Posted in

সমাজ সংস্কারক মহান শিক্ষানুরাগী আব্দুল মোতালেব

মো. আসাদুল ইসলাম ও মো. সিরাজুল ইসলাম

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় এই অবহেলিত জনপদে প্রাণে মানে শিক্ষা জাগরণে আব্দুল মোতলেব এর অবদান অসামান্য। জীবনে প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে পরতে পরতে শিকড় চালিয়েছেন। বেঁচেছেন প্রতিনিয়ত মানুষের জন্য, মানুষকে নিয়ে। কখনো স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা, কখনো প্রেসক্লাব-সাংবাদিকতা, কখনো রেড-ক্রিসেন্ট সোসাইটি, কখনো স্কাউটস, শিল্পকলা একাডেমি, কখনোবা ক্রীড়া সংস্থা নিয়ে মেতেছেন। মৃত্যুকে লয় করে জীবনের জয়গান গেয়েছেন প্রতিনিয়ত। অমর হয়েছেন সৃষ্টিতে সৃষ্টিতে।

সাতক্ষীরার এই সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষানুরাগী আব্দুল মোতলেব এর জন্ম ১৯৩৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাট জেলায়। তাঁর বাবার নাম আব্দুল হামিদ ও মাতার নাম সফুরন্নেছা বেগম। দিন যায় দিন আসে, বছর ঘুরে নতুন বছর আসে এটাই স্বাভাবিক। মানুষ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে আবার এক সময় পৃথিবী ছেড়ে চলেও যায়। রেখে যায় তার স্মৃতি, জীবদ্দশায় অনেকেই তার কর্মগুণের মাধ্যমে মরেও অমর হয়ে থাকেন। আবার অনেকের নাম মুছে যায়। অনেকের নাম লেখা থাকে মানুষের হৃদয়ে, তার সৃষ্টির মাঝে। আর তেমনই একজন মহান ব্যক্তি আব্দুল মোতালেব। তার কর্মগুণে দেশ, জাতি পেয়েছেন অনেক কিছু। তিনি ছিলেন একজন বড় মনের মানুষ। তিনি জীবদ্দশায় অনেক বড় পদে অধীন হয়েও ক্ষমতার বড়াই করেননি। তিনি আর পাঁচজন সাধরণ মানুষের মত জীবনযাপন করছেন। তিনি অগণিত প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন। বহু শিক্ষিত/অশিক্ষিত বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন। তার মুক্ত বিচরণ ছিল সাধারণ জনারণ্যে। ভাবনা চিন্তা ছিল তাদের নিয়ে যাদের নিয়ে ভাববার কেউ নেই। তিনি ভাবতেন একটি আলোকিত শিক্ষিত সমাজ গড়ার সর্বত্তোভাবে জড়িত নারী জাগরণ সৃষ্টি, নারী শিক্ষার উত্তরণ।

23

আব্দুল মোতলেব বহু স্কুল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। প্রায় ৩৫০টি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন এই অবহেলিত জনপদে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি স্কুল তৈরির মিশনে নেমেছিলেন। সাতক্ষীরা জেলার প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় সব ক’টিতে তাঁর ছোঁয়া লেগেছে। তাঁর হাত ধরেই প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নতুন নতুন কলেজের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করে কাগজপত্র প্রস্তুত করে ছুটে গেছেন ঢাকাতে প্রতিষ্ঠানটির রিকগনিশন নিতে। সফল হয়ে ফিরেছেন এলাকার মানুষের কাছে। আবার সেই প্রতিষ্ঠানে এলাকার বেকার যুবকদের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে চাকরি দিয়েছেন। বেকারত্ব ঘুচিয়েছেন এই অঞ্চলের বহু শিক্ষিত বেকারদের। এই অঞ্চলের বা দক্ষিণাঞ্চলের সর্বোচ্চ উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম দাবিদার ও সংগঠক ছিলেন এই মহান শিক্ষানুরাগী। সাতক্ষীরা জেলার বৃহৎ প্রতিষ্ঠান সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম পুরধা ছিলেন তিনি। এছাড়া সাতক্ষীরা শহর এবং পুরো জেলাতে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তার হাতের ছোঁয়ায় প্রতিষ্ঠিত। তার মধ্যে সাতক্ষীরা সিটি কলেজ, সাতক্ষীরা দিবা-নৈশ কলেজ, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, ছফুরন্নেছা মহিলা কলেজ, কুমিরা মহিলা কলেজ, দাঁতভাঙা কলেজ, ভালুকা চাঁদপুর কলেজ, সীমান্ত আর্দশ কলেজ, কলারোয়া সোনার বাংলা কলেজ, শহীদ স্মৃতি ডিগ্রি কলেজসহ অসংখ্য উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যা আজ এই জেলার উচ্চ শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। এছাড়া প্রায় ৩৫০টি প্রাইমারি বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় তার হাতেই প্রতিষ্ঠিত। তার মধ্যে কুমিরা গালর্স হাইস্কুল, সাতক্ষীরা বালিকা বিদ্যালয়, তালতলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নবারুণ বালিকা বিদ্যালয়সহ অসংখ্য মাধ্যমিক স্কুল।

নারী শিক্ষা জাগরণে এই জনপদে তথা বাংলাদেশের অন্যতম মহান ব্যক্তি আব্দুল মোতালেব। এই উপকূলীয় জনপদের কুসংস্কার দূর করে নারী শিক্ষা প্রসারে তার অবদান অসামান্য। তার হাত ধরেই এই অঞ্চলে নারী শিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিষ্ঠিত। তিনি নারীদের শিক্ষার জন্য, অধিকার আদায়ের জন্য যেসব নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন তার মধ্যে ছফুরন্নেছা মহিলা কলেজ, কুমিরা মহিলা কলেজ, সরকারি মহিলা কলেজ, কুমিরা গালর্স হাইস্কুল, সাতক্ষীরা বালিকা বিদ্যালয়, নবারুণ বালিকা বিদ্যালয়, এ করিম মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ অসংখ্য নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আজ সেখান থেকে লাখো নারী শিক্ষা নিয়ে আপন অধিকারে সোচ্চার।

এই মহান ব্যক্তির পদচারণা শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছিলো না। তাঁর পদচারণা ছিলো এই জনপদের সাংবাদিকতার পথ প্রদর্শক হিসাবে। এই অঞ্চলের সাংবাদিকতার প্রাণ-পুরুষ ছিলেন তিনি। তিনি ৬০ এর দশকের দিকে সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন। এবং দেশজুড়ে তাঁর খ্যাতি দেখিয়েছিলেন। তিনি তৎকালীন বাংলাদেশের অবজারভারের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ছিলেন। সাংবাদিকতাকে ছড়িয়ে দিতে তিনি নিজ উদ্যোগে সাতক্ষীরাতে প্রথম ১৯৬৮ সালে নিজের প্রতিষ্ঠান আহমেদিয়া প্রেস থেকে “সাপ্তাহিক কাফেলা” পত্রিকাটি প্রকাশ করেন। যা ১৯৯২ সালে সাতক্ষীরার প্রথম পত্রিকা “দৈনিক কাফেলা” হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। এছাড়া সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন বহুবার। তার উদ্যোগে বর্তমান প্রেসক্লাবের ভবনটি তৎকালীন এসডিও শহিদুল আলমের কাছ থেকে আদায় করেছিলেন। প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্থায়ী প্রেসক্লাব ভবনটি। আজ যারা সাতক্ষীরার প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক তারা অধিকাংশ সবাই এই মহান ব্যক্তির সান্নিধ্য পেয়ে সফল হয়েছেন।

সমাজ সংস্করণ বা সমাজ সেবায় এই মহান সমাজ সংস্কারকের অবদান অসামান্য। এই উপকুলীয় জনপদে সমাজ সেবায় তার বিচরণ ঘটেছে সবখানে। যখনই দুর্যোগ-বন্যা-ঝড় হয়েছে নিজে ত্রান নিয়ে ছুটে গেছেন সেইসব দুর্যোগ প্রবণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তিনি বাংলাদেশ রেড-ক্রিসেন্ট জাতীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি সাতক্ষীরা রেড-ক্রিসেন্ট এর সম্পাদক এবং বিভিন্ন সময় ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এছাড়া এই অঞ্চলের স্কাউট আন্দলোনের পুরোধা ছিলেন তিনি। এই অঞ্চলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্কাউটিং শুরু হয় তাঁর হাত ধরে। তিনি বাংলাদেশ স্কাউট এর সাতক্ষীরার কমিশনার ছিলেন বহু দিন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অন্ধ কল্যাণ সমিতিসহ অসংখ্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। সমাজ সেবায় অসামান্য অবদানের জন্য তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দীন আহম্মেদের কাছ থেকে রৌপইলিশ পদক পান তিনি।

এছাড়া এই জনপদে সাংস্কৃতিক চর্চা ছড়িয়ে দিতে তিনি ছিলেন অগ্রপথিক। তাইতো তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জেলা সাংস্কৃতি পরষিদ। এছাড়া তার বাড়িতেই নিয়মিত বসতো কচিকাঁচার মেলার আসর। সাহিত্য চর্চা ছড়িয়ে দিতে তার নিজের পত্রিকাতে সাহিত্য পাতা নামে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করতেন। মৃত্যুর কাছে মানুষ আবদ্ধ হয়ে হারিয়ে ফেলে আপনজন কিংবা প্রিয়জন। সেই মানুষের কাছে মানুষ হয়ে ওঠে উদ্বিগ্ন। যার অস্তিত্বে চেতনায় ছিলো সংগ্রামিত সংযোগ। যার দৃষ্টির দরবারে ছিলো বিচক্ষণতার পরিচয়।

আব্দুল মোতালেব শুধু একটি নাম নয়! তিনি একজন সাংবাদিক, লেখক, সাহিত্যিক, শিক্ষানুরাগী, সমাজ সেবক, সমাজ সংস্কারক, সংগঠক, নারী জাগরণের সৈনিক। সর্বোপরি এই জনপদের অভিভাবক। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি শিক্ষিত জাতি গঠনের, নারী শিক্ষার প্রসারের। তার স্বপ্ন ছিলো এই উপকুলীয় জনপদের মানুষের শিক্ষা প্রসারে এবং স্ববলম্বী হওয়ার।

মহান এই সমাজ সংস্কারক তার অনেক ইচ্ছা অপূরণ রেখে ২০০২ সালের ২রা জুন ঢাকার সিক্দার মেডিকেল হাসপাতালে হার্টস্টোক আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তিনি মরেননি; তিনি বেঁচে আছেন তার সৃষ্টিতে, সাতক্ষীরার মানুষের হৃদয়ের মাঝে, ভালোবাসাতে। এই সমাজ সংস্কারক মহান শিক্ষানুরাগী কোন কিছু প্রাপ্তির জন্য নয়, জীবনব্যাপী তিনি সমাজ কর্মের মাঝেই মানুষকে শুধু দিয়েই গেছেন। কোন প্রাপ্তির জন্য কিছু করেননি। তাই আমাদের উচিত এই সৃষ্টিশীল সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষানুরাগীর আদর্শ গ্রহণ করে তার সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখা।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.