Posted in

মানিকগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী মাছ ধরা উৎসব

আব্দুর রাজ্জাক, মানিকগঞ্জ ॥

পলো দিয়ে মাছ ধরা গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য বহু প্রাচীন। হেমন্তের শেষে আর শীতের শুরুতে কম পানিতে মাছ ধরার উৎসব শুরু হয় গ্রামবাংলায়। বাঙালির এই ঐতিহ্যের রেশ ধরে সম্প্রতি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বিভিন্ন জলাশয়ে পলো বাওয়ার ধুম লেগেছে। মুখে-মুখে, হাট-বাজারে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে ও মাইকে ঘোষণা দিয়ে শৌখিনদার মৎস্য শিকারীরা পলো নিয়ে ছুটে চলেছেন কালীগঙ্গা নদী ঘেঁষা চরাঞ্চলে, বিভিন্ন বিলে ও চকের হাঁটু জলাশয়ে।

মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার তরা, রাথুরা, বড়টিয়া দিয়াইল ও শোলধারা বিলে মাছ ধরা উৎসব হয়েছে। ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত চলে মাছ শিকারের এই উৎসব। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা হাজারো মাছ শিকারী এই উৎসবে মেতে উঠে। পলোসহ বিভিন্ন ধরনের জাল দিয়ে নানা প্রজাতির মাছ শিকার করেন তারা।

05 (1)

চলতি মৌসুমে উপজেলার কালীগঙ্গা ও পুরাতন ধলেশ্বরী নদীর ভাটি এলাকার কম পানির কুম, বানিয়াজুরীর তরা, নালী, শোলধারা, তাড়াইল, দিয়াইল, ঘিওরের মাইলাঘী, বড়টিয়া চকে রয়েছে হাঁটু থেকে কোমর অবধি পানি। আর এসব জলাশয়ে সাপ্তাহিক ছুটির দিনসহ প্রায় প্রতিদিনই চলছে পলো দিয়ে মাছ ধরার ধুম।

গত শুক্রবার বানিয়াজুরীর রাথুরা চকের জলাশয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, কমপক্ষে ৮শ’ থেকে হাজারখানেক লোকজন পলো বাইচে মাছ শিকারে নেমেছেন। দেশীয় প্রজাতির মাছের মধ্যে শোল, বোয়াল, কার্ফু, রুই কাতলা মাছ পলোতে বেশি আটকা পড়ছে। কেউ কেউ আবার ছোট আকৃতির মাছও পাচ্ছেন। জাবরা গ্রামের মো. শাহীন জানায়, শখের বশে পলো বাইচে আসছি, ছোট-বড় বেশ কয়েকটি মাছ পেয়ে অনেক খুশি হয়েছি। আরেক মাছ শিকারী বারেক মিয়া পেয়েছেন বড় আকৃতির একটি বোয়াল মাছ।

মাছ ধরা উৎসবের আয়োজক শোলধারা গ্রামে মজিবর মাস্টার জানান, বিশ একরের শোলধারা বিলের এই জলাভূমিতে শত বছর ধরে এই মাছ ধরা উৎসব চলে আসছে। প্রতিবছরই কার্তিক মাসে গ্রামবাসীর উদ্যোগে এই আয়োজন করা হয়। মাছ শিকারীরা কার্তিক মাসের এই দিনের অপেক্ষায় থাকে। মধ্যরাতের পর থেকে শোলধারা বিলে জড়ো হতে থাকে শিকারিরা।

ভোর ৫টায় শুরু হয় মাছ ধরা উৎসব। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এবার প্রায় এক হাজার মাছ শিকারী পলো, ধর্মজাল, দোলা জাল, ঝাঁকি জাল ও ফাঁস জাল দিয়ে মাছ শিকারের উৎসবে মেতে উঠে। রুই, বোয়াল, শিং, কৈ, শোলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ছেলে-বুড়ো থেকে নানা বয়সী মানুষ।

07

জেলার শিবালয় উপজেলার বরংগাইল গ্রামের মাছ শিকারী কছিম উদ্দিন জানান, তিনি গত দশ বছর ধরে প্রতিবারই এই বিলে মাছ ধরা উৎসবে যোগ দেন। এবার পলো দিয়ে তিনি একটি মাঝারি আকৃতির বোয়াল মাছ শিকার করেছেন।
জাবরা গ্রামের মো. শাহিন আলম জানান, গত ৫ বছর ধরে তিনি এই বিলে নিয়মিত মাছ ধরেন। বছরে একবার মাছ ধরা উৎসব হয়। এসময় বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু শিকারিরা বিভিন্ন ধরনের জাল নিয়ে আসে। আগে মাছ ধরার প্রতিযোগিতা হতো। ধরা শেষে বড় কৃতি ও বেশি মাছ পাওয়াদের পুরস্কারও দেওয়া হতো। তিনি বলেন, “গত কয়েক বছর ধরে আগের মত মাছ মিলছে না। তবে মানুষের উৎসাহের কমতি নেই।”

এদিকে বাইচে অংশ নিতে বিভিন্ন বয়সী মানুষ পলো কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। অন্য সময় সাধারণ একটি পলো ২৫০/৩৫০ টাকা বিক্রি হয়ে থাকে। কিন্তু বাইচের সময় তিনগুন বেশি দাম দিয়েও পলো কিনতে কাড়াকাড়ি লেগে যায়। ঘিওরের বানিয়াজুরী বাসষ্ট্যান্ডে পলো বিক্রেতা অনীল বাবু বলেন, “বাইচের আগের দিন ৫০ পিচ পলো নিয়ে আসছি। এক ঘণ্টার মধ্যেই সব শেষ। দামও পেয়েছি ভালোই।”

আয়োজকরা জানান, শত বছর ধরে এই বিলে মাছ ধরার উৎসব চলে আসছে। আগের মত মাছ না পেলেও মানুষের অনেক উৎসাহ রয়েছে মাছ শিকারে। এবারের উৎসবে জেলার শিবালয়, হরিরামপুর, দৌলতপুর, সাটুরিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় দুই হাজার মাছ শিকারী এসেছেন। আগামী বছরে আরো বড় পরিসরে এই আয়োজন করা হবে।

Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge, BARCIK is a non-governmental non-profit development organization. Established in 1997 by a group of development practitioners, researchers and social workers, BARCIK has been working in the fields of environment and development with utmost commitment and purpose. Registered with the NGO Affairs Bureau under the Prime Minister’s Office, Government of Bangladesh, to operate foreign funds.