সাম্প্রতিক পোস্ট

গাবুরার লবণাক্ত পরিবেশে ফরিদার কৃষি উদ্যোগ

সাতক্ষীরা থেকে মননজয় মন্ডল

বাংলাদেশের মধ্যে প্রাকৃতিক দূর্যোগে সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ হলো উপকূলীয় অঞ্চল। ২০০৯ সালের আইলা পরবর্তী দীর্ঘদিন লবণ পানির জোয়ারভাটা প্রবাহিত হওয়ার কারণে মাটি ও পানি মারাত্মক লবণাক্ততা হয়ে যায়। মাটির উর্বর শক্তি এতটা কমে গিয়েছিল যে, ধান ও সবজি বা ফসল চাষাবাদে কৃষক-কৃষাণীরা হিমশিম খেতে হয়। তারপরও জীবন-জীবিকার তাগিদে কৃষক-কৃষাণীরা নানান কৌশল অবলম্বন করে ফসল উৎপাদন আব্যাহত রেখেছেন। কৃষির স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার নিরন্তর প্রচেষ্টা আব্যাহত রেখেছেন এলাকার স্থানীয় জনগোষ্ঠী। তারই এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা গ্রামের কৃষাণী ফরিদা বেগম (৫৮)।
গাবুরার লবনাক্ত পরিবেশে ফরিদার উদ্যোগ (1)
ফরিদা বেগমের স্বামী বাক্কার বাউলিয়া মারা যাওয়ার পর থেকে এক ছেলেকে সাথে নিয়ে বাপের বাড়িতে থাকেন। বাপের দেওয়া ১৭ শতক জায়গার উপর বসবাস করার পাশাপাশি বসতভিটায় ১২ মাস সবজি চাষাবাদ শুরু করেন। এছাড়াও নদীতে মাছ ধরা, শ্রম বিক্রি এবং অন্যের বাড়ির কাজ করে সংসারের হাল ধরে রেখেছেন। বর্তমানে পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৪ জন। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হওয়াতে অনেক ছোটবেলা থেকে বাপ-মার সাথে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে যেতে হতো। ছোটবেলা থেকেই সবজি চাষ ও ফসল উৎপাদন মায়ের কাছ থেকে শিখেছেন।
গাবুরার লবনাক্ত পরিবেশে ফরিদার উদ্যোগ (2)
ফরিদা বেগমের কৃষি চর্চা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “২০১২ সালে জুলাই মাসে বারসিক ও শ্যামনগর এলাকার কয়েকজন কৃষক আমাদের গ্রাম পরিদর্শন করেন এবং আমাদের সমস্যা কি সে সব বিষয় জানতে চান। সেখানে আমরা ভালো সবজি বীজ চাহিদা দিই তাদের কাছে। সে মোতাবেক আগষ্ট মাসে চকবারা গ্রামের ৫০টি পরিবারের মাঝে ৭ প্রকার সবজী (শিম, লাউ, মিষ্টিকুমড়া, তরুল, লালশাক, ঢেড়স, কুশি) বীজ বিনিময় করে সেখান থেকে আমি এ বীজ গ্রহণ করি।” তিনি আরও বলেন, “সকল বীজ আমি যতœ সহকারে লাগাই বর্ষাকালে। সেখান থেকে ভালোমত সবজি উৎপাদন করি। সকল বীজ আমি পরবর্তী বছরের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছি। এরপর সেপ্টেম্বর মাসে বারসিকের সহযোগিতায় আমরা একটি দল শ্যামনগর এলাকায় হায়বাতপুর গ্রামে বারসিক কার্যক্রম পরিদর্শন করি। সেখানে হায়বাতপুর গ্রামের কৃষানী ফরিদা পারভীন সবজি ক্ষেত দেখি এবং তার কাছ থেকে সবজী চাষের বিভিন্ন পরামর্শ গ্রহণ করি।” তিনি বলেন, “একই বছর শীতকালীন সবজির চাহিদা দিই বারসিকের নিকট। তার পরিপ্রেক্ষিতে নভেম্বর মাসে হায়বাতপুর কৃষি নারী সংগঠন ও বারসিকের সহযোগিতায় শীতকালীন ৫ প্রকার সবজি বীজ (লালশাকা, পালংশাক, মূলা, ঝাল, ওলকপি) সহযোগিতা পাই, সেগুলো সহ বাজার থেকে বীটকপি ও বেগুন বীজ এনে লাগাই। তখন ফলন ভালো পাই, যে কারণে আর আগের মতো বাজার থেকে সবজি কিনতে হয় না।”
গাবুরার লবনাক্ত পরিবেশে ফরিদার উদ্যোগ (3)
আত্মপ্রত্যয়ী ফরিদা বেগম বারসিকের সহযোগিতায় একটি কুড়িয়ে পাওয়া অচাষকৃত উদ্ভিদের প্লট তৈরি করলেও অতিরিক্ত গরম পড়ায় মাটি লবণ হয়ে যাওয়ার কারণে গাছগুলো মারা যায়। তিনি সবজি চাষে বেশিরক্ষেত্রে ভাগ জৈব সার ব্যবহার করেন। ঘরের পাশে একটি গর্ত করে সেখানে বাড়ির ব্যবহৃত যাবতীয় ময়লা আবর্জনা, হাস মুরগির বিষ্ঠা, তরকারির বাছনা, গর্তের মধ্যে পচিয়ে সার হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি নিজ হাতে প্রত্যেক মৌসুমের বীজ সংরক্ষণ করে রাখেন পরবর্তী বছরের জন্য।

ফরিদা বেগমের বাড়িতে ফলজ গাছ হিসেবে আমলকি, পেঁয়ারা, বেদানা, লেবু, সবেদা, কুল, নারকেল, কদবেল ও কাঠ জাতীয় গাছ হিসেবে বাবলা, খেঁজুর ও রেইনট্রি  প্রভৃতি রয়েছে। বাড়িতে, হাস, মুরগি, কবুতর, ছাগল পালন করেও আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে বলে তিনি জানান।

স্থায়িত্বশীল কৃষি জীবনকে টিকিয়ে রাখতে হলে ফরিদা বেগমের মতো নারীদেরকে তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতায় অবদানের জন্য তাদেরকে মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের কাজকে আরও গতিশীল করতে হবে। একইসাথে তাদের কাজের সম্মাননা প্রদান করে তাদের কাজকে ধরে রাখার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: