Posted in

বীরপ্রতীক আতাহার আলীর নামেই ধলেশ্বরী নদীর ব্রিজটির নাম হোক

মানিকগঞ্জ থেকে আব্দুর রাজ্জাক  

২৬ শে মার্চ। মহান স্বাধীনতা দিবস। সকালে পৌঁছে গেলাম একজন অকুতোভয় বীর সেনানীর বাড়ি। মানিকগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার বাড়ই ভিকরা গ্রামে তার বাড়ি। তার নাম আতাহার আলী খান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখায় পেয়েছেন মর্যাদাপূর্ণ ‘বীরপ্রতিক’ খেতাব। মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন খেতাবপ্রাপ্ত মানিকগঞ্জের ৩ মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে একমাত্র তিনিই বেঁচে আছেন।

manikgonj
আমাদের দেখে অমিলন স্মিত হাসিতে বললেন, “বসেন বাবাজিরা। জানি, আপনারা আসবেন। আজ যে স্বাধীনতা দিবস। বছরের এই দিনটায় অনেকেই আসে, ছবি তোলে।” কুশল বিনিময় করার আগেই তার এমন উত্তর যেন আগে থেকেই জানা ছিল। তার দুঃখবোধ, তার আবেগী মনের কথা বলার অধিকার যে তাঁর আছে; তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয়ের মাস এলেই খোঁজ পড়ে তার। সাংবাদিকরা আসেন, ছবি তোলেন, ঝলমলে পাঞ্জাবি পরে নেতাদেরও কেউ কেউ আসেন, কুশল জিজ্ঞেস করেন, আশ্বাস দেন, চলেও যান। তারপর সব আগের মতোই সাদামাটা। বাকি দিনগুলো কেমন করে কাটছে, কী খাচ্ছে, সংসারই বা চলছে কী করে কেউ কোনো খবর রাখে না। পরিবার-পরিজন ছেড়ে মৃত্যু ভয়কে তাড়িয়ে বেড়ানো সেই বীরপ্রতিক মুক্তিযোদ্ধার চোখে আজ অশ্রু! জীবনের পড়ন্ত বেলায় আজ সে বড়ই অসহায়, বড়ই একাকী, নিঃসঙ্গ। অবহেলা আর দারিদ্র তাকে অক্টোপাসের মতো জাপটে ধরেছে।

তরুণ বয়সে রক্তে যখন টগবগে- বিভোর ছিলেন যুদ্ধ জয়ের নেশায়। অস্ত্র আর গোলাবারুদের সাহায্যে মেতেছিলেন শত্রু ধ্বংসের খেলায়। উনি যখন সেই সময়কার স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন তখন আমিও তার চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম এক অন্যরকম আগুন। চলুন শোনা যাক তারই মুখে সে সময়ের কথা। “১৯৬৩ সালের জানুয়ারি মাস। বাবার সঙ্গে অভিমান করে চট্টগ্রামে চাচার বাড়ি চলে গেলাম। স্কুল জীবনে ভালো ক্রীড়াবিদ ছিলাম। সে সূত্রে চট্টগ্রাম পোর্ট থেকে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল্সে- ইপিআর (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) এ চাকরি পেলাম। প্রশিক্ষণ শেষে পোস্টিং হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের পাটগ্রামে। চাকরির আট বছরের মাথায় এলো ১৯৭১। তখন টগবগে তরুণ আমি। বিন্দুমাত্র দ্বিধা করিনি, ভাবিনি পরিবার-পরিজনের কথা। দেশ মাতৃকার টানে সোজা যুদ্ধের ময়দানে। ভূরুঙ্গামারী কলেজে পাকসেনাদের একটি ক্যাম্পে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে ২০ জনের মতো খানসেনা মেরে তাদের অস্ত্র ছিনিয়ে নিই। এরপর রায়গঞ্জে পাকসেনাদের হেড কোয়ার্টারে আক্রমণ চালাই। লে. সামাদসহ আমাদের ১২-১৩ জন সহযোদ্ধা শহীদ হয়। আমরা বাধ্য হয়ে পিছু হটে আসি। তবে এ ঘটনার প্রতিশোধ নেবার জন্য আমরা পাগল হয়ে পড়েছিলাম। সেদিন ছিল ১৪ই ডিসেম্বর। এবার আর ব্যর্থ হইনি। আমাদের মরণপণ হামলায় রায়গঞ্জ হেড কোয়ার্টারে অবস্থানরত ১শ’রও বেশি পাকি সৈন্যকে আমরা খতম করি। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ প্রায় ৯ মাস বৃহত্তর রংপুর, লালমনিরহাট, রায়গঞ্জ, জয়পুরহাট ভুরুঙ্গামারীসহ বিভিন্ন সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছি।” শীর্ণকায় শরীর, জ্বলজ্বল করতে থাকা কোটরাগত গৌরবোজ্জ্বল চোখ আর এক দূর্বার গতি চেহারায় আতাহার আলী বললেন, “দেশ স্বাধীন হবার পর পেয়েছিলাম মর্যাদাপূর্ণ বীরপ্রতিক খেতাব। একজন সৈনিকের জন্য এরচেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে!”

তবে যুদ্ধশেষে স্বাধীন বাংলাদেশে ফের চাকরিতে যোগ দিলেও পূর্ণ মেয়াদে চাকরি করবার ভাগ্য হয় নি বীরপ্রতীক আতাহার আলীর। বরং চরম অসম্মান নিয়ে ফিরে আসতে হয় তাঁকে। ১৯৮৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভালুকাপাড়ায় শান্তিবাহিনী আতাহার আলীদের ক্যাম্পে আক্রমণ চালিয়ে ৩ সৈনিককে হত্যা করে। আকস্মিক এ হামলা ঠেকানোর ব্যর্থতার দায়ে আতাহার আলীসহ ১০ বি.ডি.আর. সদস্যকে বরখাস্ত করা হয় তখন।  অথচ এ ব্যর্থতার দায় তাঁর ছিল না। দায়িত্বে ছিল না কোনো গাফিলতি। এরপর মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রণালয়ে ঘুরেও চাকরি ফিরে পান নি এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। একবারও বিবেচনায় আনা হয়নি তাঁর বীরপ্রতীক খেতাব প্রাপ্তির গৌরব। আক্ষেপ করে বললেন, “রাজনীতি করি না বলে অথবা বিত্ত-বৈভব নেই বলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সে সম্মানটাও কেউ আগের মত দেয় না। যেটুকু দেয় সেখানেও মিশে থাকে করুণা।” এসব স্মৃতিকথায় অশ্রুসিক্ত হন আতাহার আলী খান। প্রচন্ড মানসিক যন্ত্রণা কুড়ে কুড়ে খায় তার অন্তরাত্ত্বাকে। চোখ গড়িয়ে নামে অশ্রুধারা। সেই থেকে অভাব, অনাহার, ক্ষুধা তাঁর পরিবারকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।” অপ্রাপ্তির খাতায় আরো যোগ করে বলেন, “মানিকগঞ্জ শহরে দুঃস্থ মুক্তিযোদ্ধাদের নামে বেশ ক’টি মার্কেট হয়েছে। কিন্তু একটিও দোকান বরাদ্দ জোটেনি আমার নামে।”

“ভেবেছিলাম চাকরি গেছে তো কী হয়েছে- মুক্তিযোদ্ধার সম্মান নিয়েই বেঁচে থাকবো। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে দেখলাম সে সম্মানটুকুও কেউ অন্তর দিয়ে দিতে চায় না। তাই বাধ্য হয়ে অভাব আর অবহেলায় দগ্ধ হয়েও মানিকগঞ্জের এই অজপাড়া গাঁয়ে বাপদাদার মাটি কামড়ে পড়ে আছি। বাড়িতে সাংবাদিক আর নেতাদের আনাগোনা দেখলে গ্রামের মানুষ টের পায় স্বাধীনতা দিবস অথবা বিজয় দিবস আসছে।”

আতাহার আলীর বয়স সত্তরের কোটা পেরিয়ে গেছে বেশ কয়েক বছর আগেই। জীবনের পড়ন্ত বেলায় অসুখ-বিসুখ বাসা বেঁধেছে শরীরে। এরইমধ্যে তার স্ত্রী পরপারে চলে গেছেন। এখন অনেকটা একাকী জীবনযাপন করতে হচ্ছে এই বীরপ্রতীককে। একমাত্র ছেলের রোজগারেই তার বেঁচে থাকা। কিচ্ছু চাওয়ার নেই আতাহার আলীর। অভাবে নয়, কষ্ট বাড়ে শুধু অবহেলায়।

এলাকাবাসীর আকাঙ্খা তাদের গ্রামের পাশে ধলেশ্বরী নদীতে যে ব্রিজটি হবে তা যেন বীরপ্রতীক আতাহার আলীর নামেই হয়! এটুকু সম্মানও কি দিতে পারি না আমরা মানিকগঞ্জবাসী। সংশ্লিষ্ট্য সকলের কাছেই বিনীত নিবেদন এই সম্মানটুকুও দিতে যেন কার্পণ্য না করেন।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.