সাম্প্রতিক পোস্ট

জ্বালানি বাণিজ্যের চশমায় প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন

:: পাভেল পার্থ, লা বুর্জ, প্যারিস, ফ্রান্স থেকে

SAM_7505একসময় বাংলা রচনার বইতে একটি রচনা বাংলাদেশের অনেককেই পড়তে হয়েছে। ‘বিজ্ঞান আর্শীবাদ না অভিশাপ?’ রচনাটি একতরফাভাবে ‘বিজ্ঞান আর প্রযুক্তিকে’ গুলিয়ে ‘বিজ্ঞানের’ একটা নিদারুণ মানে দাঁড় করিয়েছিল। বিজ্ঞান যেখানে একই সাথে আর্শীবাদ আবার অভিশাপ। অভিশাপ বোঝাতে সেই রচনায় বারবার টেনে আনা হতো আণবিক বোমার উদাহরণ। বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের আবিষ্কৃত আণবিক বোমা কীভাবে যুদ্ধ আর সর্বনাশ তৈরি করে তার ফিরিস্তি। বাংলা রচনার সেই যুগ এখন তেমন একটা দেখা যায় না। কিন্তু বিজ্ঞান ঘিরে চিন্তার এই বৈষম্যমূলক মনস্তত্ত্ব আজও বদলায়নি। জ্বালানি শক্তি ঘিরে এই তর্ক চলতি সময়ে আরো জোরালো হয়ে ওঠেছে। চলমান নয়া উদারবাদী সভ্যতা টিকে থাকছে জীবাশ্ম জ্বালানির রক্তপ্রবাহে। তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক ক্ষমতার তুমুল দ্বন্দ্ব সংঘাত। জীবাশ্ম জ্বালানির এই তর্ক আজ প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনেও হাজির হয়েছে। তর্কটি একেবারেই ‘বিজ্ঞান আর্শীবাদ না অভিশাপ’ এই কিসিমের বর্ণবাদী আওয়াজের মতই। অনেকেই বলছেন, এটি পুঁজিবাদী সভ্যতার সংকট। সাথে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক মন্দা, অভিবাসন ও নিরাপত্তা প্রশ্ন। ৩০ নভেম্বর ২০১৫ থেকে শুরু হওয়া জাতিসংঘের রাষ্ট্রপক্ষের ২১তম জলবায়ু আসরের মূখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘জ্বালানি তর্ক’। বলা হচ্ছে, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারই দুনিয়ার বুকে কার্বনের নির্মম দাগ ফেলেছে। কার্বন চাদরে জড়িয়ে যাওয়া পৃথিবী গ্রহের উষ্ণতা বেড়েই চলছে। উষ্ণতার মাত্রা টেনে ধরতে গত বিশটি জলবায়ু সম্মেলন পাড়ি দিয়েছে বিশ্ব। এবার দরবার চলছে প্যারিসের লা বুর্জে। উন্নত ধনী দেশ, দ্রুত উন্নয়নশীল অর্থনীতি, দ্বীপরাষ্ট্র ও স্বল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো এই সম্মেলনে সামিল হলেও সবকিছুই যেন নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে জ্বালানি বাণিজ্যের কলকাঠির ভেতর। জলবায়ু সংকটের সকল সূত্রকে আড়াল করে যাবতীয় সমস্যার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে ‘জীবাশ্ম জ্বালানিকে’। যেন তেল, গ্যাস আর কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার বন্ধ করলেই জলবায়ু সংকট কাটবে। দুনিয়ার উষ্ণতা কতটুকু বাড়বে বা কতটুকু কমানো যাবে এ নিয়ে ধনী দেশগুলো একেবারেই নিশ্চুপ। কিন্তু জ্বালানি শক্তির ধরণ নিয়ে সবদিক থেকেই চলছে গুঞ্জরণ। জীবাশ্ম জ্বালানিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে আরো বহুমাত্রিক জ্বালানির ধরণকে বৈশ্বিক বৈধতার বাহাদুরি প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের চারধার জুড়ে। প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের সব আয়োজন যেন নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোড়কে জলবায়ু সংকটকে সামনে রেখে জ্বালানি বাণিজ্যের নয়া দরবার স্থল।

প্যারিসের লা বুর্জ এলাকায় নিরাপত্তা বলয়ে শুরু হওয়া এ সম্মেলনটি মোট পাঁচটি বড় মিলনায়তন ও প্যাভিলিয়নে বিন্যস্ত। ১, ২ এবং ৩ মিলনায়তন কক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের কেন্দ্র ও প্যাভিলিয়ন। ৫নং কক্ষটি গণমাধ্যমের। ৪নং কক্ষে বেসরকারি পরিদর্শকদের প্রদর্শনী থাকলেও রাষ্ট্রপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশও জায়গা পেয়েছে এখানেই। সম্মেলনের এই অংশগুলো কেবলমাত্র জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক দপ্তর কর্তৃক নিবন্ধিতদের জন্য। এছাড়াও আছে ‘জেনারেশন অঞ্চল’ যেখানে প্রতিবাদ ও প্রশ্ন করতে নিবন্ধনহীন যে কেউ যেতে পারছে। সম্মেলনজুড়ে রাষ্ট্র, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও নানা এজেন্সি নানাভাবে তুলে ধরেছে পানিবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, সৌরশক্তি ও পারমাণবিক শক্তির নানাদিক। এসব শক্তি সম্পর্কিত বাণিজ্যে যুক্ত প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র ও কোম্পানিরা খুবই কৌশলে তাদের বিজ্ঞাপন প্রচার করে যাচ্ছেন। আর এসব বিজ্ঞাপন অনিবার্যভাবে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে জলবায়ু সংকটে মুষড়ে পড়া গরিব স্বল্পোন্নত দেশগুলোর টিকে থাকবার নির্মম লড়াইয়ের মুখচ্ছবিতে। বিষয়টি এমন যে, জীবাশ্ম জ্বালানি হল অভিশাপ, আর তাই জলবায়ু সংকট থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির’ বিকল্প নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবসা বাণিজ্য ইতোমধ্যেই যেসব রাষ্ট্র ও এজেন্সি দখল করেছে তারা আরো অধিকতর ‘জলবায়ুপ্রেম’ দেখাচ্ছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘আন্তর্জাতিক হাইড্রোপাওয়ার এসোসিয়েশন’ ২০১৫ সনের হাইড্রোপাওয়ার স্ট্যাটাস প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

SAM_7765প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, বিশ্বে পানিবিদ্যুৎ ভিত্তিক শক্তির পরিমাণ ১,০৩৬ গিগাওয়াট। বিশ্বের ১৬ শতাংশ বিদ্যুৎ চাহিদা এখান থেকেই পূরণ হয়। আফ্রিকা ২৭,০২৮ মেগাওয়াট, দক্ষিণ এশিয়ায় ১৫৫,৯৬৮ মেগাওয়াট, পূর্ব এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে ৩৬৪,০১৭ মেগাওয়াট, ইউরোপে ১৬৬,১১৩ মেগাওয়াট, উত্তর আমেরিকায় ১৬৬,১৩৩ মেগাওয়াট এবং দক্ষিণ আমেরিকায় ১৪৭,৮৮০ মেগাওয়াট শক্তি উৎপাদিত হয় পানি থেকেই। দক্ষিণ এশিয়ার ভেতর ভারতে পানিবিদ্যুৎ উৎপাদনের হার বেশি এবং তা ৪৪,৭৯৯ মেগাওয়াট। বাংলাদেশে ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পানি থেকে উৎপাদিত হয়। প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দেয়া ভূটানের কৃষি ও বনমন্ত্রণালয়ের লবজাং দর্জি জানালেন, ভূটানে ১,৪৮৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাহাড়ি নদীকে বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয়। আর এই পানিবিদ্যুতের জন্য প্রয়োজন গভীর বনভূমি। ভূটান জাতীয় বন তথ্যভান্ডার তৈরি করেছে এবং পানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বনভূমি ব্যবস্থাপনার উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু সম্মেলনের ‘জেনারেশন অঞ্চলে’ দুনিয়ার নানাপ্রান্তে থেকে আগত আদিবাসী সংগঠন ও প্রতিনিধিরা বৃহৎ বাঁধ ও পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধিতা করছেন। তাদের ভাষ্য, পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের ফলে অরণ্য বাস্তুতন্ত্র, প্রাণবৈচিত্র্য ও আদিবাসী জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে। যেমন, ১৯৬১ সনে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য প্রায় এক লাখ মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। ইন্দোনেশিয়ার প্রাণবৈচিত্র্য ও আদিবাসী অধিকার নিয়ে কর্মরত সংগঠন ‘কেহাতির’ উদ্যোক্তা ইরনা উইটোএলার জানান, বৃহৎ পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো কখনোই প্রাণবৈচিত্র্য ও মানুষের সংস্কৃতির সহাবস্থানকে গুরুত্ব দেয় না। এভাবেই উন্নয়ন গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে এবং এই নয়াবনযোগ্যশক্তির নামে এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে এটি জলবায়ু পরিবর্তনকে আরো জটিল করবে।

হাফিংটোন পোস্ট ও টাইমে মুক্ত সাংবাদিকতা করেন মেনন ভারচোট, ‘গ্রাউন্ড ট্রুথ প্রকল্পের’ হয়ে এসেছেন জলবায়ু সম্মেলনে। নিজের আশংকা জানিয়ে বাংলাদেশের সুন্দরবনের ধারে শুরু হওয়া কয়লাভিত্তিক রামপাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের কথা জানতে চাইলেন। জনগণের যাবতীয় আশংকা ও দাবিকে অস্বীকার করে ভারতের এনটিপির সাথে যৌথভাবে শুরু হওয়া এই প্রকল্প বাতিল করে সুন্দরবন সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন প্যারিসে বসবাসরত বাংলাদেশি নাগরিক সমাজ। উদীচী, সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির প্যারিস শাখার পক্ষে ৭ ডিসেম্বর সম্মেলনস্থলের ‘জেনারেশন অঞ্চলে’ এই প্রতিবাদ জানানো হয়। সম্মেলনে যোগ দেয়া ভারতের এনটিপিসি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার প্রকাশ ডি হিরানি রামপাল তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে পরিবেশবাদী নাগরিক সমাজের আশংকাকে উড়িয়ে দিলেন। আলাপকালে জানান, পৃথিবীর অধিকাংশ জ্বালানিশক্তি কয়লানির্ভর, এটি প্রায় ২০০ বছর ধরে চলে আসছে। কখনোই এটি প্রাণবৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। কয়লানির্ভর শিল্পের কার্বন নির্গমন বেশি, তাই এটি যৌক্তিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। কারণ পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে কার্বন নির্গমন কম হলেও সেখানে নানা ঝুঁকি আছে যা কোনো কারণে ভিন্নভাবে ব্যবহৃত হলে সর্বনাশ ডেকে আনবে। কয়লাভিত্তিক প্রকল্পে এমন কোনো বিপদের আশংকা নেই।

প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে খুব কৌশলে অনেকেই পারমাণবিক শক্তির সাফাই তৈরি করছেন। ‘আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি এজেন্সি (আইএইএ)’ এ ব্যাপারে পারমাণবিক বাণিজ্য বিস্তারে নাগরিকদের ভেতর একটা সম্মতিক্ষেত্র তৈরির কাজ করে যাচ্ছে। ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও পারমাণবিক শক্তি ২০১৫’ শিরোনামে একটি পুস্তিকাও প্রকাশ করেছে। সম্মেলনে যোগ দেয়া সংগঠনের পারমাণবিক শক্তি বিভাগের জ্বালানি অর্থনীতিবিদ লোরেটা স্টানকেভিসিউটন জানান, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় পারমাণবিক শক্তি আমাদের নতুন সম্ভাবনা। একে বোমা হিসেবে নয়, শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে। এটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি না হলেও এটি বিশ্বস্ত এবং আগাম অনুমান করা যায়। এতে খুবই কম কার্বন নির্গমণ ঘটে এবং কম বায়ু দূষণ হয়। কিন্তু পারমাণবিক শক্তি বাণিজ্যের বিরুদ্ধে রাউলি পার্টানেন এবং জান্নে এম কোরহোনেন সম্মেলন উপলক্ষে একটি বই প্রকাশ করেছেন। ‘ক্লাইমেট গেম্বেল: ইস এন্টি নিউক্লিয়ার অ্যাক্টিভিজম এন্ডেজারিং আওয়ার ফিউচার’ শীর্ষক বইতে তারা পারমাণবিক শক্তি নিয়ে নতুন জ্বালানি তর্ককে ‘জলবায়ু-জুয়া’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ভিয়েনায় অবিস্থত আইএইএ সংগঠনের সদস্যরাষ্ট্র বাংলাদেশও। ১৯৬১ সন থেকে চেষ্টা চালালেও পাবনার রূপপুরে ২০১৩ সনে রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে। কিন্তু চেরনোবিল থেকে জাপান পারমাণবিক প্রকল্পের ভয়াবহ বিপদের আশংকা কোনোভাবেই আজও কেউ নিশ্চিত করতে পারছে না।

এভাবেই জলবায়ু সম্মেলন নামের প্যারিস সভাটি হয়ে ওঠেছে মূলত ‘জ্বালানি সম্মেলন’। রাষ্ট্র এবং বহুজাতিক এজেন্সিগুলো কোন ধরণের জ্বালানির বাণিজ্য করবে তাই হয়ে দাঁড়াচ্ছে সম্মেলনের প্রধান তর্ক। কার্বন নির্গমনের মাত্রা, প্রশমন, অভিযোজন, লস এন্ড ড্যামেজ, জলবায়ু তহবিল এসব মাঝে মধ্যে ঝলক হিসেবে দেখা দিচ্ছে। স্মরণে রাখা জরুরি এখনও বিশ্বের মোট বিদ্যুতের ৬৭ ভাগ আসছে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে। পারমাণবিক শক্তি থেকে ১৩ ভাগ ও নবায়নযোগ্য প্রায় ২০ ভাগ। জ্বালানি বাণিজ্যই দুনিয়ার ক্ষমতা ও বাহাদুরিকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর জীবাশ্ম জ্বালানির এই নিয়ন্ত্রণ এখনও মার্কিন ও আরব মুলুকের। যুদ্ধ, হামলা, সংঘাত, নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক সহিংসতা সবকিছুই জড়িয়ে আছে এই জ্বালানি তর্কের সাথে। তবে জলবায়ু-জিজ্ঞাসাকে প্রাণ ও প্রকৃতির ঐতিহাসিক বহমানতা থেকেই দেখা জরুরি, কোনোভাবেই শুধুমাত্র একতরফা জ্বালানি বাণিজ্যের চশমায় নয়। বিশ্বব্যাপী সহস্র কোটি প্রাণ দিনের পর দিন তাকিয়ে থাকে বিশ্ব বাহাদুরদের দিকে। আশা করি বিশ্ব বাহাদুরেরা চোখ থেকে খুলে ফেলবেন ‘জ্বালানি বাণিজ্যের চশমা’, তাকাবেন বিশ্বব্যাপী মানুষের টিকে থাকবার এবং দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখবার দুর্দান্ত সংগ্রামের দিকে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: