সাম্প্রতিক পোস্ট

সুুন্দর সমাজ গঠনে চাই জ্ঞানভিত্তিক গ্রামীণ পাঠাগার

নেত্রকোনা থেকে রুখসানা রুমী

এ দেশ আমাদের, এ দেশের মাটি, বাতাস, পানি, খাদ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও প্রকৃতির সংস্পর্শেই আমারা বেড়ে উঠেছি। এই দেশ আমাদের জীবনের নিরাপত্তা দিয়েছে, দিয়েছে শিক্ষা লাভের সুযোগ। তাই আমাদের এই দেশকে সকলকে জানতে হবে, জানতে হবে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস, দেশপ্রেম জাগ্রত করে দেশ ও মানুষকে ভালোবাসতে হবে। দেশের জন্য কিছু করতে হলে প্রথমে আমাদের যুব সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে।

শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড, শিক্ষা ছাড়া কোন জাতি উন্নতি করতে পারে না। শিক্ষিত জাতিই পারে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, ভালো ফলাফল করার লক্ষ্য নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষা দেওয়া হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিক শিক্ষার প্রচন্ড অভাব। বর্তমান প্রজন্ম নৈতিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। ফলে যুব সমাজ চলে যাচ্ছে বিপথে, মাদক, জুয়া সমাজটাকে ঘ্রাস করে ফেলছে, বৃদ্ধি পেয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন, খুনাখুনি। মানুষের মধ্যে সহযোগিতা ও সহনশীলতার বড়ই অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। যুব সমাজকে সৎ পথে ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষার। আর নৈতিক শিক্ষার জন্য প্রযোজন শিক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার।

Presentation1
শিক্ষার জন্য প্রয়োজন বিখ্যাত ও আদর্শ লেখকদের জ্ঞান সমৃদ্ধ লিখনীর। আর এসব বই পুস্তক পাওয়া যায় সাধারণত পাঠাগারে। যে পাঠাগারে থাকে বিভিন্ন লেখকের হরেক রকমের বই। কিন্তু গ্রাম পর্যায়ে পাঠাগার বা লাইব্রেরি না থাকায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিশেষভাবে যুব সমাজ বই পড়ে জ্ঞানার্জনের ও নৈতিক শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। তাই প্রতিটি গ্রাম পর্যায়ে অন্তত একটি করে গ্রামীণ পাঠাগার গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই প্রয়োজনীয়তাকে উপলদ্ধি করেই নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার নোয়াদিয়া গ্রামের ধান-শালিক-নদী-হাওর যুব সংগঠন এলাকার যুব সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও নৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য গ্রাম পর্যায়ে একটি পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সংগঠনের সদস্যরা তাদের সামর্থ অনুযায়ী বিভিন্ন ধরণের বই সংগ্রহ করে এবং অন্যান্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে সচেতনতামূলক বিভিন্ন ধরণের বই ও প্রকাশনা সংগ্রহ করে এই পাঠাগারে সংরক্ষণ করছে। বর্তমানে এই পাঠাগারে পাঁচ ধরণের ৩০টি বই এবং দুই ধরণের লিফলেট সংরক্ষণে রয়েছে।

শুধু পাঠাগার স্থাপনই নয়, পাশাপাশি তারা এলাকার যুব সমাজকে প্রকৃতির সাথে পরিচয় করা, তাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করা এবং নিজ দেশ ও জেলা সম্পর্কে জ্ঞানের পরিধি বিস্তারের লক্ষ্যে প্রতিমাসে আমার দেশ ও জেলা নেত্রকোণাকে জানি, মুক্তিযুদ্ধকে জানি- আলোচনা অনুষ্ঠান করা হয় এই তরুণদের উদ্যোগে। যুব সমাজকে নিয়মিত পাঠাগারে গিয়ে বই পড়তে আগ্রহী করে তোলা, মাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ ও রাষ্ট্রদ্রোহী কাজ থেকে বিরত রেখে যুব শক্তিকে একটি উন্নত ও টেকসই পরিবার, সামাজ ও দেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত করে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে এই তরুণরা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সংগঠনের উদ্যোগে নিয়মিত খেলা ধুলার ব্যবস্থা করে তাদেরকে সংস্কৃতি চর্চায় সহযোগিতা করে থাকে। স্কুলের শিক্ষার্থীরাসহ পার্শ্ববর্তী আরো পাঁচটি গ্রামের যুব ও কিশোর-কিশোরীরা এখানে এসে বই পড়ে এবং পরস্পরের সাথে বিভিন্ন শিক্ষা ও সচেতনতামূলক বিষয় সহভাগিতা করছে। এছাড়া নিজেদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, চারিত্রিক ও সামাজিক উন্নয়নের পন্থা চিহ্নিত করছে, নিজ নিজ এলাকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করছে এবং নিজেদের উদ্যোগে এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে সক্ষম হচ্ছে।

যুব সংগঠনটি চলতি বছর (২০১৭) উপজেলা প্রাণীসম্পদ বিভাগের সাথে যোগাযোগ করে গ্রামের ১০০টি পরিবারের গবাদী পশুর (গরু ও ছাগল) বিভিন্ন রোগের টিকা দিয়ে রোগ-বালাই মুক্ত রেখে প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। নোয়াদিয়া গ্রামের ধান-শালিক-নদী-হাওর যুব সংগঠনের সদস্যদের গৃহীত এ ধরণের উন্নয়ন উদ্যোগ এলাকার সকল শ্রেণীর মানুষের নিকট প্রশংসনীয় হয়ে উঠেছে। এই সংগঠনের কার্যক্রম ও সফলতা দেখে পার্শ্ববর্তী উলুয়াঠি গ্রামে অনুরূপ আরও একটি যুব সংগঠন গড়ে উঠেছে এবং সংগঠনের উদ্যোগে ছোট ছোট বিভিন্ন ধরণের উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

শুধু নোয়াদিয়া ও উলুয়াটি গ্রামই নয়, দেশের প্রতিটি গ্রামের যুব সমাজকে এলাকার উন্নয়নে জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ করে নৈতিক ও অদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলে যুব সমাজকে যেমন মাদক ও ইভটিজিংসহ বিভিন্ন ধরণের অপরাধ থেকে বিরত রাখা সম্ভব হবে, তেমনি শিক্ষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ, প্রকৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা ও উন্নয়নে যুব শক্তির সঠিক ব্যবহার সম্ভব হবে। তাই গ্রাম পর্যায়ে ব্যক্তি, সংগঠন এবং সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে যুব সমাজকে আদর্শ ও নৈতিক শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তবেই আমাদের সমাজ থেকে সকল অপরাধ ও সহিংসতা দূরীভূত হবে।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: