Posted in

সমাজের লোকজন আমাকে মূল্য দিচ্ছে- তাতেই আমি খুশি

মানিকগঞ্জ থেকে নীলিমা দাস

মানিকগঞ্জ জেলার বেতিলা ইউনিয়নের মিতরা গ্রামের মেয়ে গীতা রানী (২২)। বাল্যবিবাহের শিকার হয়ে ৯ম শ্রেণির ছাত্রীর চলে যেতে হয় শ্বশুড় বাড়ি। কিন্তু বিধিবাম, হাতের মেহেদীর রঙ শুকাতে না শুকাতেই শশুড়বাড়ি থেকে ফিরে আসতে হয় স্বামী-শ্বাশুড়ীর মারধর, অন্যায় অত্যচার, জ্বালা-যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে।

প্রতিবন্ধকতা মানে থেমে যাওয়া নয়
মেয়েটার পড়াশুনার চেয়ে হাতের কাজের দিকে ঝোঁক বেশি ছিল। তাই বাবার বাড়িতে এসে স্কুল না গেলেও বসে থাকতো না। গীতা স্মৃতিচারণ করে বলে,  “বাবা-মার সাথে বাঁশবেতের কাজ করতাম। কৃষি কাজ করতে গিয়ে কৃষকেরা যে মাথাল ব্যবহার হয় সেগুলো বানাতাম। ছোটবোন পুস্পর সাথে প্রতিযোগিতা করে কাজ শিখতাম। কিন্তু,বাবা মারা যাওয়ার পর মা বাঁশের কাজ ছেড়ে দিলেন। কিছু দিন পর মিতরা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে  জালিব্যাগ সেলাই কাজে গেলাম; সেখানে পরিশ্রম অনুয়ায়ী বেতন নেই।” গীতা আরো বলে, “আমার বড় দাদার  বন্ধুর  মা একজন ভাল দাঁতের ডাক্তার। ওনার কাছে আমাকে কাজ শিখতে দিলেন । প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো। তবে আমার একটাই মনে মনে প্রতিজ্ঞা; এখানে যখন এসেছি কাজ শিখে বের হবো। যতই কষ্ট হোক না কেন! খাওয়া-দাওয়া’র কষ্টতো ছিল। সাথে সাথে বাড়ির সমস্ত কাজ করতে হতো। তার মধ্যে বকা আর গালগালি তো উপরি পাওনা। কখনো কখনো মনে হতো বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। দু’একবার কাজ ছেড়ে পালিয়ে যেতাম। বড়দা বুঝিয়ে সুঝিয়ে আবার দিয়ে যেতো। মনে মনে ভাবতাম জীবনটাই কি এমন ? হায়রে জীবন!”

DSC02568
“বারসিকের দিদি, বড়দা, মা বলতো বিয়ের কথা ভাবতে হবে না। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। তাদের কথায় কিছুটা সাহস পেতাম। আমিও মনে মনে প্রতিজ্ঞা নিলাম যতই কষ্ট হোক আমাকে নিজে একটা কিছু হতে হবে। বিয়ে ভেঙ্গে যাবার পর পাড়া-পড়শি, আত্মীয়-স্বজন  বলাবলি করতো জামাইর বাড়ির ভাত  জুটেনি, সন্তানের মুখ দেখসনি, অলক্ষ্মী, অপেয়া! তোকে আর কে বিয়ে করবে?  চিরদিন বাপ-ভাইয়ের ঘারে বসে খাবি।  আরোও বাজে বাজে কথা। তাদের কথা চিন্তা করলে রাত্রে আর ঘুম আসতো না। এই সব চিন্তা করে আবার ফিরে যেতাম সেই ম্যাডামের বাড়ি। সেখানে কাজ শিখতে শিখতে তিন বছর  লাগে।” এটাই ছিল গীতা রাণীর সংগ্রামী গল্প তার নিজের মুখে। এরপর শুরু হলো গীতার নতুন জীবন। ডাক্তার গীতা রানী মনিদাস।

গীতাই পরিবারও সমাজের গর্ব
আজ তার পারিবারকে সমাজ আলাদাভাবে সম্মান দেয়। গীতা রানীর মুখ থেকেই শোনা যাক সে কথা, “এখন পাড়া-পড়শিরা আর কানাকানি করে না । সবাই দাঁতের ডাক্তার বলে। নিজের ফার্মেসিতে বসি। দাঁতের চিকিৎসাও করি। যেমন – দাঁত তোলা, ফিলিংকরা, দাঁত বাঁধানো, কোন সময় কি ঔষধ খেতে হবে যাবতীয় কাজই এখন পারি। সিঙ্গাইর বাসস্ট্যান্ডে আমার চেম্বার ও ঔষধের দোকান। দোকানে বসলে ২/৩ হাজার আয় হয়।” অভিবাবকরাও এখন ভাল ভাবে কথা বলে। পাড়া-পড়শি, আত্মীয়-স্বজনদের দাঁতের কোন বিষয় সমস্যা হলে আমার কাছে আসে পর্রামশ নেবার জন্য। এখন আর কেউ আমাকে আপেয়া বলে না। যারা আমাকে দেখে একদিন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল- তারাই আসে নানান বিষয়ে পরামর্শ নিতে। আমাদের পাড়া থেকে দুইজন বৌদি এসেছিল জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে পরামর্শ নিতে। তাদেরকে বললাম এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিলাম।  সমাজের লোকজন আমাকে মূল্য দিচ্ছে- তাতেই আমি খুশি।”
DSC02571
স্বপ্ন এখন আকাশসম
গীতা দাস একদিন স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বামীর সংসার করবে  সংসারী হবে  কিন্তু এখন তার স্বপ্ন হল সে আর সমাজে সংসারে অবহেলার পাত্র হবে না। বোঝা হয়ে থাকবে না কারো । গীতা বলে, “আমি আর বিয়ের পিড়িতে বসতে চাই না। ইতিমধ্যে কয়েকটা সমন্ধ এসেছে। আমি না করে দিয়েছি। পুরানো কথা গুলো এখনো মনে দাগ কেঁটে আছে।”  গীতা এখন স্বপ্ন দেখে তার পরিবার এবং সম্প্রদায়কে নিয়ে। অতি দরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েও সে একজন আতœনির্ভরশীল নারী হয়ে বাঁচতে চান। গীতা ভবিষ্যতে দোকান আরো বড় করতে চান। অপ্রান চেষ্টা করে স্বপ্নকে বাস্তব করে তুলতে চায়। সে তার স্বপ্নকে আরো বিস্তৃত করেছে, “আমাদের মনিদাস সম্প্রদায়ে যে সমস্ত নারী, কিশোরী অবহেলিত এবং নির্যাতিত; তাদের এগিয়ে নিতে পারলে আমাদের জনগোষ্ঠি আর পিছিয়ে থাকবে না। তারা সমাজে নিজের এবং পরিবারের অধিকার আদায় করতে পারবে।” গীতার চাওয়া হচ্ছে প্রতিটি পরিবার থেকে যেন তার  মতো মেয়েরা ঘরে না বসে নিজের পায়ে দাঁড়ায়।

আমাদের গ্রাম-গঞ্জে, সমাজে এমন অনেক মেয়েরা আছেন যারা শ্বশুর বাড়ি থেকে বিভিন্ন প্রতারণা আর নির্যাতনেরর শিকার হয়ে বাপের বাড়িতে ফিরে আসে। মানুষের কানকথার জন্য তাদের বেঁচে থাকাই দুরূহ হয়ে ওঠে। গীতা নিজের মেধা, উদ্যোগ আর আগ্রহ দিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সেই সমস্ত নারীদের দেখিয়ে দিয়েছে আমরা মেয়েরাও পারি নিজের, পরিবার, দেশ ও জাতির জন্য কিছু করতে। ছেলেদের মতো মাথা উঁচু করে সমাজে দাঁড়াতে। পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে প্রতিটি ঘরে-ঘরে মেয়েদের বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। পাশাপাশি মেয়েদের কারগিরি শিক্ষার দিকে খেয়াল রাখতে হবে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.