সাম্প্রতিক পোস্ট

লবণ এলো, মিষ্টি মাছ চলে গেল

সাতক্ষীরা, শ্যামনগর থেকে চম্পা মল্লিক

বারসিক’ উদ্যোগে ইশ্বরীপুর ইউনিয়নের কেওড়াতলী গ্রামে লবণাক্ততা ও মাছ বৈচিত্র্য বিষয়ে সম্প্রতি আলোচনা সভা আনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সভাতে কেওড়াতলী গ্রামের ১৯ জন জনগোষ্ঠীসহ বারসিক কর্মকর্তা চম্পা মল্লিক উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় এই এলাকায় পূর্বে কি কি মাছ পাওয়া যেত এবং বর্তমানে কি কি মাছ পাওয়া যায় সে সম্পর্কে জনগোষ্ঠী কাছ থেকে জানার চেষ্টা করা হয়।


আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা জানান, পূর্বে তাদের এলাকায় শৈল, কৈ, লাঠা, বেতলা, পুঁটি, মলা, তোড়া, বোল, কুড়ি চিংড়ি, জেল, মজুর, টেংরা, রুই, সিলভারকার্প, কাতলা, মৃগেল, গুলেমাছ ও গলদা ছিল। আর বর্তমানে পাওয়া যায়, তেলাপিয়া, পার্শ্বে, ভেটকি, ভাঙ্গাল, টেংরা, বাগদা, হরিনা, চিংড়ি, পাংগাস, মনোসেক্স।


তারা বলেন, ‘বর্তমানে শৈল, কৈ, তোড়া, মাগুর, জেল, বেতলা, কুড়ি চিংড়ি, গলদা একেবারেই পাওয়া যায় না। এলাকা থেকে হারিয়ে গেছে। তবে, দু একটা শৌল মাছ পাওয়া যায়, যাদের পুকুরের পানি একটু মিষ্টি আছে এমন জায়গায়। আমরা যেসব উৎস থেকে মাছ পাই তা হল, ঘের, পুকুর, খাল ও নদী । তবে বর্তমানে মিষ্টি পানির মাছ কমেছে। মিষ্টি পানির মাছ সুস্বাদু। এলাকায় পর্যাপ্ত লবণ পানির মাছ আছে, কমে গেছে শুধু মিষ্টি পানির মাছ। আর তার একমাত্র কারণ হলো লবণাক্ততা।’


এই প্রসঙ্গে নবিজান (৬৫) বলেন, ‘আগে আমাদের এলাকায় লবণাক্ততা ছিলনা, প্রত্যেকের পুকুরের পানি মিষ্টি ছিল, বাড়ির পেছনে ছিল বিল, বিলে ধান হতো প্রচুর, সাথে নানা রকমের মিষ্টি পানির মাছ ছিল। কিন্তু কিছু মানুষ অন্য গ্রামে চিংড়ি ঘের দেখে এবং অনেক লাভের কথা শুনে, এই গ্রামে ও ঘের করা শুরু করে। এভাবে প্রথম লবণ ঢোকা শুরু হয়। তারপরও অনেক মানুষ ধান করতো। কিন্তু যখন ২০০৯ সালে আইলা হয়, তখন প্রচুর লবণ পানিতে চারদিক ভরে যায়। তারপর থেকেই লোক বেশি ঝোঁকে ঘেরের দিকে। কারণ তখন সবাই ভাবছিল, একবার লবণ ঢোকার পর জমিতে ধান হবে না। এভাবে এক এক করে ঘের হয়ে যায় এবং মাটিতে লবণ বাড়তে থাকে আর সব বৈচিত্র্য ও নষ্ট হতে থাকে।’


অংশগ্রহণকারীরা মাছ সংরক্ষন বিষয়ে জানান, বড় আকারে মাছ সংরক্ষণের জন্য কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করলেও ছোট আকারে তারা মাছ সংরক্ষণের চেস্টা করেন। এখানে যাদের মিষ্টি পানির পুকুর আছে তাদের মধ্যে প্রায়ই সবাই কিছু না কিছু মিষ্টি পানির মাছ সংরক্ষণ করে রেখেছেন। আর এগুলো জালে পড়লেও তারা ছেড়ে দেন বংশবিস্তারের জন্য। তারা আবারও আগের বৈচিত্র্যে ফিরে পেতে চান। এখনো মাছের বৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব বলে তারা মনে করে।


এ সময় মনোয়ারা বেগম (৪৫) বলেন, ‘যখন থেকে এলাকায় লবণ এলো, তখন থেকে মিষ্টি পানির মাছও চলে গেল। তাই আবারো এই বৈচিত্র্য ফেরাতে প্রথমেই এলাকা থেকে চিংড়ি ঘের বাদ দিতে হবে। আর তার জন্য আমাদের অনেকেরই মত আছে। কিন্তু আমাদের মতো অন্য সব মানুেষরাও যদি একমত হয়ে চিংড়ি ঘের বাদ দেয় এবং পাশাপাশি সরকার ও যদি এর জন্য কোন পদক্ষেপ নেয়, তাহলে আস্তে আস্তে মাটি, পানি, সব ক্ষেত্রে লবণাক্ততা কমতে থাকবে আর রক্ষা করতে পারবো মাছের বৈচিত্র্য।’

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: