সাম্প্রতিক পোস্ট

বাদাবনে লতা পাতার ব্যবহার

সাতক্ষীরা থেকে মননজয় মন্ডল

Ban-1পৃথিবীর একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুন্দরবন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই বনাঞ্চলে সুন্দরী, গেওয়া, পশুর, ধুন্দল, বাইন, খলিশা, গোলাপাতা, কালো লতা, গরান, কেওড়া, কাঁকড়া, হেতাল, জানা, বাউলে ইত্যাদি মূল্যবান গাছের সমাহারে আছন্ন। ঝোপ-ঝাড় ও ঘন জঙ্গলে ভরা বৃহৎ এ টাইডাল বনের উপর উপকূলীয় ৫ লাখ পেশাজীবী বনজীবীদের জীবন ও জীবিকা সরাসরি নির্ভরশীল। প্রতিদিন সুন্দরবন থেকে অফুরন্ত সম্পদ আহরণ করে মৌয়ালী, বাওয়ালী, চুনুরী, দুনুরী, মুন্ডা, মাহাতোসহ সকল বনজীবী। সুন্দরবনের অফুরন্ত প্রাণ সম্পদের মধ্যে রয়েছে কতপিয় মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদবৈচিত্র্য।

জীবনের তাগিদে বনজীবীরা বাঘ, জলদস্যু, কুমির, হাওর, বন্যশুকর, গুইশাপ এবং বিষধর সাপের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করে বনজ দ্রব্য সংগ্রহ করে। বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষিত এই সুন্দরবনে ৫ হাজার প্রজাতির সম্পূরক উদ্ভদি, ১৯৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১২৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৭৯ প্রজাতির পাখি, ১২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ৩০ প্রজাতির চিংড়ী মাছসহ নানা বৈচিত্র্যময় সুন্দরবনের পরিবেশ ও প্রতিবেশগত ঐতিহ্য রক্ষা করে সম্পদ আহরণের সময় নানা ধরণের সমস্যা ও বিপদের সম্মুখীন হন বনজীবীরা। বনের গহীনে কৌশলে চলাচলে বা অবস্থানের সময় বিপদের হাত থেকে রক্ষার জন্য প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করেন সুন্দরবনের লতা, পাতা, শেকড়, ফলমুল।
ban
সুদীর্ঘকাল ধরে লোকায়ত পদ্ধতির আলোকে বনজীবীরা যেসকল ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহার করেন তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হল সুন্দরী গাছ। এ গাছের কচি পাতা, শেকড় ও ছাল ভেষজ চিকিৎসার অন্যতম উপাদান। ব্লাডে সুগারের পরিমাণ কমায় বলেই ডায়বেটিকস রোগীদের জন্য এটি খুবই মূল্যবান হিসেবে বনজীবীদের কাছে বিবেচিত। যেসব নারীদের স্তন শক্ত ও চাকা হয়ে যায় তারা ব্যবহার করেন ধোতলের ফল। বেলের মত বড় আকৃতির এই ফলের মধ্যে তিন কোনা বীজের ভেতরের সাদা অংশ বেটে ২/৩ দিন প্রলেপ দিলে এই সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়।

মাঝারী আকৃতির বেগুনের মত দেখতে বাউলে ফল। এটা কাঁচা ও পুড়িয়ে খাওয়া যায়। আমাশয়ের প্রধান ঔষধ হিসেবে বনজীবীদের কাছে বিবেচিত। বনের মধ্যে চলাচলে শরীরে কোন স্থান কেঁটে গেলে গরানের কচি পাতা বা শেকড় বেঁটে ক্ষত স্থানে প্রলেপ দিলে দ্রুত রক্ত পড়া বন্ধ হয় এবং ব্যথা সেরে যায়। সুন্দরবনের পায়রা ও কান মাছের কাটা খুব বিষাক্ত। এর কাটা একবার ফুটলে অনেক বেশি সময় ধরে যন্ত্রণা হতে থাকে। তখন এই বিষের জ্বালা থেকে মুক্তি পেতে বনের মধেই তুলে নেয় হাতের কাছ থাকা কালো লতা বা হরখোজা গাছের শিকড়। আড়াইটি গোল মরিচের সাথে শিকড়গুলো বেঁটে বেঁধে দিলেই মুক্তি মেলে।

দেশীয় পাতি লেবুর মত দেখতে খানিকটা নাম বনলেবু। সুন্দরবনের গহীনে এই লেবুর সন্ধান রয়েছে। পেটের বদহজম থেকে মুক্তি লাভে এই লেবুর রস শরবত করে খাওয়ার জ্ঞান সকলেরই জানা। সুন্দরবনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অতি জনপ্রিয় একটি ফল কেওড়া। স্বাদে ও গুনে অনন্য এই ফল বনজীবীরা মহাঔষধি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এটাই একমাত্র উপকারী টক ফল যা কিনা সব ভাবে খাওয়ার উপযোগী। বছরের জুন, জুলাই ও আগস্ট এই তিন মাস বনজীবীদের প্রতিটি বাড়িতে এ মৌসুমী ফলের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়। কাচা, সেদ্ধ করে, তরকারী রান্না করে, ডালের সাথে, টক রেঁধে, অম্বলসহ নানাভাবে খাওয়া যায় এটি। প্রাকৃতিক এই কেওড়া ফল থেকে উপকুলীয় মানুষের মধ্যে আচার তৈরির হিড়িক পড়ে যায়। টক, ঝাল মিষ্টি স্বাদের আচার, জেলি, চকলেট, নোড়া সহ নানা আইটেম বানিয়ে রেখে দেন সারা বছর খাওয়ার জন্য।
Ban-2
“নানা ভাবে খাওয়ার উপযোপি সুন্দরবনের এই সুস্বাদু ফল শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। হজম শক্তি বৃদ্ধি করে, আমাশয় দুর করে, মুখে রুচি বাড়ায়, ক্ষুধা মন্দাভাব দুর করে এবং বমি ভাব দুরীভুত করে।” জানালেন বনজীবী শেফালী বেগম, সেলিনা আক্তার, সোনাভানু বিবি। বনজীবী ছবেদ আলী, আব্বাস উদ্দিন বলেন, “বাদার মধ্যে চালান নিয়ে অনেক দিন ধরে থাকা লাগে। এসময় আমরা ছোটখাট সমস্যা বা বিপদ-আপদে পড়লে বিভিন্ন রকম লতাপাতা ব্যবহার করি। আমাদের পুর্ব পুরুষদের কাছ থেকে এসকল অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। বাদার মধ্যে আমাদের স্থানীয় পদ্ধতি ব্যবহার করে চলতে হয়।”

সুন্দরবননির্ভর জনগোষ্ঠীর ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতি দীর্ঘকালের এক ইতিহাস। চিরায়ত ও ঐতিহ্যগতভাবেই বাদাবনের গহীনে অনাকাঙ্খিত দূর্ঘটনার হাত পরিত্রাণ পেতে বনজীবিরা এসকল ভেষজ চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করেন। বনজীবীদের এই লোকজ ঔষধি জ্ঞানকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট সকলকে ভূমিকা রাখতে হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: