সাম্প্রতিক পোস্ট

নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসুন

সিংগাইর, মানিকগঞ্জ থেকে শাহিনুর রহমান

‘আমরা এমন এক দেশ চাই যেখানে সকল ধর্মের সকল মানুষ স্বাধীন ও বৈষম্যহীন ভাবে বসবাস করতে পারে। কিন্তু বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি সহিংসতা ও বাল্য বিয়ে একটি সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। সমাজ সভ্যতা যত উন্নত হচ্ছে দেশ যতই এগিয়ে যাচ্ছে ততই নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন বেড়ে যাচ্ছে। মানুষ যত সচেতন হচ্ছে ততই নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে তাদের অজ্ঞতা বৃদ্ধি পাচ্ছে; বৃদ্ধি পাচ্ছে উদাসীনতা। দারিদ্র অশিক্ষা বেকারত্ব নানা কারনে নির্যাতিত হচ্ছে নারীরা যৌতুকের দাবি মিটাতে না পেরে নারীর জীবন হয়ে যাচ্ছে অন্ধকার। যৌতুক, বাল্য বিবাহ, বহু বিবাহ, তালাকসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ প্রয়োগ না থাকার কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন ও বাল্য বিবাহ বেড়ে যাচ্ছে।’

IMG_20190922_124240
সম্প্রতি বারসিকের উদ্যোগে আয়োজিত নারীর প্রতি সহিংসতা ও বাল্য বিবাহ রোধে করণীয় শীর্ষক এক কর্মশালায় এমন কথা বলেছেন মানিকগঞ্জ জেলা নারী উন্নযন কমিটির সাধারণ সম্পাদক সেলিনা বেগম। তিনি আরও বলেন, ‘একজন নারী পরিবারে সবার আগে সকালে ঘুম থেকে উঠে এবং সবার পরে ঘুমাতে যায়। পরিবারে সবার বেশি কাজ করে একজন নারী। এক জন নারী তার পরিবারে ৪৮ ধরনের কাজ করে থাকেন যে কাজের কোন অর্থনৈতিক মূল্য কখনই নিধারিত হয়নি।’

তিনি নারীর প্রতি সহিংসতা রোধের উপায় তুলে ধরে আরো বলেন, ‘নারী গৃহস্থালী কাজের অর্থনৈতিক মুল্য দিতে হবে। পারিবারিকভাবে নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হলে নারীকে আয় বৃদ্ধিমূলক কাজের সাথে যুক্ততা বাড়াতে হবে।’
সেলিনা বেগমের সুরে কথা বলেন কৃষাণি রোকেয়া বেগম, বিউটি বেগম, রাজিয়া বেগমরা। তাঁরা জানান, নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। অফিস আদালত রাস্তাঘাট, যানবাহন, বাজার সকল ক্ষেত্রে নারীর জন্য নিরাপদ রাখতে হবে। যে সব নারী সহিংসতার শিকার তাদের জন্য সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আইনী সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

IMG_20190922_125545
নারী নির্যাতন ও বাল্য বিবাহ রোধে সহযোগিতার মনোভাবে কাজ করার প্রত্যয় নিয়ে কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন সিংগাইর উপজেলা মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যন শাহীন আক্তার, কালিয়াকৈর খান উচ্চ বিদ্যালযের প্রধান শিক্ষক মো. যুবায়ের হোসেন খান, কবি নজরুল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হারুন অর রশীদ, বায়রা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. বিল্লাল হোসেন, কালিয়াকৈর ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সহকারি শিক্ষক আব্দুল গনি, নবগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের সহাকারি শিক্ষক ইমান ইসলাম, বায়রা জজবাড়ি মসজিদের ইমাম হাফেজ মো. শহীদুল্লাহ, পুরোহিত পরেমশ্বর মুখার্জি, স্থানীয় কৃষক কৃষক ইমান আলী, ইব্রাহিম মিয়া, আব্দুল হালিম, কৃষাণি মনোয়ারা বেগম, ভানু বেগম, শিক্ষার্থী মাসুদুর রহমান, শরিফুল ইসলাম, শাহীন আলম, মারুফা আক্তার, মাহবুবা আক্তার প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে বারসিক কর্মকর্তা শিমুল বিশ্বাস পাওয়ার পয়েন্টে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বাল্য বিয়ের কারণ, বাল্য বিয়ের প্রধান কুফল, নারী নির্যাতন ও পারিবারিক সহিংসতা, নারী নির্যাতন এবং পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে আইন ২০১০ উপস্থাপন করেন। আলোচনায় বক্তারা বলেন, ‘শিক্ষিত সচেতন ও প্রভাবশালী মানুষ দ্বারাই নারী নির্যাতন বেশি হচ্ছে, যা আমরা সম্প্রতি দেখতে পাই। এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন।’ নারী নির্যাতন বাল্য বিয়ের কুফল উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, ‘নারীরা পারিবারিক নির্যাতনের বাইরেও যৌন হয়রানি, এসিড নিক্ষেপ এর মতো সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাছাড়া নারীদের শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। এতে নারী চাইলেও আইনের আশ্রয় নিতে পারেন না।’

বক্তারা মনে করেন, নারী নির্যাতন ও বাল্য বিয়ে প্রতিরোধের উপায় তুলে ধরে গ্রাম পর্যায়ে উঠান বৈঠক ও মা সমাবেশ, স্কুল মাদ্রাসা কলেজে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গঠন প্রচার প্রচারণা প্রশাসনিক সহায়তা নবম ও দশম শ্রেণীর পাঠ বইয়ে বাল্য বিয়ের কুফল অর্ন্তভূক্ত করা প্রয়োজন।

IMG_20190922_133147
এই প্রসঙ্গে শাহিন আক্তার বলেন, ‘নারীর প্রতি যে কোন ধরনের অপ্রত্যাশিত আচরণই নারীর প্রতি সহিংসতা। বর্তমান বিশ্বে তিনজন নারীর মধ্যে একজন নারী সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। তাছাড়া, বাল্য বিয়ের কারণে একজন নারী তাঁর জীবনের সর্বোচ্চ ক্ষতির সন্মুখীন হয়। নারীর প্রতি সহিংসতা নারী মর্যাদাকে হেয় করে। সম মর্যাদায় নারী হবে বিকশিত।’

উল্লেখ্য, বারসিক দর্ঘীদিন ধরে নারীর নির্যাতন, নারীর প্রতি সহিংসতা, বাল্য বিয়ে রোধ এবং নারীর অধিকার অর্জনে গ্রামভিত্তিক কৃষক কৃষক কৃষাণি সংগঠন তৈরির ক্ষেত্রে সহায়কের ভূমিকা পালন করে আসছে। নারী অধিকার আদায়ের জন্য গঠন হয়েছে ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলা নারী উন্নয়ন কমিটি, যে কমিটির মাধ্যমে নারীরা সরকারি ও বেসকারি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কমিটিতে যুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন এবং দাবি তুলছেন অধিকার আদায়ের। এ রকম ছোট ছোট দাবির মাধ্যমেই নারীর অধিকার একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: