Posted in

জৈব কৃষি চর্চা করি-সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলি

নেত্রকোনা থেকে পার্বতী রানী সিংহ
আধুনিকতায় গতি এনেছে মানুষের জীবনে। কলকারখানা বেড়েছে, যন্ত্র বেড়েছে, শিল্প বেড়েছে, বেড়েছে কোম্পানি, বাড়ছে এক দেশ থেকে অন্য দেশকে জানার ইচ্ছা, বাড়ছে মানুষ, বাড়ছে চাহিদা। মানুষের এই চাহিদা পূরণে বাণিজ্যিকিকরণ চিন্তাধারা আমাদের ভেতরে প্রবেশ করেছে। যতই আমরা প্রকৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছি আমাদের জ্ঞান অর্জনের উৎস ছোট হতে হতে নোটপেডে এসে পৌছেঁছে। এ থেকে বাদ যায়নি আমাদের কৃষিও।
সবুজ বিল্পব আন্দেলনের ধারাবাহিকতায় গ্রামগুলো হারাচ্ছিল তার নিজস্বতা, নিজেরদের র্চচা, জ্ঞান,অভিজ্ঞতা,সম্পদকে। তরঙ্গ ¯্রােতে আধুনিকতার গতিতে চাহিদা পূরণে অধিক উৎপাদন করে বাজারজাত করে দারিদ্রতা ঘোচানোর প্রচেষ্টা। চকচকে দু’টাকার শ্যাম্পু থেকে শুরু করে খাবার পানির বোতল পর্যন্ত প্যাকেটে বন্দি- ভিক্ষুক থেকে শুরু করে আমরা সবাই।


আধুনিক কৃষির আগমনে গোবর সার, ছাই নামের পরিবর্তন ও ব্যবহারের ধরন পাল্টে নতুন করে জৈবসার, বালাই হয়েছে। এসেছে তরল সার, সবুজ সার, গর্ত কম্পোস্ট, কুইক কম্পোস্ট নামের তকমা। চাহিদার পরিমাণ বাড়তে থাকায় ফলন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ফলন বাড়ানোর প্রয়াসে আস্তে আস্তে প্রকৃতিকে ভালো রাখার চিন্তা হারিয়ে যায়।
তথাকথিত উন্নয়নে ঘর বাড়ি ,কলকারখানা, ইজ্ঞিন চালিত কৃষি যন্ত্রপাতি বাড়তে থাকায় কমতে থাকে আবাদী জমি, চারণ ভূমি ,কাঠের কৃষি উপকরণ, প্রাণীসম্পদ আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ। জমিতে বেশি ফলন পেতে গেলে যে পরিমাণ গোবর সার প্রয়োজন তা সব কৃষকের নেই। যার ফল¯্রুতিতে সহজ প্রাপ্য বাজারের সার বিষের দিকে ঝুঁকছে আমাদের কৃষকরা। গ্রামগুলো যখন হারাচ্ছিল তার নিজস্বতা। নিজেরদের চর্চা, নিজেদের বীজ, নিজেদের মাটি সুরক্ষা কালের বিবর্তনে আধুনিকতার ¯্রােতে হারিয়ে যাচ্ছিল।


কৃষির এত সহজপ্রাপ্যতাকে সামনে রেখে রাজেন্দ্রপুর গ্রামের কৃষকরা বিশ^াস করে মাটিকে ভালো রাখার। মাটির জৈব উপাদান ঠিক রাখার। অধিক ফলনের আশায় অন্য কিছু ব্যবহার করলেও তারা বিশ^াস করে মাটিকে ভালো রাখে, উর্বর করে গোবর সার। কিন্তু কৃষকের ঘরে যে পরিমাণ গোবর সার থাকে তা দিয়ে নিজেদের চাহিদা মেটানো অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। তারা তাদের চর্চাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তারা নিজেদের সংরক্ষিত গোবর নষ্ট না করে এটাকে আরো উন্নত করে ব্যবহার করার চেষ্টা। রাজেন্দ্রপুর গ্রামের বেশির ভাগ কৃষক-কৃষাণীদের ধান চাষের পাশাপাশি অন্যান্য ফসল চাষাবাদ র্পাশ^বর্তী অন্যান্য গ্রামের চেয়ে বেশি। অন্যান্য ফসল চাষাবাদের করার কারণে গোবর সারের কম বেশি ব্যবহার ছিল। তারাও সময়ের সাথে সাথে গর্ত কম্পোষ্ট, সবুজ সার ব্যবহার করেছে। তাদের এই চেষ্ঠার সাথে যোগ হয় বারসিক’র উদ্দেশ্য।


২০০৯ সালে বারসিক’র সাথে পরিচয় হয়। বারসিকের সহায়তায় জৈবকৃষি র্চচাকারী গোলাম মোস্তফার বাড়িতে অভিজ্ঞতা বিনিময় সফরে যায়। সেখানে তারা ভার্মি কম্পোস্ট তৈরি সম্পর্কে জানতে পারে এবং আগ্রহ প্রকাশ করে ভার্মি কম্পোষ্ট তৈরি করার। পরর্বতীতে বারসিক’র সহায়তায় ৫টি হাউজ তৈরির উপকরণ এবং কেঁচো দিয়ে সহায়তা করে প্রাথমিক পর্যায়ে ভার্মি কম্পোষ্ট চর্চা। প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রামের ৩ জন কৃষক ভার্মি কম্পোষ্ট র্চচা শুরু করে। বর্তমানে নিজের গ্রামেই ৩০টিরও বেশিপরিবার ভার্মি কম্পোষ্ট উৎপাদন ও ব্যহারের সাথে যুক্ত। নিজেদের চর্চা সম্প্রসারণে অন্যদেরকেও উৎসাহিত করে যাচ্ছেন। তাদের এই কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে অন্যান্য এলাকার যেমন (ময়বাগড়া, রায় বাগড়া, সনুরা, পচাশিঁপাড়া, দড়িজাগি, বানিয়াজান, মাটিকাটা, দূর্গাশ্রম, কৃষ্ণপুর, আইমা, হাসামপুর) গুলোতে ভার্মি কম্পোষ্ট চর্চা শুরু করছে কৃষক-কৃষাণীরা। কম্পোষ্টসার তৈরির উদ্যোগে উৎসাহিত হয়ে নিজ এলাকার বাইরে প্রায় ৫০ জন কৃষক-কৃষাণীকে কেঁচো দিয়ে সহায়তা করেছন যারা কম্পোষ্ট সার তৈরির চর্চা শুরু করেছে।
কম্পোস্ট সার ও সবজি উৎপাদনকে কেন্দ্র করে যুক্ততা তৈরি হয় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ কৃষি বিদ্যালয়সহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, আইএফএম সি প্রকল্প, কুমিলা র্বাড, ময়মনসিংহ, শেরপুর, ঈশ^রদী, জামালপুর আনুমানিক প্রায় ১০টি উপজেলার কৃষক-কৃষানীদের সাথে। কম্পোষ্ট তৈরি ও ব্যবহারের মাধ্যম দক্ষতা অর্জন করে কয়েকজন কৃষক-কৃষাণী যারা সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে নিজের জেলার গ্রামে গ্রামে সচেতনতামূলক আলোচনা, প্রশিক্ষণে আলোচক ও প্রশিক্ষক হিসাবে অংশগ্রহণ করেন। বর্তমান সময় পর্যন্ত ২৫টি গ্রামে আলোচক ও প্রশিক্ষক হিসাবে অংশগ্রহণ করেছে।


বর্তমান সময় পর্যন্ত ৫০ টন কেঁচো সার ও ১০০ কেজি কেঁচো বিক্রি করেছে। তাদের কেঁচো সার ব্যবহার হচ্ছে সবজি চাষে, মৎস্য চাষে, নার্সারিতে, ফলের বাগানে। ছোট কিংবা বড় হাউজ বা চাড়ি বা রিং এ কম্পোষ্ট চর্চাকারীদের প্রতিবছরে এ থেকে প্রায় ২০ হাজার থেকে একলক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারে। এ গ্রামের অনেক কৃষক বাড়তি আয় হিসাবেও এই চর্চা করে যাচ্ছেন।
আগ্রহী কৃষক-কৃষানীদের কারিগরি সহায়তাসহ বিনামূল্যে কেঁচো দিয়ে, গ্রাম সভা, প্রশিক্ষণের আয়োজন করে সবুজ পৃথিবী গড়ে তোলার অন্দোলনকে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর রাজেন্দ্রপুরের জৈব কৃষি চর্চাকারী কৃষক-কৃষাণীরা।
কৃষকের জীবনধারণ যেখানে কোম্পানিনির্ভর সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে স্বপ্ন দেখে রাজেন্দ্রপুরের কৃষক-কৃষাণীরা মাটিকে ভালোা রাখার, কৃষক কৃষক আন্তঃনির্ভরশীলতার,পরষ্পর-পরষ্পরকে সহযোগিতার, জ্ঞান- অভিজ্ঞতা ও পরস্পর বিনিময় প্রথার, লোকায়ত জ্ঞান-অভিজ্ঞতার, পরিবেশবান্ধব চর্চা এবং জননিয়ন্ত্রিত উদ্যোগের ভেতর দিয়ে সর্বজনীন সামাজিক, প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৃষিপ্রাণবৈচিত্র্যে গ্রামীণ নারী পুরুষের অধিকার নিশ্চিত করার।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.