সাম্প্রতিক পোস্ট

নিরাপদ পানি পাওয়ার অধিকার সবার

উপকুলীয় অঞ্চল থেকে বাবলু জোয়ারদার
বিশ্ব যুব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আজকের এই ‘লবণ পানির আগ্রাসন থেকে মিষ্টি পানির পুকুর বাঁচাও শীর্ষক নাগরিক সংলাপের আয়োজন করে পরিবেশবাদী বেসরকারী গবেষণা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান বারসিক। যুব দিবসের প্রতিপাদ্য (Intergenerational Solidarity: Creating a World for All Ages) আন্তঃপ্রজন্মের প্রতি সংহতি জানিয়ে সকল বয়সের মানুষের উপযোগি একটি বিশ্ব ব্যবস্থা গড়ে তুলি। আমরা সকলেই জানি বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, অধিক জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদের উপর অধিকমাত্রায় নির্ভরশীলতা, দুর্বল অবকাঠামো এই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় সংঘটিত সাইক্লোন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙ্গন, জলবদ্ধতার পাশাপশি উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতিনিয়ত ভেড়িবাঁধ ভাঙনে কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠি। প্রাকৃতিক ও মানব সৃষ্ট কারণে কৃষি জমিতে লবণ পানির অনুপ্রবেশের কারণে এলাকায় কৃষিকাজ কমে যাচ্ছে ফলে নারী ও পুরুষের আয় বর্ধনমূলক কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে। ফলে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের কাজের সন্ধানে বছরের বেশির ভাগ সময় এলাকার বাইরে থাকতে হয়।

আমরা সকলেই জানি সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় প্রতিবছর গাবুরা, পদ্মপুকুর, কাশিমাড়ি, আটুলিয়া ও বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের মানুষ নদীর বাঁধ ভাঙনের শিকার হন। এর ফলে লবণ পানি প্রবেশ করে তাদের ফসলের জমি, চিংড়ি ও কাকড়া ঘের, বাড়িতে উৎপাদিত শাকসবজি, গাছপালা, মিষ্টি পানির মাছ, পানি খাওয়ার পুকুর, গবাদি পশু-পাখি, হাঁস, মুরগি ঘরবাড়ি এবং পরিবারে প্রয়োজনীয় উপকরণ তারা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। খাবার পানি সংগ্রহের দায়িত্ব যেহেতু পরিবারের নারী সদস্যদের, তাই তাদের পানি সংগ্রহের জন্য অনেক দুরের কোন পুকুর বা ফিল্টার থেকে পানি সংগহ করতে হয়। এই পানি সংগ্রহ নিয়ে অনেক সময় নানান ধরনের বিবাদ তৈরি হয় যা থেকে বড় ধরণের সংঘাত তৈরি হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা এবং মাত্রা দিন দিন আরো বেড়েই চলেছে। ফলে উপকূলীয় এলাকার মানুষ এইসব দুর্যোগের কারণে বারবার তাদের সম্পদ হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। উপকূলীয় এলাকার বাঁধের মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দেখাশোনার দায়িত্ব যেহেতু পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের। ফলে জলবাযু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট দুর্যোগের ফলে বাঁধের কোন সমস্যা হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের সাথে এলাকার মানুষের সাথে ভূল বোঝাবুঝি ও দ্বন্দ্ব সংঘাতের মত সমস্যা তৈরি হয় যা এলাকার মানুষের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে। যদিও চিংড়ি ঘেরের পানি তোলার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই ঘের মালিকরা বাঁধ ছিদ্র করে লবণ পানি উত্তোলন করে বাঁধের প্রতিরোধের ক্ষমতাকে দূর্বল করে দেয়।

আজ সকাল ১০টায় শ্যামনগর অফিসার্স ক্লাবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আক্তার হোসেনের সভাপতিত্বে বারসিক’র কর্মসুচি কর্মকর্তা গাজী আল ইমরানে সঞ্চালনায় নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউল হক দোলন, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান খালেদা আইযুব ডলি, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান গাজী আব্দুর রউফ ইউপি সদস্যা উমা রানী মল্লিক। নাগরিক সংলাপের ধারনাপত্র উপস্থাপন করেন বারসিকের কর্মসুচি কর্মকর্তা বাবলু জোয়ারদার।

নাগরিক সংলাপে উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউল হক দোলন বলেন, ‘জলে কুমির ডাঙায় বাঘ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ এই তিনটি নিয়ে আমরা উপকূলীয় এলাকায় বসবাস করি। আমি সব সময় আমার এলাকার মানুষের পাশে থাকি । তাদের সমস্যাও বুঝি। আমরা চেষ্টা করবো এলাকায় কিছু বড় পুকুর থেকে লবণ পানি অপসারণ করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করার।’ উপজেলা পরিষদের সাথে সার্বক্ষণিক স্থানীয় সরকারকে যোগাযোগ রাখার অনুরোধ জানান।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার আক্তার হোসেন বলেন, ‘প্রায়শই বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন ভেড়িবাঁধ ভাঙনের মুখোমুখি হচ্ছে। বর্তমানে নদীর তলদেশ উচু হয়ে যাচ্ছে। বুষ্টির পানি সংরক্ষণে পানির ট্যাংক ও পিএসএফ সহযোগিতা করার কাজ চলমান আছে। আগামী এডিপির প্রকল্পে সিংহভাগ আমরা পানির জন্য খরচ করবো। এলাকায় যতগুলো মিষ্টি পানির খাল যেগুলো ইজারা আছে সেগুলো স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে ইজারা বাতিল করে মিষ্টি পানির মাছ সংরক্ষণ করা হবে। সরকারের পক্ষ থেকে স্থানীয় মানুষের পাশে থাকার সব সময় চেষ্টা করছি।’
স্থানীয় জনগোষ্ঠি মলিনা রানী রপ্তান, জোৎসনা রানী মন্ডল যুব সংগঠক প্রদীপ বলেন, ‘বার বার নদীর বাঁধ ভাঙনের ফলে লবণ পানির কারণে নারীদের মাসিকসহ নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। গায়ের রং কালো হয়ে যাচ্ছে। পুকুরের লবণ পানি অপসারণ করে মিষ্টি পানি সংরক্ষণ করতে হবে। নদী ভাঙনের হাত থেকে মিষ্টি পানির পুকুরগুলো যদি বাঁচানো যেত তাহলে আমরা একটু বাঁচতে পারতাম।’

ইউপি সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান গাজী আব্দুর রউফ, উমা রানী বলেন, ‘নদীভাঙনের ফলে আমাদের মিষ্টি পানির পুকুর লবণ পানিতে ডুবে গেছে। রাস্তাঘাট সব নষ্ট হয়ে গেছে। নারীদের পানি সংগ্রহ করতে অনেক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এলাকায় কিছু বড় পুকুর থেকে লবণ পানি অপসারণ করে বুষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে হবে। এলাকায় অনেকেই আ্যাসবেষ্টার্স এর পানি ধরে সংরক্ষণ করে রাখছেন এটা আমাদের স¦াস্থ্যের জন্য অনেক ক্ষতি হচ্ছে। আমাদের এলাকায় বড় বড় পুকুরগুলো পুনঃখনন ও পাড় উচু করে পানি সংরক্ষন করতে হবে।’

লবণ পানির আগ্রাসন ঠেকাও নাগরিক সংলাপে আরো উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা জনসংগঠন সম্বনয় কমিটির সভাপতি শেখ সিরাজুল ইসলাম, বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী রামকৃষœ জোয়ারদার, কর্মসুচি কর্মকর্তা বিশ^জিত মন্ডল, রুবিনা পারভীন যুব প্রতিনিধি, স্থানীয় জনগোষ্ঠি ও সাংবাদিকবৃন্দ।

উল্লেখ্য যে, সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় প্রতিবছর নদীর বাঁধ ভেঙে লবণ পানিতে প্লাবিত হয়। ২০২১ সালে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতে আবার ২০২২ সালের জুলাই মাসে বুড়িগোয়ালিনি ইউনিয়নের ভেড়িবাঁধ ভেঙে মানুষের সবকিছু লবণ পানিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। চোখের নিমিষে পানিতে ভেসে যায় ছোট বড় মিলিয়ে আনুমানিক প্রায় ২০০০ একর (৬০০০ বিঘা জমি) ৪৯০টি চিংড়ি মাছের ঘের, খাবার পানির ২৪টি পুকুর, সবুজে ঘেরা প্রতিটি বাড়িতে উৎপাদিত অসংখ্য সবজি বাগান, হাস মুরগি, বাগ-বাগিচা, অসংখ্য কাঠ, ওষধি এবং ফলের গাছ, ঘরবাড়িসহ অসংখ্য স্থাপনা যার আনুমানিক আর্থিক মূল্য প্রায় ২.৫ কোটি টাকা। বার বার লবণ পানির আগ্রাসনের ফলে মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে ফলে মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তু গয়ে গ্রাম ছেড়ে বিভিন্ন্ শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমরা যারা আক্রান্ত তাদের জন্য বিশ্ববাসীর নিকট জলবায়ুর ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার জন্য দাবি জানাই। আমরা আশা করছি এখানে উপস্থিত দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ, সাংবাদিক ভাইয়েরা, যুব সমাজ সবাই মিলে এই সমস্যার সমাধান করতে পারব। এবং এই জলবায়ু সংকটের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগের ন্যায় বিচার বিশ্ববাসীর কাছে মিডিয়ার কাছে তুলে ধরে তা নিশ্চিত করতে পারব।

happy wheels 2

Comments

%d bloggers like this: