সাম্প্রতিক পোস্ট

কৃষক বাশার মোল্লার নার্সারি

রাজশাহী থেকে শহিদুল ইসলাম শহিদ

রাজশাহী জেলা তানোর উপজেলার ধানতৈড় গ্রামের কৃষক বাশার মোল্লা (৩৫)। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর দারিদ্রতার কারণে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে সংসারের হাল ধরার দায়িত্ব নেন তিনি। জমিজমা না থাকলেও পেশা হিসেবে কৃষিকেই গ্রহণ করেছেন। সংসারের হাল ধরার পর থেকেই তিনি চিন্তা করেন কীভাবে সামান্য জমিতে বৈচিত্র্যময় ফসল আবাদের মাধ্যমে অভাব দূর করা যায়! এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কৃষি কাজের জন্য প্রয়োজন জমি। জমি না থাকায় আমাকে হতাশার মধ্যেই সময় কাটাতে হয়েছে অনেকবার।”

বাশারের সংগ্রামের
আর্থিক সম্পদ বা জমি না থাকলেও বাশারের আছে বুদ্ধি, সুস্থ শরীর ও পরিশ্রমী মানসিকতা। তাই নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের জন্য তিনি নানান উদ্যোগ নিতে শুরু করেন। এর  মধ্যে ২০০৭ সালে সাতশ’ টাকার পুঁজি নিয়ে অবহেলা না করে নিজ উদ্যোগে কাজ শুরু করেন তিনি। তাঁর বড় ভাই বাবলুর পরামর্শে ৪ শতাংশ জমিতে দেশীয় জাতের টমেটোর চারা তৈরি করেন। টমেটোর চারা বিক্রি করে একমাসের মধ্যেই তিনি আয় করেন সাত হাজার টাকা। লাভ পেয়ে তিনি আরও আগ্রহী ও উদ্যোগী হন। তাই ২০০৯ সালে ৮ শতাংশ জমি পাঁচ বছরের জন্য লিজ নিয়ে সেখানে সব ধরনের সবজির চারা উৎপাদন করতে শুরু করেন। এই জমির চারা বিক্রি করে তিনি প্রথম তিন মাসেই ২৩ হাজার টাকায় করনে বলে জানান। ২০১৪ সাল পর্যন্ত এই জমিতে চারা উৎপাদন করেন। এভাবে ধীরে ধীরে তিনি পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা আনেন। দুই মেয়েকে স্কুলে লেখাপড়া করাতেও তেমন কোন সমস্যা হয় না।
Bashar
বাশারের ‘নুসরাত নার্সারি’
২০১৫ সালে বাশার মোল্লা একটি নার্সারি করে গড়ে তুলেন চারা বিক্রির টাকা দিয়ে। নার্সারি করার জন্য তিনি তানোর উপজেলা প্রশাসনের একটি জমি পছন্দ করেন। কেননা এই জমিতে নার্সারি করলে সহজে মানুষের চোখে পড়বে। এভাবে তানোর উপজেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করে কর্তৃপক্ষের কাছে ৩৬ শতাংশ জমি পঞ্চাশ হাজার টাকায় ৫ বছরের জন্য লিজ নেন। মূলত এই জমিটিতেই এই নার্সারি গড়ে তোলেন। গাছ লাগানোর প্রতি মানুষকে আকৃষ্ট ও সচেতন করার উদ্দেশ্য থেকেই তিনি এই নার্সারি করে বলে জানান। এই নার্সারি নামকরণ করেন তার ছোট মেয়ে নুসরাতের নামে। তাই এটি এখন সবার কাছে  “নুসরাত নার্সারি”  নামেই পরিচিত।
বর্তমানে নার্সারিতে তিনি মৌসম অনুযায়ী বিভিন্ন ফুল, ফল, সবজি ও বনজ চারা উপাদন করেন। তাঁর নার্সারিতে ৪৫ জাতের সবজি, ১৫ জাতের ফলজ, ২ প্রকার বনজ এবং ৫০ জাতের দেশী-বিদেশী ফুল, ফুলের চারা ও বীজ রয়েছে। বাশার মোল্লার তথ্যানুযায়ী নার্সারির চারা ও বীজ বিক্রি করে খরচ বাদে প্রতিবছর ৫০ হাজার টাকা আয় হয়।

বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, গাছ, ফুল এবং ফলের চারা ও বীজ থাকলে তাঁর নার্সারিতে মসলা জাতীয় চারা তেমন দেখা যায় না। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কেন আমাদের দেশের মাটিতে মসলা চাষ হয় না, তা আমি নিজে পরীক্ষা করে দেখতে চাই।”  তাই তিনি বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্র থেকে ২টি এলাচের (গরম মসলা) চারা সংগ্রহ করেন। বর্তমানে তার দু’টি এলাচের চারার গোড়া থেকে প্রায় ৫০টি চারা বের হয়েছে। তিনি বলেন, “চারাগুলোর নিবিড় পরিচর্যা করে যাচ্ছি এবং এখান থেকে কি ফলাফল আসে সেটা আমি নিজের চোখে দেখতে চাই।”
Bashar.jpg 1
বাশারের ইচ্ছা
বাশার মোল্লার ইচ্ছা হচ্ছে বিভিন্ন চারা তৈরির পাশাপাশি মসলা জাতীয় এবং ঔষধি গাছের চারা তৈরি করে মানুষের উপকারে ছড়িয়ে দেয়া। যাতে করে আমাদের দেশের মানুষকে চড়া দামে এগুলো কিনতে না হয়। বাশার তার নার্সারিতে বিভিন্ন ধরনের চারা উৎপাদন করে এলাকার মানুষের ফুল, ফল, বৃক্ষ ও বিভিন্ন ধরনের সবজির চাহিদা পূরণ করতে সহায়তা করেন। এই মসলা চাষে সফলতা পেলে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিবেন বলে জানান।

happy wheels 2
%d bloggers like this: