সাম্প্রতিক পোস্ট

গ্রীষ্মকালীন টমেটোর পাশাপাশি অন্যান্য ফসল চাষে সফল মাহমুদুল

নেত্রকোনা থেকে খাদিজা আক্তার লিটা
নেত্রকোনা জেলার আমতলা ইউনিয়নে বিশ্বনাথপুর গ্রামের মাহমুদুল হাছান দ্বিতীয়বারের মতো গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ করে সফলতা পেলেন। গতবছর উদ্যোগী যুব মাহমুদুল হাছান প্রথমবারের মতো গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষের সফলতা সবার নজর কাড়ে। রাস্তার পাশে ছবির মতো গুছানো টমেটো গাছগুলো অনেক কৃষকের টমেটো চাষে আগ্রহ সৃষ্টি করে। পথ চলতে চলতে অনেক পথিকের পা থেমে গেছে এক নজর ক্ষেতটি দেখার জন্য। টমেটো ক্ষেত না বলে আমরা এটিকে একটি টমেটোর গুছানো বাগান বলতে পারি, যে বাগানের মালিককে দেখতে এসে, টমেটো চাষের পদ্ধতি জানতে এসে চোখ ছানা ভরা অনেক লোকের। দুর্ঘটনায় এক হাত হারানো যুবক নিজের এক হাতের উপর নির্ভর করে কঠোর পরিশ্রম করে এ বাগানটি করেছেন নেত্রকোনা জেলার আমতলা ইউনিয়নের বিশ্বনাথপুর গ্রামের যুবক মাহমুদুল হাছান।


বিশ্বনাথপুর গ্রামের কৃষকদের নানা রকম উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহায়ক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে বারসিক। মাহমুদুলের পরিবেশবান্ধব নানামূখী উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন ও প্রচারণায় বারসিক সহায়তা করে আসছে। এর ধারাবাহিকতায় গতবছর মাহমুদুলের টমেটো চাষের উপর একটি ফিচার তৈরি করা হয়। এতে করে অনেক কৃষক টমেটো চাষে আরও আগ্রহী হয়ে উঠেন।

একজন উদ্যোগী যুব
ছেলেবেলা থেকে সকল বিষয়ে আগ্রহ ছিল মাহমুদুলের। যখন কোন কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয় তার শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে। অদম্য ইচ্ছাশক্তি তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠে সামনে যাওয়ার পথ তৈরি করে দেয়।

টমেটো চাষের সফলতা
চলতি বছরে ১০ শতাংশ জমিতে টমেটো চাষ করে প্রায় ৭০ হাজার টাকা বিক্রয় করেছেন মাহমুদুল। গত বছর টমেটো চারা কিনতে হয়েছে অন্য ইউনিয়রের কৃষকদের কাছ থেকে। এতে করে যেমন উৎপাদন খরচ বেড়েছে সেই সাথে দূর থেকে আনায় অনেক চারা নষ্ট হয়েছে। যা দেখে মাহমুদুল সিদ্ধান্ত নেয় চারা তৈরি করারা। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কৃষকদের কাজ থেকে তথ্য নেন তিনি। জানতে পারেন কিভাবে চারা তৈরি করা যায়।

চাষ পদ্ধতি ও উৎপাদন খরচ
গাজীপুর কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর ২০ গ্রাম বীজ কিনেন। এছাড়া গ্রামের আশপাশ থেকে সংগ্রহ করেন জঙ্গলী বেগুন নামে পরিচিত ফলের বীজ। জঙ্গলী বেগুন মূলত রাস্তার পাশে ঝোপঝাড়ে হয়ে থাকে। গ্রীষ্মকালীন টমেটোর চারা করার জন্য জঙ্গলী বেগুনোর বীজ শুকিয়ে চারা করে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে বা দুইটি জাতকে থেকে একটি জাত তৈরি করতে হয়। এভাবে চারা করার কারণ সম্পর্কে মাহমুদুল বলেন, ‘জঙ্গলী বেগুন পানি সহনশীল একটি গাছ। দীর্ঘ বর্ষায় এ গাছে পচন ধরেনা। গ্রীষ্মকালীন টমেটো গাছে পচন রোগ আক্রমণ করে। গ্রাফটিং চারা জলাবদ্ধতা সহনশীর একটি জাতে পরিণত হয়। আয়ুকাল বেশি। ফলনও বেশি।’ গ্রাফটিং পদ্ধতিতে চারা প্রস্তুত করার পর ৬ থেকে ৭দিন চারা মুক্ত স্থানে রাখতে হবে। জ্যৈষ্ঠের শুরুতে বীজতলা তৈরি করা হয়। বীজতলা থেকে চারা গজানো পর্যন্ত ৪৫ দিন সময় লাগে।

বেড তৈরি
গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষের একটি উল্লেখ্যযোগ্য কাজ হচ্ছে বেড ও ছাউনি তৈরি। পলিথিন ও বাঁশ দিয়ে ছাউনী তৈরি করতে হয়। ছাউনি তৈরিতে মাহমুদুলের খরচ প্রায় আট হাজার টাকার। মাটি শোধন করে জমি বেড তৈরি করে নিতে হয়। মাহমুদুল ১০ শতাংশ জমিতে এমনভাবে বেড তৈরি করেন যাতে করে গাছ বড় হওয়ার পর এক গাছ অন্য গাছের সাথে লেগে না থাকে। সারি থেকে সারির দুরত্ব রাখে প্রায় দেড় ফুট। এতে করে গাছে আলো বাতাসের পাশাপাশি এক গাছের ডাল পাতা অন্য গাছে লেগে থাকে না। চারা রোপণের পর মাচা এমনভাবে দিতে হবে যাতে করে বৃষ্টি পানি গাছের বা ফলের উপর না পড়ে। কারণ বৃষ্টি পানি ছিটা টমেটোর উপর পড়লে টমেটো ফেটে যায়। এতে করে ফল বড় হওয়া ও বিক্রয়ে সমস্যা তৈরি করে। মাহমুদুল জ্যৈষ্ঠের শুতে চারা রোপণ করে ভাদ্র মাসে বিক্রয় শুরু করেন।

বৈচিত্র্যময় সবজি চাষ
টমেটো চাষ করেই থেমে থাকেনি মাহমুদুল। চলতি বছরে শসা, করলা, মরিচ, ডাটা পুঁইশাক চাষ করেছেন, যা পরিবারের চাহিদা পূরণ করে ২৫ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করেছেন।

অনাবাদী জমি চাষের আওতায় আনা
মাহমুদুলের চাষের জমি কম থাকায় কম খরচে গ্রামের একজন কৃষকের ১০ কাঠা অনাবাদী জমি বন্ধক নিয়ে সারাবছর কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। তিনি কঠোর পরিশ্রম করে মাটি কেটে জমির চারপাশে নালা তৈরি করেন। যাতে করে জমিতে বেড তৈরির পর পানি জমে না থাকে। এক কাজে তাকে তার ছোট ভাইয়েরা সহায়তা করেন। এ বছর বর্ষা মৌসুমে লাউ ও পুঁইশাক চাষ করেন, যা দিয়ে পরিবারের ও প্রতিবেশিদের মাঝে পুঁইশাক, লাউ ও শাক বিতরণ করেও প্রায় ২০ হাজার টাকার বিক্রি করেছেন।

বীজ সংগ্রহকারী
সবজি চাষ করে থেমে থাকেনি মাহমুদুল। স্থানীয় জাতের সবজি ও ফলজ গাছে বীজ রেখে উদপাদন খরচ কমানো নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। চলতি বছর বাড়িতে পেঁপে ও টমেটো বীজ সংগ্রহের কাজ শুরু করেছেন। এ সম্পর্কে মামহুদুল বলেন, ‘গ্রীষ্ম্কালীন টমেটোর বীজ কিনতে আমাকে ঢাকার গাজীপুর পর্যন্ত যেতে হয়েছে। বীজের দামের চেয়ে আমার যাতায়াত খরচ বেশি লেগেছে। তাই আমি এ বছর টমেটো বীজ সংগ্রহ করে আগামী মৌসুমে চাষ করার পরিকল্পনা করছি।’ তিনি জানান, পেঁপের বীজ বাজার থেকে কিনলে অনেক দাম লাগে সেই সাথে বীজ সব সময় ভালো থাকে না। যে বীজগুলো এলাকার কৃষকরা কম রাখে চলতি বছর থেকে সে ধরনের বীজ সংগ্রহ করে নিজের ও গ্রামের চাহিদা পূরণে কাজ শুরু করেছেন।

জৈবকৃষি চর্চাকারী
মাহমুদুল সারাবছর বাড়িতে চার থেকে ৫টি গরু পালন করে। গরু গোবর একসময় মাটিতে রেখে জৈব সার তৈরি করেন। গতবছর বারসিক’র সহায়তায় ভার্মি কম্পোস্ট হাউজ তৈরি করে সার উৎপাদন করে সবজি ক্ষেতে ব্যবহার করছেন। নিজের সবজি ক্ষেতে প্রয়োগ করে ভালো ফলাফল পাওয়ায় এ কাজে আগ্রহ বেড়েছে তাঁর। চলতি বছর থেকে বাণিজ্যিকভাবে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি করার কাজ শুরু করেছেন যে কাজে তাকে সার্বিকভাবে সহায়তা করছে বারসিক।

উপসংহার
কঠোর পরিশ্রমী মাহমুদুল ছেলেবেলায় রাইস মিলে চাল ভাঙ্গাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় এক হাত হারালে হারাননি আত্মবিশ্বাস। এক হাত দিয়ে ধরেছেন কলম, ধরেছে লাঙ্গল, ধরেছে কুদাল। বর্তমানে অনার্স পড়লেও সরে যায়নি কৃষিকাজ থেকে। রাত জেগে পড়া শিখে সকাল হলে ছুটে যান সবজি ক্ষেতে। বর্তমানে কাজ করছেন নিজের পরিবারের পাশাপাশি নিজের গ্রামকে একটি সুন্দর নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনকারী, পরিবেশবান্ধব গ্রাম হিসেবে পরিচিত করার জন্য। মাহমুদুল মতো স্বপ্নজয়ী যুবক যখন তাঁর স্বপ্নের লক্ষ্যে এগিয়ে যান, আমাদের মতো দেশে অনেক পিছিয়ে পড়া যুবকের মনে নতুন করে স্বপ্ন দেখার আলোগুলো জেগে উঠে। এর জন্য চায় একটু সহায়তা, একটু প্রচারণা, যার মাধ্যমে তৈরি হবে স্বনির্ভর বাংলাদেশ।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: