Posted in

কোভিড-১৯ মোকাবিলায়: শতবাড়ি উন্নয়ন মডেলের মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক পুষ্টিব্যাংক

বারসিক ঢাকা থেকে এবিএম তৌহিদুল আলম

১.
কোভিড-১৯ বিশ্বজুড়ে শুধু মহামারী ঘটিয়েই থামছে না, বিশ্বসভ্যতাকে দাঁড় করিয়েছে এক সীমাহীন অনিশ্চয়তার মুখে। আশঙ্কা করা হচ্ছে ব্যাপক খাদ্যঘাটতি প্রাণহানির। ঐতিহাসিকভাবেই কৃষি ও কৃষক এদেশের মাটি ও মানুষের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। করোনা মহামারীকালীন বর্তমান সময়েও পুষ্টি চাহিদা পূরণ ও খাদ্যনিরাপত্তায় কৃষিই বাংলাদেশের অন্যতম আশা-ভরসার ক্ষেত্র। পৃথিবীর অনেক দেশের মতোই আমাদের দেশেও কৃষিব্যবস্থা উৎপাদন এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের উল্লেখযোগ্য খাত হিসেবে বিবেচিত। করোনাকালে লকডাউনে অন্যান্য শিল্প স্থবির হলেও কৃষি থেমে থাকেনি বরং এই দুর্যোগকালীন সময়েও ঝুঁকি এড়িয়ে কৃষি উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। করোনা প্রমাণ করেছে মহামারীর কারণে অন্যান্য শিল্প স্থবির হলেও কৃষ্টির সাথে সম্পর্কিত কৃষি কখনোই থামে না। এমনকি কৃষিখাত অন্যান্য অনেক শিল্পের কাঁচামালের মূল উপাদান যোগান দিয়ে সেগুলোকেও সচল রাখতে সক্ষম। এভাবে শুধু সারাবছর নয়; যে কোন দুর্যোগকালীন সময়েও এই খাতই দেশের মানুষকে দূর্ভিক্ষ থেকে পরিত্রাণের অন্যতম নির্ভরতা।

বারসিক কর্মএলাকায় নানা ধরনের প্রান্তিক পেশাজীবী জনগোষ্ঠিসহ বিপুল সংখ্যক কৃষি পেশাজীবী পরিবারের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসম্পর্কে জড়িত। কারোনাকালীন খাদ্যউৎপাদনের এই ‘খাদ্যযোদ্ধা’ কৃষকদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক এবং সামাজিক ব্যবস্থাপনায় সুরক্ষিত রেখে কৃষিউৎপাদন কার্যক্রম ধারাবাহিক রাখা অতি জরুরি। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, যাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি তাদের ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক অনেক কম বা তারা আক্রান্ত হলেও তা কম জটিল আকার ধারণ করে। এই প্রেক্ষিতে সুষম ও পুষ্টিকর তথা বৈচিত্র্যময় খাবার গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে বারসিক কৃষকদের মানসিক শক্তির মাধ্যমে মনোবল সুদৃঢ় রাখা ও ধারাবাহিক সহায়তা কার্যক্রম চলমান রেখে দায়িত্বশীলতার সাথে তথ্য, পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। একই সাথে কোভিড-১৯ মহামারীকালীন ও কোভিড পরবর্তী প্রান্তিক জনগোষ্ঠির পুষ্টি নিরাপত্তার জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। চারটি (নেত্রকোণা, সাতক্ষীরা, মানিকগঞ্জ ও রাজশাহী) কর্মএলাকায় ‘কৃষক-নেতৃত্বে কৃষি’ কার্যক্রমের অংশ হিসাবে বারসিক শতবাড়ি উন্নয়ন মডেলের মাধ্যমে ‘প্রতি ইঞ্চি মাটি, গড়ব সবুজ খাঁটি’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পরিবারভিত্তিক পুষ্টিব্যাংক স্থাপনের মাধ্যমে নিরাপদ উপায়ে পুষ্টি-ভিত্তিক শস্য-ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে জনগণের পুষ্টিস্তর উন্নয়নের লক্ষ্যে কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।

২.
বাংলাদেশে প্রায় দেড়কোটি বসতবাড়ি আছে। অন্যদিকে ১৯৮৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী মোট বসতবাড়ির মাত্র শতকরা মাত্র ১৩ ভাগ বসতবাড়ি সবজি চাষের আওতাভূক্ত। পরিবারভিত্তিক পুষ্টিব্যাংক হলো এমন একটি কৃষিপদ্ধতি যেখানে কৃষির মাধ্যমে উৎপাদিত খাদ্যশস্যে পুষ্টিগুণ ও খাদ্যবৈচিত্র্যের প্রতি অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সাথে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নিরাপদ উপায়ে খাদ্যশস্য উৎপাদন, কৃষির উৎপাদনশীলতা, খাদ্যের সামাজিক তাৎপর্য ও গ্রামীণ জীবিকা নির্বাহে কৃষির বিষয়টিও প্রাধান্য পায়। এই ধরনের কৃষিতে গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারে খাদ্যপুষ্টি অভাব পূরণ, জেন্ডার সমতা ও পুষ্টিশিক্ষার ব্যবস্থা থাকে যাতে পরিবারের শিশু ও নারীদের অপুষ্টি দূর হয়। পুষ্টিভিত্তিক কৃষি একই সাথে কৃষিকে এমন খাতগুলোর সাথে সংযুক্ত করে যা অপুষ্টিজনিত অন্যান্য কারণ যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা আনয়নে ভূমিকা রাখে।

বারসিক প্রতিটি কর্মএলাকায় ১০০টি করে মোট ৪০০টি পরিবারভিত্তিক পুষ্টিব্যাংক স্থাপনের মাধ্যমে বসতবাড়ি, বাড়ির আঙিনা, সংলগ্ন জমি, জমির আইল, রাস্তার পাশের অব্যবহৃত জমি, পতিত জমি, স্কুল বা অন্য প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গন, বাড়ির চালা, বেড়া, বসতবাড়ির বড় গাছসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় পুষ্টিভিত্তিক কৃষির আওতায় আনার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। পরিবারভিত্তিক প্রতিটি পুষ্টিব্যাংকে নানা প্রকার শাকসব্জি, লতা, পাতা, মূল, ফল, মসলা যেখানে যেটি উপযোগি সেটির চাষাবাদ করা হবে। একই সাথে প্রতিটি শস্য-ফসলের গুনাগুণ সম্পর্কে পুষ্টিব্যাংক’র প্রতিটি পরিবার নিয়মিত সভা ও উঠান বৈঠকে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জানবেন।

৩.
প্রতিটি প্রাণির শুধু জীবনধারণের জন্যই নয়, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য নিরাপদ, পুষ্টিমান সম্পন্ন ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের আর্টিকেল ১৮(১) ধারায় জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও পুষ্টি নিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে এখনো অনেক পিছিয়ে। বিরাট জনগোষ্ঠী এখনও অপুষ্টির শিকার যা করোনাকালীন ও করোনা পরবর্তীতে আরও ব্যাপকতা লাভ করতে পারে। খাদ্য উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে পরিবারভিত্তিক পুষ্টিব্যাংক তাই একটি অগ্রাধিকার এজেন্ডা। বিগত ৩১ মার্চ ২০২০ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৬৪টি জেলার জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্টদের সাথে ভিডিও কনফারেন্সে জরুরি নির্দেশনা প্রদান করে বলেন ‘খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আবাদী কোনো জমি ফেলে না রেখে প্রতি ইঞ্চি জমিতে ফসল ফলাতে হবে’ সরকার প্রধানের এই নির্দেশনা অনুসরণ এবং বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বারসিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠির পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যে পরিবারভিত্তিক পুষ্টিব্যাংক স্থাপনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে।

দেহের সংক্রমণ ও অসংক্রমণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই হার্ড ইমিউনিটি। কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় বিশ্বব্যাপী মানুষের দেহে পুষ্টি অবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পুষ্টি হলো জীবনধারণ ও স্বাস্থ্য রক্ষার অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। পুষ্টি এমন একটি শক্তি যা সুষম খাবার (খাদ্যের ৭টি উপাদান যেমন শর্করা, আমিষ, স্নেহ/চর্বি, ভিটামিন, খনিজ লবণ, পানি ও আঁশ শরীরের চাহিদা অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে) গ্রহণের মাধ্যমে তৈরি হয় এবং আমাদের দৈহিক গঠন, বৃদ্ধি, ক্ষয়পূরণ, শক্তি অর্জন, শারীরবৃত্তীয় কাজ পরিচালনা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, তাপ উৎপাদন, ভবিষ্যতের জন্য শক্তি সঞ্চয় ও সুস্থ থাকতে সাহায্য করে। আমরা সকলেই জানি, খাদ্যের প্রয়োজনীতা অনুযায়ী বিভিন্ন খাদ্যকে সাধারণতঃ তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে ঃ ১. শক্তিদায়ক খাবার-যেমন শর্করা বা কর্বোহাইড্রেট; যা আমরা ভাত, গম, ভুট্রা, আলু ইত্যাদি থেকে পাই; ২. শরীর বৃদ্ধিকারক ও ক্ষয়পূরক খাবার- যেমন প্রোটিন বা আমিষ যা আমরা ছোট মাছ, বড় মাছ, মাংস, দুধ ইত্যাদি থেকে পাই ও ৩. রোগ-প্রতিরোধকারী খাবার- যেমন ভিটামিন্স ও মিনারেল্স যা আমরা একমাত্র শাকসব্জি ও ফল-মূল হতে পেয়ে থাকি। পরিবারভিত্তিক পুষ্টিব্যাংক প্রতিষ্ঠা আমাদের এই তিন শ্রেণির খাদ্যেরই যোগান দিতে পারে।

৪.
বিজ্ঞানীরা মানুষের জীবনের জন্য ৪৯ ধরনের অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদান সম্পর্কে জেনেছেন যা দেহের মেটাবলিক বা জৈবিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে। পুষ্টি উপাদানসমূহের মধ্যে যেগুলো বেশি পরিমাণে গ্রহণ করা বা খাওয়া হয় সেগুলো হলো ম্যাক্রো নিউট্রিয়েন্ট যেমন- কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও চর্বি বা তেল। আবার যে সমস্ত পুষ্টি উপাদান তুলনাম‚লক কম পরিমাণে লাগে সেগুলো হল মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট বা অনুপুষ্টি । যেমন মিনারেল এবং ভিটামিনসমূহ। পরিমাণে কম বা বেশি প্রয়োজন হলেও এ সমস্ত উপাদান দেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এবং এদের যে কোন একটি অপর্যাপ্ততা শরীরের জৈবিক কার্যক্রমের ব্যাঘাত ঘটায়। ফলাফল হিসেবে অসুস্থ’তা, দুর্বল স্বাস্থ্য, শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয় তেমনই শিশুরা দূর্বল স্বাস্থ্য নিয়ে বেড়ে ওঠে। এহেন পরিস্থিতি মোকাবেলায় ব্যাপক সামাজিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। কোভিড-১৯ মোকাবিলা করতে গিয়ে তা আরও প্রকটভাবে সারাবিশ্বের মানুষ অনুধাবন করছেন। অন্যদিকে আমাদের অধিকাংশেরই খাদ্যের গুণাগুণ ও খাদ্য উৎসের বৈচিত্র্য সম্পর্কে তেমন ধারণা নেই। যেমন কার্বোহাইড্রেট শুধু গøুকোজ সরবরাহ করবে না সেখানে ফাইবার বা আঁশও থাকতে হবে। আবার ৯ ধরনের আমিষ (উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ উৎসের), ২ ধরনের অসম্পৃক্ত চর্বি (সম্পৃক্ত চর্বি বা ফ্যাটি এসিড ছাড়া), ২৩ ধরনের খনিজ লবণ ও ১৩ ধরনের ভিটামিন রয়েছে (মোট ৪৯টি), যা মানুষের সুস্থ’ভাবে বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যক। নিম্নের ছকে ৪৯টি খাদ্য উপাদানের তালিকা প্রদান করা হল-

স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি এর অভিধা হচ্ছে পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করা। কৃষিজাত দ্রব্য তথা উদ্ভিদ ও প্রাণি (ভিটামিন ডি এর অনুঘটক ব্যতীত) এ সমস্ত পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। যখন কোন মানুষের প্রয়োজনীয় পুষ্টি অভাব দেখা দেয় তখন রোগের সৃষ্টি হয় যা শারীরিক এবং মানসিক উন্নয়ন ব্যাহত করে। অনেকেরই ধারণা দামি খাবার ছাড়া পুষ্টি পাওয়া যায় না, যা সম্পূর্ণ ভুল। অপুষ্ট ব্যক্তি সমাজের অগ্রগতির পথে মস্ত বড় বাধা। অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু, মা ও বৃদ্ধরা পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয় ডেকে আনে। তাই আমাদের খাদ্যপুষ্টি সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। তাই পুষ্টি, পুষ্টি উপাদান ও তাদের উৎস ও কার্যকারিতা ফসল ভেদে পুষ্টির প্রাপ্তি ও পরিমাণের যে পার্থক্য আছে তা জানা জরুরি। বিশ্বখাদ্য সংস্থা ( FAO ) ও ডায়েটারি গাইডলাইন্স অব বাংলাদেশের এর সুপারিশ অনুযায়ী একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক ১০০ গ্রাম শাক, ২০০ গ্রাম অন্যান্য সব্জি ও ১০০ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন। অথচ এদেশের মানুষ এখনও গড়ে প্রতিদিন মাত্র ১২৫ গ্রাম সব্জি ও প্রায় ৮০ গ্রাম ফল খেয়ে থাকেন ( FAO পরিসংখ্যান, ২০১২)। কর্মক্ষম ও সুস্থভাবে বাচাঁর জন্য মানুষের প্রাত্যহিক খাবার তালিকায় ফল ও সব্জি অপরিহার্য। কেননা ফল ও শাক-সবজিতে প্রচুর পরিমাণে পানি, অত্যাবশকীয় ভিটামিন, মিনারেল, ডায়েটারী ফাইবার থাকে পরিবারিক পুষ্টিব্যাংকে পুষ্টিভিত্তিক কৃষিচর্চার মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠি নিজেদের চাহিদা মেটাতে পারেন। পুষ্টিবিজ্ঞানীর মতে, সুস্বাস্থ্যের জন্য উদ্ভিদজাত খাবার বেশি পরিমাণে গ্রহণ করা দরকার। এ ক্ষেত্রে সবজি প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহে অনন্য ভূমিকা রাখে। আমাদের খাদ্যের অর্ধেক পরিমাণের মত থাকা দরকার কার্বোহাইড্রেট (যদি ও বর্তমানে দেশে তা প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ), বিশ্বব্যাপী তা সরবরাহ করে ধান, গম ভুট্টা, আলু, কাসাভা ইত্যাদি। বাকি প্রায় সকল উপাদানের মূল উৎস সবজি ও ফল। দেশে প্রায় ১০০ ধরনের সবজি আছে। আবার কিছু কিছু ফল বা ফলের অংশ বা ফলের বৃদ্ধির বিভিন্ন পযার্য়ে তা সবজি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তাছাড়া একই সবজিতেও পুষ্টি উপাদানের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। গত শতক পর্যন্ত মানুষের চাহিদা ছিল শক্তি সমৃদ্ধ খাবার কিন্তু বর্তমানে বিশ্বে এ ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। যদি কোন কারণে খাদ্যব্যবস্থা ও জীবনাচরণে প্রয়োজনীয় সমস্ত পুষ্টি-উপাদান পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ না হলে স্বাস্থ্যকর জীবন ধারণ ব্যাহত হয় এবং তার প্রভাব সমগ্র জনস্বাস্থ্যে ব্যাপকভাবে পড়ে।

৫.
একটা সময় ছিল যখন মানুষের জীবনমান কায়িক শক্তি দ্বারা চিহ্নিত হত। বিশ্বব্যাপী মূল্যবোধ পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এখন জীবনমান পরিমাপ করা করা হয় পুষ্টি পরিস্থিতির মাধ্যমে। তাই পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ অপরিহার্য। তাই পুষ্টি-ঘন খাবার সর্ম্পকে ধারণা থাকা প্রয়োজন। যে সমস্ত খাবার পুষ্টি উপাদান এর পরিমাণ বেশি, কিন্তু তুলনামূলক কম ক্যালোরি সরবরাহ করে সেগুলো হল পুষ্টি-ঘন খাবার। আর ভিটামিন, মিনারেলস, জটিল কার্বোহাইড্রেট, ফাইবার, পলিফেনল, ক্যারোটিন, চর্বিযুক্ত আমিষ, স্বাস্থ্যকর তেল ইত্যাদি পুষ্টি-ঘন খাদ্যের নির্ণায়ক গুনাগুণ। নানাবিধ সবজি রয়েছে যাদের ফল, পাতা, কান্ড ও মূলের বিশেষ যা পরিপক্কতায় গ্রহণ করা হয় সেগুলো দেহ-রক্ষাকারী বা প্রোটেক্টটিভস খাবার হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এগুলোতে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে সকল ধরনের ভিটামিন, খনিজ বা মিনারেল্স ও সুস্বাস্থ্যের জন্য ফাইবার বা আঁশ। ফলে সবজিকে পুষ্টি-ঘন খাবারের আদর্শ উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উদ্ভিদের নানাবিধ অংশ সবজি হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এ সমস্ত অংশ কখনও সরাসরি (তাজা), কখনও কম তাপমাত্রায় আধাসিদ্ধ বা পূর্ণসিদ্ধ কখনও বা ভাজি বা ভর্তা করে খাওয়া হয়। প্রতিদিন ৩০০ গ্রাম সবজি গ্রহণের মাধ্যমে এ সমস্ত পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করলে জিহবা থেকে অন্ত্র পর্যন্ত অসংখ্য অণূজীব নানাবিধ জৈবরাসায়নিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে দেহের জন্য প্রয়োজনীয় রকমারি অন্তবর্তী জৈব রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে যা শরীরের কোষসমূহ গ্রহণ করে কোষ সমূহের কার্যকারিতা সমুন্নœত রাখে। এ সার্বিক কার্যাবলি দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করে। খাদ্য যত বৈচিত্র্যময় হয় অন্তবর্তী জৈবরাসায়নিক পদার্থ তত বেশি রকমারি হয় এবং ততবেশী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে যা আমাদের দেশের বৈচিত্র্যময় সবজি থেকে পাওয়া যায়। আবার একই ধরনের সবজিতে পুষ্টি উপাদানে ও তারতম্য দেখা যায়। যেমন টমাটোর পুষ্টি ও ভেষজগুণ অনন্য। কেরোটিনেয়ড্স টমাটোর অন্যতম ফাইটোকেমিকেল্স যার ৬০-৬৪ % লাইকোপেন, ১০-১২% ফাইটোন, ৭-৯ % নিউরোস্পোরেন এবং ১০-১৫ % কেরোটেন্স। টাটকা ওজনের ভিত্তিতে টমাটোর প্রতি কেজিতে ৩৫ মিলিগ্রাম লাইকোপেন থাকে যা লাল টমাটোর প্রতি কেজি ৯০ মিলিগ্রাম এবং হলুদ রংয়ের টমাটের প্রতি কেজিতে ৫ মিলিগ্রাম থাকে। প্রক্রিয়াকৃত (সস, পেস্ট, জুস ও কেচাপ) টমাটোতে লাইকোপেন এর পরিমাণ টাটকার তুলনায় ২ থেকে ৪০ গুণ বেশি। এই তারতম্যের কারণ হলো জাত, মাটি ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন প্রক্রিয়া, তাপমাত্রা, খরা, লবণাক্ততা, সবজি প্রক্রিয়াকরণ প্রভৃতি। নি¤েœ পুষ্টি উপাদান পরিমাণ এর আধিক্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রকার সবজির একটি তালিকা প্রদান করা হল।

ফাইবার: ব্রোকলি, গাজর, মিষ্টি ভ‚ট্টা, শিম, বাঙ্গী, মটরশুটি, ডাটা ও পুঁঁইশাক
প্রোটিন: শিম, মটরশুটি, সবজি সয়াবিন, ব্রোকলি, ফুলকপি, চীনা বাধাকপি, পালংশাক, পুঁইশাক ও এসপারাগাস
ভিটামিন এ: গাজর, টমাটো, লালশাক, পালংশাক, পুঁইশাক, মিষ্টিকুমড়া, মিষ্টিমরিচ, বিট ও বথুয়া
ভিটামিন ই: পালংশাক, পুঁইশাক ও কচুশাক
ভিটামিন কে: পালংশাক, পুঁইশাক, কচু শাক, পেরিলা, ব্রোকলি, ফুলকপি, চীনা বাধাকপি, বাঁধাকপি ও ঝাড়শীম
রিবোফ্লাভিন: পালংশাক, পুঁইশাক, কুমড়াজাতীয় সবজির পাতা, ব্রোকলী, মাশরুম, মিষ্টি আলুর পাতা, কচু পাতা ও কান্ড ও বাঁশের কচি কান্ড
নায়াসিন: সবুজ মটরশুটি ও মাশরুম
থায়ামিন: শিমের বীজ, এসপ্যারাগাস ও কুমড়াজাতীয় সবজির ডগা
পেন্টোথানিক এসিড: রোদে শুকানো টমাটো, ফুলকপি ও মাশরুম
ভিটামিন বি৬: গাজর, সবুজ মটর শুটি, পালংশাক, পুঁইশাক ও সজিনার পাতা
ভিটামিন বি১২: পাট পাতা, সজিনার পাতা, ব্রোকলি, পাস্তরিত শিমের বীজ ও বাঁধাকপি
বায়োটিন: ব্রোকলি, গাজর, ফুলকপি, পালংশাক ও মাশরুম টমাটো
ফোলেট: সীম, কচু পাতা ও কান্ড, লাল শাক, পুইশাক, বথুয়া, পালংশাক, হেলেঞ্চা ও অংকুরিত সবজি
ভিটামিন সি: সবুজ লাল হলুদ মিষ্টি মরিচ, সরিষার পাতা, ব্রোকলি,
ক্যালসিয়াম: শিম, পুঁইশাক, পালংশাক, লেটুস, কচি সবুজ ডাটার পাতা, ডাটা ও ঢেঁড়শ
ফসফরাম: মিষ্টি কুমড়ার বীজ, ডাটা, শীম, কাঁটানটে, শাকনটে ও বথুয়া
ম্যাগনেসিয়াম: পুঁইশাক, পালংশাক, শিম, বাঁধাকপি, ব্রোকলি ও এসপ্যারাগাস,
পটাসিয়াম: শিম, কাঁচাকলা, ব্রোকলি, পালংশাক, পুঁইশাক, বেগুন, টমাটো মিষ্টি কুমড়া ও শশা
ক্লোরিন: টমাটো, মিষ্টি কুমড়া ও মাশরুম
আয়রন: কাঁচাকলা, ব্রোকলি, কচু শাক, পালংশাক, পুঁইশাক, বেগুন, টমাটো, শিম, মটরশুটি, বথুয়া ও শাকনটে
জিংক: শিম, মটরশুটি ও পালংশাক
কপার: শিম, মটরশুটি ও পালংশাক
সেলিনিয়া: শিম, মটরশুটি ও পালংশাক,
আয়োডিন: কলমি শাক, পাটশাক ও সজিনা পাতা

৬.
বাংলাদেশ শস্য-ফসলের বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ। আমাদের প্রচলিত-অপ্রচলিত ফল ও সব্জির প্রতিটি জাতই কোন না কোন ধরণের পুষ্টির আধার। একইভাবে বাংলাদেশ দুর্যোগ প্রবণ একটি দেশ যেখানে নানা ধরণের প্রাকৃতিক দূর্যোগ, খরা-বন্যা, অতিবৃষ্টি-অনাবৃষ্টি, ঝড়-জলোচ্ছ¡াস কৃষি উৎপাদনে বড় অন্তরায়। উপরোন্তু বিশ্বব্যাপী করোনার আঘাত দেশের কৃষির জন্য ও অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বিঘœ খাদ্য উৎপাদন ও সবার জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিতকরণ সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এই পরিপ্রেক্ষিতে কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলায় পরিবারভিত্তিক পুষ্টিব্যাংক কর্মসুচি প্রান্তিক জনগোষ্ঠির পুষ্টিস্তর উন্নয়ন ও কোভিড প্রতিরোধে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের ফল, মু. ফজলুল হক রিকাবদার ও ইন্টারনেট ওপেন সোর্স

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.