সাম্প্রতিক পোস্ট

চরে ভেড়া পালন: লাভবান হচ্ছেন পালনকারীরা

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থেকে মো. মুকতার হোসেন

হরিরামপুর উপজেলা থেকে এক ঘণ্টা নৌকা যোগে পদ্মা নদী পার হলে হালুয়াঘাটা গ্রামে যেতে হয়, চরাঞ্চলে বেলে মাটি হওয়ার হালুয়াগাটা গ্রামে মেহেন্দীপুর কোলে প্রায় ৫০ একর জমি সারাবছর পতিত থাকে। এসব পতিত জমিতে জন্ম নেয় বিভিন্ন ধরনের নলখাগড়া, কাইশ্যা, কলমী, খরমা, গইচা, বাদাল, দুর্বলা, জলদুর্বা, হেনচি ইত্যাদি ঘাস। চরের পতিত জমির ঘাস প্রায় প্রতিটি পরিবারে গরু, ছাগল, ভেড়া পালনে রাখছে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা। চরের নারীরা পশু পালনে সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পশু পালনে উপযোগী পরিবেশ পাওয়ায় ওই এলাকায় নারীরা ভেড়া পালনের উদ্যোগ নিয়ে সফল হয়েছেন। একেকজনের সাফল্য দেখে আরেকজন অনুপ্রাণীত হয়ে ভেড়া পালনের উদ্যোগ নিয়েছেন। এভাবে ২০১৩ সালে যেখানে ক্ষুদ্র ভেড়া খামারছিলো তিনটি সেখানে এ বছরে এসে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪০টিতে!

ভেড়া কেন পালন করেছেন এবং ভেড়া পালনের ক্ষেত্রে চরে কি কি সুবিধা পান জানতে চাইলে কৃষাণী পারভীন বেগম আরও বলেন, “চকে ঘাসের অভাব নাই, সারাদিন চড়ায় (চকে) থাকে, গরু বাছুরের সাথে  মিলে মিশে ঘাস খায়, বিকাল হলে আপনা আপনি দলবেঁধে বাড়িতে চলে আসে। আবার অনেক সময় গিয়ে নিয়ে আসি।” ভেড়া শুধু ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে এ ছাড়াও দানাদার (ভুষি) খাবার সরবরাহ করলে আরও ভালো উৎপাদন পাওয়া যায়। তাই ভেড়ার জন্য অতিরিক্ত কোন পরিশ্রম করতে হয় না বরং লাভ বেশি বলে তিনি জানান।

Lamb
তবে শুরুতে ভেড়া পালন খুব সহজ ছিলোনা বলে ভেড়া পালনাকারীরা জানান। কেননা ভেড়া পালন করাকে কেউ তেমন স্বাগত জানাতো না। তবে যারা পালন করেছেন তাদের সাফল্য দেখে মানুষের এ ধারণা পাল্টাতে শুরু করে। চর এলাকার কৃষাণী পারভীন বেগমই প্রথমে ভেড়া পালন করতে শুরু করেছেন। এই তিনি বলেন, “আমার বিয়ের পর বাবার বাড়ি ফরিদপুর থেকে পালার জন্য দু’টি ভেড়া এনেছিলাম। সেই দু’টি ভেড়া থেকে বর্তমান আমার ভেড়ার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫টি।” তিনি গড়ে তুলেছেন খুদ্র খামার। গত ৩ বছরে আরও ৮টি ভেড়া বিক্রি করে তিনি আয় করেছেন ১৪০০০ টাকা। তাঁর কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকেই ধীরে ধীরে ভেড়া পালন করতে শুরু করেন। ২০১২ সালে পাটগ্রামচরে ৩ জন কৃষক ভেড়ার খামার শুরু করলেও বর্তমানে পাটগ্রামচর, খরিয়া, হালুয়াঘাটা, নটাখোলা, বসন্তপুর, হরিহরদিয়া, বালিয়াচক, গঙ্গাদরদী গ্রামের মানুষও ভেড়ার ক্ষুদ্র খামার গড়ে তুলেছেন। প্রতিটি গ্রামের খামারীদের বাড়িতে ৫-২৫টা পর্যন্ত ভেড়া রয়েছে।

ভেড়া পালনের সুবিধার সাথে অসুবিধাও রয়েছে বলে ভেড়া পালনকারীরা জানান। বিশেষ করে ভেড়াগুলো অসুস্থ হলে বা রোগবালাই আক্রমণ করলে এগুলোর সহজ চিকিৎসা পাওয়া যায় না। চরাঞ্চলে ভেড়াপালনকারী খামারীদের সাথে আলোচনা করে জানা যায়, চরে অনেক ভেড়া পালনকারী খামারী রয়েছে। কিন্তু ভেড়ার অসুখ বিসুখ হলে ডক্তার পাওয়া যায় না ফলে ভেষজ চিকিৎসা ও দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাওয়ানো হয়। বিশেষ করে শীত মৌসুমে ভেড়ার বেশি রোগ ব্যাধি দেখা যায়। এসব রোগের মধ্যে রয়েছে ঠান্ডা লাগা, বাদলা, খুড়া রোগ, ম্যাসস্টাইটিস, চর্ম রোগ, কৃমি, বহিঃ পরজীবি (আটালী) পাতলা পায়খানা, পেটফুলাসহ ইত্যাদি। তাছাড়া চরে শিয়াল, খাটাস, গাওড়া দ্বারাও আক্রান্ত হয় ভেড়ার পাল। চিকিৎসার জন্য উপজেলা প্রাণী সম্পদ হাসপাতালে নিয়ে আসাটা খামারীদের জন্য কষ্টসাধ্য হওয়ায় অনেক সময় তারা কম দামে ভেড়া বিক্রি করতে বাধ্য হন।

ভেড়া একটি নিরীহ প্রাণী। এরা চারণভূমিতে ঘুরে ঘুরে ঘাস খেতে পছন্দ করে এবং দলগতভাবে ঘুরে বেড়ায়। ১৫ মাসে ২ বার বাচ্চা দেয় এবং একটি ভেড়া ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত বাচ্চা দেয়। এই ভেড়া পালন করে হরিরামপুরের চরাঞ্চলের ব্যাপক সংখ্যক মানুষ এখন সাবলম্বী। দিন দিন আরো জনপ্রিয় হচ্ছে এই ভেড়া পালন কার্যক্রম। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কৃষাণ-কৃষাণীদের এ স্বউদ্যোগকে আরও বেগবান করার জন্য সরকারি উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। এছাড়া ভেড়াসহ অন্যান্য গবাদিপশু অসুস্থ হলে যাতে কৃষাণ-কৃষাণীরা সহজে এর চিকিৎসা করাতে পারে সেই ব্যবস্থাও করার প্রয়োজন রয়েছে। ভেড়া পালনকারীরা তাই আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের এই পেশাকে আরো জনপ্রিয় করে তোলার জন্য সরকারের প্রাণী সম্পদ বিভাগসহ দায়িত্বপ্রাপ্তদের আরো উদ্যোগী ভূমিকা পালন করবেন।

happy wheels 2
%d bloggers like this: