Posted in

ঈদ আসে ভয় হয়

এত আনন্দের ঈদ চলে গেলে পরের কিছু দিন গুলো খুব কষ্টে পার হয়।

তানোর, রাজশাহী থেকে অমৃত সরকার:
ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদ অনেক আনন্দ আর খুশি নিয়ে মানুষের মাঝে এসেছে। দেশের সর্বত্রই চলছে ঈদকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি। বাড়ি বাড়ি রকমারি খাবার তৈরির প্রস্তুতি। দোকানে দোকানে নতুন জামা কাপড় কেনা ও কিনতে যাওয়ার প্রস্তুতি। কারণ নতুন জামা কাপড় আর খাবার ছাড়া কি ঈদকে বরণ করা যায়! ঈদ মানে খুশি আর আনন্দ হলেও আর ১০টা উৎসবের মতো সব শ্রেণির মানুষের জন্য একই রকশ আনন্দ বয়ে নিয়ে আসে না। কারো কারো জীবনে নিয়ে আসে দুশ্চিন্তা আর পরিবারকে খুশি করতে না পারার অপ্রাপ্তি। আমাদের প্রতিটি গ্রামে কিছু প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষ আছে যারা আমাদের এই দেশের জন্য করে চলেছেন নিরলস পরিশ্রম। কখনও কৃষি কাজের মাধ্যমে, কখনও অন্যের বাড়িতে শ্রম বিক্রয়ের মাধ্যমে, কখনও ভ্যান বা রিক্সা চালানোর মাধ্যমে। কিন্তু ঈদ সবার জন্য আনন্দ আর খুশি বয়ে নিয়ে আসলেও আমাদের এ সকল মানুষের মাঝে শত আনন্দেরই এই ঈদ বয়ে নিয়ে আসে কখনও না দিতে পারা বা না পাওয়ার বেদনা ও মনোঃকষ্ট। চলুন জেনে নিই তেমন কিছু মানুষের ঈদ প্রস্তুতি।

এত আনন্দের ঈদ চলে গেলে পরের কিছু দিন গুলো খুব কষ্টে পার হয়।
এত আনন্দের ঈদ চলে গেলে পরের কিছু দিন গুলো খুব কষ্টে পার হয়।

মোঃ সালাম শেখ (৫৬) সালাম শেখ বসবাস করেন রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার আকচা গ্রামে। পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৫জন। পেশায় একজন কৃষি শ্রমিক। বাড়িতে বৃদ্ধ মা ও প্রতিবন্ধি মেয়ে। এবারের ঈদ আয়োজন সম্পর্কে বলতে গিয়ে কিছুটা থমকে যান। উৎসব আসলেই তার মনের মাঝে ভেসে ওঠে বৃদ্ধ মা ও প্রতিবন্ধি মেয়ের কথা। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, “ভাই ঈদের আর কি আনন্দ করবো বলেন? মা ও মেয়ের ঔষধ কিনতেই তো সব আয় শেষ হয়ে যায়।” এরপর আর কথা না বাড়িয়ে নিজের কাজে মনসংযোগ করেন।

আমাদের ঈদ কিছু আনন্দ দিলেও কষ্টই হয় বেশি।
আমাদের ঈদ কিছু আনন্দ দিলেও কষ্টই হয় বেশি।

মোঃ আনিস মিয়া (৬০) বসবাস করনে রাজশাহী জেলার তানোর উপজেলার ধানতৈর গ্রামে। পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৪ জন। জীবনের বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেছেন কৃষি শ্রমিক হিসেবে শ্রম বিক্রয় করে। এখন আর শক্ত কাজ করতে পারেন না বলে ঋণ করে ভ্যান কিনেছেন। এখন সেটাই একমাত্র আয়ের উৎস। এবারের ঈদ প্রস্তুতি সম্পর্কে বলেন, “প্রতিবার ঈদ আসে আর আমার ভয় হয় কারন ঈদ আনন্দের পাশাপশি খরচও নিয়ে আসে অনেক। নিজে নতুন কাপড় না কিনলেও পরিবারের সবাইকে দিতে তো হয়ই। এত আনন্দের ঈদ চলে গেলে পরের কিছু দিন গুলো খুব কষ্টে পার হয়।”
“আমাদের মত মানুষের ঈদ আনন্দ কখনোই পরিপূর্ণ হয় না। কারণ প্রতিবছরের মতো আমাদের আয় তো সমানই থাকে। তাই ঈদ চলে যাওয়ার পর কষ্ট আরো বেশি হয়।” এভাবেই এবারের ঈদ সম্পর্কে সাবলিল ভাবে বলেন মোঃ আকরাম আলী(৫৮)। তিনি বসবাস করেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট এলাকায়। তিনি বর্তমানে তানোর উপজেলায় ধানকাটা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। বাড়িতে রেখে এসেছেন ৬জন সদস্যকে।
মোঃ মোরসেদ মিয়া(৪৫) বসবাস করেন রাজশাহীর তানোর উপজেলার ঠাকুরপুকুর গ্রামে। পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৫জন। পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস ঝালমুড়ি বিক্রি করে। তিনি ১৭ বছর বয়স থেকে এই ঝালমুড়ি বিক্রয়ের সাথে জড়িত। এবারের ঈদ সম্পর্কে বলেন “ভাইরে সামনে বর্ষা মৌসুম আসছে- ঘরের চালা ঠিক না করলে বৃষ্টির সময় ঘরেযে থাকতে পারব না। ছেলেটা জেদ ধরে আছে তাকে তো কিছু দিতে হবেই। আমার কিছু সঞ্চয় আছে আর কিছু ঋন করে আগে ঘরটা সারাতে হবে। দোয়া করেন যেন ঈদের কয়দিন বেশি বিক্রয় হয়।”
মোঃ আক্কাস আলী(৬০) বসবাস করেন রাজশাহীর তানোর উপজেলার চিনাসো গ্রামে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৫জন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারি ব্যক্তি তিনি। আয়ের উৎস শ্রম বিক্রি। তাঁর ছোট মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর এবারই প্রথম ঈদ। তিনি বলেন “মেয়েকে ঋণ করে বিয়ে দেওয়ার পর আমার সঞ্চয় বলতে কিছুই নেই। যা আয় হয় পরিবারের খাওয়া খরচ আর কিস্তি দিতেই সব খরচ হয়ে যায়। ঘরে নতুন জামাই-মেয়ে আসবে নিজেরা না নিলেও তাদেরকে তো নতুন কাপড় দিতে হবেই। তাই অন্য এক সমিতি থেকে আবার কিছু ঋণ করেছি। আমাদের তো আর ঈদ উপলক্ষে বাড়তি কোন আয় বা বোনাস নেই। ঈদের কয়দিন আবার কাজও কম পাওয়া যায়। আমাদের ঈদ কিছু আনন্দ দিলেও কষ্টই হয় বেশি।”

আমরা গরীব দিন আনি দিন খাই।
আমরা গরীব দিন আনি দিন খাই।

রাজশাহী জেলার মোহনপুর উপজেলার তুলসীক্ষেত্র গ্রামের বাসিন্দা মোঃ আরমান মিয়া(৬৫)। পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৩জন। পরিবারের আয়ের হয় বাজারে চুন বিক্রি করে। গত ৩০বছর ধরে আশেপাশের এলাকার সাপ্তাহিক হাটে চুন বিক্রি করেই তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তার ঈদ প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, “সবার সাথে নামাজ পড়ার মাধ্যমেই আমি ঈদের আনন্দ খুঁজে পাই। এছাড়া অন্য কিছু আর আমার মনে হয় না। কারণ আমরা গরীব দিন আনি দিন খাই।”
বাংলাদেশে এমন অসংখ্যা মানুষ আছে যারা এখন দিন এনে দিন খাওয়ার মাধ্যমে দিনাতিপাত করেন। কাজ থাকলে ভাতের অভাব না হলেও বিভিন্ন অনুষ্ঠান তাঁদের কাছে প্রতিদিনের মতোনই মনে হয়। ভাবনাতেও তাদের পরিবর্তন হয়না কখনোই। তবে সরকারসহ সমাজের বৃত্তশালী মানুষদের দ্বারা আমাদের গ্রাম বাংলার এসকল মানুষদের ভাবনার জগতের পরিবর্তন ঘটানোর মাধ্যমেই সমাজের ঈদের মত অনুষ্ঠানকে পরিনত করা যায় সার্বজনিন উৎসবে। এইসমস্ত প্রান্তিক আর দরিদ্র মানুষের পক্ষ থেকে সবাইকে ঈদের অগ্রীম শুভেচ্ছা!

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.