Posted in

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা

সাতক্ষীরা থেকে ফজলুল হক

উপকূলীয় অঞ্চলে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা এখনো বেশ জনপ্রিয়। আবহমানকাল ধরে উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলায় বিনোদনের খোরাক যুগিয়েছে এই লাঠিখেলা। কিন্তু কালের বির্বতনে মানুষ ভুলতে বসেছে এই লাঠিখেলা। বাংলার ঐতিহ্যের অংশ লাঠিখেলা নিয়ে মানুষের আগ্রহ আছে। কিন্তু লাঠিখেলার নতুন করে কোন সংগঠন বা দল তৈরি হচ্ছে না। ফলে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা। ঢোল আর লাঠির তালে তালে নাচা নাচি।

1

প্রতিপক্ষের হাত থেকে আত্মরক্ষার কৌশল অবলম্বনের প্রচেষ্টা সম্বলিত টানটান উত্তেজনার একটি খেলার নাম লাঠিখেলা। এ খেলা একটি ঐতিহ্যগত মার্শাল আর্ট। মূলত ঢাকের বাজনা, মার্শাল আর্ট আর লাঠি এই দুইয়ের সংমিশ্রণ। লাঠি খেলা অনুশীলনকারীকে লাঠিয়াল বলা হয়। এই খেলার জন্য লাঠি সাড়ে চার থেকে পাঁচ ফুট লস্বা, তবে প্রায়শই তৈলাক্ত হয়। প্রত্যেক খেলোয়ার তাদের নিজ নিজ লাঠি দিয়ে রণকৌশল প্রদর্শন করে। শুধু মাত্র বলিষ্ঠ যুবকেরাই এই খেলায় অংশ নিতে পারে। কিন্তু বর্তমানে শিশু থেকে শুরু করে, যুবক, বৃদ্ধ পুরুষেরাই লাঠি খেলায় অংশ নিয়ে থাকেন। লাঠি খেলার আসরে লাঠির পাশাপাশি যন্ত্র হিসাবে ঢোলক, কর্নেট, ঝুমঝুম ইত্যাদি ব্যবহৃত হয় এবং সঙ্গীতের পাশাপাশি চুড়ি নৃত্য দেখানো হয়।

3এই লাঠি খেলা নিয়ে শ্যামনগর উপজেলার ৮নং ইশ্বরীপুর ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের খেওড়াঘাট গ্রামের মতলেব গাজী বলেন, “আমার একটি লাঠি খেলার দল আছে। আমার বাবাও লাঠি খেলা করতো। আমিও ২৫ বছর ধরে লাঠি খেলা করছি। এখন আমার দলের সদস্য সংখ্যা প্রায় ২০-২২ জন। আগে সদস্য সংখ্যা বেশি ছিল। আমার এই বাপের ঐতিহ্য ধরে রাখতে অনেক কষ্ট হচ্ছে।” তিনি আরো বলেন, “এখন আর আগের মতো ছেলে পাওয়া যায় না খেলার জন্য। আগের মত ডাকে না কোন অনুষ্ঠনে- না ডাকলে আমাদের আয় হচ্ছে না। সে জন্য আমাদের খেলার প্রতি মনোনিবেশ কমে যাচ্ছে। অন্য দিকে আবার খেলার সামগ্রী কেনার জন্য অর্থের প্রয়োজনও তো রয়েছে।”

লাঠি খেলার আর এক জন সদস্য আশরাফুল ইসলাম বলেন, “আমাদের যদি আগের মতো বিবাহ, চড়ক পূজা, মহরম, ঘোড়দৌড় ইত্যাদি অনুষ্ঠানে ডাকে; তাহলে আমাদের আগ্রহ বেড়ে যাবে, আমরা পারব ঐতিহ্য ধরে রাখতে। সরকারি-বেসরকারি এবং ব্যক্তি সকলে সহযোগিতা করলে ঐতিহ্যবাহী লাঠি খেলা ধরে রাখা যাবে।

2

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী এই লাঠি খেলা আজ বিলুপ্ত প্রায়। এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধরণের লাঠি খেলা রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম সড়কি খেলা, ফড়ে খেলা, ডাকাত খেলা, বানুটি খেলা, গ্রুপ যুদ্ধ, নরি বারি খেলা এবং দা খেলা ইত্যাদি। গ্রামের সাধারণ মানুষেরা তাদের নৈমিত্তিক জীবনের উৎসব- যেমন বাংলা বর্ষবরণ, বিবাহ, চড়ক পূজা, মহরম ইত্যাদি উপলক্ষে লাঠি খেলার আয়োজন করে থাকে। এক্ষেত্রে সাধারণত কোন লাঠিয়াল দলকে ভাড়া করে আনা হয়। আগে গ্রামাঞ্চলে লাঠি খেলা বেশ আনন্দের খোরাক যুগিয়েছে। মানুয়ের হদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছিলেন এ খেলাটি। দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসত এ খেলা দেখার জন্য। বিভিন্ন জায়গায় মাঝে মধ্যে এ লাঠি খেলা দেখা গেলেও বর্তমানে তা খুব সীমিত। এ খেলা দিন দিন বিলুপ্তি হওয়ার কারণে এর খেলোয়াড়ের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে না কোন নতুন খেলোয়াড়। আর পুরানো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা অর্থের অভাবে প্রসার ঘটাতে পারছেনা এ খেলা। বিনোদনের উৎস লাঠি খেলা আর চোখে পড়ে না।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.