সাম্প্রতিক পোস্ট

পাখিরে ভালোবাসি রে ভাই!

সাতক্ষীরা থেকে শাহীন ইসলাম

ঘটনা-১
চাতালের ধান খেয়ে যাচ্ছে কবুতর, ফিঙে, শালিক, চড়ুই, বুলবুলি। কারও কোন ভ্রুক্ষেপ নেই! অবাক করার বিষয়। আমরা সচরাচর দেখি যে, কোন পশু-পাখি, জীবজন্তু আমাদের ফসল খেলে আমরা তাদেরকে তাড়িয়ে দিই, প্রহার করি! কিন্তু সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ১২টি চাতালের মালিক ও শ্রমিক কেউই এই পাখির ক্ষতি করা তো দুরে থাক বরং চাতালের ধান খাওয়া থেকে পাখিগুলোকে বিরত করেন না! প্রতিটি পাখি নিজের পেট না ভরা পর্যন্ত ধান খেতে থাকে। ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতর উড়ে এসে ধান খেয়ে গেলেও মিল চাতাল মালিক ও শ্রমিকেরা পাখি শিকার/পাখি মেরে ফেলে না। পাখি বা কবুতরকে ধান খেতে দিতে পারায় তাদের চোখে মুখে প্রশান্তির ছায়া!

আরও চমকপ্রদ ব্যাপর হলো এই পাখিগুলো সহজে যাতে ধান খেতে পারে সেজন্য কিছু অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করতে হয় চাতাল শ্রমিকদের। এই প্রসঙ্গে উপজেলা সদরে আলিপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের চাতাল শ্রমিক লিপি ও খালেদা বেগম বলেন, “অনেক সময় আমরা চাতালে ধান জড়ো করে রাখি পরের দিন রোদে শুকানোর জন্য। শত শত মণ জড়ো করা ধান পলিথিন পেপার দিয়ে ঢেকে রাখি। সকাল হলেই ঝাঁকে ঝাঁকে কবুতর চাতালে বসে ধান খাওয়ার জন্য।” তারা বলেন, “সকালে ওরা খাবারের জন্য খুব জ্বালাতন করে। ধান না পেয়ে পলিথিন ঠোট ও পা দিয়ে ছিড়ে ফেলতে থাকে। সেজন্য মালিকের নির্দেশ আছে কবুতরের ধান খাওয়ার জন্য খুব সকালে (৭টা) ধানের উপর থেকে পলিথিন তুলে ফেলার।” তাই তো পাখি মারা তো দূরের কথা, তাড়ানোও মালিকের নিষেধ রয়েছে। প্রায় ৭ বছর শ্রমিকরা এই চাতালে কাজ করেন। নিজেরা পালাক্রমে পাখিকে ধান খাওয়ানোর জন্য পলিথিন তুলে ফেলার দায়িত্ব পালন করেন।

Exif_JPEG_420

একটি চাতাল থেকে দৈনিক কি পরিমাণ ধান পাখিতে খেয়ে যায়, তার হিসাব করার জন্য ৩টি চাতালের ৯জন শ্রমিকের সাথে আলোচনা করে জানা যায়, দৈনিক দুই বারে একটি চাতাল থেকে প্রায় ১০ কেজি ধান পাখিতে খেয়ে যায়। তবে, বর্ষাকালে দৈনিক প্রায় ১২ কেজি ধান খেয়ে ফেলে। কারণ বর্ষার সময় চারিদিকে জলাবদ্ধ থাকে, বিল থেকে নানান খাবার খুঁজে খেতে পারে না। আর শুস্ক মৌসুমে কবুতর ও অন্যান্য পাখি বিল ও মাঠ থেকে নানান খাবার খুঁজে খেতে পারে। তাদের মতে, “বছরে গড়ে দৈনিক ১০ কেজি ধান পাখিতে খায়। সে হিসাব অনুযায়ি প্রতিটি চাতাল থেকে দৈনিক ১০ কেজি, মাসে ৩০০ কেজি এবং বছরে ৩৬০০ কেজি বা ৯০ মণ ধান পাখিরা খায় যার বাজার মূল্য প্রায় এক লাখ টাকা। এই হিসাব অনুযায়ী সাতক্ষীরার সদর উপজেলার শতাধিক মিল চাতালের প্রায় কোটি টাকার ধান পাখিতে খেয়ে যায়। কিন্তুু চাতাল মালিক ও শ্রমিকেরা কখনও পাখি মারে না। বরং পাখির সেবায় ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেয়।

বছরে লক্ষ টাকার ৯০ মণ ধান পাখিতে খেয়ে যায়, বিষয়টি ক্ষতি না লাভ এমন প্রশ্ন করলে শ্রমিক থেকে মালিক সকলেই উত্তর দেন লাভ। কারণ হিসেবে বলেন, “পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, ফল ও ফসল হতে অবদান রাখে, জমিন উর্বর করে, ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে ফেলে, কবুতর পাখি দরিদ্র পরিবারের মাংসের চাহিদা পূরণ করে, শরীরের রক্ত তৈরি করে, পাখি গান শুনাই, পাখি দেখলে মন ভালো হয়ে যায়।” এ প্রসঙ্গে মাহমুদপুর চাতাল মালিক চান্দু বলেন, “হাদিসে বলা হয়েছে যদি কোন ব্যক্তি জমিতে কোন ফসল চাষ করেন বা গাছ লাগান অতঃপর কোন পথচারী বা প্রাণী উক্ত জমিনের ফসল বা গাছের ফল ভোগ করিলে পরকালে জমি বা গাছের মালিকের জন্য তা দানে পরিণত হবে। তাই আমার চাতাল থেকে প্রতিদিন পাখিতে যে পরিমাণ ধান খেয়ে যায় তা আমার জন্য এহকাল এবং পরকালের জন্য মঙ্গল”।

ঘটনা-২
জিয়ারুল সরদার। আলিপুর গ্রামের একজন মিল চাতাল শ্রমিক। ২০ বছর যাবত কবুতর পোষেন তিনি। তবে, অন্য শ্রমিকদের থেকে জিয়ারুলের কাজের শর্ত ভিন্ন। যে চাতালেই কাজ করুক না কেন জিয়ারুলকে কবুতর পালতে দিতে হবে। তানাহলে সেই মিল চাতালে জিয়ারুল কাজ করবে না। কেন তার এই শর্ত জানতে চাইলে জিয়ারুল বলেন, “কবুতর আমার মনের ভাষা বোঝে। আমি রাতে বাড়ি আসলে ওরা আমার উপস্থিতি বুঝতে পারে। আমিও একটু কথা বলি। আমরা যারা চাতালে কাজ করি তাদেরকে স্ত্রী সন্তানসহ চাতালের ঘরে বসবাস করতে হয়।” বর্তমানে ৪০টি খোপে তার ৩০টির মত কবুতর আছে। ৩ ছেলে ২ মেয়ে স্ত্রী ও কবুতর নিয়ে তার সংসার। মাঝে মাঝে ছেলে মেয়েদের কবুতরের মাংস খেতে দেন। কোন সময় মিল মালিককে খেতে দেন। খুব টাকার প্রয়োজন হলে ১/২টা কবুতর বিক্রি করেন বলে জানান।
1
ঘটনা-৩
আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম। শ্যামনগর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা। একজন সরকারি কর্মকর্তা। সম্প্রতি, শ্যামনগর উপজেলা প্রশাসনের সীমানার সমস্ত গাছের পাখি বসবাসের জন্য কয়েকশ মাটির ভাঁড় ঝুলিয়ে দিয়েছেন। একই সাথে উপজেলা প্রসাশনের এলাকাকে পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণা করেছেন। প্রতিনিয়ত উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিয়ে তিনি উপজেলার কৃষি, প্রকৃতি এবং প্রাণের সকল ধরনের বৈচিত্র্য সুরক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করছেন। প্রাখির প্রতি ভালোবাসায় তাঁর এই উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে বলেন, “নির্বচারে বনভূমি উজাড়, বৃক্ষনিধন, রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার, পাখি শিকারসহ নানাবিধ কারণে আমাদের পরিবেশ ও প্রকৃতি থেকে পাখি হারিয়ে বা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সুস্থ সুন্দর পরিবেশে মানুষের টেকসই জীবন-জীবিকার জন্য পাখিসহ প্রতিটি প্রাণীর সুরক্ষা খুবই জরুরি।” তিনি জানান, উপজেলার পাখির বৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা সুরক্ষায় মানুষের মাঝে সচেতনা তৈরিতে এই উদ্যোগ। পাশাপাশি, এই উদ্যেগে তরুণ প্রজন্ম (সুন্দরবন স্টুডেন্টস সলিডারিটি টিম), গবেষক, উন্নয়ন কর্মী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

ঘটনা-৪
আব্দুর রহিম। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র। নিজের বাড়ির কুল গাছের ডালে সখ করে একটি ভাঁড় ঝুুলিয়ে রেখেছিল পাখি বসার জন্য। প্রতিদিন ঘরের জানালায় বসে পড়ার সময় রহিম ভাঁড়ে দিকে তাঁকিয়ে থাকে পাখি বসেছে কিনা? এভাবে ৩ মাস অপেক্ষার পর হঠাৎ একদিন বৃষ্টির সময় রহিম দেখলো তার ঝুলানো ভাঁড়ে পাখি বসেছে। সাথে সাথে রহিম ফেইসবুকে ছবিসহ স্ট্যাটাস দিল তার ্উদ্যোগ সফল হয়েছে। আজ তার মন খুব ভালো।

উপসংহার
পাখির প্রতি ভালবাসায় উপরোক্ত মানুষের উদ্যোগুলো সত্যিই প্রশংসনী ও অসাধারণ। পাখির মত প্রতিটি প্রাণের খাবার, বাসস্থান, বিচরণ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব মানুষকেই নিতে হবে। তাই পাখির মত সকল প্রাণের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মানুষ প্রাণীকে সবসময় মনে রাখতে হবে,“প্রাণবৈচিত্র্যই জীবন, প্রাণবৈচিত্র্যই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে”।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: