সাম্প্রতিক পোস্ট

মাটিসহ প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের সুস্বাস্থ্য চান বাঘড়া হাওর কৃষক সংগঠনের সদস্যরা

নেত্রকোনা থেকে সুয়েল রানা

কৃষির উপর নির্ভরশীল আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষের জীবন ও জীবিকা। তাই প্রতিনিয়ত আবহাওয়ার পরিবর্তনের সাথে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে পুঁজি করে টিকে থাকার চেষ্টায় প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন কৃষকরা। সঙ্গত কারণেই মাটি, পানি, বাতাস ভালো থাকলে আমাদের কৃষক বাঁচবে আর কৃষক বাঁচলে আমরা বাঁচবে। তবে বর্তমান সময়টা খুবই প্রতিযোগিতামূলক। সবকিছুতেই মানুষ বাণিজ্য করতে চান। পরস্পারিক সম্পর্ক থেকে শুরু করে বিনিময় ও আদান-প্রদানের ভেতরেও আজ বাণিজ্য স্থান করে নিচ্ছে। মোদ্দা কথা, বাণিজ্যের বৃত্তে আবদ্ধ হচ্ছে মানুষের জীবনের সাথে সর্ম্পকিত সব বিষয়গুলো। কৃষিও এতে বাদ যায়নি!
মানুষের এই বাণিজ্য প্রিয়তার কারণে আজ প্রকৃতিতে পড়েছে নেতিবাচক প্রভাব। প্রকৃতির সবকিছুকেই মানুষ এখন আর্থিক মূল্য দিয়ে বিবেচনা করছে। তাই তো মানুষ দেদারসে প্রকৃতির গাছ থেকে শুরু করে প্রাণী পর্যন্ত হত্যা করছে নিজ স্বার্থ হাসিল করা কিংবা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য!

তবে এক কিছুর মাঝেও আমাদের দেশে এখনও কিছু মানুষ রয়েছেন যারা সবকিছুকে আর্থিক মূল্য দিয়ে বিবেচনা করেন না। নানান প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে এসব মানুষেরা প্রকৃতিসহ মানুষের ভালো থাকাকে নিশ্চিত করতে চান। দূর্গাশ্রমের বাঘড়া হাওর কৃষক সংগঠনের সদস্যরা হচ্ছেন এই শ্রেণীর মানুষ যারা প্রকৃতিসহ মানুষের ভালো ও কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন। এই সংগঠনের সদস্যরা প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানসহ তাদের কৃষিজ ফসলের বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের জন্য বেশ কবছর আগে গড়ে তুলেছেন ‘ফসলের হাসপাতাল’। শস্য উৎপাদনে তাই তাঁরা লক্ষ্য রাখেন যাতে মাটি, পানি, বাতাসের কোন ক্ষতি না হয়।
IMG_20170402_104709587
সাম্প্রতিক সময়ে পানি সঙ্কট মোকাবিলায় কম পানি লাগে এমন শস্য ও ফসল চাষের সিদ্ধান্ত নেন। পানি সঙ্কটের কারণে কোন জমি যাতে অনাবাদী না থাকে সেজন্য এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই সংগঠনের সদস্যদের চিন্তা একটাই, শস্য ও ফসল উৎপাদন করে দেশকে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং এমনভাবে শস্য ও ফসল উৎপাদন করতে হবে যাতে মাটি ও পানির ওপর কোনভাবে চাপ না পড়ে। অর্থ্যাৎ ফসল উৎপাদনে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের ভালো থাকা নিশ্চিত করতে চান তারা। এভাবে তাদের মধ্যকার আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তারা বোরো ধানের (পানি বেশি লাগে) পরিবর্তে গম (পানি কম লাগে) চাষের সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাঁরা (১৫ জন কৃষক) প্রায় ১০০০ শতক জমিতে গম চাষ করেছেন।

এই প্রসঙ্গে কৃষক জালাল উদ্দিন বলেন, “এই বছর আমি ৫ কাঠা (৫০শতক) জমিতে গম চাষ করেছি। গম এর ফলন ভালো হয়েছে, কোন পোকাও আক্রমন করে নাই।” কৃষক মো. আব্দুল হাই বলেন, “আমার ক্ষেতের ফলন ভালো হইছে। কাঠাতে প্রায় ২ মণ ২০ কেজিরও বেশি গম পাইছি। তবে চৈত্র মাসে বৃষ্টির কারণে ভালো করে লইতে (তুলতে)পারিনাই। কিছু নষ্ট হইছে নইলে আরো বেশি গম পাইতাম।” মো: সাজল মিয়া বলেন, “ফলন ভালো হইছে কিন্তু নিজেরা বীজ রাখলে সব বীজ গজায় নাই্। তাই আমরা বাজার থাইক্যা বীজ কিনি। নিজেরা বীজ রাখতাল্লে খরচ আরো কম পড়তো।এই বছর ঘরের জন্য রাইখ্যা বিক্রি করা যাইবো। বাজারে গমের দামও ভালো আছে।”

কৃষক  মোহামদ্দআলী বলেন, “আমি এবছর ৭ কাঠা জমিতে মোট লাভ পেয়েছি ৯৮৭০ টাকা। আমাদের ফসলের হাসপাতালের ১৫ জন কৃষকও একইভাবে লাভবান হয়েছেন। এখন আমরা অন্য কৃষকদের উৎসাহ দিচ্ছি গম চাষের জন্য। এতে করে জমি ভালো থাকবে, জমির উর্বরতা বাড়বে। পাট চাষ করা যাবে আর পাটও ভালো ফলন হবে।” তিনি বলেন, “এভাবে চাষাবাদে পানি কম, খরচ কম, পোকার আক্রমণ কম হয়। আমরা এসব বিষয়গুলো মানুষের কাছে তুলে ধরতে ও জানানোর জন্যই ফসলের হাসপাতাল গড়ে তুলেছি।”
কৃষকের উদ্যোগে গত তিনবছরে ফসলের হাসপাতালটি ধীরে ধীরে কাজ করে যাচ্ছে। বাঘরা হাওরের কৃষদের সফল উদ্দ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: