সাম্প্রতিক পোস্ট

দেশীয় অণুজীব ব্যবহারের মাধ্যমে তরল অণুজীব সার (IMO) উৎপাদন

বারসিক ঢাকা থেকে এবিএম তৌহিদুল আলম

ইনডিজেনাস মাইক্রো অর্গানিজম সংক্ষেপে IMO হলো স্থানীয় আবহাওয়ায় প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন অণুজীব। এই অণুজীবগুলো নানা ধরনের হয়ে থাকে যেমন ব্যকটেরিয়া, ছত্রাক, একটিনোমাইসিটিস ইত্যাদি। উপকারী অণুজীব মাটির স্বাস্থ্য ও উদ্ভিদকে রোগবালাই থেকে রক্ষা করে। মাটির তিনটি উপাদান ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক এই তিনটি উপাদানের ভারসাম্য থাকলে সে মাটিকে স্বাস্থ্যবান মাটি বলা যায়।

গত কয়েক দশকে আমরা শুধুমাত্র মাটির রাসায়নিক গুণাবলীর প্রতি গুরুত্ব দিতে গিয়ে চাষাবাদের পদ্ধতির কারণে ফসলি জমিতে অণুজীবের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। অণুজীব নিম্নশ্রেণীর বলে এদের গুণাবলী পারিপার্শ্বিক আবহাওয়া দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। দেখা গেছে, কোনো অণুজীব কোনো নির্দিষ্ট আবহাওয়া ও মাটিতে খুব ভালো কাজ করলেও সেই একই অণুজীব বিশুদ্ধ কালচার করে অন্য আবহাওয়ায় ব্যবহার করলে অনুরূপ ফল পাওয়া যায় না। আবার একটি অণুজীবের তুলনায় বহুবিধ অণুজীব একত্রে বেশি কার্যকরী। তাই বিজ্ঞানীরা স্থানীয় আবহাওয়ায় বিদ্যমান অণুজীবসমূহ কালচার করে সেখানেই ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। বাংলাদেশে সরকার ও জৈব সার, বিশেষ করে অণুজীব সার উৎপাদন ও বিপণনে বিদেশী অণুজীব নিষিদ্ধ করে দেশীয় অণুজীব ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।

IMO বানানোর জন্য মিশ্রণ তৈরি করণ
১টি প্লাস্টিক ড্রামে ৪ কেজি পরিমাণ কাঁচা গোবর নিয়ে তাতে ১০ লিটার পানি যোগ করে দ্রবণ তৈরি করতে হবে। এরপর এতে ১ লিটার দুধ ও ২ লিটার মোলাসেস দিয়ে আরও ৩ লিটার পানি ঢেলে কাঠি দিয়ে ভালোভাবে মিশ্রিত করতে হবে। এরপর অর্ধ পচা জৈবসার, পিঁপড়া বা উঁইপোকার ঢিবি ২ কেজি, ২ কেজি বাঁশ ঝাঁড়ের তলায় পড়ে থাকা অর্ধপচা পাতা, প্লাস্টিক ড্রামে রেখে তাতে অবশিষ্ট পানি ঢেলে ভালোভাবে নাড়তে হবে।

দুই ভাবে IMO তৈরি করা যায়
১. বায়বীয় (Aerobic) পদ্ধতি
একটি প্লাস্টিক ড্রামে মিশ্রণটি নিতে হবে। এ পদ্ধতিতে প্রতিদিন মিশ্রণটিতে অক্সিজেন সংযোগের মাধ্যমে IMO দ্রবণ তৈরি করা হয়।বায়বীয় পদ্ধতিউপকরণগুলি প্লাস্টিক ড্রামের মধ্যে ভালভাবে মিশ্রিত করে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রেখে দিতে হবে। প্রতিদিন সকাল বিকাল ঢাকনা খুলে দ্রবণটি নেড়ে দিতে হবে। এভাবে ২৫-৩০ দিন পর পরিপক্ক ইমো দ্রবণ তৈরি হবে।

২. অবায়বীয় (Anaerobic) পদ্ধতি
প্লাস্টিকের একটি ড্রামে মিশ্রণটি নিয়ে ঢাকনাটি শক্ত করে এমনভাবে লাগাতে হবে যাতে বাতাস ভিতরে ঢুকতে না পারে। মিশ্রনটি ড্রামে ভরার সময় প্লাস্টিক ড্রামের প্রায় ৫ সেমি জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে। অবায়বীয় পদ্ধতিএরপর প্লাস্টিক ড্রামের ঢাকনাটির উপরিভাগে অল্প একটি ছিদ্র করে তাতে স্যালাইন সিরিঞ্জের মোটা অংশটির মাথা পুঁতে দিয়ে অন্য অংশটি পানিপূর্ণ বোতলে ডুবিয়ে দিতে হবে যাতে টিউব দিয়ে বাতাস ঢুকতে না পারে। এরপর বোতলটি প্লাস্টিক ড্রামের গায়ে বেঁধে দিতে হবে। ঢাকনাটির কিনারা মাস্কিন টেপ দিয়ে মুড়িয়ে দিতে হবে। এভাবে ২০-২৫ দিন রেখে দিলে পরিপক্ক স্টক দ্রবণ IMO তৈরি হবে।

IMO দ্রবণ সংরক্ষণ
ইমো দ্রবণ তৈরি হওয়ার পর অস্বচ্ছ বোতলে সংরক্ষণ করতে হবে যাতে ভিতরে আলো না যায়। প্রয়োজনে আলাদা পাত্রে মোলাসেস দ্রবণ করে তা বোতলে মিশিয়ে সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

ব্যবহার
উৎপন্ন মূল IMO দ্রবণের ২ লিটার ২০ লিটার পানিতে মিশিয়ে সবজি ফল গাছে বা মাটিতে প্রয়োগ করা যেতে পারে। তাছাড়া অন্য জৈব সার উৎপাদনের সময় ও এটি ব্যবহার করা যায়। প্রতিবার দ্রবণ তৈরির সময় IMO পুরাতন দ্রবণ ব্যবহার করলে দ্রবণে অণুজীবের গুণগত মান ও বৈচিত্র্য বাড়ে।

সারণি ১: প্রতি ২০০ লিটার IMO তৈরির উপাদান ও আনুমানিক খরচ

New Microsoft PowerPoint Presentation

উপসংহার
মাটি সুস্থ রেখে ফসল উৎপাদন বর্তমান কৃষি ব্যবস্থার অন্যতম চালেঞ্জ। কোন একক অণুজীব ব্যবহার করে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। স্থানীয় পরিবেশে উৎপন্ন বৈচিত্র্যময় অণুজীবের ব্যবহার আগামী দিনের কৃষির স্থায়িত্বশীল সমাধানে IMO দ্রবণের ব্যবহার বর্তমান প্রক্রিয়ার ক্ষুদ্র প্রয়াস মাত্র।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: