সাম্প্রতিক পোস্ট

‘আগাছা বলে কিছু নেই- হয় সেটা ঔষধি, না হয় খাদ্যের বনজ উৎস’-সংলাপে বক্তারা

15গত ২১ নভেম্বর ২০১৫ সাতক্ষীরায় নিরাপদ খাদ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং কুড়িয়ে পাওয়া পুষ্টির প্রাকৃতিক উৎস সংরক্ষণ বিষয়ক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাতক্ষীরা উপজেলা পরিষদের ডিজিটাল কর্নারে ‘আগাছা বলে কিছু নেই- হয় সেটা ঔষধি, না হয় খাদ্যের বনজ উৎস’ শিরোনামের সংলাপটি আয়োজন করে বারসিক। সংলাপে অংশ নেন সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আমজাদ হোসনে, বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্দ কৃষাণী ফরিদা পারভীন, বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্ত কৃষাণী আল্পনা রাণী, কৃষক বাবর আলী, সংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জী, সাংবাদিক এম কামরুজ্জামান, তুজলপুর সিআইজি কৃষক ক্লাবের সভাপতি ইয়ারব হোসেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ প্রোগ্রামের সেন্ট্রাল ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর ডা. সুব্রত ঘোষ, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হাসান রেজা, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রঘুজিৎ গুহ প্রমুখ। সংলাপে বক্তারা সাতক্ষীরা জেলার খাদ্য পরিস্থিতি, নিরাপদ খাদ্য, অপুষ্টি এবং কুড়িয়ে পাওয়া প্রাকৃতিক খাদ্যগুলোর প্রয়োজনীয়তা ও পুষ্টিগুণ নিয়ে আলোচনা করেন। সংলাপে বক্তাদের বক্তব্যগুলোকে বারসিক নিউজ.কম এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন শেখ তানজির আহমেদ

সভাপতি
আবুল কালাম আজাদ, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক পত্রদূত

প্রধান অতিথি
অরুন কুমার মন্ডল, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সাতক্ষীরা

স্বাগত বক্তব্য
শাহীন ইসলাম, আঞ্চলিক সমন্বয়কারী, বারসিক

আলোচক
কৃষিবিদ আমজাদ হোসেন, সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, সাতক্ষীরা
কল্যাণ ব্যানার্জি, নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথমআলো, সাতক্ষীরা
এম কামরুজ্জামান, জেলা প্রতিনিধি, সমকাল/এটিএন বাংলা
ফরিদা পারভীন, বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্ত কৃষাণী, হায়বাতপুর, শ্যামনগর
অল্পনা মিস্ত্রী, বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্ত কৃষাণী, ধুমঘাট, শ্যামনগর
ইয়ারব হোসেন, সভাপতি, তুজলপুর-আখড়াখোলা সিআইজি (ফসল) সমবায় সমিতি
শেখ তানজির আহমেদ, জেলা প্রতিনিধি, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
ডা. সুব্রত ঘোষ, সেন্ট্রাল ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
হাসান রেজা, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকতা, সাতক্ষীরা সদর
রঘুজিৎ গুহ, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, সাতক্ষীরা পৌর
বাবর আলী, অচাষকৃত পুষ্টিকর সবজি বিক্রেতা
সাইদুর রহমান, শিক্ষার্থী, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ

শাহীন ইসলাম
আঞ্চলিক সমন্বয়কারী, বারসিক
সাতক্ষীরায় বাৎসরিক ৩,৫৯,৬২০ মেট্রিক টন খাদ্য প্রয়োজন। সেখানে এ জেলায় উৎপাদন হচ্ছে ৬,৩৩,০১৯ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য। অর্থাৎ জেলায় প্রতিবছর ২,৩১,৫৭৫ মেট্রিক টন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকছে। এ অর্থে সাতক্ষীরা জেলাকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলা যায়। আবার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের সর্বশেষ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) অনুযায়ী সাতক্ষীরার ২৯.৫ শতাংশ শিশু অপুষ্টিজনিত কারণে কম ওজন নিয়ে জন্ম গ্রহণ করছে। আর ইউএন রিচের তথ্য অনুযায়ী, অপুষ্টি দূরীকরণে সরকারের কৃষি, খাদ্য, জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাশাপাশি ১৯টি সরকারি দপ্তর ও ৩৫টি দেশীয় বেসরকারি সংস্থা বিভিন্ন দাতাসংস্থার সহায়তায় সাতক্ষীরায় খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির উন্নয়নে কাজ করছে। আবার যে খাদ্য গ্রহণ করা হচ্ছে- তা নিরাপদ কিনা তা নিয়ে সর্বদা চিন্তিত থাকছে সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশের প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ এখনো গ্রামে থাকে। গ্রামীণ অপুষ্টি দূরীকরণে বরাবরই ভূমিকা রাখে হেলেঞ্চা, কলমি, শাপলা, গিমে, থানকুনি, আদাবরুণ, বউটুনি, গাদোমনি, কালো বনকচু, ঘেটকোল, আমরুলসহ বিভিন্ন কুড়িয়ে পাওয়া শাক। বাংলাদেশের খাল-বিল, নদী-নালা, পতিত জমি, বাড়ির আশপাশেই রয়েছে এসব শাক-সবজি। যা মানুষের খাদ্যদ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আবার যেগুলো মানুষ খায় না সেগুলো পশু খাদ্য হিসেবেও স্বীকৃত। এসব সবজি সংরক্ষণ যেমন জরুরি, তেমনি এর ব্যবহারও বাড়ানো দরকার। মূলত খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, বিদ্যমান অপুষ্টি ও নিরাপদ খাদ্য-এসব বিষয়ে পুষ্টির প্রাকৃতিক উৎসগুলো কিভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ও কীটনাশক আমাদের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে কিভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে, এ সংকট দূরীকরণে প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, স্থানীয় জনগণ কিভাবে ভূমিকা রাখতে পারে- সে বিষয়ে আলোচনার জন্যই আজকের এই সংলাপ আয়োজন করা হয়েছে।

অরুন কুমার মন্ডল
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), সাতক্ষীরা
আজকের বিষয়টি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত এবং সময়ের দাবি। নিরাপদ খাদ্য ও কুড়িয়ে পাওয়া শাকসবজি শুধু পুষ্টি যোগায় না, এটি আমাদের রোগ প্রতিষেধকও বটে। তাই এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সবাইকে পুষ্টির প্রাকৃতিক উৎস সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে হবে। আজকের আলোচনায় পুষ্টির প্রাকৃতিক উৎস সংরক্ষণের বিষয়টি ইনোভেশন সার্কেলে তোলার কথা উঠে এসেছে। আমি অবশ্যই জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অবগত করে বিষয়টি ইনোভেশন সার্কেলে আলোচনার ব্যবস্থা করবো। বর্তমান সরকার অত্যন্ত কৃষিবান্ধব। কৃষকের ভাগ্য উন্নয়নে সরকার কৃষি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজিয়েছে। ই-কৃষি তথ্য সার্ভিস চালু করেছে। সার-বীজ ও প্রযুক্তি বিনামূল্যে প্রদান করছে। ভর্তুকি দিয়ে কৃষককে সেবা দেওয়া হচ্ছে। ১০ টাকায় কৃষকের জন্য ব্যাংক এ্যাকাউন্ট খুলে দিচ্ছে। কৃষক যাতে ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় সে জন্য বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করেছে। কৃষি এদেশের অর্থনীতির মেরুদন্ড। আর সাতক্ষীরার মাটি অনেক উর্বর। এ মাটিতে যে কেনো ফসল ভালো হয়। সাতক্ষীরার আম-কুল-পেয়ারা দেশ সেরা। এ জেলার চিংড়ি বিদেশে রপ্তানি হয়। সাতক্ষীরাকে আরো কীভাবে কৃষিতে সমৃদ্ধ করা যায় তা সরকারের চিন্তা-চেতনায় রয়েছে। এখন দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দরকার শুধু ক্ষতিকর রাসায়নিক ও কীটনাশক পরিহার করা। তাহলে নিরাপদ খাদ্যের যে কথা বলা হয়েছে, তা অর্জন সম্ভব হবে।

কৃষিবিদ আমজাদ হোসেন
উপজেলা কৃষি অফিসার, সাতক্ষীরা সদর
আমরা আদি কৃষিতে ফিরে যেতে চাই। কৃষিই সমৃদ্ধি। কৃষি আমাদের আদি পেশা। কৃষি আমাদের অর্থনীতির মেরুদন্ড। সরকারের উদ্ভাবনী চিন্তা হিসেবে ৪টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে কুড়িয়ে পাওয়া অচাষকৃত শাকসবজি রয়েছে। পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এসব শাক-সবজির ভূমিকা অপরিসীম। দেশের প্রতি ইঞ্চি মাটিকে আমরা উৎপাদনের আওতায় আনতে চাই। এজন্য কৃষকদের মাঝে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিয়ে কৃষি বিপ্লব ঘটানোর প্রয়াস চালানো হচ্ছে। এর সাথে পুষ্টির প্রাকৃতিক উৎস সংরক্ষণও জরুরি। এ বিষয়ে অবশ্যই উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

কল্যাণ ব্যানার্জি
নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথমআলো, সাতক্ষীরা
কুড়িয়ে পাওয়া অচাষকৃত শাকসবজি আমাদের পুষ্টির আদি উৎস। নিরাপদ খাদ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে এসব শাকসবজির অবদান অপরিসীম। সাধারণত সরকারের উপর মহল থেকে যে প্রেসক্রিপশন দেওয়া হয় কৃষি বিভাগ তা মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন করে। পুষ্টির প্রাকৃতিক উৎস সংরক্ষণে কৃষি বিভাগকে কিছুই করতে দেখা যায় না। আমরাও জ্ঞানের অভাবে সচেতন হচ্ছি না। তাই পুষ্টিহীনতায় ভুগছি। সাতক্ষীরায় পুষ্টি আছে। কিন্তু সেই পুষ্টি আমরা ব্যবহার করছি না। সাতক্ষীরার সীমিত সংখ্যক বাগানে বিষমুক্ত আম চাষ হচ্ছে। একজন চাষীকে থাইল্যান্ডেও পাঠানো হয়েছে। কিন্তু দেশ থেকে দেশান্তরে সাতক্ষীরার কুল ও পেয়ারার সুনাম ছড়িয়ে পড়লেও সে বিষয়টি নিয়ে কোন তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় না। উপরের প্রেসক্রিপশন বাস্তবায়নে হাইব্রিড ধান বা ফসল আমাদের জাতীয় স্বাস্থ্য নষ্ট করছে। কৃষিবিভাগ কৃষককে ঘুম পড়িয়ে রেখে সরকারের নীতি নির্ধারণী মহল থেকে যে প্রেসক্রিপশন আসে তা বাস্তবায়ন করে। কৃষকদের জাগাতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারিভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।

এম কামরুজ্জামান
জেলা প্রতিনিধি, সমকাল/এটিএন বাংলা
এক সময় কৃষকরা গরুর গাড়িতে করে গোবর নিয়ে জমিতে দিত, তাতে জমিতে ফলতো সোনার ফসল। বর্তমানে জৈব সারের পরিবর্তে মানুষ রাসায়নিক সার ব্যবহার করছে। এতে মাটির পুষ্টি ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে। তাই এখন আবার সেই পুরাতন জৈব সারের দিকে ফিরে যেতে হচ্ছে। সাতক্ষীরা একটি সম্ভাবনাময় জেলা। এ জেলায় প্রতিবছর লবণ পানির কারণে জমির উর্বরতা শক্তি হৃাস পাচ্ছে। কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। যেভাবে হোক এটা প্রতিরোধ করতে হবে। অচাষকৃত শাক-সবজি পুষ্টিগুণে ভরা। কিন্তু সেটা কতজন জানে? তাই এসব শাক-সবজির পুষ্টিগুণ জনগণকে জানাতে হবে। মানুষ কৃষির খবর জানতে চায়। জানতে চায় কোন গাছের কী গুণ রয়েছে। তাই এ বিষয়ে সরকারি উদ্যোগ একান্ত জরুরি। সরকারের উদ্ভাবনী চিন্তার আওতায় আজকের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানাচ্ছি।

ফরিদা পারভীন
বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্ত কৃষাণী, হায়বাতপুর, শ্যামনগর
আদিকাল থেকে মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল। মানুষের এখন রোগ হলে ডাক্তারের কাছে যায় না। আগে যায় ঔষুধের দোকানে। আমাদের জ্ঞানের অভাবে আমরা বিপথগামী। আমাদের দেশে অনেক পতিত জমি আছে। এসব জমিতে কোনো ফসল চাষ করা হয় না। তবে এসব জমিতে প্রাকৃতিকভাবে যেসব উদ্ভিদ জন্ম নেয় তা অতি মূল্যবান। আমাদের দৈনিক ২৫০/৩০০ গ্রাম সবজি খেতে হবে। এসব সবজি আমাদের রোগ প্রতিরোধ করে। জৈব বালাই নাশক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বীজ আমাদের সম্পদ। প্রত্যেককেই নিজ বাড়িতে বীজ সংরক্ষণে উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের দেশের কৃষক কোন জমিতে কোন ফসল চাষ করতে হবে তা জানে না। এজন্য তাদের সচেতন হতে হবে। কৃষক জানে না-কোনটি উপকারী পোকা এবং কোনটি অপকারী পোকা। কৃষককে পোকা চিনিয়ে দিতে হবে। তারপর জৈবিক দমন পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তবেই আমাদের নিরাপদ খাদ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি স্বার্থক হবে।

অল্পনা মিস্ত্রী
বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্ত কৃষাণী, ধুমঘাট, শ্যামনগর
কুড়িয়ে পাওয়া শাক-সবজির নাম অনেকে জানে না। সবজি চেনে না অনেকেই, গুণাগুণ তো দূরের কথা। জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করে বালাই দমন পদ্ধতি সম্পর্কেও অনেকে জানেন না। ফসলের ক্ষেতে পোকা দেখলেই অনেকেই ঢালাওভাবে বিষ প্রয়োগ করেন। এটা ঠিক নয়। কারণ অপকারী পোকা মারতে গিয়ে অনেক উপকারী পোকাও মারা যায়। তাছাড়া খাদ্যে বিষক্রিয়া তো আছেই। মেহগনির বীজ ও নিমপাতা সিদ্ধ করে হুইল পাউডার মিশিয়ে স্প্রে করলে অনেক পোকার আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করা যায়। জৈব সার মাটির জীবন। রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহার করতে হবে। যাতে মানুষ খাদ্যের পুষ্টিগুণের নিরাপত্তা পায়। বিষয়টি সরকারিভাবে উদ্যোগ নিলে কৃষক বাঁচবে। কৃষিতে আরো সম্ভাবনা দেখা দেবে।

ইয়ারব হোসেন
সভাপতি, তুজলপুর-আখড়াখোলা সিআইজি (ফসল) সমবায় সমিতি
কুড়িয়ে পাওয়া শাক-সবজি শতভাগ বিষমুক্ত। এসব শাক-সবজি পুষ্টিগুণে ভরা। যেসব শাক-সবজি চাষ করা হয়, তাতে ৩০০ প্রকার বিষ প্রয়োগ করা হয়। একটি বেগুণের পোকা মারতে যে উচ্চ মাত্রার বিষ প্রয়োগ করা হয় তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে আমাদের স্বাস্থ্যের উপর। কৃষকরা এসব বিষের মাত্রা সম্পর্কে জানে না। আবার কারা বিষ বিক্রি করতে পারবে তাও নির্দিষ্ট নয়, হাত বাড়ালেই ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ও কীটনাশক পাওয়া যায়। এসব অসাধু ব্যবসায়ীকে প্রতিরোধ করতে প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা যেতে পারে। কৃষকদের সংগঠিত করতে হবে। কৃষি হাসপাতাল গড়ে তুলতে হবে। বীজ ব্যাংক স্থাপন করতে হবে। এতে কৃষকরা যেমন একদিকে ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ও কীটনাশক থেকে দূরে সরে যাবে, তেমনি বীজ নিরাপত্তা অর্জিত হবে। দেশীয় শাকসবজি চাষের আওতা বাড়বে।

শেখ তানজির আহমেদ
জেলা প্রতিনিধি, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
সাতক্ষীরায় চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন হলেও অপুষ্টির হার খুব বেশি। এক্ষেত্রে কুড়িয়ে পাওয়া হেলেঞ্চা, কলমি, শাপলা, গিমে, থানকুনি, আদাবরুণ, বউটুনি, গাদোমনি, কালো বনকচু, ঘেটকোল, আমরুলসহ পুষ্টির প্রাকৃতিক উৎসগুলো সংরক্ষণের মাধ্যমে যেমন অপুষ্টি দূর করা সম্ভব, তেমনি নারীর ক্ষমতায়ন ও গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব। সাথে সাথে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণের লক্ষ্যে ক্ষতিকর কীটনাশক এবং রাসায়নিক সার মুক্ত সবজি উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। শ্যামনগর বাজারে বিষমুক্ত সবজি বেচাকেনার যাত্রা শুরু হয়েছে। এ যাত্রা সব জায়গায় ছড়িয়ে দিতে হবে। দেশীয় ও প্রাকৃতিক খাদ্য সামগ্রী সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণের বিষয়টি উদ্ভাবনী চিন্তা হিসেবে বর্তমান সরকারের উদ্ভাবনী সার্কেলে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উদ্ভাবনী আইডিয়া হিসেবে-সর্বত্র পুষ্টির প্রাকৃতিক উৎস সংরক্ষণ সম্ভব হলে জেলায় অপুষ্টি থাকবে না।

ডা. সুব্রত ঘোষ
সেন্ট্রাল ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর, অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
কুড়িয়ে পাওয়া শাক-সবজিতে রয়েছে দ্বিমুখী লাভ। একটি আর্থিক লাভ। অন্যটি স্বাস্থ্যগত লাভ। একটি আমলকিতে এক কেজি আপেলের খাদ্য গুণ রয়েছে। শুধুমাত্র কচুপাতার মাধ্যমে মানুষের রক্তশূন্যতা পূরণ করা সম্ভব। এসব খাদ্যের উপকারিতা অপরিসীম। আবার কিছু কিছু খাদ্যের অপকারিতাও আছে। ৪৩ প্রকার মাশরুম আছে। যা বিষাক্ত। এসব বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ খাদ্য চেনে না। খাদ্যের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানে না। গর্ভবতী অবস্থায় আনারস খাওয়া যাবে না। যাদের কিডনির সমস্যা আছে তারা টক জাতীয় ফলমূল খেতে পারবেন না। এসব বিষয়গুলো মানুষকে জানাতে হবে। এজন্য চাই শিক্ষা ও সচেতনতা। কুড়িয়ে পাওয়া শাকসবজির মধ্যে যেগুলো পুষ্টিগুণ সম্পন্ন সেগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। আর যেগুলো বিষাক্ত সেগুলোও চিহ্নিত করতে শিখতে হবে। পুষ্টিগুণ সম্পন্নগুলো সংরক্ষণ ও গ্রহণ করে অপুষ্টি দূর করা সম্ভব।

শেখ হাসান রেজা
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকতা, সাতক্ষীরা সদর
আকাশ সংস্কৃতির কারণে আমাদের খাদ্য সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য। বর্তমান সরকার উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্য ঘাটতি কমিয়ে এনেছে। ১৯৭০ সালে সাড়ে সাত কোটি মানুষ ছিল। এখন সেই জনসংখ্যা ১৬ কোটি। প্রতিবছর কৃষিজমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। আমাদের খাদ্য ঘাটতি ছিল ৪০ লক্ষ মেট্রিক টন। বর্তমান সরকার সেই খাদ্য ঘাটতি কমিয়েছে। এখন ৩৫/৪০ লক্ষ মেট্রিক টন খাদ্য উদ্ধৃত্ত আছে। আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা আছে। কিন্তু পুষ্টি নিরাপত্তা নেই। আমাদের সচেতনতার অভাবে আমরা খাদ্যে বিষ প্রয়োগ করি এবং সেই বিষযুক্ত খাদ্য কিনে খাই। চাহিদা, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের উপর গুরুত্ব দিয়ে আধুনিক টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষকদের লাভের দিক বিবেচনায় নিয়ে কৃষি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া আমরা এগিয়ে যেতে না পারলে পিছিয়ে পড়ব। এতে একদিকে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, অন্যদিকে নিরাপদ খাদ্যগ্রহণ সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে পুষ্টির প্রাকৃতিক উৎসগুলো আমাদের সার্বক্ষণিক সহায়ক।

রঘুজিৎ গুহ
উপ-সহকারী কৃষি অফিষার, সাতক্ষীরা পৌর
সাতক্ষীরায় বিষমুক্ত আমচাষ শুরু হয়েছে। এ আম বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। আমে স্প্রে কমিয়ে আনা হয়েছে। আমের পাশাপাশি পেয়ারা, কুল ও কুমড়া জাতীয় ফসলে স্প্রের মাত্রা কমিয়ে আনা হবে। ফসলের ক্ষেত্রে ডাল-কুঞ্চি পুঁতে জৈব পদ্ধতিতে পোকা দমন করা হচ্ছে। ধানে বিষ প্রয়োগ করলে তার কোন ক্ষতিকর প্রভাব থাকে না। কিন্তু সবজিতে বিষ প্রয়োগ করলে তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। কৃষক না বুঝে বিষ প্রয়োগ করে। তাই কৃষকদের বোঝাতে হবে এবং তাদের সচেতন করতে হবে। এতে নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ সম্ভব হবে, খাদ্য নিরাপত্তা থাকবে।

সাইদুর রহমান
শিক্ষার্থী, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ
সমুদ্রের মাছ আমাদের কাছে খাদ্য চাইতে আসে না। তাদের মধ্যে রয়েছে একটি খাদ্য শৃংখল। বাস্তুসংস্থান একটি জটিল জালিকা। পৃথিবীর সব প্রাণী একে অপরের উপর নির্ভরশীল। পৃথিবীতে বৈচিত্র্যপূর্ণ কৃষি ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়। ইতালির রোমে প্রায় ১০০ রকম শাক আছে। যার অর্ধেকের নাম আমরা জানি না। আমাদের দেশে অচাষকৃত এসব শাক-সবজি পুষ্টির আঁধার হলেও আকাশ সংস্কৃতির কারণে আমরা হারিয়ে ফেলেছি, ভুলে গেছি সেগুলোর নাম। আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে এসব শাকসবজি সংরক্ষণ করতে হবে। সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। এগুলো গ্রামীণ খাদ্য নিরাপত্তার মূল চালিকাশক্তি।

বাবর আলী
অচাষকৃত পুষ্টিকর সবজি বিক্রেতা
কুড়িয়ে পাওয়া সবজি যেমন-সাদা শাপলা, লাল শাপলা, হেলেঞ্চা, থানকুনি, ঘাটকোল, বউটুনি, গাদোমনি ইত্যাদি শতভাগ বিষমুক্ত। তাই এর চাহিদাও বেশি। যারা জানে-বোঝে তারা তো লাইন দিয়ে এগুলো কেনে। অনেকেই আছেন আমার ধরা কাস্টমার। প্রতিদিন শাকসবজি নিয়ে যাবেই। এসব শাক-সবজি সংরক্ষণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা একান্ত জরুরি।

আবুল কালাম আজাদ
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, দৈনিক পত্রদূত
সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, আজকের এ ‘সংলাপ’ অত্যন্ত অর্থবহ। আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন এই কুড়িয়ে পাওয়া শাকসবজিই ছিলো আমাদের খাদ্য তালিকার বড় অংশ। শাকসবজির পুষ্টিগুণ জানতে হবে, জানাতে হবে, শাকের পরিচিতি তুলে ধরতে হবে। বিষমুক্ত ভবিষ্যত প্রজন্ম দেখতে চাইলে বিষমুক্ত খাদ্যের নিশ্চয়তা থাকতে হবে। অকৃষি জমির সুষ্ঠু ব্যবহার করতে হবে। কৃষকদের জন্য কৃষি হাসপাতাল গড়ে তুলতে হবে। কৃষি বিভাগের নেটওয়ার্কের আওতায় উদ্ভাবনী চিন্তার জায়গা তৈরি করতে হবে। কৃষি বিভাগের প্রত্যেক ব্লক থেকে বঙ্গবন্ধু পদকপ্রাপ্ত কৃষাণী ফরিদা, অল্পনা ও চ্যানেল আই পদকপ্রাপ্ত কৃষক সিরাজুলের মতো কৃষক-কৃষাণী তৈরি করতে হবে। নারীদেরকে জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করতে হবে। নারীদের হাত থেকেই কৃষির জন্ম হয়েছিল। এসব অচাষকৃত শাক-সবজি সংরক্ষণে নারীদের সম্পৃক্ত করতে পারলে দারিদ্র্য বিমোচনের পাশাপাশি আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

 

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: