সাম্প্রতিক পোস্ট

প্রকৃতি সুন্দর তো আমরাও সুন্দর

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী

নেত্রকোনার প্রাণ ও প্রকৃতি এ অঞ্চলের মানুষকে করে তুলেছে বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, সাধক, গায়ক (বাউল, কবিয়াল) ও গবেষক। নেত্রকোনার সেই হাওর ও সীমান্ত পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য্যের সেই প্রকৃতি মানুষের নির্দয় আচরণে আজ বিপন্ন প্রায়, দিন দিন সৃষ্টি হচ্ছে মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে বিস্তর ফারাক। প্রকৃতিতে বৈচিত্র্যময় হাজারো প্রাণ আছে বলেই আমাদের জীবন আজও এত সু›ন্দর। এ অঞ্চলের নদী, ছড়া ও জলাশয়গুলোতে ছিল নানা বৈচিত্র্যের অসংখ্য প্রজাতির মাছ, বনে ছিলো নানা জাতের গাছগাছড়া, পশু-পাখি, ফল-মূল। সকল প্রাণের সমন্বয়ে বর্ণীল জীবন ছিল। ছিলনা জাতি, ধর্ম, বর্ণ কোনা ভেদাভেদ। তাইতো বিখ্যাত বাউল সাধক শাহ আব্দুল করিম প্রায়শই গেয়ে উঠতেন,‘‘গ্রামের নৌজুয়ান হিন্দু-মুসলমান, মিলিয়া বাউলা গান আর মূশির্দী গাইতাম, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’’। বাউল আব্দুল করিমের ন্যায় অনেক গায়ক, সাধক, কবি-সাহিত্যিকগণ এ অঞ্চলের প্রকৃতির টানে জন্ম নিয়ে নেত্রকোনার প্রাণ ও প্রকৃতির ঐতিহ্যক বিশ্বের মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন।
20170525_114912-W600
প্রাণ-প্রকৃতির আগের সেই সুন্দর দিনগুলো স্মৃতি মন্থন করা এবং সেগুলো সংরক্ষণের মাধ্যমে পুনরায় ফিরিয়ে আনতে নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার নোয়াদিয়া একতা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আয়োজন করে ‘প্রাণ ও প্রকৃতির উৎসব’। শিক্ষার্থীরা প্রতিকী পাখি, মাছ, শামুক, ব্যাঙ, সাপ, প্রজাপতি, মৌমাছি, কেঁচো ইত্যাদি প্রাণী সেজে পোস্টার পেপারে প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্যকে রক্ষায় বিভিন্ন দাবি, দাওয়া তুলে ধরে। শিক্ষার্থীরা অনুধাবন করতে পেরেছে যে, প্রকৃতিতে প্রাণী না থাকলে যে এই সুন্দর পরিবেশ, সমাজ ও সভ্যতা কিছুই সুস্থ থাকবে না, সবকিছুই বিপন্ন ও বিষন্ন হয়ে যাবে! শিক্ষার্থীরা তাই এই প্রাণ ও প্রকৃতিকে বাঁচাতে প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে, গ্রামে ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের ফুল, ফল, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করে, পাখির অভয়ারণ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করে, বিষ প্রয়োগ করে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষাকারী ও কৃষকের বন্ধু মাছ, শামুক, ব্যাঙ, সাপ, প্রজাপতি, মৌমাছি, ভ্রমরা, কেঁচো ইত্যাদি প্রাণগুলো হত্যা না করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় এবং আগ্রাসী প্রজাতির গাছ রোপণ না করে স্থানীয় প্রজাতিগুলো সংরক্ষণ করে আগের সেই প্রাণ ও প্রকৃতিকে ফিরিয়ে আনার শপথ গ্রহণ করে। শিক্ষার্থীরা বর্জ্র কন্ঠে আওয়াজ তুলে এই বলে যে, ‘আমরা বিদেশি প্রজাতি পালন না করে স্থানীয় প্রাণের সমাহার ঘটিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুন্দর একটি পৃথিবী উপহার দিব।” প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষায় শপথ গ্রহণ করে।
20170525_114926-W600
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে প্রায় আড়াইশত শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে স্থানীয় ভেষজ চিকিৎসক (কবিরাজ) সুমন মিয়া’র নেতৃত্বে ‘প্রকৃতিকে জানি, প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলি’ এই শ্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে এক বক্তৃতামালা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বক্তৃতামালায় শিক্ষার্থীদের জন্য গাছ চেনার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের ফলে শিক্ষার্থীরা বৈচিত্র্যময় গাছ ও লতা-গুল্মের সাথে এবং এসবের ব্যবহার ও উপকারিতা সম্পর্কে পরিচিত হয়েছে। এই বিষয়ে সহকারী শিক্ষক আব্দুস সাত্তার বলেন, “এ অঞ্চলের প্রাণবৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে হলে জমিতে বা পুকুরে রাসায়নিক সার ও বিষ প্রয়োগ করে প্রাণীকূলকে হত্যা করা যাবে না। মৌমাছি না থাকলে ফসলের পয়াগায়ন হবে না, শামুক না থাকলে পানি পরিস্কার হবে না। ব্যাঙ কৃষকের বন্ধু, ব্যাঙ ফসলের ক্ষেতের পোকা খায়। কৃষি ও পরিবেশের টিকে থাকার জন্য প্রত্যেক প্রাণীরই বেছে থাকা প্রয়োজন।” তিনি আগ্রাসী প্রজাতির মাছ ও গাছ না লাগিয়ে দেশীয় মাছ ও গাছ লাগানো অঙ্গিকার করে বলেন, “পরিবেশ সুন্দর থাকলে আমরাও সুন্দর ও সুস্থ থাকব। তাই আমাদের সকলের প্রাণবৈচিত্র্যকে রক্ষা করা খুবই জরুরি।”
20170525_121126-W600
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আঃ কাদির বলেন, “আমাদের শিক্ষার্থীরা আমাদের চারপাশের প্রকৃতিকে জানুক, জেনে প্রকৃতি রক্ষায় ও প্রকৃতির বৈচিত্র্য সংরক্ষণে উদ্যোগী হয়ে উঠুক। নেত্রকোনা প্রাণবৈচিত্র্য ও প্রকৃতি রক্ষা হলে পরিবেশ যেমন সুন্দর হবে, তেমনি আমাদের সকলের জীবনও সুন্দর ও সমৃদ্ধশালী হবে। নতুন প্রজন্মই পারবে এ অঞ্চলের প্রাণ ও প্রকৃতিকে রক্ষা করতে।” প্রধান শিক্ষক স্কুলের প্রত্যেক ক্লাশে প্রাণ ও প্রকৃতি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন।

আজকে যারা শিশু তারাই আগামী দিনের ভবিষ্যত। আগামী দিনের ভবিষ্যত এই শিশু বা নতুন প্রজম্মের সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন সুস্থ পরিবেশ ও প্রকৃতির। এই প্রাণ ও প্রকৃতি থেকেই নতুন প্রজম্ম আগামী দিনে তাদের ব্যক্তিগত ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা লাভ করবে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের দেশের বিশেষভাবে হাওর-নদী ও গারো পাহাড় বেস্টিত নেত্রকোণা অঞ্চলের প্রাণ ও প্রকৃতির যে অবস্থা পরিলক্ষিত হচ্ছে তাতে আগামী প্রজন্ম এর উপকার থেকে প্রায় পুরোপুরি বঞ্চিত রয়ে যাবে। আগামী প্রজেেন্মর ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে তা আমাদের জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও অঞ্চল ভেদে সকলকে প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষায় শপথ নিতে হবে, ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায়। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই সুন্দর হবে আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশ এবং সুন্দরতর হবে আমাদের জীবন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: