সাম্প্রতিক পোস্ট

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেনের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেনের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা

গাইবান্ধা থেকে শহিদুল ইসলাম

“গ্রামের নাম কালাসোনা। চরের নাম কালাসোনা। সোনার মতো মূল্যবান বলেই এর নাম কালাসোনা। দেশের স্বাধীনতা আনতে যে সোনার মানুষগুলো রক্ত দিয়েছিলো তাঁর অনেক স্মৃতিমাখা আমাদের এই কালাসোনার চর।” কথাগুলো বলেছিলেন গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের কালাসোনা গ্রামের অধিবাসি বীরমুক্তিযোদ্ধা ও প্লাটুন কমান্ডার আবুল হোসেন। তখন ২০১০ সাল। সবেমাত্র মাঠের সাথে পরিচয় ঘটতে শুরু করেছে এই প্রতিবেদকের। যথাযথ নিয়মেই তখন আমরা কথা বলি গ্রামের প্রতিথযশা ও সর্বশ্রেণীর মানুষের সাথে। জানতে চাই এলাকার ইতিহাস ও বৈচিত্র্যের কথা। আরো শিখতে চাই সমস্যা ও সম্ভাবনার দিকগুলো কিভাবে মোকাবেলা ও কাজে লাগান স্থানীয় মানুষগুলো।
একজন গবেষক ও উন্নয়নকর্মী হিসেবে সবসময় শেখার ইচ্ছায় কাটতো মাঠের প্রতিটি দিন। আর আমদের শিক্ষকের ভূমিকায় অটো রোলপ্লে করতো গ্রামের সেই মানুষগুলো। যাদের রসদে আমরা অনেকেই এগিয়ে যাই কাঙ্খিত প্রত্যাশার প্রত্যয়ে। সেরকমই একজন শিক্ষক ছিলেন বীরমুক্তিযোদ্ধা ও প্লাটুন কমান্ডার আবুল হোসেন। তিনি আর এই পৃথিবীতে দেহের অবয়বে নেই! আছেন মনে ও দেশের স্বাধীনতার স্মৃতীতে। আরো আছেন তাঁর স্মৃতিময় কর্মের মধ্যে দিয়ে। বিগত ১৭ ডিসেম্বর তিনি চলে গেলেন মহাকালেন উদ্দেশ্যে। তোমায় বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই!
DSC01877
কালাসোনার ইতিহাস অনেক দীর্ঘ এবং জৌলুসপূর্ণ । যুগে যগে এখানে নানা স্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছে। গাইবন্ধা তথা গোটা উত্তরবঙ্গের মধ্যে কালাসোনার চর একটি অন্যতম পরিচিত নাম। এই নামের সাথে যে মানুষটি কালাসোনার আরো অলংকার বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি হলেন বীরমুক্তিযোদ্ধা ও প্লাটুন কমান্ডার আবুল হোসেন। একসময় কালাসোনাকে গ্রাম হিসেবেই চিনতো সবাই। কালের বিবর্তনে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে নদী ও রূপের সাথে কালাসোনাকে এখন অনেকে চিনেন কালাসোনার চর নামে। লোকমুখে শোনা যায়-প্রায় ৩০০-৪০০ বছর আগে শ্রী কালামানিক চন্দ্র বর্মণ নামের একজন নেতৃত্বেদানকারী যোদ্ধা বসবাস করত এখানে। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাধর ও প্রতাপশালী। তার নামানুসারেই এই গ্রামের নামকরণ হয় কালাসোনা গ্রাম। যা পরবর্তীতে নদীভাঙনের শিকার হয়ে আবার জেগে উঠার পর নাম হয় কালাসোনার চর।
এখনে বলে নেয়া ভালো যে, কালাসোনার নামকরণে লোকমুখে আরো কিছু গল্পকাহিনী আছে। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে কালাসোনার রয়েছে অনেক অবদান। কালাসোনা চর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ৬নং সেক্টরের আওতাভুক্ত ছিলো। এই সেক্টরের রণাঙ্গন পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত ছিল। ভৌগলিক অবস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করার ক্ষেত্রে এই কালাসোনা চরের অবদান ছিলো তাই অপরিসীম। কালাসোনার চরটি ব্রহ্মপুত্র নদীর পাশে ভারতের নিকটবর্তী হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীন ভূমি হিসেবে ব্যবহার হিয়েছিল। এ গ্রাম থেকে কালাসোনাসহ অত্র অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের পরিকল্পনাসহ যুদ্ধ পরিচালনা করত। নিরাপদ ঘাঁটি হওয়ায় সব সময় এখানে ৪৫০-৫০০ জন মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান করত। এখানে প্রায় ৩০-৪০ জন শহীদ মুক্তিযোদার গণকবর ছিলো। যা ২০১১ সালে নদীগর্ভে বিলীন হয়। এই স্মৃতিময় কালাসোনার গণকবর এবং কালাসোনাকে রক্ষায় অনেক চেষ্টা করেছেন বীরমুক্তিযোদ্ধা ও প্লাটুন কমান্ডার আবুল হোসেন। নিজে কালাসোনা রক্ষা কমিটির আহবায়ক ছিলেন। নদীভাঙন থেকে কালাসোনাকে রক্ষার জন্যে তিনি জেলা উপজেলাসহ নানা জায়গায় যোগাযোগ করেছেন। করেছেন আন্দোলন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনটাই রক্ষা হয়নি!

DSC01896

২০১৫ সালে প্রায় গোটা কালাসোনা নদী গর্ভে বিলীন হয়। জাতীয় বীরদের স্মৃতিও রক্ষা করা যায়নি। সে সময় সরকারের উদাসীনতা এবং অবহেলার কারণেই আমাদের হারাতে হয়েছে জাতীয় বীরদের কবরস্থান। একই সাথে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন হাজার হাজার পরিবার। তিনি নিজেও বাড়িভিটা হারিয়ে ফুলছড়ির কালিরবাজার এলাকায় নতুন করে বসতি গড়ে তুলেছিলেন। সেখানেই তিনি উল্লেখিত তারিখে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। অথচ এই কালাসোনার শস্য ফসল এই দেশের খাদ্য যোগানে অবদান রাখতো। অপরিকল্পিত কার্যক্রমের কারণে এখনো নদী ভেঙেই যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত নদীর গভীর খননের কার্যকর কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বীরমুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসন স্বপ্ন দেখতেন কালাসোনা কখনো নদী গর্ভে বিলীন হবে না। কারণ এখানে আছে জাতীয় বীরদের কবরস্থান এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। কিন্তু এই জাতীয় বীরের স্বপ্ন আমরা রক্ষা করতে পারিনি। এই জাতীয় বীরের স্বপ্ন এবং তাঁর কর্মময় জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: