Posted in

পঁচিশ বছরের প্রাণবৈচিত্র্য অভিযাত্রা

পাভেল পার্থ

১.

১৯৯২ থেকে ২০১৮। দীর্ঘ পঁচিশ বছর। জাতিসংঘ প্রাণবৈচিত্র্য ঘিরে এই ফেলে আসা পঁচিশ বছরের যাত্রাকে উদযাপনের ঘোষণা দিয়েছে এবারের আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবসে। কিন্তু প্রাণবৈচিত্র্য নিয়ে দুনিয়ার জাতিরাষ্ট্রসমূহের ভূমিকা বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ। মাত্র পঁচিশ বছর সময় ধরে জাতিসংঘ জাতিরাষ্ট্রসমূহে একত্র করে প্রাণবৈচিত্র্য বিষয়ে কিছু মৌলিক নীতি গ্রহণ করেছে। যদিও অধিকাংশ রাষ্ট্রই এসব নীতি অস্বীকার করে চলেছে। দায় ও দায়িত্বগুলো অধিপতি কায়দায় আড়াল করেছে। এছাড়াও প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় দুনিয়ার সকল ভূগোলের সকল প্রাণ সমান গুরুত্ব ও মর্যাদা পায় না। দুনিয়ার ক্ষমতা ও শ্রেণিদরবার দিয়ে কেবল মানুষ নয় অন্যান্য প্রাণবৈচিত্র্যেরও শ্রেণিকরণ হয়। আর তাই বাঘ, মেরুভালুক, পান্ডা, হাতি, অ্যানাকোন্ডা, সবুজ ব্যাঙ কী গরিলারাই অন্যদের চেয়ে কদর বেশি পায়। হয়তো তারপরও প্রাণবৈচিত্র্য নিয়ে গত পঁচিশ বছরে বিশ্বব্যাপি রাষ্ট্র কাঠামোতেও কিছুটা সক্রিয়তা তৈরি হয়েছে। প্রাণবৈচিত্র্যের আন্তর্জাতিক সনদের রূপরেখা প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ১৯৮৮ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটা এ্যাডহক কর্মী সম্মেলন আহŸান করে। ১৯৮৯ এবং ১৯৯১ সালের সম্মেলনের ভেতর দিয়ে ২২ শে মে ১৯৯২ সালে আফ্রিকার নাইরোবিতে প্রাণবৈচিত্র্য সনদের মূল সনদ অনুমোদনের ভেতর দিয়ে কমিটির কাজ শেষ হয়। ১৯৯২ সালের ৫ জুন ব্রাজিলের রাজধানী রিওডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনে স্বাক্ষরের জন্য সনদটি উন্মুক্ত করা হয়। ১৯৯৩ সালের ৪ জুন পর্যন্ত তা স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত থাকে এবং ১৬৮টি দেশ তাতে স্বাক্ষর করে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ১৯৯২ সালের ৫ জুন এ সনদটি স্বাক্ষর করে এবং ১৯৯৪ সালের ৩ মে অনুসমর্থন দান করে। উক্ত সনদের আলোকে বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে “ইরড়ফরাবৎংরঃু ধহফ পড়সসঁহরঃু শহড়ষিবফমব ঢ়ৎড়ঃবপঃরড়হ ধপঃ’’ নামে একটি আইনের খসড়া তৈরি করেছে। উক্ত আন্তর্জাতিক সনদ প্রাণবৈচিত্র্যের সংরক্ষণ, প্রাণসম্পদের অধিকার ও জনগণের নিজস্ব জ্ঞান-সম্পদ-অভিজ্ঞতার সুরক্ষার জন্য বেশ কিছু আইনগত সিদ্ধান্ত হাজির করেছে। বিস্ময়করভাবে ১৯৯৮ সন থেকে আইনটি খসড়া হয়েই আছে। পাশাপাশি জনগণের কোনো ধরণের অংশগ্রহণ ছাড়াই প্রাণবৈচিত্র্য আইনের খসড়াও তৈরি করেছে রাষ্ট্র। জাতিসংঘের সাধারণ সভার দ্বিতীয় কমিটিতে প্রথম উত্থাপিত হয় ‘আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবসের’ কথা। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এটি পালিত হয় প্রতিবছরের ২৯ ডিসেম্বর। ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে আন্তজার্তিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবসের তারিখটি পরিবর্তিত হয়ে পুনরায় এটি ২২ মে নির্ধারিত হয়। ২০১০ সালকে আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য বর্ষ ঘোষণা করা হয়। প্রতিবছর এ দিবসের জন্য একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়। ২০১৮ সনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রাণবৈচিত্র্য ঘিরে বিগত পঁচিশ বছরের কাজ, সাফল্য, উত্তরণ, ফলাফল, প্রভাব এবং ঝুঁকির এক সামগ্রিক মূল্যায়ন। মূলত প্রাণবৈচিত্র্য ঘিরে পঁচিশ বছরের উদযাপন এ বছরের প্রতিপাদ্য। এখন প্রশ্ন আসে বিগত পঁচিশ বছর আমরা প্রাণবৈচিত্র্য নিয়ে কী করেছি? হয়তো বলা ভালো আমরা কী করিনি। প্রতিদিন আমরা একটি একটি করে, কখনো লাগাতার নানাভাবে দেশের প্রাণের বৈচিত্র্য সমূলে উপড়ে ফেলেছি, নির্মমভাবে রক্তাক্ত করেছি, জখম করেছি আর নিরুদ্দেশ করে চলেছি। তাহলে আমাদের পঁচিশ বছরের উদযাপন কেমন হবে? রক্তদাগে লেখা প্রাণবৈচিত্র্যের এক করুণ আহাজারি!

২.
বৈচিত্র্য ও প্রতিবেশ ন্যায়বিচার নিয়ে কাজের সুবাদে প্রায়ই অনেকে একটা প্রশ্ন করেন, দেশে প্রাণবৈচিত্র্যের কী অবস্থা? অবশ্য তাদের অধিকাংশই ‘জীববৈচিত্র্য’ প্রত্যয়টি ব্যবহার করেন। এর ভেতর আবার বড় অংশটিই ‘জীববৈচিত্র্য’ বলতে কেবলমাত্র বন্যপ্রাণী বোঝেন। এর ভেতর বড় দলটি বন্যপ্রাণী বলতে বাঘ, বানর, হাতি কিংবা কুমীরকে সামনে রাখেন। তো, অধিকাংশ সময় আমি এই মৌলিক প্রশ্নটির কোনো যুতসই উত্তর দাঁড় করাতে পারিনা। কারণ এ প্রশ্নটি শুনলে বারবার আমার মনে হয়, প্রশ্নটিতো আমাকেও করা হয়েছে। কারণ শুধু বাঘ বা হাতি তো নয়, গাছ কী পাখি বা শামুক কী মানুষ এই দুনিয়ার আমরা সকলে মিলেই তো প্রাণের বৈচিত্র্য। প্রাণবৈচিত্র্য। কিন্তু দেশে প্রকাশিত পাঠ্য কী পাঠ্যের বাইরের তথাকথিত মূলধারার পুস্তকগুলো বরাবর প্রাণবৈচিত্র্য বলতে ‘জীববৈচিত্র্যই’ বোঝাচ্ছে আর ‘জীববৈচিত্র্য’ বলতে মূলত বৃহৎ মেরুদন্ডী বন্য জন্তুকে চেনাচ্ছে। যারা প্রাণবৈচিত্র্যের এমন একতরফা ও খন্ডিত মানে দাঁড় করিয়েছেন তারা এ বিষয়ে যে অনভিজ্ঞ বা উদাসীন এমন নয়; বরং হিসাবটা অন্য জায়গা। এ এক গভীর রাজনীতি। বৈষম্য এবং চক্রন্তও বলা যায়। কারণ প্রাণবৈচিত্র্যর সদস্য হিসেবে মানুষকে বাদ রেখে চিন্তা করলে যারা এই চিন্তা চাপিয়ে দিচ্ছেন তাদের বেশ ফায়দা হয়। তারা মনে করেন এই দুনিয়া তাদের মতো কিছু মানুষের জন্য সৃষ্টি হয়েছে। এখানকার তরুলতা, পাখপাখালি, শামুক-ঝিনুক, বাঘ-ভাল্লুক সব মানুষের পদানত হয়েই তো থাকবে। এই দুনিয়ায় তাই এককভাবে মানুষের টিকে থাকবার জন্য আর সকল প্রাণকেই শেষ করে দেয়া যায়। লুট, গুম, ধর্ষণ ও হত্যা করা যায়। লাগাতার একতরফা বাণিজ্য করা যায়। আর তাই প্রাণবৈচিত্র্যের তথাকথিত মূলধারার সংজ্ঞা ও উদাহরণে আমরা কখনোই মানুষের প্রতিকৃতি দেখিনা। আমাদের দেখানো হয় বাঘ, হাতি বা সিংহের ছবি। কোনো এলাকায় কোনো উন্নয়ন প্রকল্প চাপিয়ে দেয়ার আগে এখন রাষ্ট্রও বলে ‘জীববৈচিত্র্যের কোনো ক্ষতি হবে না, জীববৈচিত্র্য সংক্ষণ করা হবে’। রাষ্ট্রের কাছেও জীববৈচিত্র্য মানে কেবলমাত্র বন্যপ্রাণী। প্রাণবৈচিত্র্য নিয়ে বাংলাদেশের বিদ্যায়তন, সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষ, গণমাধ্যম কী রাষ্ট্র এমন এক ভীষণ বৈষম্যমূলক ধারণাকে অনিবার্য করে তুলছে যা দেশের প্রাণবৈচিত্র্যের ধারাকে অবিরাম দম চেপে ধরছে। অথচ বাংলাদেশের গ্রামীণ নি¤œবর্গ হাজার বছর ধরে মনে করে, প্রাণবৈচিত্র্য মানে দুনিয়ার দেখা-অদেখা জানা-অজানা দৃশ্য কি অদৃশ্যমান সকল প্রাণের বহুপাক্ষিক বহুমাত্রিক বৈচিত্র্য। আমাদের সংকট হলো আমরা দেশের মানুষের চিন্তা, জ্ঞান ও দর্শনকে বুঝতে চাইনি, পাত্তা দিইনি, আস্থা রাখিনি। আর তাই আজ তলিয়ে যাওয়া হাওরে মাছ বা ধান মরলে মানুষের কিছু যায় আসে না, নির্বিচারে মানুষ মরলেও তা কীভাবে বন্যপ্রাণকে প্রভাবিত করতে পারে তা আন্দাজ করা হয় না। প্রজাতি হিসেবে মানুষের ভেতর এক অসহনীয় বৈচিত্র্যমুখীনতা তৈরি হয়েছে। আর তাই নিরাপদে প্রশ্নহীনভাবে প্রতিদিন নির্যাতিত হচ্ছে প্রাণের বৈচিত্র্য, এক সহিংস জোরজুলুমের ভেতর টিকে থাকবার আপ্রাণ লড়াই করে যাচ্ছে। কিন্তু বিবর্তনবিদ্যার নিয়মে এটি প্রজাতির টিকে থাকবার প্রাকৃতিক সংগ্রাম নয়।

৩.

প্রাতিষ্ঠিানিক কায়দায় এবং বিদ্যায়তনিক পরিসরে অধিকাংশ সময় বাংলাদেশের প্রাণবৈচিত্র্যের খতিয়ান বর্ণনা করতে বরাবরই বাংলাদেশের গাছ-পাখি-মাছ এর প্রজাতি সংখ্যা তুলে ধরা হয়। দেশে ভিন্ন ভিন্ন ৩০টি কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চলে এখনও অসংখ্য প্রজাতির ধানজাত চাষ হলেও ধান বিজ্ঞানী ড.হেক্টর দেখিয়েছেন একটা সময় এদেশে প্রায় ১৮ হাজারেরও বেশি ধানের চাষ হতো। কিন্তু সবুজ বিপ্লবের নামে কৃষির উন্নয়ন করতে গিয়ে আমাদের ধানের বৈচিত্র্য আজ নিরুদ্দেশ হয়েছে। দেশের সবচে বড় হাওর হাকালুকি, যেখানে প্রতি শীত মওসুমে পরিযায়ী পাখিদের খুন করা হয়। সুন্দরবনের বাঘ বিশ্ববাজারে বিক্রি হতে হতে আজ মাত্র ১০৬। এক শিঙা গন্ডার আর হাতি বাণিজ্যের কারণে আগেই প্রাকৃতিক বন থেকে উধাও হয়েছে। রাজা-বাদশাহ কি ব্রিটিশ শোষণ গেলেও এখনো স্বাধীন রাষ্ট্রে হরিণ ও বুনো পাখির মাংশ প্রভাবশালীরাই খায়। দেশের টিকে থাকা একমাত্র জলাবন রাতারগুলকে প্রজাতিশূণ্য করবার চেষ্টা চলছে। ভালো নেই শালবন, বর্ষারণ্য, পাহাড়ি বন, গর্জন বন, ঘাসবন, গ্রামীণ বন কী বাদাবন। দেশের সকল বাস্তুসংস্থানসহ সামগ্রিক প্রতিবেশ এক জটিল সংকটের মুখোমুখি। মানুষসহ প্রাণের সকল বৈচিত্র্যকে আজ কেবল খাদ্য বা আবাস নয়, নিরাপত্তার জন্যও লড়তে হচ্ছে। কিছু মুনাফাভোগী লুটেরা দুর্বৃত্ত লোভী মানুষের জন্যই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শুধু তৈরি হয়নি, এটি বহাল আছে এবং এটিই যেন চূড়ান্ত হয়ে যাচ্ছে। প্রাণবৈচিত্র্যর প্রতি এই যে অবিরাম নিষ্ঠুরতা আর সহিংসতা এর বিরুদ্ধে কী তবে জাগবে না বাংলাদেশ? স্ন্দুরবনের বাঘ, মহানন্দার ঘড়িয়াল, টাঙ্গুয়ার হাওরের বুনো গোলাপ, পদ্মার ইলিশ, লাউয়াছড়ার উল্লুক, শ্যালা নদীল ইরাবতী ডলফিন, হাকালুকির কালিম, উপকূল দ্বীপের চামচ-ঠুঁটো বাটান কী মল্লিকপুরের বিশ্ববট এদের পাশে কী দাঁড়াবে না মানুষ? মানুষের পাশেই তো এরা জীবনভর দাঁড়িয়েছে, জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু মানুষ কী করেছে? হাতি মেরে দাঁতের দোকান দিয়েছে। বাঘের চামড়া দেয়ালে ঝুলিয়ে ব্যাটাগিরি প্রমাণ করছে। গরম জামার জন্য ভাল্লুক খুন করছে। কারখানা আর ইটভাটার জন্য গাছেদের নির্মূল করছে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রাণবৈচিত্র্যের উপর এমন নির্দয় সহিংসতাকে রুখে দাঁড়ায়নি। বরং নানাভাবে তা উসকে দিচ্ছে। রাষ্ট্র যেন আজ প্রাণের দেশ নয়, নির্মম বহুজাতিক বিষ কোম্পানি। কেবলমাত্র নিজের মুনাফাই গুণছে। ধান জমিনের পোকা দমনে বিষ দিতে গিয়ে মরছে জলের মাছ, মাটির কেঁচো। প্রতিদিন এমন লাগাতার মৃত্যুর নেই কোনো পরিসংখ্যান, নেই ন্যায়বিচার।

৪.

প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ নানা আন্তর্জাতিক নীতি ও সনদ স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হলেও এসবের কোনো প্রয়োগ নেই। অথচ এক ছোট আয়তনের দেশ হয়েও ভিন্ন ভিন্ন বাস্তুসংস্থানে বাংলাদেশে প্রাণের যে বৈচিত্র্য ছড়িয়ে রেখেছে তা দুনিয়ার আর কোথায় আছে? নোয়াখালীর ঠেঙ্গারচর চামচ ঠুঁটো বাটান পাখির বড় বিচরণস্থল। সুন্দরবন ইরাবতী ডলফিনের সর্ববৃহৎ বিচরণ অঞ্চল। টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো আর কোন জলায় এত বুনো গোলাপ আর বুনো স্ট্রবেরীর ঝোপ আছে? ঝিনাইদহনের মল্লিকপুরের বিশ্ববট বা ঠাকুরগাঁওয়ের সূর্য্যপুরী আম গাছের মতো বিশাল বট ও আম গাছের হদিশ পাওয়া ভার। শ্রীমঙ্গলের নাহার ও নিরালাপুঞ্জির কাছের বাদুড় গুহাগুলো এখনও বিস্ময় জাগায়। রাজশাহীর গোদাগাড়ী অঞ্চলের মহানন্দা ও পদ্মা নদীতে হয়তো এখনো টিকে আছে মিঠা পানির ঘড়িয়াল। চট্টগ্রামের বায়েজীদ বোস্তামীর মাজারের কালো নরম খোলের কচ্ছপ তো আজ দুনিয়া জুড়েই বিলুপ্ত। লাউয়াছড়া ও সাতছড়ি বনের উল্লুকদল বা রেমা-কালেঙ্গা বনের বাংলা শকুন দলটি আর কোথায় মিলবে? কক্সবাজারের গর্জন মাতৃবৃক্ষ বা হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গার উড়ন্ত কাঠবেড়ালী তো দুনিয়া জুড়েই বিপদাপন্ন। আমাদের হাওরাঞ্চল গভীর পানির ধানের আঁতুরঘর। বাংলাদেশ বেগুনের আদি জন্মভূমি। কিন্তু আমরা তো দেশের অসীম প্রাণের বৈচিত্র্যর কথা দারুণ গর্ব নিয়ে দুনিয়াকে জানাতে পারিনি। সারা দুনিয়া আসুক দেখুক জানুক কী অপরূপ ঐশ্বর্য আর বৈভব নিয়ে বাংলাদেশ বেঁচে থাকার লড়াই করছে। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের প্রাণবৈচিত্র্য এবং এর সাথে জড়িত জনজীবনধারা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সুরক্ষানীতি তৈরি করতে পারে সরকার। যা বিপর্যস্ত প্রাণবৈচিত্র্যর বাসস্থান ও টিকে থাকার নানা কারিগরিকে মজবুত করতে পারে। পাশাপাশি এর ভেতর দিয়ে স্থানীয় জনগণের এ মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান হতে পারে, যা সর্বোপরি দেশের জাতীয় উন্নয়ন বিকাশকে সক্রিয় করে তুলতে পারে।

৫.

একটামাত্র অভ্যাস পাল্টালেই প্রাণবৈচিত্র্য ঘিরে বাংলাদেশ দুনিয়ার বুকে এক অবিস্মরণীয় উদাহরণ তৈরি করতে পারে। যদি মানুষের বুকের ভেতর সকল প্রাণপ্রজাতির জন্য সত্যিকারের মমতা তৈরি হয়। যদি কোনো শামুক বা বাঘ, গাছ বা পাখি বিপদাপন্ন হলে মানুষেরও অন্তর কাঁপে তবেই এই নির্দয় সহিংসতা বন্ধ হতে পারে। দেশব্যাপি চিড়িয়াখানা, উদ্ভিদ উদ্যান বা সংরক্ষণাগার করে এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়। নতুন প্রজন্মের ভেতর দেশের প্রাণের বৈচিত্র্যের প্রতি মমতা জাগতে হবে, মমতা জাগাতে হবে। আবারো স্মরণ করিয়ে দিই, শালবনের ময়ূর বা হাওরের নানিদ মাছ আমরাই শেষ করেছি। এখনো শেষ করে চলেছি কত মাছ আর পাখিদের সংসার। দেশের নতুন প্রজন্ম তাহলে কী নিয়ে দাঁড়াবে আগামী দিনে? গর্ব আর আশার সব বৈচিত্র্যই যদি শেষ হয়ে যায়। প্রবীণের স্মৃতি আখ্যান নিয়ে আজ জাগতে হবে নবীনকে। প্রাণবৈচিত্র্যের প্রতি প্রশ্নহীন অবিচার আর সহিংসতাকে রুখে দাঁড়াতে হবে। জাগিয়ে রাখতে হবে বাংলাদেশের অসীম প্রাণের বৈচিত্র্যময় সম্ভার। দুনিয়াব্যাপি প্রাণবৈচিত্র্য খুনখারাবির খতিয়ানে বিগত পঁচিশ বছরে বাংলাদেশও প্রবলভাবেই সংঘাতে জড়িয়েছে। আজ পঁচিশ বছরের খতিয়ানের স্মৃতি-বিস্মৃতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া জরুরি। স্মরণ রাখা জরুরি একটি পাখি হারানো মানে মানুষের সমাজ অনেকখানি ভেঙে পড়া। কেবল দৃশ্যমান কিছু প্রাণীর সংখ্যার জন্য কোনো বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প নয়, পঁচিশ বছরের প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষা যাত্রার খতিয়ানে আমাদের দেখা-অদেখা সকল বৈচিত্র্যর অবস্থাই আলাপে আনতে হবে। শুরু করতে হবে আরেক নতুন প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষা অভিযাত্রা।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.