সাম্প্রতিক পোস্ট

গোল গাছে বাহারী পুষ্প মঞ্জরী

:: দেবদাস মজুমদার, পিরোজপুর থেকে

গোল গাছে বাহারী পুষ্প মঞ্জরী সমুদ্র উপকূলবর্তী বনাঞ্চল বিস্তৃত নৈসর্গিক প্রাণে। অগণিত বৃক্ষরাজি আমাদের পরিবেশ ও জীবন প্রবাহকে বাঁচিয়ে রাখে। আমাদের বনজ সম্পদের মধ্যে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় গোলগাছ মূলত গোলপাতা নামে পরিচিত এবং একটি অর্থকারী সম্পদ। সাগরের পানি চলাচলের এলাকাগুলোতে বিভিন্ন নদী-খালের মোহনায় পলিমাটির চরে প্রকৃতিগতভাবে গোলগাছ জন্মে থাকে। পাম গোত্রের ম্যানগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদ এই গোলগাছ। সারিবদ্ধ ঘন ঝোপের মত বেড়ে ওঠা গোলগাছ দেখতে অনেকটা নারিকেল গাছের মত বলে সাধারনভাবে একে নারিকেল গাছের প্রজাতিও মনে করেন উপকূলের বনজীবিরা। স্থানীয় ভাষায় গোল ফলকে গাবনা অথবা গোল মোচা বলে। গোল ফলের বৈজ্ঞানিক নাম Nypa fruticans,স্থানীয় নাম Nypa fruit। গোল ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম Globular flower। শুধু বাংলাদেশ নয় ,ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের উপকূলে এ প্রজাতির গাছ দেখা যায়। খেজুর আর তাল গাছের ছড়া সদৃশ কাদিতে গোল ফুল ও ফল হয়। গোল গাছের পুষ্পমঞ্জুরি ঢাউশ সাইজের হয়ে ফোটে। অপূর্ব দৃষ্টিনন্দন গোল ফুল। সারি সারি গোলবনে ফোটা পুষ্প মঞ্জরি নিসর্গের শোভাবর্ধনে করে।

সাধারনত ভাদ্র-আশ্বিন মাসে গোল গাছে ফুল ও ফল ধরে। তবে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ বন হরিণঘাটায় অসময়ে ফুটেছে বাহারী এই পুষ্পমঞ্জরীর গোল মোচা। শনিবার হরিণঘাটা বনের দুটি গোলগাছে এ বিশাল বাহারী ফুল ও ফলের দেখা মেলে। সবুজ নিসর্গের ভেতর হলুদাভ হালকা খয়েরী রঙের বর্ণিল অদ্ভূত পুষ্পমঞ্জরি দুটি দেখলে বিমোহিত হতে হয়।

স্থানীয় বনজীবি রণজিত সরকার জানান,পরিপক্ক হলে গোল ফল কেটে খাওয়া যায়। খেতে অনেকটা কাঁচা তালের শাসের মত। তবে নোনতা স্বাদ যুক্ত, মিষ্টি ও রসালো । গোলগাছের ছড়ার সম্মুখ ভাগ কেটে বছরের অগ্রাহায়ণ থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত দিনে দুবার করে রস সংগ্রহ করা হয়। গোল মোচার ডগা কেটে রস সংগ্রহকালে গোল মোচা বিনষ্ট হয়। তবে হরিণঘাটা বন সংরক্ষিত বলে এখানে গোল মোচা কেটে ফেলা হয়না। ফলে গোল মোচা বা গাবনা গাছে টিকে থাকে।

গাবনা- গোল গাছের ফলবনবিভাগ পাথরঘাটা রেঞ্জ সূত্রে জানাগেছে,সাগর উপকূলবর্তী ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের বিশাল এলাকায় ৩৩৪ প্রজাতির বৃক্ষের মধ্যে গোলগাছ অন্যতম অর্থকরী সম্পদ। পাম গোত্রের ম্যানগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদ সারিবদ্ধ ঘন ঝোপের মত বেড়ে ওঠে। সাগরের পানি চলাচলের এলাকাগুলোতে বিভিন্ন নদী-খালের মোহনায় পলি জমে জেগে ওঠা চরে গোলগাছ জন্মে। উপকূলীয় পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা অঞ্চলের সুন্দরবনে গোলগাছ জন্মে । এসব এলাকার পলিযুক্ত মাটি, মৌসুম ভিত্তিক নোনা পানি এবং অবাধ পানির প্রবাহ গোলগাছ বেড়ে ওঠার জন্য খুব সহায়ক। গোলগাছের এক একটা ছড়ায় একশ থেকে দেড়শ বীজ হয়। এই বীজ গুলো কাঁদা মাটিতে, নিচু ও অবাধ পানি চলাচলের জায়গায় বীজ পুতে রাখলেই চারা জন্মায় । আর এ কারনেই গোলগাছের চাষাবাদ সহজ ও সুবিধাজনক। ভাইরাসসহ অন্যান্য তেমন কোন রোগের আক্রমন না থাকায় গোল গাছে কোন পরিচর্যারও প্রয়োজন হয়না। প্রকৃতিগতভাইে বেড়ে ওঠে। গোল ফল পেকে ঝড়ে পড়ে। গোল বন জোয়ারের পানিতে ডুবে গেলে ফল ভেসে স্থানান্তরিত হয়ে বংশ বিস্তার করার ফলে নতুন গোলবনের সৃষ্টি হয়।

গোল গাছ অর্থকরী এক প্রাণ। এর রস, শিকড়, ফল এবং পাতা নানাভাবে দরকারী । শুকনো গোল পাতা ঘরের চালা, নৌকার ছাউনি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। গোল পাতার ছাউনি ঘর নাতিশিতোষ্ণ হয়। গোল গাছ ভূমিক্ষয় রোধেও ভুমিকা রাখে। উপকূলের বনজীবিরা গোলপাতা সংগ্রহ করেন বাণিজ্যিকভাবে ।

এ বিষয়ে পাথরঘাটা মহাবিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নকুল চন্দ্র অধিকারি বলেন, গোল গাছ আগের মত উপকূলে যত্রতত্র দেখা মেলেনা। গোল গাছের পুষ্প মঞ্জরি খুবই নয়ণাভিরাম। গোল গাছের বীজ জরায়ূজ-অংকুরোদগম ধরনের, যা গাছেই বা গাছ থেকে ঝড়ে পড়লেই বংশ বৃদ্ধি করতে সক্ষম। তাই গোল গাছের কঁচি বীজ কেটে রস সংগ্রহ করা হলে প্রাকৃতিক বংশ বিস্তার বিপর্যস্ত হতে পারে।

পাথরঘাটার হরিণঘাটা সংরক্ষিত বনের বিট অফিসার মো. হুমাউন কবীর বলেন, হরিণঘাটার গহীন বনের ভেতর খালের চরসমূহে এ গোল গাছ বিস্তৃত। প্রাকৃতিকভাবেই জন্মেছে গোলবন। তবে সরকারের উদ্যোগে এ বছর হরিণঘাটা বনে প্রচুর পরিমানে গোলগাছ বীজ বপন করা হয়েছে। গোলগাছ অর্থকরী সম্পদ। গোল গাছ থেকে সংগৃহিত কাঁচা রস খেতে খুব সুস্বাদু । এ রসের পিঠা বা পায়েস অতি মুখরোচোক ।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: