সাম্প্রতিক পোস্ট

প্রাকৃতিক সংকটে বিপন্ন পক্ষিকূল

মানিকগঞ্জ থেকে মো. জাকির হোসেন রাজু

পৃথিবীর প্রকৃতিতে বর্তমানে চরম সংকট বিরাজমান। দুনিয়াব্যাপী অপরিকল্পিত ব্যাপক কর্মযজ্ঞের ফলে দ্রুত বদলে যাচ্ছে জলবায়ু। বাড়ছে প্রাণের ঝুঁকি। ফলে ধীরে ধীরে বিপন্ন এমনকি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে আমাদের চারপাশের মূল্যবান অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পাখি। প্রকৃতির ভারসাম্যের সাথে যারা কিনা নিবিড়ভাবে জড়িত। মানুষের সৃষ্ট প্রাকৃতিক কারণে তারাই আজ বিপন্ন; অতঃপর অস্তিত্ব সংকটে।

প্রকৃতির এক অপরূপ সুন্দর সৃষ্টি হলো পাখি। একটা সময় ছিলো যখন আবহমান বাংলার মাঠ-ঘাট, নদী-নালা, খাল-বিল ও বন-বাদাড়ে চেনা-অচেনা হাজার প্রজাতির পাখির দেখা মিলত। এদের রূপ, রঙিন পাখা, বাহারী গড়ন, ডানা মেলে নীল আকাশে উড়ে বেড়ানো, বাসা বাঁধা, ডিম পাড়া, শাবক বড় করা ও খাদ্য সংগ্রহ করা এক মনোরম প্রাকৃতিক বিস্ময়। জল-স্থল-অন্তঃরীক্ষের সর্বত্র তার অবাধ বিচরণ। মানুষের পরম বন্ধু, প্রকৃতির মূল্যবান সম্পদ এই পক্ষিকুল।
কিন্তু আমাদের মানবজাতির অতিমাত্রার সামাজিক উন্নতির পানে ধাবিত হওয়া, অতিমাত্রায় ভোগবিলাসী জীবনযাপন, বন ধ্বংস এবং দেদারসে পাখি শিকারের কারণে আজ প্রকৃতির বন্ধু এই পাখির টিকে থাকা সত্যিই কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

2
বিগত মাত্র কয়েক দশক আগে অর্থাৎ ৬০-৭০ দশকেও দেশের যে কোন ছোট-বড় জলাশয়ে চেনা-অচেনা নানা প্রজাতির পাখিদের কলকাকলিতে মুখরিত থাকতো। হাকালুকি হাওড়, চলন বিলসহ দেশের সব বিল-হাওরে শীতের সময় নানা জাতের বিদেশী পাখিরাও আসতো। যেমন বিভিন্ন জাতের রাজহাঁস, অন্য অনেক জাতের হাস, শ্বেতবক, খঞ্জন, কয়েক প্রকার বাটাং, টিট্রিম ও কাদাখোচা, কালো মাথা গাংচিল ও কুরি গাংচিলসহ চেনা-অচেনা আরো অনেক জাতের পাখি। এদের আগমনে দেশের ছোট-বড় হাওর, বিল, নদী-নালাগুলো মেছো পাখিদের স্বর্গ হয়ে উঠেতো। প্রাকৃতিক নিয়মে এরা বাসা বাঁধতো, ডিম পাড়তো, বংশবৃদ্ধি করতো। কিন্তু প্রকৃতিতে বর্তমানে অপ্রাকৃতিক আগ্রাসনের ফলে এসব পাখ-পাখালীর সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস হতে যাচ্ছে।

মানুষ তার নিজের জীবিকাকে উন্নতি করা এবং ভোগ-বিলাসিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানকে ধ্বংস করছে। ফলশ্রুতিতে বন-বাদাড় নষ্ট করে নগরায়ন হচ্ছে। জলাভূমি ভরাট করে প্রচুর শিল্প-কারখানা হচ্ছে, যেগুলোর নানা প্রকার বিষাক্ত দ্রব্য ও পদার্থ আবার নানাভাবে প্রকৃতিকে দূষিত করছে। অন্যদিকে বিলের জলকে চাষের কাজে ব্যবহার এবং বিলের জমি মাটি দিয়ে ভরাট করে কৃষি জমি বৃদ্ধির প্রচেষ্টাও অহরহ দেখা যাচ্ছে। মানুষের আগ্রাসী আচরণে জল, স্থল, অন্তরীক্ষে পাখিদের অস্তিত্বকে আজ বিপন্ন। ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়ে পড়েছে এই সব জলচারী মেছো পাখিরা।

@ Hafiz Shishir
বেশ কয়েকবছর যাবত বিলম্বিত বন্যার ফলে মাছের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দেরিতে বর্ষা হওয়ার কারণে মাছের ডিম যেমন একদিকে পুষ্ট হতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে। তেমনি শ্যাওলা ও কচুরিপানা দূষণ ক্রিয়ায় আবদ্ধ জলে মাছের জন্ম ও বংশবৃদ্ধি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে মেছো পাখি অর্থাৎ শুধুমাত্র মাছকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে এমন পাখিদের খাদ্যে সঙ্কট দেখা দিয়েছে। একসময় ছোট-বড়, নদ-নদী এবং বিভিন্ন জলাশয়ে অনেক প্রজাতির চিংড়ি এবং প্রায় ৭০ প্রজাতির বুনো মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে এর পরিমাণ অনেকাংশেই কমে গেছে। মানুষ ও প্রকৃতির বন্ধু পাখিদের আশংকাজনক হারে কমে যাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে-
১. আবদ্ধ জমি এবং ফলের গাছে প্রচুর কীটনাশকের ব্যবহার পাখিদের জীবনে গুরুতর সমস্যা ডেকে এনেছে। পাখিদের খাদ্য নানা প্রকার পোকা-মাকড় প্রাণ হারাচ্ছে, পাখিদের খাদ্যভাব ঘটছে। পাখিদের দেহে কীটনাশকের দীর্ঘমেয়াদী বিষক্রিয়ার ফলে পাখিদের ডিমের খোসা পাতলা হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি বিষক্রিয়ার ফলে পাখি নিজেও অকালে প্রাণ হারাচ্ছে।

২. পাখি ধরে শহরের বাজারে অথবা বিলাসিতদের নিকট বিক্রি করা। এক গবেষণায় জানা গেছে, গ্রাম গঞ্জের বন-বাঁদাড় থেকে যেসব পাখি ধরে বিক্রির জন্য শহরে নিয়ে আসা হয়; শেষ পর্যন্ত তার মাত্র ২০ ভাগ জীবিত থাকে। আর ৮০ ভাগ আগেই মারা পড়ে।

৩. অবাধে বনভূমি ধ্বংস, জলাভূমি ও জলাশয় ভরাট এর ফলে নির্জনতা ক্রমেই কোলাহলে রূপ নেয়া, মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, শব্দ দূষণ, ঝোপ-ঝাড় আগাছার জঙ্গল কমে যাওয়ার ফলে অনেক পাখিই আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-ছোট ক্যাসপাতি, বুনো টিয়া, বড় ক্যাসপাতি, বুলবুলি, বৌ কথা কও, টুনটুনি, মাছরাঙা, কাঁঠঠোকরা ইত্যাদি। তার সাথে হারিয়ে গেছে প্রকৃতির শিল্পী বাবুই পাখিরাও।

৪. পর্যাপ্ত খাদ্য না পাওয়া, রাতে নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব, বাসা বাঁধা থেকে সন্তান পালনের উপযুক্ত স্থানের অভাবের কারণে আশংকাজনক হারে পাখির সংখ্যা কমে গেছে।
অচিরেই স্থানীয় পর্যায়ে গনসচেতনতা তৈরি না হলে পাখিদের সংখ্যা একটা সময়ে এসে এমন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে যে, গ্রামে গঞ্জের মাঠ-ঘাট, বন, বাঁদাড়ে এক সময় অবাধে বিচরণকারী পাখিদের বিষয়টি কেবল ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে; বাস্তবে নয়। হয়ে থাকবে। তাই আসুন পাখির রক্ষায় আমরা স্ব স্ব অবস্থান থেকে এগিয়ে আসি।

happy wheels 2
%d bloggers like this: