সাম্প্রতিক পোস্ট

লবণাক্ততা জয়ে বিলপুকুর

সাতক্ষীরা থেকে শাহীন ইসলাম

প্রতিটি প্রাণের জন্য পানি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাওড়, জলাশয়, ডোবা, ঝিরি, ঝর্ণা, দীঘি, পুকুর, কূয়া, কনকনা, বেড় ইত্যাদি আমাদের প্রাকৃতিক পানির উৎস। এর মাধ্যমেই প্রাণের অস্তিত্ব রক্ষা পায়। বস্তুত, বাংলাদেশ ৩০টি কৃষি প্রতিবেশ এলাকায় বিভক্ত। ভৌগলিক ও  অঞ্চলগত কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় (১৩নং কৃষি প্রতিবেশ) অঞ্চল লবণাক্ত। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরিশাল, পটুয়াখালী জেলার ১৭টি উপজেলা প্রত্যক্ষ/পরোক্ষভাবে কম-বেশি লবণাক্ত। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, উপকূলীয় অঞ্চলে মানুষরে বসতি শুরুর সময় থেকেই নিরাপদ পানির সমস্যা ছিল। কারণ, এলাকাটি উপকূলীয় জলাভূমি এবং ঈষৎ নোনা পানির এলাকা (ইৎধশরংয ধিঃবৎ ুড়হব)। এই এলাকার সাগর সংলগ্ন নদী ও জলাভূমি ২৪ ঘণ্টায় ৪ বার জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত হয়। এলাকাটি গাঙ্গয়ে প্লাবণ ভূমি। অতীতে অঞ্চলটি গঙ্গা নদীর সুমিষ্ট ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিল। ছিল, মিষ্টি ও নোনা পানির ভারসাম্য অবস্থা। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে নদীতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে গেলেও পুকুর/জলাভূমিগুলো সারাবছর মিষ্টি পানির সংরক্ষণ উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হত।

একটি বাড়ি একটি পুকুর
পুকুর ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসের কথা চিন্তাই করা যায় না! মিষ্টি পানির জন্য জনবসতি স্থাপনের সাথে সাথে মানুষ পুকুর খনন করে। শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন গাবুরার চকবারা গ্রামের অভিজ্ঞ কৃষক মোহাশেখ বলেন,“আমাদের এলাকা নোনা। মাটির নিচের পানি নোনা। বন কেটে এখানে মানুষ বসবাস শুরু করে। নতুন বসতি তৈরির আগে মানুষ পুকুর খনন করে। পুকুরের মাটি দিয়ে বসতভিটা উুঁচু করে ঘর তৈরি করে। বর্ষায় ঐ পুকুরে মিষ্টি পানি ভরে গেলে তারপরও একটি পরিবার সেখানে বসবাস করতে থাকে।” তিনি জানান, যত ছোট পরিবার হোক না কেন, পুকুর ছাড়া কোন পরিবার বসবাস শুরু করে না। পরিবারের সদস্যদের গোসল, কাপড় পরিস্কার, থালা-বাসন পরিস্কার, বসতভিটায় সবজি চাষ, পুকুরে মাছ চাষ, গবাদিপশুর পানি খাওয়ানোসহ দৈনন্দিন বিভিন্ন কাজে মিষ্টি পানি প্রয়োজন। সেজন্য পুকুর খনন ও পূনঃখনন ছাড়া এ অঞ্চলে বসবাসের কথা চিন্তাই করা যায় না বলে তিনি জানান।
2-3
এলাকার বিভিন্ন মানুষের ভাষ্যমতে, মিষ্টি পানির জন্য বসতভিটার পাশে পুকুর এবং বিলের কৃষিজমিতে বিলপুকুর খনন করা হয়। চৈত্র-বৈশাখ মাসে পুকুরগুলো খনন করা হয়। বর্ষাকালে বিল অঞ্চল প্লাবিত হলে স্থানীয় কৈ, শোল, টাকি, বেতলা, পুটি, মৌরুল্য, বেলে, বাইন, ট্যাংরা, মাগুর, জিয়েল প্রভৃতি মাছ বিলপুকুরে আশ্রয় নেয়। আমন ধান কাটার পরপরই বিলপুকুর থেকে মাছ ধরা শুরু হয়। কার্তিক থেকে পৌষ এই তিন মাস বিলপুকুর থেকে মাছ ধরা হয়। প্রতিটি কৃষি পরিবার বিভিন্ন মাছ শুটকি করে সংকটকালীন (মাঘ-ফাল্গুন-চৈত্র) মাছের চাহিদা পূরণ করে। এভাবে বিলপুকুর থেকে একটি পরিবারের বছরের ৬ মাসের মাছের চাহিদা পূরণ হয়।

বিলপুকুরের পানি সেচ দিয়ে বোরো ফসল চাষ করা হয়। আবার সংকটকালীন মৌসুমে বিলপুকুর গবাদিপশুর পানি খাওয়ার অন্যতম উৎস। গবেষণা বলছে, উপকূলীয় অঞ্চলের ৯৯ ভাগ মানুষ লবণাক্ততায় আক্রান্ত। এসআরডিআইর জরিপ অনুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলে গত এক দশকে নোনাক্রান্ত ভূমির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর। সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলায় নোনাক্রান্ত জমির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর। খুলনা বিশ্ববদ্যিালয়ের অ্যাগ্রোটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল ইসলামের মতে,“ব্যাপকমাত্রায় নোনা পানির বাগদা চিংড়ি চাষের ফলে কোথাও কোথাও জমিতে সারাবছর, কোথাও কোথাও বছরের বেশির ভাগ সময় নোনা পানি আটকে রাখা হয়। এতে ভূমি ও পানিতে লবণাক্ততার পরমিাণ বাড়ছে”। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্তের মতে, ‘ভূর্গভের পানির ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে পুনঃভরণের (রিচার্জ) সমস্যা। যে পরিমাণ ভূর্গভের পানি তোলা হচ্ছে, আনুপাতিক হারে সেই পরমিাণ পানি আবার ভূর্গভে যাচ্ছে না। তিনি এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “পানি ভূর্গভে যাওয়ার দু’টি উপায়। একটি বৃষ্টির পানি আর অন্যটি ভূ-উপরভিাগের জমে থাকা (পুকুর, খাল, নদী প্রভূতি) পানি চুইয়ে চুইয়ে যাওয়া। উপকূলীয় এলাকার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বৃষ্টির পানি ভূর্গভে কম মাত্রায় প্রবেশ করে। তাই, একমাত্র উপায় ভূ-উপরিভাগে জমে থাকা পানি”।

বিলপুকুর
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিজমিতে ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। আমন ফসল ছাড়া বছরের বাকি সময় জমি পতিত থাকে। তবে, জমির লবণাক্ততারোধে “বিলপুকুর” গুরুত্বপূর্ণ সমাধান বলে মনে করেন উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার ধুমঘাট বিলের কৃষক আব্দুর সাত্তার। তিনি বলেন, “সেচের পানির অভাবে আমাদের অঞ্চলে হাজার হাজার বিঘা কৃষি জমি পড়ে থাকে। আমাদের চারিপাশে পানি আর পানি। কিন্তু তা নোনা পানি। অতীতে এলাকায় অনেক মিষ্টি পানির জলাশয় থাকলেও তা চিংড়ি চাষের কারণে আজ সেগুলো লবণাক্ত। কৃষিজমিকে লবণাক্ততা থেকে বাঁচাতে বিলপুকুরই একমাত্র সমাধান।” তিনি আরও বলেন, “বর্ষাকালে জমিতে লবণাক্ততা কম থাকে। বোরো মৌসুমের শুরু থেকে জমিতে লবণাক্ততা বাড়তে থাকে। ফাল্গুন চৈত্র মাসে জমিতে লবণের সাদা সাদা আবারণ দেখা যায়। তবে, বিলপুকুর আছে বলে আমার জমিতে লবণ কেটে উঠতে পারে না। আমার তিন পুরুষ বিলপুকুর ধরে রেখেছে। আমার এক বিঘা (৩৩ শতাংক) জমির ৫ কাঠাতে একটি বিলপুকুর আছে। আইলায় লবণাক্ত হয়ে যায়। আইলার পানি সরে গেলে আমি আবারও বিলপুকুর সংস্কার করি ও বৃষ্টির পানি ধরে রাখি।” তিনি জানান, প্রথম বছর বিলপুকুরের পানি এবং কৃষিজমি পুরোপুরি লবণ মুক্ত হয়নি। পরের বছর পুকুর ও জমি লবণমুক্ত হয়। তিনি বিলপুকুরের পানি সেচ দিয়ে কয়েক বছর ধরে তরমুজ চাষ করছেন। তরমুজ চাষে প্রতিদিন বিলপুকুর থেকে কলসে পানি তুলে সেচ দেন। এর ফলে জমির উপরিভাগের মাটি ধুয়ে ভিতরে চলে যায়। মাটি নোনা হতে পারে না এবং তরমুজ চাষ ভালো হয় বলে তিনি জানান।

OLYMPUS DIGITAL CAMERA

অনেকে বিলপুকুরের পানি দিয়ে বোরো ধান চাষ করে। বিলপুকুরের পানি সেচ দিয়ে যে সকল জমিতে ফসল চাষ করা হয়, ওই সকল জমিতে প্রচুর ঘাসও জন্ম নেয়। এর ফলে সংকটের সময় ঘাস ও তরমুজ গাছ গরু ছাগলে খেতে পারে; গবাদি পশুর খাদ্য সঙ্কট থাকে না। কৃষক আব্দুল সাত্তার জানান, প্রতিদিন অসংখ্য গরু বিলপুকুর থেকে পানি খেয়ে যায়। বছরে ৫/৬ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করা যায়। তাঁর পরামর্শ হলো; যে সকল কৃষকের বিলে জমি আছে, তারা নিজ নিজ উদ্যোগে জমির একটি জায়গায় বিলপুকুর খনন করতে পারেন। তাহলে, একদিকে যেমন জমিকে লবণমুক্ত রাখা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ফসল চাষ করে লাভবান হওয়া যাবে। পাশপাশি, পরিবারের মাছের চাহিদা পূরণ ও গবাদিপশুর খাবারের ব্যবস্থাও সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।।

পরিশেষে বলতে চাই, লবণাক্ততা ও খরা মোকাবেলায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে পুকুর ও বিলপুকুর খনন/পূনঃখনন খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় অভিযোজন চর্চা। বিশেষ করে কৃষিজমির লবণাক্ততা দুর্যোগ মোকাবেলায় বিলপুকুরের কোন বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ উপকূলীয় অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় আসুন এলাকা উপযোগি ফসল চাষের পাশপাশি পুকুর ও বিলপুকুর খনন করে মাটির লবণাক্ততা জয় করি এবং উপকূলীয় প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষা করি।

happy wheels 2
%d bloggers like this: