সাম্প্রতিক পোস্ট

‘মাতৃভূমি জয়নুবের প্রাণের ক্ষুধা মেটায়’

তানোর রাজশাহী থেকে মো. শহিদুল ইসলাম শহিদ

মাতৃভূমি আর প্রাণ প্রকৃতির টানে নিঃসঙ্গ জয়নুব পৃথিবীর কোথাও থাকতে পারছেন না নিজ এলাকা ছেড়ে। বারবার ফিরে আসছেন জন্মভূমির কোলে। এলাকাবাসীর মতে নব্বইয়ের ঘরে পা দিয়েছেন তিনি। আপন বলতে কেউ নেই তাঁর। বার্ধ্যক্য আর অসুস্থতার কারণে জীবন ভারী হয়ে উঠেছে। নিজস্ব বাড়ি ছিল রাজশাহী গোদাগাড়ী উপজেলার রিশিকুল ইউনিয়নের খড়িয়াকান্দি গ্রামে। সহায় সম্বলহীন মানুষটি প্রায় ত্রিশ বছর আগে বাড়ি ভিটাও হারিয়েছেন। বিগত ১৭ রছর আগে স্বামী ব্যানা মারা যান। তারপর তানোর উপজেলার সরনজাই গ্রামে তার বোনের জামাই বাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি। সেখানেও মন টিকেনি তাঁর। পর্যায়ক্রমে নিজ গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের বিভিন্ন মানুষের বাড়িতেও থেকেছেন তিনি।

হাবিবুর রহমান, বুধু হোসেন, আতাউর রহমান, রইচ উদ্দিন সরকার ও আলাউদ্দিনসহ অনেকের বাড়িতেই থেকেছেন। ছয় মাস, তিন মাস ও একমাস এভাবে থাকার পর সেখান থেকে একা একাই  আবার চলে গেছেন। কিন্তু গেলেও দেখা গেছে এলাকার বাইরে কখনই থাকেন না। shah এ প্রসঙ্গে হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এভাবে অন্যের বাড়ি থেকে বের হয়ে বাজারের বিভিন্ন বারান্দায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। এলাকাবাসী তার থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা করার জন্য তাকে পবা উপজেলার একটি বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন। কয়েক দিন পর দেখা যায় জয়নুব আবার রিশিকুল বাজারে ফিরে এসেছেন। বৃদ্ধাশ্রম কেন ছেড়ে আসলেন? সেখানে থাকার কষ্ট হয় কিনা জানতে চাইলে জয়নুব বলেন, ‘সেখানে থাকা খাওয়ার কোন কষ্ট আমার হয়নি। আমি অনেক আরাম আয়েসে থাকতাম। কিন্তু আমি আমার এলাকার মানুষদের দেখতে পেতাম না। এই ইস্কুলের মাস্টার ও বাজারের দোকানদারদের কথা আমি ভুলতে পারি না। বাজারে আমার পাড়ার মানুষরাও আসেন তাদের দেখতে পাই। তাদের দেখার জন্য আমি পালিয়ে আসি।’

shah-1 বর্তমানে রিশিকুল তরুণ সংঘের ঘরটির বারান্দায় শুয়ে রাত কাটান তিনি। সকাল হলেই লাঠি হাতে বাজারে ঘুরা শুরু করেন। এলাকার মানুষ যে, যা দেয় তা দিয়েই পেটের ক্ষুধা নিবারণ করেন তিনি। তার সম্পদ বলতে যা চোখে পড়ে, একটি গ্লাস, বিছানোর একটি চট, একটি কাঁথা, একটি হাত পাখা ও পরনের কাপড় ছাড়া মানুষটির আর কিছুই নেই। স্থানীয় ইউপি সদস্য জালাল উদ্দিন তাঁর প্রসঙ্গে বলেন, ‘এই মানুষটি আমাদের এলাকা ছেড়ে কোথাও থাকতে পারেন না। তাকে আমরা সবাই ভালোবাসি। তাঁর বেশি কোন চাহিদাও নেই। তারপরও তার সুবিধার জন্য কিছু করা যায় কিনা, এ বিষয়ে আমি চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলেছি।’

পৃথিবীতে পেটের ক্ষুধা ছাড়াও মানুষের যে প্রাণের ক্ষুধা আছে সেটা জয়নুবকে না দেখলে পুরোপুরি উপলদ্ধি করা কঠিন। আর এই ক্ষুধা এলাকার প্রাণ প্রকৃতি পরিবেশ- প্রতিবেশ মিটিয়ে থাকে প্রতিনিয়ত। যা না চাইলেও অঢেল পেয়ে থাকি। তাই অনেক সময় আমরা মূল্য দিতে চাই না। ছোটবেলা থেকে এই এলাকার মানুষ ও প্রকৃতির সাথে তাঁর ভাব বিনিময় করার ক্ষেত্রে যে সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে সেটা জীবন দিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে জয়নুব।

happy wheels 2
%d bloggers like this: