সাম্প্রতিক পোস্ট

একজন ‘বিনে পয়সার’ গ্রাম্য কবিরাজ

মানিকগঞ্জ থেকে শিমুল বিশ্বাস

একটা সময় ছিল মানুষের চিকিৎসার প্রধান মাধ্যমই ছিল কবিরাজি। নানান ভেষজ উদ্ভিত, লতা গুল্ম দিয়ে যুগে যুগে মানুষ লোকায়ত পদ্ধতিতে এই চিকিৎসা চালিয়ে এসেছে। কিন্তু কবিরাজি চিকিৎসায় আজ অধিকাংশ মানুষের আস্থা নেই। ভেষজ ও বনৌষধের গুরুত্বের অভাবে মানুষ  এগুলোকে আগাছা বলে শেকড় সমেত উপড়ে ফেলে। ফলে পেশাদার কবিরাজ আজ চোখে দেখা যায় খুবই কম। এ অবস্থাতেও দু’একজন কবিরাজ পেশাগত ও দায়িত্বশীলতার  কারণে এখনও নিজ বাড়িতে সংরক্ষণ করেন চিকিৎসার প্রয়োজনীয় ঔষধি বৃক্ষ। এমনই একজন কবিরাজ ইব্রাহিম মিয়া। গ্রাম্য কবিরাজ ইব্রাহিম মিয়া। পৈত্রিক নিবাস সিংগাইর উপজেলার বায়রা ইউনিয়নের নয়াবাড়ি গ্রামে। ইব্রাহিম মিয়ার দাদা আসমান ফকির ছিলেন নামকরা পেশাদারী করিরাজ। যদিও এই পেশা আর কোন কবিরাজের অন্ন বস্ত্রের যোগান দিতে সক্ষম নয়, তারপরও আকড়ে ধরে আছেন বংশপরম্পরা আর দায়িত্বের কারণে। শুধুমাত্র বংশগত ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য ইব্রাহিম মিয়ার মত অনেকেই খুঁড়িয়ে  খুঁড়িয়ে চালিয়ে নিচ্ছেন এই সনাতনী চিকিৎসা ব্যবস্থাকে। আসমান ফকিরের মত আরো নাম ডাকওয়ালা কবিরাজের ছড়াছড়ি ছিল এই বায়রা এলাকায়। নয়াবাড়ির কাঞ্জু ফকির, জিগির আলী ফকির, আলিমুদ্দিন ফকির, গাড়াদিয়ার সদা ফকির, বায়রা গ্রামের বৈঠা ফকিরসহ অনেকেই কবিরাজ হিসাবে যথেষ্ট সমাদৃত ছিলেন। এ সব কবিরাজ থাকার কারণেই একসময় অনেক ধরনের ঔষধি গাছে সমৃদ্ধ ছিল এলাকাটি। একসময় কবিরাজ হিসাবে ইব্রাহিম মিয়ার চাচা মাদারি মল্লিকেরও যথেষ্ট সুনাম ছিল। মূলত চাচা মাদারি মল্লিকের নিকট থেকে কবিরাজি জ্ঞান নিয়ে ষাটের কাছাকাছি এই প্রবীণ মানুষটি এখনো করে চলেছেন নানান রোগের চিকিৎসা। ৩৮ বছরের চিকিৎসা জীবনে চার হাজারের উপরে রোগীর চিকিৎসা করেছেন তিনি।

Ibrahim
কথা প্রসঙ্গে ইব্রাহিম মিয়া বলেন, “একটা সময় ছিল যখন মানুষের রোগ নিরাময়ের একমাত্র ভরসা ছিল গ্রাম্য কবিরাজ। পা ব্যথা, মাথা ব্যথা, জ্বর, আমাশয়, জন্ডিস, পেট ব্যথা, চোখের ফুলি, দাঁতের পোকা নিরাময়, মেয়েদের শ্বেত রোগসহ শরীরের এমন কোন রোগ ছিল না যা কবিরাজি চিকিৎসায় নিরাময় হতো না।” কবিরাজি চিকিৎসার ঔষধ তৈরির একমাত্র এবং অন্যতম উপাদান ছিল বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা উদ্ভিদ ও বৃক্ষরাজি। বাড়ির আসে পাশে ঝোপঝাড়ে ছিল ঔষধি গাছের ছড়াছড়ি। আর পেশাগত প্রয়োজনেই কবিরাজগণ সযতেœ সংরক্ষণ করতেন নানা ধরনের ভেষজি উদ্ভিদ, বৃক্ষ, তরুলতা। কালের বিবর্তনে ঘটেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসার। পরিবর্তন এসেছে মানুষের ভাবনা চিন্তায়। মানুষের আস্থা ও আগ্রহ বেড়েছে আধুনিক এলোপ্যাথি ও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার ওপর। যে কারণে ধীরে ধীরে কালের গর্ভে হারিয়ে যেতে বসেছে পেশাধারী কবিরাজ, সংরক্ষণের অভাবে বিলুপ্ত হচ্ছে রোগ চিকিৎসার সেই সব মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদ।

ইব্রাহিম মিয়া চলতি বছরেই তিন শতাধিক রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছেন। আর কবিরাজি চিকিৎসার প্রয়োজনে তার বাড়িতে স্বযতেœ সংরক্ষণ করে রেখেছেন উলট কমল, ঘৃতকমল, মুরমুরে, কল্পনাথ, গোড়া চক্কর, রাধা চক্কর, সাদা লজ্জাপতি, মনিরাজ, পাথর চুনা, শতমুল, বাসক, রামতুলশি, কাল তুলশি, বায়না, ঈশ্বর মুল, তুলশি, জ্যৈষ্ঠমধু, টাকা থানকুন, ভুইকুমড়া,তুরুক চন্ডাল,বিষজারুল, ফণিমনশা, বিষকাটালি, দকালধুতরা, সাদা ধুতরা, মোরগফুল, হাতিশুরা, পুদিনা গাছ, সাপাচক্কর, আমলকি, বহেরা, হরিতকি, বিলাইহেচড়া, নিম, হাড়মচকা,তালমাকনা, রক্ত জবা, ভাটি গাছ, ডালিম গাছ, মেহেদী গাছ, কইউপড়া, নলটুনি ফুল, ভুই আম্বলী, ভেন্না গাছ, অগ্নিশ্বর, কদম রসুল ফুল, গ্যাস্টিক গাছ, ফিন্নি বাদাম, ভুইচন্ডাল সহ ৫৭ প্রকারের ঔষধি গাছ। ইব্রাহিম মিয়া বলেন, “একসময় আমার বাড়িতে ১০০ প্রকারের উপরে ঔষধি গাছ ছিল। ১৯৮৮ সালের বন্যার কারণে অনেক গাছ মারা গেছে। যে গাছগুলো মারা গেছে সেগুলো আমি যোগাড় করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোথাও পাইনি।”
তিনি আরও বলেন “আমি অধিকাংশ সময় হেটে চলাফেরা করি। রাস্তায় যখন আমার প্রয়োজনীয় কোন গাছ দেখি তখনই সেই গাছ আমার বাড়িতে এনে লাগাই।” বৃক্ষের প্রতি ভালোবাসার কারণে এই মানুষটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবস ২০১৬ উপলক্ষে বেসরকারি গবেষণাধর্মী উন্নয়ন সংগঠন বারসিক কর্তৃক পেয়েছেন প্রাণবৈচিত্র্য সম্মাননা। তার বাড়িকে ঘোষণা করা হয়েছে “প্রাণবৈচিত্র্য সমৃদ্ধ কৃষি নিবাস”। কবিরাজ ইব্রাহিম মিয়ার কাছে প্রতিমাসেই পাঁচ থেকে দশ জন রোগী আসে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা নিতে। এছাড়া নিজ গ্রামসহ আশেপাশের মানুষ তার বাড়িতে আসে বিভিন্ন ধরনের ঔষধি গাছ নেওয়ার জন্য। তিনি শুধু কি গ্রামের মানুষমই নয় তার কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য ঢাকা, সাভার, নবাবগঞ্জসহ অনেক দূর দূরান্ত থেকে নিয়মিত রোগীরা আসেন। চিকিৎসায় কোন টাকা পয়সা নেন না। এজন্য তিনি ‘বিনা পয়সার কবিরাজ’ হিসাবে এলাকায় পরিচিত। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “কবিরাজি আমার পেশা না। আমার চিকিৎসায় যদি রোগী ভালো হয় তাহলে আমার আনন্দ লাগে। তয় আমি প্রত্যেক বছর ভেওরা ভাষানো অনুষ্ঠান করি। যারা আমার চিকিৎসায় ভালো হয় তারা তখন কিছু কিছু জিনিসপত্র নিয়ে আসে এই যা।”

বর্তমান চিকিৎসা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে মানুষ আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয় তাই কবিরাজি পেশায় মানুষের আস্থা আর আগের মত নেই। যে কারণে পেশাদারি কবিরাজ খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। তারপরও যেসব কবিরাজ আমাদের দেশে আছে তারা নিজেদের প্রয়োজনে অনেক গাছপালা লতাপাতা সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে রাখছেন। প্রাণ-প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে, টিকিয়ে রাখতে হবে ইব্রাহিম মিয়ার মত বিনা পয়সার কবিরাজদের। যারা নিঃস্বার্থভাবে শুধু ঐতিহ্য ও সংস্কার রক্ষার তাগিদে বৈচিত্র্যময় প্রাণ প্রকৃতিকে লালন করে চলেছেন।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: