সাম্প্রতিক পোস্ট

পানি ব্যবস্থাপনা: বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকট

::তানোর, রাজশাহী থেকে  মো. শহিদুল ইসলাম::

বাংলাদেশসহ সন্নিহিত জনপদগুলোর মধ্যে প্রথম মানব বসতির আদিভূমি খ্যাত দেশের উত্তর পশ্চিমের বরেন্দ্রঅঞ্চলটি নানা বৈচিত্র্য আর ঐশ্বর্যমন্ডিত। নৃবিজ্ঞানী, সমাজ তাত্ত্বিক, ইতিহাস-সাহিত্য ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং প্রবীণজনের তথ্যে জানা যায়, বরেন্দ্রর ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ছিল বৈচিত্র্যময়। বিস্তীর্ণ তৃণাচ্ছাদিত সমতলভূমি, ঘন বনজঙ্গল, গড়-পাহাড়, নদী-নালা, খাল-খাড়ি-বিল, জলাশয় মিলে অনুকূল ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জলবায়ু, প্রাণীজ ও বনজ খাদ্য বস্তুর প্রাচুর্যে ভরপুর এই ভূভাগ আদিমকাল থেকেই মানব বসতির উপযুক্ত এক অনুপম ক্ষেত্র হিসেবে বিদ্যমান ছিল। বর্তমান সময়ের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে মরা ও মৃতপ্রায় নদ-নদী, পরিত্যক্ত খাল-খাড়ি, বিল, অসংখ্য জলাশয়, শিলালিপি, উচু-নীচু ভূ-বৈশিষ্ট্যই প্রমাণ করে দেয় অঞ্চলটির অতীতের সবুজ ইতিহাস। কিন্তু কালের বিবর্তনে ওই ঐশ্বর্য ও সমৃদ্ধময় জনপদটি বর্তমান নানা সংকটময় পরিস্থিতির শিকার। দিনে দিনে সংকট আরো ঘনীভুত হয়ে উন্নয়নবিদগণের নানা পদ্ধতি প্রয়োগের শিকারে পরিণত হয়েছে এই জনপদটি। বসবাসরত জনগোষ্ঠীর সচেতন ও প্রবীণ অভিজ্ঞজনসহ নানা পেশার মানুষের সমন্বিত মতামতে উন্নয়ন পদ্ধতির প্রয়োগ হচ্ছে খুব কমই। যার কারণে সাময়িক কিছু সমস্যা সমাধান হচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী সংকট আরো প্রসারিত থেকে বহুমুখী দুর্যোগে রূপান্তরিত হচ্ছে। নব্বই এর দশকের অনেক আগে থেকেই এই অঞ্চটিকে কেন্দ্র করে নানামূখী উন্নয়নবাস্তবায়নসহ গবেষণা পর্যালোচনা হয়ে আসছে। বেশিরভাগ উন্নয়ন গবেষণায় পানিসংকট এর সমাধানে পানি ব্যবস্থাপনাসহ ফসলচাষের বিষয়টিই বেশি আলোচিত হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে বরেন্দ্র জনগোষ্টীর ভাগ্যের উন্নয়নে পানি সমস্যা সমাধানসহ অধিক পানি নির্ভরশীল ধান উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। কিন্তু পর্যালোচনায় দেখা যায়, পানি ব্যবস্থাপনায় পানির অপচয়রোধে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় জনচেতনা এবং বাস্তবতাভিত্তিক বিষয়ে গবেষণা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন প্রায়ই হয়নি।

বরেন্দ্র অঞ্চলে আশির দশক থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক বিভিন্ন  উন্নয়ন পদ্ধতির প্রয়োগ এবং উপকরণের ব্যবহারে এসেছে আমুল পরিবর্তন। সঙ্গত কারণেই কলস, বালতি, জগ, মগ, টিউবয়েল, কুপ-কুয়া, পুকুরের পরিবর্তে ব্যবহার হচ্ছে পানি উত্তোলনে মটর, ট্যাংক, সাওয়ার, ট্যাব, বেশিন, কৃত্রিম ঝরণাসহ প্রভৃতি। প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষিত সমীক্ষায় দেখা যায় এসব উপকরণের সঠিক ব্যবহার না করার ফলে পানি ব্যবহারের সময় অপচয় হচ্ছে অপ্রত্যাশিত। প্রয়োজনের তুলনায় কখনো কখনো ১০০% বেশি পানি অপচয় হয়ে যাচ্ছে। পানির ব্যবহারে কৌশলী হলে প্রতিদিন বরেন্দ্র অঞ্চলে লাখ লাখ টন পানির সাশ্রয় হবে। যা ভবিষ্যতে বরেন্দ্র প্রাণ ও প্রকৃতির সুরক্ষায় অবদান রাখবে। অন্যদিকে পানির সহজ প্রাপ্তির কারণে (সর্বত্র যন্ত্রের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন) প্রাকৃতিক জলাধারারের উৎসগুলো এবং স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় বর্তমান নানা পেশাসহ তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এসবের গুরুত্ব দিনে দিনে কমে যাচ্ছে।

এটি খুবই সত্য “বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রতি ১০ (দশ) বছরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে গড়ে ১৫ ফুট!” (সকালের খবর, ১৫জুন, ২০১৪)। আধুনিকতার বিবর্তন, প্রচলিত উন্নয়ন পদ্ধতি প্রয়োগ আর যন্ত্রের ব্যবহারের বদৌলতে সঙ্গত কারণেই এ অঞ্চলের মানুষের পানি ব্যবহার ও অভ্যাস পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু এসব উপকরণ ব্যবহার কৌশল বা সচেতনতার জায়গাটিতে ব্যাপক গ্যাপ থাকার কারণে বর্তমান সময়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির অপচয় হচ্ছে ভয়ংকরভাবে। আর এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উদ্যোগও চোখে পড়ার মত নয়।

বারসিক উচ্চ বরেন্দ্র এলাকা চাপাইনবাবগঞ্জের নাচোল এবং লেবেল/লো বরেন্দ্র এলাকা খ্যাত রাজশাহীর তানোর উপজেলায় স্থানীয় জনমানুষের কর্মউদ্যোগ, সমস্যা-সম্ভাবনা ও নিজস্ব উন্নয়ন প্রচেষ্টায় উল্লিখিত উদ্ভুত জনসমস্যার বিষয়গুলো নানা পর্যায়ের সচেতন মানুষের সাথে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় জানতে পারে। ফলশ্রুতিতে স্থানীয় নানা পেশার জনমানুষ, জনসংগঠন, সাংবাদিক, সুশীলসমাজ, কৃষক, সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সুহৃদ প্রতিনিধি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পরামর্শ ও প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ সংরক্ষণ ও সুরক্ষায় নানা কর্মসূচিতে সহায়কের ভূমিকা পালন করছে। সঙ্গত কারণেই বারসিক উল্লিখিত এলাকার নাচোলের বরেন্দ্রা গ্রামে পানি ও ব্যয়সাশ্রয়ী রবিশস্যের প্রসার, তানোর উপজেলার মধ্য বরেন্দ্রের একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ শিব নদী রক্ষাসহ এলাকার প্রাকৃতিক জলাধার খাল-খাড়ি, বিল, নালা সংরক্ষণ ও উন্নয়নে সহযোগী হয়েছে।

তানোর উপজেলা শিবনদী ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা কমিটি নিজেদের চলমান প্রধান সংকট সমস্যা পানির সম্পদ রক্ষায়-পানির অপচয়রোধে সচেতনতামূলক স্কুল ক্যাম্পেইন, মসজিদ, বরেন্দ্র ডিপ ম্যানেজার-লাইনম্যান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, স্টল, ভিলেজ ক্যাম্পেইনসহ বিলবোর্ড, পোষ্টার, হ্যান্ডবিলি, মাল্টিমিডিয়া প্রদর্শনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বরেন্দ্রখ্যাত তানোর উপজেলার সমন্বিত সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রাকৃতিক সম্পদ সংস্কার-সংরক্ষণ-রক্ষা ও উন্নয়নে নিয়মিত পরামর্শ সহযোগিতা প্রদান করছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা চেয়াম্যান ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তানোর জোনের সহকারী প্রকৌশলীসহ প্রমূখ বরেন্দ্র সুহৃদ। গত ২৭ নভেম্বর, ২০১৪ তারিখে তানোর উপজেলা অডিটরিয়ামে বারসিক ও স্থানীয় প্রশাসন, জনগোষ্ঠীর যৌথ উদ্যোগে বরেন্দ্র প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন বিষয়ক জনসংলাপে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন, “প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে হবে, বরেন্দ্র ভূমির জন্য এর কোন বিকল্প নেই”। তিনি বারসিককে পানির অপচয়রোধে সচেতনতামূলক বিভিন্ন পর্যায়ে ক্যাম্পেইন এবং নানা কর্মসূচি নেবার পরামর্শ দেন এবং সার্বিক বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। বিএমডি প্রকৌশলী বিলকুমারীর জলাধার সংস্কারে উদ্যোগ গ্রহণে অংশগ্রহণকারীদের পরামর্শ গ্রহণ করেন। সেই সাথে তিনি তানোর উপজেলার ১৫০ কি.মি. দৈর্ঘ্যেও ১৫টি খাড়ি এবং নিকট অতীতে বিএমডি কর্তৃক তৈরি ক্রোসড্যাম গুলোর বর্তমান পরিস্থিতি জানতে বারসিক, জনসংগঠন, প্রশাসন, বিএমডি, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের যৌথ অংশগ্রহণে শিব নদী যাত্রার মত খাল-খাড়ি যাত্রার কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তিনি এ বিষয়ে বারসিককে সমন্বয় করার পরামর্শ দেন। ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ তারিখে নদী দিবসে তানোর উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, “আমাদের ভুল পদক্ষেপের কারণে শিব নদীর উৎস মুখে ১৯৬২ সালে বাঁধ নির্মাণ করে যেমন নদীটি মেরে ফেলেছি, তেমনি আজ বরেন্দ্রঅঞ্চলে পানি সম্পদের সমন্বয়হীনতা ব্যবস্থাপনার কারণে পানি সংকটকে আরো ঘনীভুত করছি।”
সার্বিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলটি ভৌগোলিকভাবে আলাদা বৈশিষ্ট্যেমন্ডিত। মাটির গঠন কর্দম ও শক্ত হওয়ায় পানি নিষ্কাশন তুলনামূলক কম হয়। তাই নানা দিক থেকে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির অপচয় হচ্ছে মারাত্মকভাবে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ বাড়িতে একনাগাড়ে পানির ট্যাব ছেড়ে দিয়ে হাত, মুখ, গোসলসহ নানা কাজে ২৪ ঘণ্টায় পানি ব্যবহারে অপচয় করছে ৪৫ থেকে ৬৫ লিটার, আবার কখনো এর দ্বিগুণও পাওয়া গেছে। কিন্তু সত্যিকারে তাঁর প্রয়োজন ছিল সর্বোচ্চ ৩০ লিটার। অসতর্ক বা অবহেলার কারণে প্রতিনিয়ত এরকম কোটি কোটি টন পানি নষ্ট হচ্ছে, যার ৯৯.৯৯% উত্তোলিত হচ্ছে ভূগর্ভ থেকে। সেইসাথে পানির প্রাকৃতিক জলাধারগুলো নষ্ট বা পরিত্যক্ত হয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকট আরো সংকটে আবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু পানির অপচয়রোধে কোন উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি না থাকায় এটি পানি সংকটাপন্ন আঁচলের নীচেই ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। খাল-খাড়ি, নালা, বিল, পুকুর, নদীসহ সকল জলাধার তথা প্রাকৃতিক সম্পদের রক্ষার পাশাপাশি পানির অপচয়রোধে প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে। বরেন্দ্র অঞ্চলে সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় পানির অপচয়রোধে কার্যকর কর্মসূচি, সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মসহ প্রাণ ও প্রকৃতির সুরক্ষায় অবদান রাখবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: