Posted in

লোকজন আমার কাজের মূল্য দিতাসে তাতেই আমি খুশি

মানিকগঞ্জ থেকে নীলিমা দাস

১৯ শে জুন বিশ্ব বাবা দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে বারসিক মানিকগঞ্জে বাবাদের জন্য হাডুডু খেলার আয়োজন করে। এই খেলায় অংশগ্রহণ করেন দিনেশ মনি দাস। তিনি মানিকগঞ্জ বেতিলা মিতরা ইউনিয়নের বড় বড়িয়াল গ্রামের একজন ভ্যান চালক। ৪৬ বছর বয়ষ্ক দিনেশ মনি দাসের জন্ম থেকেই এক হাতের অর্ধেক অংশ নেই। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি তার মনের আনন্দে খেললেন এবং পুরষ্কার অর্জন করলেন। পুরষ্কার প্রাপ্তির পর তার সংগ্রামী জীবন ও সাধারণ মানুষের মত বাঁচার গল্প তুলে ধরেন বারসিক নিউজের কাছে।

মনিদাশের সংগ্রামী জীবনের গল্প
আবেগের মধ্যে দিয়ে তিনি তার জীবনের গল্প তুলে ধরেন। তিনি বলেন,“ ছোটবেলায় বাবা মারা যায়। মা ২ ভাই ও বোনকে নিয়ে অন্যের বাড়ি কাজ করি। এতে আমাদের পেটে কোনদিন খাবার থাকত, কোনদিন থাকত না। সংসারে আয় করবার মত কেউ নেই। পেটের ক্ষুধা মিটানোর জন্য ভিক্ষার থালা হাতে নিলাম। লোকের গাল, মার, ধাক্কা খেয়ে শৈশবকাল পেরিয়ে গেল। একটু বড় হওয়ার পর ভিক্ষা করতে লজ্জা করত। তখন ভিকরা বাজারে হোটেল এর ময়লা, বাজারের ময়লা পরিস্কার করতাম। dsc00375কিন্তু বিধাতা আমার ডান হাতটাই যে কেড়ে নিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন!” তিনি আরও বলেন, “বাম হাতের কাজ সবাই পছন্দ করতো না। তারপরও শুরু করলাম বোঝা বাইবার। যাদের দু’হাতই আছে তারা দুই থেকে তিন খেপ দিত কিন্তু আমি দিতে পারতাম এক খেপ। এভাবে করে তিন সন্তানের বাবা আমি মনের শক্তি বল দিয়ে ভ্যান চালানো শিখলাম। ভ্যান চালাতে গিয়ে কতবার যে আহত হয়েছি তার কোন হিসাব নেই। ভ্যানে করে বিভিন্ন বোঝা বহন করি। এক হাতে বেশি খেপ দিতে পারি না; তবু সন্তানদের পেটে ভাত দিতে হবে। আমার মনে অনেক আশা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শিখাব।” তিনি প্রতিবন্দী হলেও তার সন্তান তাঁর মত প্রতিবন্ধী হয়নি দেখে তিনি বেজায় খুশি। দিনেশ মনি দাসের বড় মেয়ে বর্তমানে ৮ম শ্রেনীতে পড়ে, ছেলে দুইটাও লেখাপড়া করে। একটু একটু টাকা জমিয়ে দুইটি ছাগল ক্রয় করেছেন তিনি। ছাগল চাইরটা বাচ্চা দিয়েছিল। রোজার ঈঁদে দুইটা ছাগল বিক্রি করে ১৪ হাজার টাকা আয় করেছেন। এবার কোরবানি ঈঁদে আরো দুইটা বিক্রি করেন। এই টাকাসহ বিভিন্ন উৎস থেকে টাকা যোগাড় করে তিনি একটা অটো রিক্সা ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাড়ির ছাগল, মুরগি দেখাশুনার কাজে তাঁর স্ত্রী (সাবিত্রী মনি দাস)। এছাড়া তাঁর স্ত্রী বাঁশ দিয়ে ঝাঁকা, টাপা বানান। সেগুলো দিনেশ মনি দাস হাটে বিক্রি করেন। স্বামীর সংগ্রাম জীবনের সাথী হিসেবে সাবিত্রী মনি দাস বলেন, ‘আমার স্বামী প্রতিবন্ধী হয়েও অনেক কাজ করেন। আমার অনেক কাজে আমাকে সাহায্য করেন। তাঁর কাজের আগ্রহ দেখে আমার গর্ব হয়। আমার সংসারে অভাব আছে তারপরও আমি ভাল আছি।”

মনিদাসের ভাবনা ও সমাজে তার মূল্যায়ন
দিনেশ মনি দাসের কাজের আগ্রহ দেখে বড় বড়িয়াল গ্রামের মাতবর সুনিল দাস তাকে একটি ভ্যান কিনে দেন। দিনেশ সম্পর্কে সুনিলদাস বলেন, “এক সময় যেসব লোক তাকে দেখলে দূরে সরে যেত তারাই আজ কাজে ডাকে। এটা আমাদের ভালো লাগে। সে যদি ভিক্ষা করত তা হলে সবাই তাকে ঘৃণা করত। ছোট বড় কেউই তাকে সম্মান দিত না। এখন সমাজের সবাই তাকে ভালোবাসে ও শ্রদ্ধা করে।” একই কথা জানান গ্রামের কাঁচামাল ব্যবসায়ী রফিক মিয়া। তিনি বলেন,‘দিনেশ মানুষ হিসেবে লোক ভালো, সৎ ব্যক্তি, কাজ কর্মে আগ্রহ আছে। প্রতিবন্ধী অফিস থেকে কোন ভাতা পায় না। যদি কিছু ভাতা পেত তার উপকার হত।’ মানুষের এই মূল্যায়ন দিনেশকে আরও আশাবাদী ও উৎসাহী করে তুলে। নিজের ভাগ্য নির্ধারণ করার জন্য আরও পরিশ্রম করতে তাকে প্রত্যয়ী করে তুলে। তাই তো গর্ব করে তিনি বলেন, ‘‘লোকজন আমার কাজের মূল্য দিতাসে তাতেই আমি খুশি।’’ dsc00578

মনিদাসের স্বপ্ন
দিনেশ মনি দাস স্বপ্ন দেখেন তিনি নিজে কাজ করে নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। এখন তিনি স্বপ্ন দেখেন ছেলে মেয়েদের লেখা পড়া শিখিয়ে মানুষ করবেন। তিনি বলেন, “কম কইরা হইলেও আমার বড় মেয়ে মৌসুমিকে মেট্রিক পাশ করাইয়া ভালো ছেলের কাছে বিয়া দিমু। পোলাগো কাপড়ের ব্যবসা বা ওয়ার্কসপ এর কাজ শিখামু। বৃদ্ধ বয়সে একটা দোকান নিয়া বসার স্বপ্ন আছে।” তিনি জানান, সবার দোয়া ও আর্শীবাদে একদিন না একদিন তিনি তাঁর স্বপ্ন পূরণ করতে পারবেন। তিনি চান তাঁর মত যারা আছেন তারাও যেন চেষ্টা করে কিছু করে।’ তিনি সবার উদ্দ্যেশে বলেন, ‘‘মানুষের দয়া না নিয়ে নিজে কিছু করেন মানুষের মত কইরা বাঁচেন।”

উপসংহার
আমাদের গ্রাম গঞ্জে, সমাজে এমন অনেক আছেন যারা অন্যের দয়া নয়, করুণা নয়, নিজের সক্ষমতা বলে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে অন্যদের দেখিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁরা কারো দয়ার পাত্র নন। তাঁদের চেষ্টা, প্রত্যয় ও ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে প্রতিনিয়ত প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছেন। আসুন সেইসব আত্মপ্রত্যয়ী মানুষের স্বপ্নের পথকে সুগম করার জন্য আমরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই ।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.