Posted in

ভালোবাসা যে মহিমাময়!

নেত্রকোনা থেকে তোবারক হোসেন

সামনের কুরবানী ঈদ। একটা বলদ গরু রয়েছে। বর্গা নিয়ে লালন-পালন করেছেন তিনি। এটা বিক্রি করে ছেলের জন্য একটি পুরাতন মটর সাইকেল কেনার বড্ড ইচ্ছে তাঁর। বলদ গরুর জন্য তাই তিনি তিনি বন-বাদারে, পাহাড়ে ঘাস কাটতে যান। ঘাস খেয়ে যাতে এটি সুস্বাস্থ্য হয়, ভালো দামে বিক্রি করতে পারেন। বলদ গরুকে খাওয়ানোর পর অবশিষ্ট ঘাস বিক্রি করা টাকা দিয়ে তিনি পেঁপে, ছোট মাছ, ডিম কিনবেন পোয়াতি বউয়ের জন্য। তাঁর নিজের শরীরই তো ভালো যাচ্ছেনা, ৬২ বছর বয়সটাও কম না! কিন্তু তিনি নিজের জন্য নয়, সন্তান ও সন্তানের সন্তান সম্ভাবার বউয়ের কথায় বেশি ভাবেন। তিনি বলেন, “বাজান এইডা যদি আমার নিজের মাইয়া অইতো তাইলে কি আমি সেবা না কইরা পারতাম? আমি যদি পরের ঝিয়েরে করি আমার ঝিয়েরেও তাঁর শাশুড়ী সেবা করবো। হের লাইগা আমার শইল্লে কোন আলসি নাই। এই বউরে ছেড়ার (পুত্র) বাহে (বাবা) শক (শখ) কইরা বিয়া করাইছে। বউ কোন সময় মনে করে না আমি যে তার শাশুড়ী।”

Mah-1
নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়নে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে ঘেরা একটি চন্দ্রডিঙ্গা গ্রামের ৬২ বছর বয়সী জহুরা বেগম এভাবে তার সংসার ও সংসারের সদস্যদের প্রতি ভালোবাসার কথা প্রকাশ করেন। নিরক্ষর এই মানুষটি আমাদের মতো সভ্য সমাজের মানুষকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে সন্তান ও সন্তানের স্ত্রীকে আপন করে নিতে হয়; কীভাবে পারস্পারিক নির্ভরশীলতার ভেতর দিয়ে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন তৈরি করতে হয়। ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ এর অবস্থার মধ্যে থেকে মানবিক ভালোবাসায় ও আন্তরিকতায় সংসারে সুখের বীজ বপন করে তিনি প্রমাণ করেছেন, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য অঢেল সম্পদের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন আন্তরিকতা ও একটি উদার হৃদয়!

জহুরা বেগমের সাথে তাঁর সন্তানের স্ত্রীর সম্পর্ক মায়ের মতো। সাধারণত এটাই হওয়া উচিত। একজন মেয়ে বিয়ের পর বাবা-মায়ের সংসারের সবকিছু ছেড়ে স্বামীর সংসারে চলে আসে এবং এই নতুন সংসারের সদস্য হয়। কিন্তু আমাদের দেশে অনেকেই আছেন যারা নতুন সংসারের সদস্যকে সাদরে বরণ করে না নিয়ে তাদের দোষারূপ করেন। জহুরা বেগমর দৃষ্টিতে এটি একটি বড় অপরাধ। তিনি বলেন, “অনেকে বাড়ির বউরে দোস দেয়। আমি মনে করি, শাশুড়ী যদি পুতের বউরে নিজের মাইয়া মনে করে তাইলে আর কোন সমস্যা থাহে না।”

বউকে কীভাবে আপন করে নিতে হয়, ভালোবাসায়, আদর ও মমতায় সিক্ত করতে হয় জহুরা বেগম আমাদের শিখিয়ে গেলেন। অন্যদিকে জহুরা বেগমের স্নেহ স্নাত ভালোবাসা পেয়ে তার সন্তানের বউও জহুরার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে জহুরা বেগম বলেন, “আমার পুতের বউ আমারে তাঁর মার মতন দেহে, হজর নামাজের সময় উডে, সারা বাড়ির কাম করে, সহালে রান্ধনের আগেই গরুর ঘাস কাডে, শীতের সময় আমার গোসলের পানি গরম কইরা দেয়, ঘাস কাটতে গিয়া আমার আঙ্গুল কাইটা গেছিল, আমারে ২০ দিন নিজের হাতে খাওয়াইছে, পিন্দাইছে। একটা আম বা একটা পাপদা কাইট্টা থালিত দিলে হে নিজে না খাইয়া আগে আমার মুখে তুইলা দেয়। এইডা আমার কত শান্তি লাগে।” এটির নামই ভালোবাসা। ভালোবাসা দিলে বিনিময়ে ভালোবাসা পাওয়া যায় এই চিরন্তন সত্যকে জহুরা ও তার সন্তানের বউ প্রমাণ করেছেন।

Mah-2
অন্যদিকে শুধু সংসার নয়; প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণ ও উদ্ভিদকে তিনি আপন করে নেন। তিনি চান প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণ ও অস্তিত্ব যেন তাদের মতো করে বাঁচতে পারে, স্বাধীনভাবে চলতে পারে। তাই তো তিনি বলেন, “আমরার গেরামে অনেকে আছে, পাহাড়ের কানির জমি থাইকা গাছ কাটে, ব্যাঙ, শামুখ, কুইচা মারে। আমি তারারে কইছি তরা সবসময় এডি মারিছ না, ব্যাঙ, কুইচা, শামুক আমরার অনেক উপকারে আসে। যারা পাখি মারে আমি হেরারে বারণ করি। অনেক পাখি আছে আমরার উপকারে আসে। অনেক গাছ আছে আমরার কাজে লাগে।”

জহুরা বেগম ভেজাল খাদ্য কি জিনিস তা জানেন না; তবে তিনি জানেন কিভাবে বিষমুক্ত শাকসবজিসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন করতে হয়। তিনি বলেন, “আমার জমি বেশি নাই, যাই আছে হেইডার মধ্যে কচু, কুমড়া, লাউ, কড়লা লাগাই। আমার সব্জিগুলা বাজারে সবার আগে বিক্রি হয়ে যায়। কারণ আমি সব্জিতে কোন সার-বিষ ব্যবহার করি না।” সবজি ক্ষেতে বিষ না দেওয়া ব্যাপারে তিনি বলেন, “আমি জেনে শুনে একটা খারাপ কাজ করি কেমনে। আমি আমার গ্রামের অন্যদেরও বলছি সার-বিষ ছাড়া সব্জি ফলানোর জন্য।” এ কথা বলে জহুরা বেগম আমাদের কাছে বিদায় নেন এই বলে যে, “বউয়ের অষুধ খাওনের সময় অইছে। আমার বউয়ের লাইগা দোয়া করবাইন।”
উল্লেখ্য যে, জহুরা বেগমের সংসারে একছেলে ও এক মেয়ে। স্বামী আবু চান দু’বছর আগে মৃত্যুবরণ করেন। স্বামী থাকতেই ছেলেকে বিয়ে করিয়েছেন। কিছু জমি বিক্রি করে গতবছর মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন কালিকাপুর গ্রামে। জহুরা বেগমের ছেলে মাঝে মাঝে ভাড়ায় মটর সাইকেল চালায়। আবার কাঠ মিস্ত্রির কাজও করেন। ছেলের বউ সন্তান সম্ভাবা থাকায় সংসারের প্রায় সব কাজ তাঁকেই শেষ করতে হয়।

এটিই আমাদের দেশের পারিবারিক বন্ধন, ঐতিহ্য, যৌথ পরিবারের মর্যাদা, নবীণ-প্রবীণের বন্ধন। আসুন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী জহুরা বেগমের পরিবারকে সম্মান জানাই যেন বাংলাদেশের সব পরিবারই এমন হয়।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.