সাম্প্রতিক পোস্ট

বদলে যাচ্ছে রাধা চক্করের মেলার আসল রূপ

মানিকগঞ্জ থেকে নজরুল ইসলাম

মেলা হলো গ্রাম-বাংলার লোকায়ত চর্চার অন্যতম বাহন। এখানে থাকে না কোন জাতিভেদ, বর্ণভেদ। সকল বর্ণের, সকল ধর্মের মানুষের এক মহামিলন কেন্দ্র হলো গ্রামীণ মেলা। এছাড়া মানুষের চাহিদা পূরণে, বিশেষত, শিশুদের মন আকৃষ্ট করতে বৈচিত্রপূর্ণ বহু পণ্যের সমারহ ঘটে মেলাতে। গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা হয় সচল। তেমনই একটি মেলা হলো মানিকগঞ্জ জেলার ঘিওর উপজেলার নালী ইউনিয়নের উভাজানি গ্রামের রাধা চক্করের মেলা।

উভাজানি গ্রামের বৈরাগী হিন্দু সম্প্রদায় এই মেলার মূল আয়োজক এবং সহযোগিতা করছেন গ্রামবাসীসহ স্থানীয় লোকজন। উভাজানি গ্রামের প্রবীণ শিল্পী ৭৫ বছর বয়সী আব্দুর রহমান বয়াতী বলেন, “মেলা আনুমানিক  তিনশত বছর পূর্ব হতে প্রচলিত হয়ে আসছে। কথিত আছে, বৈশাখ মাসে আউশ-আমন ধানের বাইন দেয়ার (রোপণ করা) জন্য মাটিতে যেন পোম (উর্বরতা) থাকে, তার জন্য বৃষ্টি প্রার্থনা করা হয়। এই প্রার্থনার নিমিত্তে, তৎসময়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা রাধা-গোবিন্দ বিগ্রহ স্থাপন করে। পূর্বে রাধা-গোবিন্দ বিগ্রহটি স্বর্ণের  নির্মিত ছিল। বর্তমান পিতলের বিগ্রহ রয়েছে।”

radha

৮৬ বছর বয়সী প্রবীণ নারী, মাধবী রানী সরকার বলেন, “এই পিতলের বিগ্রহটি মহিলাদের গৃহস্থালীর কাজে ব্যবহৃত কুলার মাঝখানে স্থাপন করে, গ্রামের  প্রত্যেক ঘরে ঘরে ঘুরে, টাকা-পয়সা চাল, ডাল সংগ্রহ করে, পূজা ও ভোগের আয়োজন করা হয়। এই পূজা-ভোগ উপলক্ষে হরি উৎসবও হয়ে থাকে। হরি উৎসব ও পূজাকে কেন্দ্র করেই মূলত রাধা চক্করের মেলার উদ্ভব হয়েছে।” উভাজানির এই মেলা প্রতিবছর বৈশাখ মাসের প্রথম বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মেলার বিশেষ আকর্ষণ ছেলেমেয়েদের চিত্ত-বিনোদনের জন্য নাগরদোলা। এই নাগরদোলাকে অনেকে রাধাচক্কর বলে অভিহিত করে। রাধাচক্করের আধিক্য হেতু অবশেষে সবার কাছে মেলাটি ”রাধাচক্করের মেলা” হিসেবে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে পরিচিতি লাভ করে। আজ থেকে বিশ বছর আগে মেলায় হিন্দু-মুসলমান সকল ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করার মত। অসংখ্য সাধু-সন্ন্যাসীদের আগমন ঘটত বলে এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের মাধ্যমে জানা যায়। তখন অত্যন্ত জাঁকজমপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হত।

radha-1

বর্তমানে মেলায় আগের মত জনসমাগম হয় না। তেমন সাধু-সন্ন্যাসিদের আগমনও প্রত্যক্ষ করা যায় না। ৭৭ বছর বয়সী, রাধারামন মাঝি বলেন, “মেলার সেই অতীত ঐতিহ্য আর নেই। এখন কোন মতে বেঁচে আছে আমাদের মত কয়েকজন অতি উৎসাহী রাধা-গোবিন্দ ভক্তদের প্রাণান্ত মেহনতের কারণে।” মেলার প্রধান আকর্ষণ নাগরদোলা ও সার্কাস হলেও, স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠা হরেক রকমের মিষ্টান্ন- আমেত্তি, জিলাপি, চমচম, রসগোল্লা, রাজভোগ, কালোজাম, দই, ঘি, দানাদার, সন্দেশ ইত্যাদির চাহিদা আছে ব্যাপক পরিমাণে। এছ্ড়াা, বেদেরা আসত মহিলাদের ও শিশুদের হরেক রকমের বাহারি আকর্ষণের বানিয়াদি প্রসাধনী, বিলাসি রঙের পণ্য নিয়ে। তাছাড়া তামা, কাসা, মাটির  তৈরি বিভিন্ন রকমের তৈজসপত্র বিশেষ করে, শিশুদের খেলনার জন্য মাটির তৈরি দুলদুল ঘোড়া, টমটম ইত্যাদি শিশুদেরকে এখনো আকৃষ্ট করে। গ্রামীণ কারুশিল্পীদের তৈরি অসংখ্য উপকরণ, হরেক রকমের খাদ্য সম্ভার, চিনির সাজ, কদমা, বাতাসা, বিন্নি খই, মুড়ি, ভ্রাম্যমাণ দোকানীদের নানা রকমের পণ্যসামগ্রী  এখনো পাওয়া যায়। তবে আগের তুলনায় অনেক কম। মেলার এক বয়োজ্যেষ্ঠ দোকানদার, কারুশিল্পী হারুন-আর-রশিদ (৬৮) বলেন, “আমি ১৭ বছর ধরে একভাবে এই মেলায় দোকান করছি। বছর যাচ্ছে আর মেলার আসল রূপ পাল্টে যাচ্ছে। আগে আমাদের এই পণ্যগুলো প্রচুর বেচাকেনা হতো। মেলায় গ্রামের নারীরা আসত, সংসারের  জিনিস কিনতো, ছেলেমেয়েদেরকে শখের খেলনা কিনে দিত।” তিনি আরও বলেন, “মেলায় একটা প্রাণ ছিল। এখন মেলা নষ্ট হয়ে গেছে। বেচাকেনার জন্য আগের সেই জিনিস তৈরীর কারিগর নেই, পেশা পরিবর্তন হচ্ছে। মেলার মধ্যে দেশী পণ্যের চাইতে বিদেশী পণ্যের সমারহ বেশি। প্লাস্টিকের বিভিন্ন জিনিস হরেক মাল বলে চালিয়ে দিচ্ছে, খাদ্যের মধ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য সংযোজন, বিভিন্ন কোমল পানীয় ,কৃত্রিম খাবার অবাধে বেচাকেনা হচ্ছে। উঠতি যুবকদের কাছে বিক্রি হচ্ছে নেশা জাতীয় জিনিসও।”

জেলার অন্যতম প্রাচীন-ঐতিহ্যের এই রাধাচক্করের মেলা  প্রতিবছর আজও  নির্দিষ্ট সময়ে বসে, কিন্তু আগের মত সেই বৈচিত্র্য আর নেই। মেলায় গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ-প্রবীণ ব্যক্তিদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। লোকসংখ্যা কমেনি, মেলার ঐতিহ্য কমেছে, কমেছে প্রাণ। এই মেলাকে আবার জীবন্ত করতে হলে, বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে। নতুনদেরকে তাদের মাধ্যমে শিখতে হবে। পাশাপাশি, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা একান্ত দরকার।

happy wheels 2
%d bloggers like this: