেছে আত্মনির্ভরশীল। প্রকৃতির উদারতায়, প্রাকৃতিক সম্পদের উন্মুক্ত ব্যবহারে খেয়েপড়ে বেঁচে আছে সরল সাধারণ গ্রামের মানুষগুলো।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.